নিয়ম ভেঙেছেন সাবেক উপাচার্য সোবহান

রাবি উপাচার্যের নিয়োগ দুর্নীতি: ব্যবস্থা নিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সুপারিশ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সদ্যবিদায়ী উপাচার্য অধ্যাপক এম আব্দুস সোবহানের ‘অনিয়ম’ তদন্তের জন্য গঠিত কমিটির প্রতিবেদন অনুসারে, তিনি সংবিধান ও বিশ্ববিদ্যালয় আইন লঙ্ঘন করার পাশাপাশি সরকারি নির্দেশ উপেক্ষা করে তার শেষ কর্মদিবসে ১৩৭ জন শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দিয়েছেন।
Abdus Sobhan.jpg
রাবির সদ্যবিদায়ী উপাচার্য অধ্যাপক আবদুস সোবহান। ছবি: সংগৃহীত

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সদ্যবিদায়ী উপাচার্য অধ্যাপক এম আব্দুস সোবহানের ‘অনিয়ম’ তদন্তের জন্য গঠিত কমিটির প্রতিবেদন অনুসারে, তিনি সংবিধান ও বিশ্ববিদ্যালয় আইন লঙ্ঘন করার পাশাপাশি সরকারি নির্দেশ উপেক্ষা করে তার শেষ কর্মদিবসে ১৩৭ জন শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দিয়েছেন।

তদন্ত কমিটির সদস্য ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, সদ্য বিদায়ী এই উপাচার্য ‘শাস্তিযোগ্য অপরাধের’ সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

গতকাল রোববার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে এই তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। যেখানে তার বিদেশযাত্রার ব্যাপারেও নিষেধাজ্ঞার সুপারিশ করা হয়েছে।

তদন্ত কমিটির প্রধান ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সদস্য অধ্যাপক মুহাম্মদ আলমগীর গতকাল দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘আমরা তদন্ত প্রতিবেদনটি জমা দিয়েছি।’

আর কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান তিনি।

এ বিষয়ে কথা বলার জন্য গতকাল বিকেলে অধ্যাপক সোবহানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সাড়া দেননি তিনি।

আব্দুস সোবহান শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দেওয়ার পর মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ গত ৬ মে চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। 

ওই দিন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই উপাচার্য অ্যাডহক ভিত্তিতে নয় জন শিক্ষক, ২৪ জন অফিস সহকারী, ১৯ জন সেকশন অফিসার এবং ৮৫ জন তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীকে নিয়োগ দেন।

ওই নিয়োগকে কেন্দ্র করে বিশৃঙ্খলা তৈরি হওয়ার পাশাপাশি ক্যাম্পাসে দিনভর সংঘর্ষ চলে।

দুপুর নাগাদ নিয়োগের খবর ছড়িয়ে পড়লে নিয়োগপত্র নিতে আসা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিট ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা নিয়োগের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া মহানগর ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ান।

গত বছরের ২০ ডিসেম্বর বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের এক তদন্ত রিপোর্টে সোবহানসহ অন্যদের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগের প্রমাণের ভিত্তিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সব ধরনের নিয়োগের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা জারি করে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও তদন্ত কমিটির সদস্যরা বলছেন, আব্দুস সোবহান যে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও প্রবিধানের পাশাপাশি সংবিধানের ২৯ (১) নম্বর অনুচ্ছেদ লঙ্ঘন করেছেন তার প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত কমিটি। সংবিধানের এই অনুচ্ছেদে বলা আছে, প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ লাভের ক্ষেত্রে সব নাগরিকের সুযোগের সমতা থাকবে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘এটা একটা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এবং সোবহানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’

ওই কর্মকর্তার ভাষ্য, ‘সোবহানের বিরুদ্ধে ঠিক কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া উচিত তা তদন্ত কমিটি নির্দিষ্ট করেনি। কিন্তু সুষ্ঠু বিচার প্রক্রিয়ার জন্য তার বিদেশযাত্রার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা উচিত বলে সুপারিশ করা হয়েছে।’

তদন্ত কমিটির এক কর্মকর্তা বলেন, ‘তদন্ত কমিটি দেখেছে যে ১৩৭ নিয়োগের বিপরীতে মাত্র নয় জনের জীবন ‍বৃত্তান্ত জমা পড়েছে। যা একটা অভূতপূর্ব ঘটনা।’

এর আগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে দুর্নীতি ও অনিয়মের সঙ্গে তৎকালীন উপাচার্য ও উপ-উপাচার্যের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পায় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের তদন্ত কমিটি। গত বছরের অক্টোবরে এ সংক্রান্ত একটা প্রতিবেদন শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে জমা দেওয়া হয়।

