গণমানুষের চলচ্চিত্রকার মৃণাল সেন

বাংলা চলচ্চিত্রকে তিনি নিয়ে গেছেন বিশ্ব কাতারে, অথচ মনে প্রাণে তিনি আজীবন ছিলেন বাঙালি। তার চলচ্চিত্র কথা বলতো গণমানুষের, শোষিত মানুষ, দুর্ভিক্ষ, অভাব, সংগ্রাম, জীবনের বাস্তবতার চরম উপলব্ধির। যিনি ভেঙে দিয়েছিলেন চলচ্চিত্র নির্মাণের সব ব্যাকরণ। চলচ্চিত্রে তিনি সৃষ্টি করলেন নিজস্ব ধারা, নিজস্বতার ধাঁচ আর চলচ্চিত্র নির্মাণের অনন্য কৌশল। বাংলায় চলচ্চিত্র নির্মাণকে তিনি নিয়ে গেছেন শিল্পের কাতারে। তার চলচ্চিত্র হয়ে উঠল চিরন্তন সমাজের অনবদ্য ভাষ্য। তাই তো মৃণাল সেন নামটা উচ্চারণ করলে চোখের সামনে ভাসে আজন্ম অপ্রতিরোধ্য এক চলচ্চিত্র স্রষ্টার কথা।
মৃণাল সেন। ছবি: সংগৃহীত

বাংলা চলচ্চিত্রকে তিনি নিয়ে গেছেন বিশ্ব কাতারে, অথচ মনে প্রাণে তিনি ছিলেন বাঙালি। তার চলচ্চিত্র কথা বলতো গণমানুষের, শোষিত মানুষ, দুর্ভিক্ষ, অভাব, সংগ্রাম, জীবনের বাস্তবতার চরম উপলব্ধির। যিনি ভেঙে দিয়েছিলেন চলচ্চিত্র নির্মাণের সব ব্যাকরণ। চলচ্চিত্রে তিনি সৃষ্টি করলেন নিজস্ব ধারা, নিজস্বতার ধাঁচ আর চলচ্চিত্র নির্মাণের অনন্য কৌশল। বাংলায় চলচ্চিত্র নির্মাণকে তিনি নিয়ে গেছেন শিল্পের কাতারে। তার চলচ্চিত্র হয়ে উঠল চিরন্তন সমাজের অনবদ্য ভাষ্য। তাই তো মৃণাল সেন নামটা উচ্চারণ করলে চোখের সামনে ভাসে আজন্ম অপ্রতিরোধ্য এক চলচ্চিত্র স্রষ্টার কথা।

মৃণাল সেনের জন্ম ১৯২৩ সালের ১৪ মে ফরিদপুর শহরের ঝিলটুলি মহল্লার এক বৈদ্যব্রাহ্মণ পরিবারে। তার বাবা দীনেশ সেন ছিলেন আইনজীবী, স্বদেশী, কংগ্রেসি ও বিপ্লবী বিপিনচন্দ্র পালের ঘনিষ্ঠ। তাদের বাড়িতে নিয়মিতই বিপ্লবীদের আনাগোনা ছিল। নেতাজী সুভাসচন্দ্র বসু দুবার  তাদের বাড়িতে আত্মগোপন করে ছিলেন। দীনেশ সেন নিজের গাঁটের টাকায় বিপ্লবীদের মামলা লড়তেন, কারাগার থেকে জামিনের ব্যবস্থা করতেন। কেবল রাজনীতিবিদেরাই নন, তাদের বাড়িতে আসতেন কাজী নজরুল ইসলাম, জসীমউদদীনের মতো বিখ্যাত কবিরা। ত্রিশের দশকে গান্ধীর আমরণ অনশনের সময় ফরিদপুরের আইনজীবীদের নিয়ে আদালত বর্জন করেছিলেন দীনেশ সেন। এজন্য তৎকালীন জেলা প্রশাসক তার কাছে কৈফিয়ত চাইলে দীনেশ সেন সেই কৈফিয়ত দেওয়া তো দূরের কথা ভেবে দেখার প্রয়োজনও বোধ করেননি। এজন্য অবশ্য তাকে ব্রিটিশ সরকারের  শাস্তিও পেতেও হয়েছিল।

