অস্থির সময়ে বাড়ছে নৃশংসতা

গত কয়েক মাসে ঢাকাসহ সারাদেশে উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে গেছে নৃশংসতা। হত্যা, যৌন নিপীড়ন ও নির্যাতনের মতো ঘটনা ব্যাপকহারে বেড়েছে। দুঃখজনক ব্যাপার হলো, বেশিরভাগ ঘটনাতেই পরিবারের সদস্যদের জড়িত থাকতে দেখা গেছে।

গত কয়েক মাসে ঢাকাসহ সারাদেশে উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে গেছে নৃশংসতা। হত্যা, যৌন নিপীড়ন ও নির্যাতনের মতো ঘটনা ব্যাপকহারে বেড়েছে। দুঃখজনক ব্যাপার হলো, বেশিরভাগ ঘটনাতেই পরিবারের সদস্যদের জড়িত থাকতে দেখা গেছে।

ছেলে বা মেয়ের হাতে বাবা-মা খুন, বাবা-মায়ের হাতে শিশু সন্তান খুন, স্বামীর হাতে স্ত্রী বা স্ত্রীর হাতে স্বামী খুন- এ জাতীয় নানা নৃশংস ঘটনা সম্প্রতি জাতীয় গণমাধ্যমগুলোর শিরোনামে উঠে এসেছে। ‍

অপরাধবিজ্ঞানী ও মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, দুর্বল পারিবারিক বন্ধন, মানসিক অস্থিরতা ও সামাজিক বিশৃঙ্খলার কারণে এ ধরনের ভয়াবহ অপরাধের ঘটনা ঘটছে।

কোভিড-১৯ মহামারির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব, আর্থিক সংকট ও সুস্থ বিনোদনের অভাবে অনেকেই অসহিষ্ণু হয়ে ওঠছেন। মানসিক অশান্তি ও হতাশা তাদের আক্রমণাত্মক করে তুলছে। এমনকি আত্মহত্যাপ্রবণও হয়ে ওঠছেন অনেকে।

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলোজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ওমর ফারুক বিষয়টিকে ‘আন্তব্যক্তিক সহিংসতা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা একটি বিশৃঙ্খলাপূর্ণ সমাজের দিকে অগ্রসর হচ্ছি। দায়মুক্তির সংস্কৃতি ও সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখছে। সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটলে অপরাধ প্রবণতা ও আগ্রাসী আচরণ বেড়ে যায়।’

অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক বা পারিবারিক কারণে মানব আগ্রাসন বাড়ার ফলে নৃশংসতা বাড়ছে বলে মত দিয়ে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগ খুব কম। মানুষ পুলিশকে জানাতে চায় না বা আদালতে যেতে চায় না। সুতরাং খুন হওয়ার আগ পর্যন্ত একজনের ওপর নির্যাতনের ঘটনা চলতে থাকে।’

কিছু ঘটনা

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ৩০ মে পর্যন্ত প্রায় ৯৫ জন নারী স্বামীর হাতে খুন হয়েছেন। এ ছাড়া, শ্বশুরবাড়ির লোকজনের হাতে ১১ জন এবং নিজ পরিবারের সদস্যদের হাতে ২৩ জন খুন হয়েছেন। আত্মহত্যা করেছেন ৪০ জন নারী।

এ সময়ের মধ্যে প্রায় ৫০২ জন নারীকে ধর্ষণ করা হয়েছে। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ২২ জনকে। ‍

আসকের তথ্য বলছে, ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে স্বামীর হাতে খুন হয়েছিলেন প্রায় ৮৬ জন নারী। এ ছাড়া, শ্বশুরবাড়ির লোকজনের হাতে ২১ জন এবং নিজ পরিবারের সদস্যদের হাতে ১৬ জন খুন হন। আত্মহত্যা করেন ২৫ জন।

পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, চলতি বছরের শুধু মে মাসেই দেশজুড়ে ১২৯ জনকে হত্যা করা হয়েছে।

কিছু ক্ষেত্রে পরিবারের লোকজনই তাদের হত্যা করে পুলিশে খবর দিয়েছে। গত ১৯ জুন ৩০ বছর বয়সী রাজধানীর কদমতলির বাসিন্দা মেহজাবিন ইসলাম মুন বাবা-মা ও ছোট বোনকে খুনের পর নিজেই জাতীয় জরুরি সেবা হটলাইন ৯৯৯ নম্বরে কল করে পুলিশকে জানিয়েছেন।

