‘আঘাতের চিহ্ন কেন পাওয়া যায় না’ যা বললেন ২ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক

কার্টুনিস্ট আহমেদ কবির কিশোরের শরীরে ‘আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি’ আদালতকে জানিয়েছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের মেডিকেল বোর্ড। দেশব্যাপী আলোচিত বিশ্বজিৎ হত্যাকাণ্ডেও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে মরদেহে চাপাতির আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। এমন আরও বহু নজির আছে।
আহমেদ কবির কিশোর ও বিশ্বজিৎ দাস।

কার্টুনিস্ট আহমেদ কবির কিশোরের শরীরে ‘আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি’ আদালতকে জানিয়েছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের মেডিকেল বোর্ড। দেশব্যাপী আলোচিত বিশ্বজিৎ হত্যাকাণ্ডেও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে মরদেহে চাপাতির আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। এমন আরও বহু নজির আছে।

দৃশ্যমানভাবে যা দেখা যায়, মেডিকেল বোর্ড বা ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকরা অনেক ক্ষেত্রেই তা দেখতে পান না কেন? এর মূল কারণ কী? রহস্যটা কোথায়?

দ্য ডেইলি স্টার কথা বলেছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক বে-নজির আহমেদের সঙ্গে।

অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম ও অধ্যাপক বে-নজির আহমেদ।

দৃশ্যমানভাবে যে আঘাত করতে দেখা যায়, আঘাতের চিহ্ন দেখা যায়, মেডিকেল বোর্ডের চিকিৎসকদের সেটা দেখতে না পাওয়াটা অ্যাবসার্ড বলে মন্তব্য করেন অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আঘাতের চিহ্ন থাকা সত্ত্বেও যদি তারা সেটি দেখতে না পান, তাহলে এখানে নিশ্চয়ই তাদের কোনো উদ্দেশ্য আছে। বিনা উদ্দেশ্যে তো এরকম মিথ্যা কথা বলবে না। এর মধ্যে আমি দুর্নীতি দেখছি।’

তিনি বলেন, ‘বিশ্বজিৎকে কোপানোর ভিডিও চিত্র আমরা টেলিভিশনে দেখেছিলাম। এরকম একটা ঘটনার পরেও মরদেহে কোপানোর চিহ্ন না পাওয়া মানে হলো তা অ্যাবসার্ড। একটা মানুষকে কোপালে সেই চিহ্ন থাকবে না, এটা কোনো কথা হলো? সবাই দেখেছে বিশ্বজিৎকে কোপানো হয়েছে, তারপরেও তার শরীরে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায় না, এটা কি জাদুবিদ্যা?’

মেডিকেল বোর্ড কার্টুনিস্ট কিশোরের শরীরে আঘাতের চিহ্ন না পাওয়ার দুটো দিক থাকতে পারে বলে মনে করেন এই বিশেষজ্ঞ। ‘এক হয়তো সত্যিই চিহ্ন ছিল না। দ্বিতীয়ত, মেডিকেল বোর্ড দুর্নীতিগ্রস্ত’, বলেন তিনি।

অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘ফরেনসিক, ময়নাতদন্ত বা এ ধরনের মেডিকেল প্রতিবেদনের ক্ষেত্রে এমন চিত্র আমাদের দেশে কমন ঘটনা। এগুলো গুরুত্বপূর্ণ মেডিকেল এভিডেন্স। তাই অনেকে অর্থ দিয়ে এই প্রতিবেদন বদলে ফেলে। শক্তিশালী বা ক্ষমতাশালীরা এ কাজগুলো করে থাকে। অনেক ঘটনাতেই দেখা গেছে, প্রথম ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে কিছু পাওয়া যায়নি, পরে মরদেহ আবার তুলে পুনরায় করা ময়নাতদন্তে অনেক কিছু পাওয়া গেছে। সে কারণে এসব প্রতিবেদনের প্রতি মানুষের বিশ্বাস হারিয়ে গেছে।’

অধ্যাপক বে-নজির আহমেদ বলেন, ‘আমি যেহেতু প্রতিবেদন দেখিনি, তাই অনুমান করে এ বিষয়ে কথা বলাটা মুশকিল। আমরা বিভিন্ন মাধ্যমে যে বিষয়গুলো শুনি, সেখানে দুটো প্রেক্ষাপট থাকে। যিনি ভুক্তভোগী, তার স্বজনরা বলবে একভাবে, তারা বলবে আঘাত ছিল। আবার পুলিশের হাতে যদি নির্যাতিত হয়, তারা নিশ্চয়ই চাইবে না সেটা বের হোক। তখন তারা বলে যে, নির্যাতন করা হয়নি। একইভাবে চিকিৎসকরা যখন কাজ করেন, অনেক সময় তাদেরও প্রেক্ষাপট থাকে। তার মধ্যে একটা হচ্ছে পেশাদারিত্ব। অর্থাৎ এ বিষয়ে তার দক্ষতা। আমাদের এমবিবিএসে ফরেনসিক মেডিসিন বিষয়ে খুব সামান্যই ধারণা দেওয়া হয়ে থাকে, যা একজন চিকিৎসকের জন্যে যথেষ্ট নয়। যারা ফরেনসিক মেডিসিনে পোস্ট-গ্রেজুয়েশন করেন, তারা হয়তো শিখতে পারেন। আর কিছু প্রেক্ষাপট হচ্ছে চিকিৎসকের বায়াসড থাকা, কোনো কারণে প্রভাবিত হওয়া।’