মৃণাল সেনের মা ছিলেন স্বাধীনতা অনুরাগী স্বশিক্ষিত। ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনের জনসভায় উদ্বোধনী গান গাইতেন তার মা। মাকে নিয়ে স্মৃতিকথায় লিখেছিলেন মৃণাল সেন, ‘‘তখন দেখেছি কত অসংখ্য লোক আসতেন আমাদের বাড়িতে। আসতেন সে-সব লোক, যাঁরা সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত, যাঁদের পুলিশ খুঁজে বেড়াচ্ছে। ফলে আমাদের বাড়িতে ক্ষণে ক্ষণে পুলিশের তল্লাশি চলতে লাগল। কী করে মানুষ পালিয়ে বেড়ায় এটা আমি খুব ছেলেবেলা থেকে দেখে আসছি। মানুষ ভয় পেয়ে পালায়, একজন মানুষ অনেক মানুষের জন্যেই পালায়। ছোটবেলা থেকেই আমি পুলিশ চিনেছি।’’

সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে মৃণাল সেন

মৃণাল সেনের প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার হাতেখড়ি হয় ফরিদপুরের ঈশান স্কুলে ১৯২৯ সালে। স্কুলে থাকা অবস্থায় তাদের বাড়িতে প্রায়ই আসতেন তার বড় দাদার বন্ধু পল্লীকবি জসীমউদদীন। মৃণাল সেনরা তাকে ডাকতেন "সাধুদা" বলে। একবার তার বড়দা তার বন্ধুর একটি কবিতা তার বাবাকে পড়তে দিলেন। দশ লাইনের কবিতাটি পড়ে মৃণাল সেনের বাবা বললেন "ভালো হয়েছে কবিতাটি। কিন্তু অনেক বানান ভুল।" সেটি আদতে ছিল জসীমউদদীনের বিখ্যাত  "কবর" কবিতার প্রাথমিক খসড়া। তার মা কবিকে সন্তানের মতো স্নেহ করতেন। এই স্কুলে পড়াবস্থায় কৈশোরে এক মিছিলে  ব্রিটিশবিরোধী স্লোগান দেওয়ার অপরাধে কিশোর মৃণাল সেনকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। এরপর তার বাবা থানা থেকে তাকে ছাড়িয়ে নিয়ে আসেন।

ঈশান স্কুল থেকে দ্বিতীয় বিভাগে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর মৃণাল সেন ভর্তি হলেন ফরিদপুরের বিখ্যাত রাজেন্দ্র কলেজে। ১৯৪৩ সালে রাজেন্দ্র কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পড়ার পর কলকাতা চলে গেলেন মৃণাল সেন। ভর্তি হলেন স্কটিশ চার্চ কলেজে। স্কটিশ চার্চ কলেজে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে অনার্স পড়ার সময় আন্দোলনে উত্তাল চল্লিশের দশকের কলকাতায় বামপন্থার অমোঘ আকর্ষণে কমিউনিস্ট পার্টির সংস্পর্শে আসেন মৃণাল সেন। অবশ্য ছাত্রাবস্থায় কমিউনিস্ট পার্টির সাংস্কৃতিক শাখার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি, কিন্তু তখনো কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হননি। কলকাতায় কলেজে থাকার সময় তিনি সদস্য হয়েছিলেন গণনাট্য সংঘেরও।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে স্নাতকোত্তর পাশ করার আগেই  মৃণাল সেন পুরোদস্তুর জড়িয়ে পড়লেন বামপন্থী রাজনীতিতে। স্নাতকোত্তর শেষে যোগ দিলেন সাংবাদিকতায়। সেখানেও স্বস্তি না পেয়ে যোগ দিলেন এক ওষুধ কোম্পানিতে ওষুধ বিপণনকারী হিসেবে। কিন্তু সেখানে বেশি দিন টেকেননি মৃণাল সেন। অবশেষে চলচ্চিত্রের শব্দ প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দেয়ার পরেই তার স্বস্তি এসেছিল।