পারিবারিক কলহের কারণেই এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। আর হত্যার এ পরিকল্পনাটি মেহজাবিন করেছিলেন ভারতীয় টিভি সিরিজ ‘ক্রাইম পেট্রোল’ দেখে।

দ্বিতীয় বিয়ে মেনে নিতে না পেরে গত ৩০ মে অটোরিকশা চালক ময়না মিয়াকে হত্যা করে ছয় টুকরো করে ফেলে দেন তার প্রথম স্ত্রী ফাতেমা খাতুন।

৩১ মে গ্রিন লাইফ হাসপাতালের চিকিৎসক কাজী সাবরিনা আলম কলাবাগানের একটি বাসায় খুন হন। এ ঘটনাটিও পারিবারিক কলহের কারণে ঘটেছে বলে পুলিশের সন্দেহ।

স্বামী সুমন মোল্লাকে হত্যা করে ছয় টুকরো করার অভিযোগে একইদিনে আরিফা ও তার প্রেমিক তনয়কে গাজীপুর থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

১৯ মে ঢাকার দক্ষিণখানের একটি মসজিদের ইমাম আবদুর রহমান তার কক্ষে আজহার নামের এক গার্মেন্টকর্মীকে খুন করে সেপটিক ট্যাংকে ফেলে দেন। পরকীয়া জনিত ঘটনায় এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

২৩ মার্চ বনানীর করাইল বস্তির কাছে একটি খালের পাশ থেকে হাসি বেগম নামের এক গৃহিণী এবং তার তিন বছর বয়সী ছেলের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। হাসির স্বামী রুবেল হোসেন পারিবারিক কলহের জেরে তাদের হত্যা করেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

এ ছাড়া, গত ১১ ফেব্রুয়ারি ওয়ারী থেকে সাজিদ হাসান নামের এক যুবকের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুসারে, পরকীয়ার ঘটনা থেকে তাকে খুন করা হয়েছে।

ঘটনার পেছনের কারণ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মনিরুল আই খান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, দুর্বল পারিবারিক বন্ধন ও বঞ্চনাসহ নানা কারণে এসব নৃশংসতার ঘটনা ঘটছে।

এ ছাড়া অর্থনৈতিক বঞ্চণার কারণেও বৈষম্য বাড়ছে বলে মত দেন তিনি।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার শফিকুল ইসলামের মতে, মানুষের অসহিষ্ণু হয়ে ওঠার পেছনে বিভিন্ন কারণ রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘বর্তমানে পারিবারিক বন্ধন তেমন একটা নেই। একজন হয়তো সারাদিন অফিসে কাটাচ্ছেন। তার বাচ্চারা হয়তো ফেসবুকে ব্যস্ত থাকছে। স্ত্রী ব্যস্ত থাকছেন টেলিভিশন দেখায়। তারা একে অন্যের সঙ্গে কথা বলছেন না, অনুভূতি শেয়ার করছেন না।’

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক মেখলা সরকার এসব ক্ষেত্রে ‍গণমাধ্যমকে খুনের খুঁটিনাটি তথ্য তুলে না ধরার পরামর্শ দেন। এটি মানুষকে প্রভাবিত করতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

এ ছাড়া, ‘ক্রাইম শো’র মতো অনুষ্ঠান ও কিছু অনলাইন গেম নিয়ন্ত্রণে রাখতে কর্তৃপক্ষকে পরামর্শ দেন তিনি।

লাইফস্প্রিংয়ের প্রধান মনোরোগ বিশেষজ্ঞ সায়েদুল আশরাফ মনে করছেন, মানুষকে এতটা আগ্রাসী করে তোলার পেছনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেরও ভূমিকা আছে।

প্রতিবেদনটি ইংরেজি থেকে অনুবাদ করেছেন জারীন তাসনিম।

সংক্ষেপিত: ইংরেজিতে পুরো প্রতিবেদনটি পড়তে ক্লিক করুন Cruelties rising in chaotic time

Comments

The Daily Star  | English

Dhaka traffic still light as offices, banks, courts reopen

After five days of Eid and Pahela Baishakh vacation, offices, courts, banks, and stock markets opened today

59m ago