মুক্তিযুদ্ধ

৮ জুন ১৯৭১: রয়েল কমনওয়েলথ সোসাইটিতে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর ভাষণ

একাত্তরের ৮ জুন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ঘটনাবহুল ও গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। এদিন প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ দূত আবু সাঈদ চৌধুরী ব্রিটেনের লন্ডনে রয়েল কমনওয়েলথ সোসাইটির সদর দপ্তরে দেয়া এক ভাষণে বলেন, 'সংবাদপত্র খুললেই আপনারা দেখতে পাবেন পূর্ব বাংলার নাগরিকরা দেশ ছেড়ে পালাচ্ছে। ভারতে গিয়ে শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিচ্ছে কিন্তু এসবের কারণ কী? কোথায় এ হত্যাযজ্ঞের সূচনা? এই মানবিক লাঞ্ছনার জন্য দায়ী কে?

একাত্তরের ৮ জুন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ঘটনাবহুল ও গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। এদিন প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ দূত আবু সাঈদ চৌধুরী ব্রিটেনের লন্ডনে রয়েল কমনওয়েলথ সোসাইটির সদর দপ্তরে দেয়া এক ভাষণে বলেন, 'সংবাদপত্র খুললেই আপনারা দেখতে পাবেন পূর্ব বাংলার নাগরিকরা দেশ ছেড়ে পালাচ্ছে। ভারতে গিয়ে শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিচ্ছে কিন্তু এসবের কারণ কী? কোথায় এ হত্যাযজ্ঞের সূচনা? এই মানবিক লাঞ্ছনার জন্য দায়ী কে? তিনি বলেন, আমি সুস্পষ্টভাবে বলতে চাই, পূর্ব বাংলার জনগণ তাদের প্রত্যাশা আর আকাঙ্ক্ষার অপূর্ণতা এবং রাজনৈতিক শাসন ও অর্থনেতিক শোষণে দীর্ঘদিন ধরে জর্জরিত ছিল। ১৯৭০ এর ডিসেম্বরে জনগণ ভোটকেন্দ্রে গিয়েছিল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শোষণের কথা মনে রেখেই। তারা শেখ মুজিবুর রহমানের আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় বসানোর জন্য ভোট দেন। কারণ তারা বৈদেশিক বাণিজ্য ও অন্যান্য বিষয়ে ৬ দফার দাবিতে প্রদেশের হাতে ক্ষমতা দিয়েছিল, যেন অভিন্ন পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা নীতিকে স্বীকার করে দুটি অঞ্চলই হাতে হাত ধরে এক পাকিস্তানের শান্তি ও উন্নয়নের লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে পারে।'

আবু সাঈদ চৌধুরী একই সঙ্গে উল্লেখ করে বলেন, '১৬৯টির মধ্যে ১৬৭টি আসনে আওয়ামী লীগের জয়লাভ করার ব্যাপারটাকে ইয়াহিয়ার মন্ত্রণাদাতারা ভালো চোখে দেখেনি। সামরিক একনায়কেরা বুঝতে পেরেছিল জনপ্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করার সময় এসে গেছে। এই উপলব্ধিতেই তারা মাত্র ৩০টি আসন পাওয়া জুলফিকার আলী ভুট্টোকে নিজেদের দলে টেনে নিলো। ভুট্টো ঘোষণা করলেন ৩ মার্চের জাতীয় পরিষদ অধিবেশন তিনি বয়কট করবেন। চাপের মুখে ইয়াহিয়া পরিষদ অধিবেশন বাতিল করলেন। শেখ মুজিবুর রহমান নিয়মতান্ত্রিকভাবে এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে হরতালের কর্মসূচি দিলেন। পূর্ব বাংলার সমগ্র জনগোষ্ঠী তার আন্দোলনের সাথে যোগ দিলো। কেননা, পূর্ব বাংলার জনগণ শেখ মুজিবুর রহমানকে তাদের আইনসম্মত শাসক হিসেবে গ্রহণ করেছিল এই পরিস্থিতিতে ইয়াহিয়া শেখ মুজিবুর রহমানকে তার সঙ্গে আলোচনায় বসার জন্য আমন্ত্রণ জানান। শেখ মুজিব তা গ্রহণ করেন। আর শেখ সাহেব যখন আলোচনায় অংশগ্রহণ করেছেন, তখন জাহাজ ভর্তি অস্ত্র ও পাকসেনা পাঠানো হয়েছে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে। তারপর ঘটলো ইতিহাসের বর্বরতম ঘটনা। যার শুরু বৃহস্পতিবার ২৫ মার্চের রাতে। আমার ছাত্র ও অধ্যাপকরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হল ও অ্যাপার্টমেন্টে ঘুমিয়ে আছে, পুরো ঢাকা শহর নিদ্রামগ্ন-সেনাবাহিনী নেমে এলো পথে, নির্বিচারে হত্যা করলো ছাত্র ও অধ্যাপকদের।' 

