মুক্তিযুদ্ধ

অপারেশন খরচাখাতা: নৃশংসতা, পৈশাচিকতার আরেক নাম

নীলফামারী জেলার সৈয়দপুর শহরে তখন বাস করতেন বিপুল সংখ্যক অবাঙালি। যাদের মাড়োয়ারি বলেই সম্বোধন করা হতো। ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ থেকে আসা হিন্দু সম্প্রদায়ের এই মানুষেরা, মূলত ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যেই বহু যুগ আগে থেকেই বাণিজ্যিক শহর সৈয়দপুরে আসতেন। এই এলাকা ছিল অনেকটা তীর্থভূমির মতোই। দেশভাগের আগে থেকে বহু মানুষ ব্যবসায়িক উদ্যোগে আসতে আসতে সৈয়দপুর ভালো লেগে যাওয়ায় থেকে যান সৈয়দপুরেই। আর সৈয়দপুরে রেলওয়ে কারখানা, পাটকলসহ নানা মিল কারখানা থাকায় অনেকে চাকরির সুবাদে দেশভাগের পর থেকে যান সৈয়দপুরে। তারা একসময় স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে যান সৈয়দপুরেরই।
গোলাহাট গণহত্যায় শহীদদের স্মৃতিতে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভ। ছবি: সংগৃহীত

নীলফামারী জেলার সৈয়দপুর শহরে তখন বাস করতেন বিপুল সংখ্যক অবাঙালি। যাদের মাড়োয়ারি বলেই সম্বোধন করা হতো। ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ থেকে আসা হিন্দু সম্প্রদায়ের এই মানুষেরা, মূলত ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যেই বহু যুগ আগে থেকেই বাণিজ্যিক শহর সৈয়দপুরে আসতেন। এই এলাকা ছিল অনেকটা তীর্থভূমির মতোই। দেশভাগের আগে থেকে বহু মানুষ ব্যবসায়িক উদ্যোগে আসতে আসতে সৈয়দপুর ভালো লেগে যাওয়ায় থেকে যান সৈয়দপুরেই। আর সৈয়দপুরে রেলওয়ে কারখানা, পাটকলসহ নানা মিল কারখানা থাকায় অনেকে চাকরির সুবাদে দেশভাগের পর থেকে যান সৈয়দপুরে। তারা একসময় স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে যান সৈয়দপুরেরই। 

মুক্তিযুদ্ধ শুরুর তিন দিন আগে ২৩ মার্চ রাত থেকে সৈয়দপুরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের দোসর সৈয়দপুরের বিহারিরা বাঙালি নিধন শুরু করে। মহল্লায়-মহল্লায় ঢুকে নেতৃস্থানীয় বাঙালিদের নির্বিচারে হত্যা করা হয়। নির্যাতন, নিপীড়ন পৌঁছে গিয়েছিল চরম আকারে। এ অবস্থায় আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছিল শহরের মাড়োয়ারিপট্টির বাসিন্দাদের। ২৪ মার্চ থেকে সৈয়দপুর শহরের বাঙালি পরিবারগুলো পুরোপুরি অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে।

তখন সৈয়দপুর বিমানবন্দরের কাজ চলছিল। সেখানে প্রায় ২০০ মাড়োয়ারিকে জোর করে কাজ করাতে নিয়ে যাওয়া হয়।

অন্যদিকে সৈয়দপুরের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে মাড়োয়ারি সম্প্রদায়ের শীর্ষব্যক্তিত্ব তুলসীরাম আগরওয়ালা, যমুনাপ্রসাদ কেডিয়া, রামেশ্বর লাল আগরওয়ালাকে ১২ এপ্রিল রংপুর সেনানিবাসের অদূরে নিসবেতগঞ্জ বধ্যভূমিতে নিয়ে হত্যা করে পাকিস্তানি বাহিনী। তখন মাড়োয়ারিপট্টিতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে আরও তীব্রভাবে। এ সময় বিহারিরা মাড়োয়ারিদের ঘরে ঘরে ঢুকে চালায় লুটতরাজ। এপ্রিল পেরিয়ে মে মাসেও ভয়াবহ নির্যাতন, লুটতরাজ, ধর্ষণ গণহত্যা থেমে থাকেনি সৈয়দপুরে। বাঙালি অবাঙালি কেউই ছাড় পায়নি হানাদারদের কবল থেকে। মে মাসের শেষদিকে মাড়োয়ারিদের সঙ্গে উপকারী সুলভ ভঙ্গিতে সাহায্য করার বাহানা করতে এগিয়ে আসে বিহারী ও শান্তি কমিটির লোকেরা। তারা বোঝায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী দেশপ্রেমিক। তারা যদি ভারতে চলে যেতে চায় সেই ব্যবস্থাও করা হবে। ক্রমান্বয়ে বিহারিদের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে উঠে মাড়োয়ারিদের।