মৃণাল সেনের চলচ্চিত্রে পরিচালক হিসেবে হাতেখড়ি হয় "রাত ভোর"  চলচ্চিত্র দিয়ে। স্বরাজ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাহিনীতে এই চলচ্চিত্রের প্রযোজনা করেছিল এস. বি. প্রোডাকশন্স। মজার বিষয় হলো এই চলচ্চিত্র নির্মাণে আর্থিকভাবে কোনো বেগ পেতে হয়নি মৃণাল সেনকে। চলচ্চিত্রের আগে  গণনাট্য, স্টুডিয়ো-তে ট্রেড ইউনিয়ন ইত্যাদির সঙ্গে নিজেকে জড়িয়েও মৃণাল সেন চলচ্চিত্র সংক্রান্ত লেখালেখির কাজও চালিয়ে যাচ্ছিলেন৷

১৯৫৫ সালের ২১ অক্টোবর মুক্তি পেল মৃণাল সেনের প্রথম পরিচালিত চলচ্চিত্র  "রাত-ভোর"। উত্তম কুমার ও সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় জুটি বেঁধে অভিনয় করেছিলেন এই চলচ্চিত্রে। ছিলেন বিখ্যাত অভিনেতা ছবি বিশ্বাসও।  যদিও এই চলচ্চিত্রটি তেমন একটা সাফল্য পায়নি। এই চলচ্চিত্র নিয়ে বেশ হতাশও ছিলেন তিনি।

মৃণাল সেনের দ্বিতীয় চলচ্চিত্র "নীল আকাশের নিচে" মুক্তি পায় আরও তিন বছর পরে। "নীল আকাশের নিচে" চলচ্চিত্র মোটামুটি বেশ সাড়া  ফেলেছিল। এই চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছিলেন বিখ্যাত অভিনেতা উৎপল দত্ত। অনেক চলচ্চিত্র বোদ্ধা বলে থাকেন এটিই ছিল মৃণাল সেনের শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র। এই চলচ্চিত্রে ব্রিটিশ ভারতের শেষ দিককার পটভূমিকায় কলকাতায় সমাজের নানা স্তরের মানুষের জীবন তুলে ধরা হয়েছিল। যেখানে ফেরিওয়ালা ও বাসন্তী নামের এক নারীর মধ্যে প্রেম চিত্রায়িত করা হয়েছে। এই চলচ্চিত্রে ভারত সরকারের সেন্সর কর্তৃপক্ষ প্রথমে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল। এটিই ছিল ভারতের প্রথম নিষেধাজ্ঞা পাওয়া চলচ্চিত্র। যদিও দুমাস পরে এই চলচ্চিত্রের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছিল। মৃণাল সেনের দ্বিতীয় চলচ্চিত্র "বাইশে শ্রাবণ" মুক্তি পেয়েছিল ১৯৬০ সালে। এই চলচ্চিত্রই আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত করে তোলে মৃণাল সেনকে। এই চলচ্চিত্র নির্মাণ নিয়ে ভীষণ তৃপ্তি পেয়েছিলেন মৃণাল সেন। তিনি বলেছিলেন,  ‘আমার তৃতীয় ছবি “বাইশে শ্রাবণ” আমাকে তৃপ্তি দেয়। অসাধারণ কিছু নয়, তবু এই ছবি আমার একান্ত আপন। দুর্ভিক্ষের করাল প্রভাবে কীভাবে মানুষের সুকুমার প্রবৃত্তি নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল, সেটি তুলে ধরাই ছিল আমার উদ্দেশ্য। এটা এক দুর্বিষহ সময়ের নিষ্ঠুর ছবি। স্বাভাবিকভাবেই এই ছবি বাণিজ্যিক সাফল্যের মুখ দেখেনি। তা সত্ত্বেও “বাইশে শ্রাবণ”-এর এক অন্তর্লীন জোরের শক্তি আমার ভবিষ্যৎ চলচ্চিত্রের প্রেরণা। আমি নিয়মিত ছবি করা শুরু করলাম।’