আবু সাঈদ চৌধুরী তার বক্তব্যে আরও বলেন, 'পূর্ব বাংলার জনগণ জেগে উঠেছে। আওয়াজ তুলেছে স্বাধীনতার। নতুন এক দেশের অভ্যুদয় হয়েছে, তা আজকের বাংলাদেশ। কোনো দেশ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিক বা কৌশলগত কারণে না দিক, বাস্তবতা হলো ইয়াহিয়ার বাহিনী ঢাকাকে ধ্বংসস্তুপে পরিণত করেছে। এই বাহিনীকে প্রত্যাখ্যান করেছে সমগ্র জাতি। কারো পক্ষেই বাংলাদেশকে সেনাবাহিনীর কর্তৃত্বাধীন রাখা সম্ভব নয়। সাড়ে সাত কোটি মানুষকে এভাবে বন্দি রাখা যাবে না। পশ্চিম পাকিস্তানের সরকার ও পাকসেনা পূর্ব বাংলা নিয়ন্ত্রণ করছে’ তা মোটেই সত্যি নয়। সংখ্যালঘুর নিয়ন্ত্রণে জনগণকে আতঙ্কিত করে কখনো কোনো দেশ চালানো যায় না। পূর্ব বাংলার জনগণ জানে পাকিস্তানের এই শাসন, পাক সেনার এই আস্ফালন আর বেশি দিন টিকবে না। আমরা এখন ভালোভাবেই জানি, উপনিবেশ থেকে আমরা আমাদের স্বাধীনতার মর্যাদাকে আয়ত্ব করতে যাচ্ছি। জীবনযাপন, সংস্কৃতি ও ভাষায় আমরা স্বতন্ত্র। আমাদের জনগোষ্ঠী আলাদা। জাতিসংঘ সনদের ভিত্তিতে নিজেদের আত্মরক্ষার অধিকার আমাদের আছে।'

ঢাকায় এদিন

৮ জুন ঢাকায় এক নম্বর বিশেষ সামরিক আদালত আওয়ামী লীগ নেতা তাজউদ্দীন আহমদ, তোফায়েল আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, আব্দুল মান্নান এবং পিপলস পত্রিকার সম্পাদক আবিদুর রহমানের বিরুদ্ধে দেশদ্রোহিতার অভিযোগ এনে তাদের অনুপস্থিতিতে বিচারকার্য শুরু করে।এই বিচারে তাদের ৫ জনের প্রত্যেককে ১৪ বছর সশ্রম কারাদণ্ড এবং তাদের সম্পত্তির শতকরা ৫০ ভাগ বাজেয়াপ্ত ঘোষণা করা হয়।

আন্তর্জাতিক মহলে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে প্রচারণা 

৮ জুন ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্যার আলোক ডগলাস হোম কমন্স সভায় দেওয়া বক্তব্যে বলেন, 'নতুন অর্থনৈতিক সাহায্য প্রকল্পে সম্মত হওয়ার আগে রাজনৈতিক সমাধানের জন্য ব্রিটেন পাকিস্তানের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে। তবে আমরা একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের ওপর রাজনৈতিক সমাধান চাপিয়ে দিতে পারি না।'

৮ জুন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সরদার শরণ সিং সোভিয়েত ইউনিয়নের মস্কোতে সোভিয়েত পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রে গ্রোমিকোর সঙ্গে আবার বৈঠকে বসেন। এই নিয়ে তাদের মধ্যে তৃতীয় দফা বৈঠক হলো। তৃতীয় দফার এই বৈঠকে ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় নানা চুক্তি নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠক শেষে সরদার শরণ সিং সাংবাদিকদের বলেন, আলোচনা ফলপ্রসূ হয়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন পূর্ব বাংলার বিষয়ে ও শরণার্থীদের বিষয়ে ভেবে দেখছে।