এর মধ্যে চলে আসে জুন মাস। জুন মাসের প্রথম দিন থেকেই অবাঙালি বিহারী, শান্তিকমিটি ও রাজাকারেরা বলে শিগগিরই ট্রেনের ব্যবস্থা হবে। মাড়োয়ারিরাও চান ভারতে চলে যেতে, অন্তত এই আতঙ্কের মধ্যে তো আর থাকতে হবে না। তাদের জলপাইগুড়ি অব্দি পৌঁছে দেয়া হবে। জুন মাসের ৫ তারিখে ঠিকই পাকিস্তানি সামরিক প্রশাসন মাইকে ঘোষণা শুরু করে। ঘোষণায় বলা হয়, ‘যারা হিন্দু মাড়োয়ারি তাদের নিরাপদ স্থান ভারতে পৌঁছে দেওয়া হবে। একটি বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ট্রেনটি ১৩ জুন মাড়োয়ারিদের চিলাহাটি সীমান্ত দিয়ে ভারতের জলপাইগুড়ি অব্দি পৌঁছে দেবে আটকে পড়া মাড়োয়ারিদের। তখন রাজাকার, শান্তিবাহিনী ও বিহারীদের কথায় আস্থা খুঁজে পায় মাড়োয়ারিরা। ৫ জুনের ঘোষণায় আশায় বুক বাঁধে অবাঙালি মাড়োয়ারিরা। একই সঙ্গে এরপরের কয়েকদিন সারা সৈয়দপুর শহর ঘুরেও মাইকিং করা হয়।

১২ জুন রাত থেকে মাড়োয়ারিদের ঢল নামে সৈয়দপুর রেলস্টেশনে। তারা তখনও কল্পনাতেও আনতে পারছিলো না পরদিন কী অপেক্ষা করছে তাদের সামনে। ন্যূনতম শঙ্কা আর অবশিষ্ট ছিল না তাদের মধ্যে। কারণ একে তো রাজাকারেরা আগেই বলেছিলো ভারত সীমান্তে পোঁছে দেয়া হবে, অন্যদিকে সেনাবাহিনী যখন দায়িত্ব নিয়েছে তখন আর ভয় ছিল না।

১৩ জুন ঘটনার দিন

১৩ জুন ১৯৭১। দিনটি ছিল রবিবার। আগের রাত থেকেই সাড়ে চারশর বেশি মাড়োয়ারি অপেক্ষমান সৈয়দপুর রেলওয়ে স্টেশনে। ট্রেনে যদি জায়গা না পাওয়া যায় সেই আশঙ্কায় আগেই হাজির হয়ে গিয়েছিলেন মাড়োয়ারিরা। ভোর পাঁচটার দিকে ট্রেন আসতেই ট্রেনের চারটি বগিতে গাদাগাদি, হুড়োহুড়ি করে উঠে পড়েন মাড়োয়ারিরা। বাক্স পেটারা আর মানুষে পূর্ণ তখন ট্রেন। অপেক্ষা কখন ট্রেন ছাড়বে। ট্রেন ছাড়ার আর কতো দেরি। অপেক্ষার তর সইছেনা তাদের। মনে একদিকে উত্তেজনা, অন্যদিকে ভয় কাটিয়ে প্রাণভরে নিঃশ্বাস নেয়ার অপেক্ষা। 

অবশেষে নির্ধারিত সকাল ১০টায় ট্রেনটি ছাড়ে। ট্রেন ছাড়ার পর সব জানালা-দরজা বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছিলো। ট্রেনটি ধীরগতিতে দুই মাইলের মতো পথ অতিক্রম করার পর শহরের গোলাহাটের কাছে এসে থেমে যায়। সবাই আশ্চর্য হয়ে ভাবছে কী হলো, ট্রেন থেমে গেল কেন? কোনো সমস্যা হয়েছে নাকি! ভয় ও শঙ্কা দেখা দিলো তাদের চোখেমুখে।

অন্যদিকে বিহারী ও রাজাকার ইজাহার আহমেদ, বিহারী নেতা কাইয়ুম খান ও বিপুলসংখ্যক বিহারী ও পাকিস্তান সেনাবাহিনী সৈন্য উপস্থিত তখন গোলাহাটে সেই ট্রেনটিরই অপেক্ষায়। ট্রেন থামতেই প্রতিটি বগির দরজা খুলে ভেতরে রামদা হাতে কয়েকজন বিহারি প্রবেশ করে, বাইরে তখন ভারী আগ্নেয়াস্ত্র হাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী গোটা এলাকা ঘিরে রেখেছে। যেন একজন মাড়োয়ারিও পালাতে না পারে। শুরু হয় রামদা দিয়ে কোপানো। মুহূর্তের মধ্যেই বীভৎস আর পৈশাচিক উৎসবে মেতে ওঠে বিহারীরা। কোনো কোনো লাশকে কয়েক টুকরো করে রেললাইনের চারপাশে ছুড়ে ফেলা হয়। নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় শিশুদের।