মৃণাল সেন পরিচালিত ‘বাইশে শ্রাবণ’ চলচ্চিত্রের একটি দৃশ্য

"বাইশে শ্রাবণ" চলচ্চিত্রে উঠে এসেছিল প্রত্যন্ত এক গ্রামের অজস্র সমস্যার কথা। যেখানে এসেছিলো তেতাল্লিশের দুর্ভিক্ষ, অভাবের গল্প। এরপর একাধারে মুক্তি পেয়েছিল মৃণাল সেনের চলচ্চিত্র পুনশ্চ, অবশেষে, প্রতিনিধি, আকাশ কুসুম। ১৯৬৫ সালে "কাঁচ কাটা হীরে" চলচ্চিত্র পরিচালনার মধ্য দিয়ে হিন্দি চলচ্চিত্রে অভিষেক ঘটে মৃণাল সেনের।

আর এর পরের বছর মাটির মনীষা চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়ে ওড়িয়া ভাষার চলচ্চিত্রে অভিষেক হয়েছিল মৃণাল সেনের। ১৯৬৯ সালে মুক্তি পেল মৃণাল সেনের বিখ্যাত হিন্দি চলচ্চিত্র "ভুবন সোম"। ভুবন সোমকে ভারতীয় নতুন ধারার চলচ্চিত্রের পথিকৃৎ বলা হয়। ভুবন সোম শ্রেষ্ঠ অভিনেতা, শ্রেষ্ঠ পরিচালক ও শ্রেষ্ঠ কাহিনীকার এই তিনটি শাখায় ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছিল। এই চলচ্চিত্রে শ্রেষ্ঠ পরিচালক হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছিলেন মৃণাল সেন।

মুক্তিযুদ্ধের বছর মুক্তি পেয়েছিল মৃণাল সেনের বিখ্যাত চলচ্চিত্র ইন্টারভিউ। যে চলচ্চিত্রে মৃণাল সেন তুলে ধরেছিলেন কলকাতার এক সাধারণ তরুণের চাকরির সাক্ষাৎকার প্রসঙ্গ। "ইন্টারভিউ" ছিল মৃণাল সেনের কলকাতা ত্রয়ীর প্রথম চলচ্চিত্র।

একই বছর মুক্তি পেয়েছিল মৃণাল সেনের কলকাতা ত্রয়ীর বিখ্যাত চলচ্চিত্র কলকাতা ৭১। চলচ্চিত্রটি ছিল চারটি আলাদা আলাদা গল্পের সমষ্টি। সমরেশ বসু, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রবোধ সান্যাল ও মৃণাল সেনের চারটি গল্পের ওপর ভিত্তি করে চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করা হয়েছিল। কলকাতা ত্রয়ীর শেষ চলচ্চিত্র ছিল "পদাতিক"। পদাতিক মুক্তি পেয়েছিল ১৯৭৩ সালে। চলচ্চিত্রটির কাহিনীকার মৃণাল সেন স্বয়ং ও আশীষ বর্মণ।  মৃণাল সেন যখন কলকাতা ত্রয়ী নির্মাণ করছেন তখন সত্যজিৎ রায় নির্মাণ করছেন তার কলকাতা ত্রয়ী চলচ্চিত্র প্রতিদ্বন্দ্বী, সীমাবদ্ধ ও জন অরণ্য। কলকাতা ত্রয়ীর তিন চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়ে মৃণাল সেন তৎকালীন কলকাতার অস্থির অবস্থাকে তুলে ধরেছিলেন।