নানা কারণেই চিকিৎসক বায়াসড বা প্রভাবিত হয়ে থাকে বলে মনে করেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক এই পরিচালক। তিনি বলেন, ‘অনেক সময় রাজনৈতিক প্রভাব বা চাপ থাকে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে অনৈতিকতাও থাকে। আবার যেসব চিকিৎসকরা প্রতিবেদন তৈরি করেন, তারা তো সরকারি চাকরি করেন। সেক্ষেত্রে তাদের বায়াসড হওয়া বিচিত্র কিছু নয়। কারণ, কোনোকিছু যদি সরকারের বিপক্ষে যায়, তাহলে তাদের জন্যে বিষয়টি কঠিন। এসব মিলিয়েই অনেক ক্ষেত্রেই এসব প্রতিবেদন পেশাদারিত্বের সঙ্গে তৈরি হয় না এবং এর ফলে ন্যায়বিচার নিশ্চিতে এসব প্রতিবেদনের অবদানটা যথাযথভাবে পাওয়া যায় না।’

‘মেডিকেল পরীক্ষার এ বিষয়টি আমাদের আরও উন্নত করতে হবে। আলাদাভাবে একটা ফরেনসিক বেঞ্চ করা যেতে পারে। এতে পেশাদারিত্বের উন্নয়ন করা যাবে। যুক্তরাষ্ট্রে জজ ফ্লয়েড হত্যাকাণ্ডের একটা বিষয় খেয়াল করেছি যে, ফিজিওলজিস্ট ও ক্রিটিক্যাল কেয়ার স্পেশালিস্ট একজন বিশেষজ্ঞ হিসেবে যেভাবে সাক্ষ্য দিয়েছেন, এর তো কোনো তুলনা নেই। তার সাক্ষ্যতেই কিন্তু ওই পুলিশ কর্মকর্তা অভিযুক্ত হয়েছেন। যা আমাদের এখানে চিন্তাও করা যায় না। মেডিকেল লিগ্যাল আইনটা সম্পর্কেও চিকিৎসকদের ধারণা নেই। সেটাও তাদের জানতে হবে’, যোগ করেন অধ্যাপক বে-নজির আহমেদ।

আরও পড়ুন:

শুধু নির্যাতনের চিহ্ন নয়, দানবীয় আঘাতের যন্ত্রণা নিয়ে বেঁচে আছি: কিশোর

কার্টুনিস্ট কিশোরের শরীরে ‘নির্যাতনের চিহ্ন’ পায়নি মেডিকেল বোর্ড

সজোরে আঘাত...ইলেকট্রিক শক...

নির্যাতন করা হয়েছে, এখন হাসপাতালে যাচ্ছি: কিশোর

১০ মাস পর মুক্তি পেলেন কার্টুনিস্ট কিশোর

অবশেষে জামিন পেলেন কার্টুনিস্ট কিশোর

মুশতাক আমার ভাই

কিশোরের জামিন আদেশ ৩ মার্চ

কিশোরকে নির্যাতনের অভিযোগ: সেশন কোর্টে আবেদন করার নির্দেশ

কার্টুনিস্ট কিশোরের রিমান্ড নামঞ্জুর

মুশতাকের মৃত্যুর পর কিশোরের জীবন নিয়ে শঙ্কা

কার্টুনিস্ট কিশোরকে মুক্তি দেওয়ার আহ্বান জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের

কারাবন্দি কার্টুনিস্ট কিশোর পেলেন রবার্ট রাসেল কারেজ অ্যাওয়ার্ড

কার্টুনিস্ট কিশোর, লেখক মুশতাক গ্রেপ্তার

কিশোর ও মুশতাকের জামিন শুনানিতে অপরাগতা জানিয়েছেন ভার্চুয়াল আদালত

মুশতাক গতকালও জামিন পাননি, আজ কারাগারে মারা গেলেন

Comments

The Daily Star  | English

Inadequate Fire Safety Measures: 3 out of 4 city markets risky

Three in four markets and shopping arcades in Dhaka city lack proper fire safety measures, according to a Fire Service and Civil Defence inspection report.

2h ago