সেদিন এই কালভার্টের চারপাশ লাশে পূর্ণ ছিল। ছবি: সংগৃহীত

মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শহীদ হন ৪৪৮ জন। ওই হত্যাযজ্ঞ থেকে কোনোরকমে আশ্চর্যজনকভাবে সেদিন প্রাণে বেঁচে যান মাত্র ১০ জন যুবক। তারা ট্রেন থেকে নেমে ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়ে দিনাজপুরে যান।

সেদিনের সেই পৈশাচিক গণহত্যা থেকে ভাগ্যক্রমে পালিয়ে বেঁচে যাওয়া সেই দশ যুবকের মধ্যে একজন তপন কুমার দাস। সেদিনের সেই গণহত্যার প্রত্যক্ষদর্শী তপন কুমার দাস দিয়েছিলেন গণহত্যার বর্ণনা।

তিনি বলেন, 'পাকিস্তানী সেনারা ১৩ই জুন আনুমানিক সকাল ৫টায় ভারতে পৌঁছে দেয়ার কথা বলে ৪টি বগিতে আমাদের তোলে। ট্রেনে উঠার পরই পাকিস্তানী সেনাদের বুঝতে অসুবিধা হলো না এই দিন আমাদের শেষ দিন। সে সময় গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছিলো। ঠিক সকাল ১০টার দিকে স্টেশন থেকে ছেড়ে যায় ট্রেনটি। চলছিল ধীরে ধীরে। শহর থেকে বেরিয়ে রেলওয়ে কারখানা পেরিয়েই হঠাৎ থেমে যায় ট্রেন। জায়গাটা স্টেশন থেকে দুই মাইল দূরে। নাম গোলাহাট। ট্রেন থামার কারণ অনুসন্ধানের চেষ্টা করি আমি। বাইরে সারি সারি পাকিস্তানি হানাদার সেনা। সঙ্গে তাদের দোসর বিহারীরা। সেনা সদস্যদের হাতে রাইফেল। আর বিহারীদের হাতে ধারালো রামদা। পাকিস্তানী সৈন্যরা যাত্রীদের কিল- ঘুষি- লাথি মেরে ট্রেন থেকে নামাতে থাকে। ট্রেনের যাত্রীদের ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে হত্যা করতে শুরু করে। যাত্রীদের অনেকে ধারালো অস্ত্রের আঘাত সইতে না পেরে গুলি করে মারার জন্য অনুরোধ করে। পাকিস্তানী সেনাদের জবাব ছিল একটি গুলির অনেক দাম। একে একে বগি থেকে নামিয়ে তলোয়ার দিয়ে কাটতে শুরু করে। ট্রেয়ের একপাশে যখন গণহত্যা চলছিলো সে সময় অন্য পাশ থেকে আমিসহ কয়েক জন যুবক দশ পনেরো ফুট নিচে লাফ দিয়ে পড়ি। তখন অনেক বৃষ্টি হচ্ছিলো। আমরা বৃষ্টির মধ্যে দৌড় দিয়ে জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করি। পাকিস্তানী সেনারা পিছন থেকে আমাদের গুলি করতে থাকে, আমরা কয়েকজন পালিয়ে নিজেদের রক্ষা করলেও ওই ট্রেনের প্রায় ৪১৩ জন যাত্রী শহীদ হন।'

সেদিনের সেই পৈশাচিক গণহত্যা থেকে ভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া আরেক প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন গোবিন্দ চন্দ্র দাস। তিনিও পালিয়ে ভাগ্যক্রমে বেঁচে গিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘থেমে থাকা ট্রেনের কম্পার্টমেন্টে ঢুকেই পাকিস্তানি সেনারা চিৎকার করে উর্দুতে বলতে থাকেন, একজন একজন করে নেমে আসো। তোমাদের মারতে এসেছি আমরা। তবে পাকিস্তানের দামি গুলি খরচ করা হবে না। সকলকে এ কোপে বলি দেওয়া হবে। সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়ে যায় বেপরোয়া হত্যাযজ্ঞ। ধারালো রামদা দিয়ে কেটে ফেলা গলা। ওই হত্যাযজ্ঞে শিশু, বৃদ্ধ, নারীরাও রেহাই পাননি।'

তথ্যসূত্র:

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র অষ্টম খণ্ড 

গোলাহাট গণহত্যা/ আহম্মেদ শরীফ

Comments

The Daily Star  | English
Increased power tariffs to be effective from February, not March: Nasrul

Increased power tariffs to be effective from February, not March: Nasrul

Gazette notification regarding revised tariffs to be issued today, state minister says

1h ago