আর মধ্যবিত্ত সমাজের নীতিবোধকে মৃণাল সেন তুলে ধরেন ১৯৭৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত তার বিখ্যাত চলচ্চিত্র "এক দিন প্রতিদিন" এ। মধ্যবিত্ত পরিবারের এক কর্মজীবী মেয়ে মেয়ে চিনু। একদিন সে রাতে বাড়ি ফিরতে পারে না। সেই রাতে গোটা পরিবারের উৎকণ্ঠা, ভয় আতঙ্ক সবমিলিয়ে একটি মেয়ের পরিবার যে কলকাতা শহরে কতোটা অসহায় তা তুলে ধরা হয়েছে। একদিন প্রতিদিন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছিল তিনটি বিভাগে। সেবার শ্রেষ্ঠ  পরিচালক নির্বাচিত হয়েছিলেন মৃণাল সেন। এর পরের বছর মুক্তি পেয়েছিল মৃণাল সেনের আরেক বিখ্যাত চলচ্চিত্র “আকালের সন্ধানে”। আকালের সন্ধানে চলচ্চিত্রে দেখা যায় একটি চলচ্চিত্রের কলাকুশলীরা শুটিংয়ের জন্য দল বেঁধে একটি গ্রামে আসে।  চলচ্চিত্রটির বিষয়বস্তু ছিল তেতাল্লিশের মন্বন্তর।

ডিম্পল কপাড়িয়াকে ‘অন্তরীন’ চলচ্চিত্রে শট বুঝিয়ে দিচ্ছেন মৃণাল সেন

দেখা যায় ১৯৪৩ সালের সাথে চলচ্চিত্র নির্মাণের সাল তথা ১৯৮০ সালের ঘটনার অদ্ভুত একটা সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে। এরই সাথে জড়িয়ে যায় একজন গ্রামের মহিলার ভাগ্য। যার দৃষ্টিভঙ্গি চলচ্চিত্রে একটি আলাদা মাত্রা যোগ করে। তা হলো ভবিষ্যৎ। এই অবস্থাটি ছিল আকালের সন্ধানীদের কাছে খুবই অনভিপ্রেত একটি অবস্থা। আকালের সন্ধানে মৃণাল সেনের সবচেয়ে বিখ্যাত চলচ্চিত্রগুলোর একটি। এই চলচ্চিত্র ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার তো পেয়েছিলই, পেয়েছিল বিশ্বখ্যাত বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবে সিলভার বিয়ার।

মৃণাল সেনের সবচেয়ে বিখ্যাত চলচ্চিত্র বলা যায় খারিজ'কে। খারিজ মুক্তি পেয়েছিল ১৯৮২ সালে। খারিজ চলচ্চিত্রের কাহিনীর প্রখ্যাত সাংবাদিক ও সাহিত্যিক রমাপদ চৌধুরী। খারিজ চলচ্চিত্র মুক্তি পেয়েছিল ১৯৮২ সালে। এই চলচ্চিত্র বিশ্বখ্যাত কান চলচ্চিত্র পুরস্কারে পেয়েছিলো বিশেষ জুরি পুরস্কার। শিকাগো চলচ্চিত্র উৎসব পেয়েছিল ব্রোঞ্জ হুগো পুরস্কার আর ভ্যালাডয়েড চলচ্চিত্র উৎসবে গোল্ডেন স্পাইক পুরস্কার।

মৃণাল সেনের পরবর্তীকালের চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র ছিল ১৯৯২ সালে মুক্তি পাওয়া মহা পৃথিবী ও ১৯৯৪ সালে মুক্তি পাওয়া অন্তরীন। মৃণাল সেনের সর্বশেষ চলচ্চিত্র "আমার ভুবন" মুক্তি পেয়েছিল ২০০২ সালে।

বাংলা চলচ্চিত্রে সবচেয়ে প্রভাব বিস্তার করে আছেন যে তিন চলচ্চিত্রকার তাদের মধ্যে অন্যতম মৃণাল সেন। আবার সত্যজিৎ, ঋত্বিক, মৃণাল বাংলা চলচ্চিত্রের এই তিন পুরোধার মধ্যে সবচেয়ে বেশি সময় কর্মব্যাপ্তি ছিল মৃণাল সেনের। ৪৭ বছরের চলচ্চিত্র পরিচালনার জীবনে মৃণাল সেন নির্মাণ করেছেন ৩১টি চলচ্চিত্র। কেবল বাংলা ভাষাই নয়, বাংলার পাশাপাশি তিনি  চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন হিন্দি, ওড়িয়া, তেলেগু ভাষায়।