৮ জুন  ভারতের সর্বোদয় পার্টির নেতা জয়প্রকাশ নারায়ণ যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে দেশটির সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও সিনেটর জোসেফ সিসকোর সঙ্গে এক বৈঠক করেন। সেই বৈঠকে জয়প্রকাশ নারায়ণ সহকারী মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে পাকিস্তানকে দেয়া সব ধরনের আর্থিক সাহায্য ও সামরিক সহায়তা বন্ধের অনুরোধ করেন। এই বৈঠকের পর জয় প্রকাশ নারায়ণ একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং বাংলাদেশ সম্পর্কিত সভায় বক্তব্য দেন, পাশাপাশি এদিন রাতে তিনি টেলিভিশনে একটি সাক্ষাৎকার দেন।

ভারতে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে এদিন

হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্টে বিশ্ব শান্তি সম্মেলন ও কয়েকটি দেশে রাষ্ট্রীয় ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে বৈঠক শেষে সফরকারী বাংলাদেশ দলের প্রধান আবদুস সামাদ ভারতের দিল্লিতে ফিরে সাংবাদিকদের বলেন, ইউরোপীয় দেশগুলো, দেশের মানুষ, দেশের রাজনৈতিক নেতারা বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে ভীষণ হতাশ বলে জানিয়েছেন। তারা বলেছেন বাংলাদেশে যেভাবে পাকিস্তান সেনাবাহিনী গণহত্যা ও নিপীড়ন চালাচ্ছে তা কেবল ভয়াবহই নয়, ইতিহাসের অন্য সব ঘৃণ্য পৈশাচিকতাকেও হার মানিয়েছে। আমরা বিশ্বনেতাদের কাছে পরিস্থিতি সবিস্তারে তুলে ধরেছি। তারা আমাদের আশা দিয়েছেন যে তারা এই ব্যাপারে কার্যকর ব্যবস্থা ও পদক্ষেপ নেবেন।

৮ জুন ভারতের শিক্ষামন্ত্রী সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায় লোকসভার অধিবেশনে বলেন, পূর্ব বাংলা থেকে ভারতে আশ্রয় নেয়া অধ্যাপকদের কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে অধীন বিভিন্ন কলেজে অস্থায়ী অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ দিতে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আর্থিক অনুদানের জন্য যে আবেদন করেছেন, সরকার তা এখন বিবেচনা করছে। এই পর্যন্ত মোট ১০ জন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং ৭০০ কলেজশিক্ষকের চাকরির বিষয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কাছে আবেদন এসেছে।

দেশব্যাপী প্রতিরোধ যুদ্ধ, বিবৃতি

৮ জুন ফেনীর ফুলগাজীর সিলোনিয়া নদীর পাড়ে মুক্তিবাহিনীর বন্দুয়া রেলস্টেশন ঘাঁটিতে হানাদার বাহিনী ব্যাপক আক্রমণ চালায়। এ আক্রমণে মুক্তিবাহিনীর মুক্তিযোদ্ধারা বন্দুয়া রেলস্টেশনের নিজেদের অবস্থান ত্যাগ করে তাদের পরশুরামের বিলোনিয়া সীমান্তের পাশে মূল প্রতিরক্ষা ঘাঁটিতে চলে আসে। 

৮ জুন বগুড়ার জাতীয় পরিষদের সদস্য হাবিবুর রহমান এক বিবৃতিতে বলেন, 'আমি আওয়ামী লীগের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করেছি। আমার সাথে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। আমি একজন খাঁটি পাকিস্তানি হিসেবে দেশের সেবা করে যাব। পূর্ব পাকিস্তানকে রক্ষা করার জন্য আমি পাকিস্তানের মাননীয় প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খানের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি। একই সঙ্গে আমি দেশপ্রেমিক আমাদের সেনাবাহিনীকেও দেশের স্বার্থে এগিয়ে আসার জন্য অভিনন্দন ও কৃতজ্ঞতা জানাই। পাকিস্তান রক্ষায় আমরা সর্বসময় অটুট থাকবো।' 

তথ্যসূত্র- 

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র নবম, দ্বাদশ, ত্রয়োদশ ও চতুর্দশ খণ্ড। 

দৈনিক পাকিস্তান - ৯ জুন ১৯৭১ 

দৈনিক অমৃতবাজার পত্রিকা, ৯ জুন ১৯৭১ 

আহমাদ ইশতিয়াক [email protected]

Comments

The Daily Star  | English

Medium of education should be mother language: PM

Prime Minister Sheikh Hasina today said that the medium for education in educational institutions should be everyone's mother tongue.

3h ago