ওই তদন্ত প্রতিবেদনে মঞ্জুরী কমিশন উপাচার্য আব্দুস সোবহান ও উপ-উপাচার্য চৌধুরী এম জাকারিয়াসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করে।

প্রতিবেদনে একই সঙ্গে ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি শিথিল করে’ নিয়োগ দেওয়া ৩৪ জন শিক্ষকের নিয়োগ বাতিলের সুপারিশও করা হয়।

ওই ৩৪ জন শিক্ষকের মধ্যে দুজন ছিলেন উপাচার্যের মেয়ে ও জামাই। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, অন্যদের সঙ্গে যোগসাজশ করে নিজের মেয়ে ও জামাইয়ের নিয়োগের জন্যও উপাচার্য নিয়োগ বিধি শিথিল করেছেন।

ডিসেম্বরে শিক্ষা মন্ত্রণালয় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সব ধরনের নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত করে।  এ ছাড়া আব্দুস সোবহানের মেয়ে ও জামাইয়ের নিয়োগ কেন বাতিল হবে না এই মর্মে সাত দিনের মধ্যে তার ব্যাখ্যা জানতে চায় মন্ত্রণালয়।

এ ছাড়া শিক্ষা মন্ত্রণালয় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অনিয়ম তদন্তে সহযোগিতা না করার জন্য আলাদা আদেশে রেজিস্ট্রার পদ থেকে অধ্যাপক আব্দুল বারিকে অপসারণের জন্য উপাচার্য আব্দুস সোবহানকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলে।

গত বছরের অক্টোবর মাসে আব্দুস সোবহান সংবাদ সম্মেলন করে ইউজিসির তদন্ত কমিটির নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি এই তদন্ত কমিটিকে অভিহিত করেন ‘পক্ষপাতদুষ্ট’ হিসেবে।  একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ ‘অর্থহীন, মিথ্যা ও মনগড়া’।

আব্দুস সোবহান অভিযোগ করে বলেন, একটা অংশ তাকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে এবং বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করার চেষ্টা করছে।

ইউজিসির একজন সদস্য বলেন, ‘ডিসেম্বরে বারি রেজিস্ট্রার পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। কিন্তু উপাচার্যসহ অন্যদের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি।’

এরপরেও ৬ মে আব্দুস সোবহান তার শেষ কর্মদিবসে ১৩৭ জন শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ দেন।

তবে নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে মন্ত্রণালয় গঠিত কমিটির তদন্ত কার্যক্রম চলার কারণে এর দুদিন পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নতুন নিয়োগ পাওয়া শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগদান প্রক্রিয়া স্থগিত করে।

 

প্রতিবেদনটি ইংরেজি থেকে অনুবাদ করেছেন মামুনুর রশীদ

 

আরও পড়ুন:

এ কেমন উপাচার্য

মানবিক কারণে ছাত্রলীগ নেতাদের নিয়োগ দিয়েছি: সাবেক ভিসি অধ্যাপক আব্দুস সোবহান

রাবিতে এডহক নিয়োগের যোগদান স্থগিত

রাবিতে ‘অবৈধ’ নিয়োগের সঙ্গে জড়িতদের বিচার দাবি সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের

রাবি উপাচার্যের নিয়োগ দুর্নীতি: ৪ সদস্যের তদন্ত কমিটি রাবিতে

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ অবৈধ: শিক্ষা মন্ত্রণালয়

রাবি উপাচার্যের জামাতার বিরুদ্ধে ‘গোপন নথি’ চুরির অভিযোগ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে মহানগর ও রাবি ছাত্রলীগের সংঘর্ষ

‘দুর্নীতিবিরোধী’ শিক্ষকদের বাধার মুখে রাবি সিন্ডিকেট সভা স্থগিত

রাবি উপাচার্যের নামে বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থে নির্মিত মাদ্রাসা

উপাচার্য ভবনের পরে রাবি সিনেট ও প্রশাসন ভবনেও তালা

রাবি উপাচার্য ভবনে আবারও তালা!


রাবিতে দুর্নীতি-অনিয়ম: ইউজিসি প্রতিবেদন দিলেও সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করছে সরকার

ইউজিসির তদন্ত প্রতিবেদন একপেশে ও পক্ষপাতমূলক: রাবি উপাচার্য

এবার প্রশাসনিক ভবনে তালা দিয়েছে রাবি ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা

উপাচার্যকে অবরুদ্ধ করে রেখেছেন রাবি ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা

ছাত্রলীগকে চাকরি দিতে ‘সর্বোচ্চ’ অগ্রাধিকারের আশ্বাস রাবি উপাচার্যের

Comments

The Daily Star  | English

Rohingyas being forcibly recruited by Myanmar military: report

Community leaders have been pressured to compile lists of at least 50 men for each small village and at least 100 for each IDP camp and large village

26m ago