মৃণাল সেন তো কেবল একজন নিছক চলচ্চিত্রকারই ছিলেন না। কিংবা তার চলচ্চিত্র কেবলই নিছক চলচ্চিত্র ছিল না। মৃণাল সেন ছিলেন চলচ্চিত্র আন্দোলন থেকে সাংস্কৃতিক আন্দোলন, সমাজ ও রাজনীতির অন্যতম শ্রেষ্ঠ পুরোধা। যিনি সমাজ, রাজনীতি, সংস্কৃতি, গণ মানুষের ভাষ্য সমস্ত কিছুকে বিবেচনা করতেন চলচ্চিত্রের দলিল হিসেবে। মৃণাল সেনের চলচ্চিত্রের সবচেয়ে শক্তিশালী যে দিক তা হলো গল্পের বাস্তবতা। কাল্পনিক কোনো গল্পের স্থান ছিল না মৃণাল সেনের চলচ্চিত্রে। অতি সাধারণ মানুষের জীবনের গল্প, পারিপার্শ্বিক অবস্থান, রাজনীতির চিরন্তন বাস্তবতা, অভাব দৈনন্দিন চিত্র, মানুষের পরিভাষাই ছিল মৃণাল সেনের চলচ্চিত্রের গল্প। যে গল্পগুলো সচেতনভাবেই বেশিরভাগ চলচ্চিত্রকাররা এড়িয়ে চলেন। মৃণাল সেন কিংবা ঋত্বিক ঘটকের মতো চলচ্চিত্রকারেরা সেখানে ছিলেন ব্যতিক্রম। 

কেবল চলচ্চিত্রই নয়, মৃণাল সেন ছিলেন একাধারে চলচ্চিত্র বোদ্ধা, লেখক, চলচ্চিত্র সমালোচকও। তিনি তার লেখায় এনেছেন প্রান্তিক মানুষের জীবনের গল্প। তথাকথিত মানুষেরা যাদের খোঁজ নিতে চান না। এতো বিখ্যাত চলচ্চিত্র স্রষ্টা হয়েও আজীবন নিজের আদর্শ আর গভীর সমাজ ভাবনায় ও চিন্তায় অটুট ছিলেন মৃণাল সেন। তার চলচ্চিত্র নিয়ে তিনি নিজেই বলেন, "আমি অন্যদের মতো কাহিনিনির্ভর ছবি তৈরি করিনি। ডকুমেন্টারি ফিল্মমেকার আমি নই। আমার সিনেমা জ্ঞান ও প্রমাণ দিয়ে বুঝতে হবে।"

গতকাল ১৪ মে ছিল কিংবদন্তি চলচ্চিত্রকার মৃণাল সেনের ৯৮তম জন্মদিন। বিনম্র চিত্তে স্মরণ করি উপমহাদেশের চলচ্চিত্রের এই মহীরুহকে।

তথ্যসূত্র-

ডকুমেন্টারি ফিল্মমেকার আমি নই: মৃণাল সেন/ নাসির আলী মামুন।

আনন্দলোক মৃণাল সেন স্মরণ সংখ্যা ২০১৯

তৃতীয় ভুবন/ মৃণাল সেন

Always Being Born: Recipient Of Dadasaheb Phalke Award Mrinal Sen A Memoir by Mrinal Sen

Mrinal Sen An unrevealed mystery pride of Bengal/ Professor  Soumik Kanti Ghosh

 

আহমাদ ইশতিয়াক [email protected]

আরও পড়ুন:

সাদত হাসান মান্টো: এক নির্মম কথাশিল্পী

কিংবদন্তি কথাসাহিত্যিক আলাউদ্দিন আল আজাদ

সাহিত্যে আবুল মনসুর আহমেদ আজও প্রাসঙ্গিক

ঢাকায় সত্যজিৎ রায়

 

Comments

The Daily Star  | English

Create right conditions for Rohingya repatriation: G7

Foreign ministers from the Group of Seven (G7) countries have stressed the need to create conditions for the voluntary, safe, dignified, and sustainable return of all Rohingya refugees and displaced persons to Myanmar

1h ago