বৈষম্যে দূর করতে হলে কী করতে হবে?

স্টার ফাইল ছবি

১৯৪৮-এ মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্র বলে যে 'সকলেই যেকোনো বৈষম্যের বিরুদ্ধে সমান সুরক্ষা পাওয়ার অধিকারী' (অনুচ্ছেদ ৭)। ১৯৬৫-এ সকল প্রকারের বর্ণবৈষম্যে নির্মূলের আন্তর্জাতিক কনভেনশন এর ১(১) অনুচ্ছেদ সংজ্ঞায়িত করে যে জাতিগত বৈষম্য অর্থ হচ্ছে জাতি, বর্ণ, বংশ, বা জাতীয় বা জাতিগত উৎসের উপর ভিত্তি করে যে কোনো পার্থক্য, বর্জন, বিধিনিষেধ বা পছন্দ। হানা শেফার্ড এবং দেবাহ পেজার-এর মতে '৭০ এর দশকের পর থেকে, 'প্রাতিষ্ঠানিক', 'কাঠামোগত', বা 'পদ্ধতিগত' বৈষম্য শব্দগুলির প্রয়োগ দেখা যায়, মার্কিন আইনের অধীনে।

তথাকথিত 'জাতি নির্দেশিকা', ২০০০ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাতিগত বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য, 'পরোক্ষ বৈষম্য'-এর ধারণাটিকে সংজ্ঞায়িত করে, যেখানে একটি আপাতদৃষ্টিতে নিরপেক্ষ বিধান, একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর ব্যক্তিদের অন্যান্য ব্যক্তির তুলনায় একটি বিশেষ অসুবিধাজনক পরিস্থিতিতে রাখবে। বিপরীতে, 'প্রত্যক্ষ বৈষম্য' হল এমন পরিস্থিতি যেখানে একজন ব্যক্তির সাথে সরাসরি অন্যের তুলনায় কম অনুকূল আচরণ করা হয়।

কানাডিয়ান আদালত, 'পদ্ধতিগত বৈষম্য' হিসেবে চিহ্নিত করেছে, আচরণ, নীতি এবং কিছু চর্চার ফলাফল যা যে কোনো সংস্থার কাঠামোর অংশরূপেই প্রতিষ্ঠিত থাকবে। অ্যামি এল শেপার্ডের মতে, এটি আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক মনোভাব এবং চর্চার একটি ধারা থেকে উদ্ভূত হয়, যা একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর উপর প্রভাব সৃষ্টি করতে তৈরি হয়। এই প্রক্রিয়ায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ উভয় বৈষম্যই জড়িত থাকতে পারে।

ক্রিস্টিন বুমিলার পর্যবেক্ষণ করেছেন যে শুধুমাত্র বৈষম্যকে নিষিদ্ধ করা এবং ক্ষতিগ্রস্তদের আইনি প্রতিকার প্রদান বৈষম্য দূর করার জন্য অপর্যাপ্ত। গবেষণা দেখায় যে আক্রান্তরা প্রতিশোধের ভয়, আইনি প্রক্রিয়ার খরচ এবং দীর্ঘসূত্রিতা, এবং তার নেতিবাচক ফলাফলের ভয়ে কোনপ্রকার আইনি প্রতিকারের পথে এগোয় না। স্যান্ড্রা ফ্রেডম্যান শনাক্ত করেছেন যে ব্যক্তিগত মামলা সফল হলে, সাধারণত কাঠামোগত পরিবর্তনের পরিবর্তে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ক্ষতিপূরণের দিকেই পরিচালিত করে। কিছু দেশে বিভিন্ন ধরনের সম্মিলিত পদক্ষেপের উদ্যোগ দেখা গেলেও, এই ধরনের আইনি প্রক্রিয়া জটিল, দীর্ঘ, এবং ব্যয়বহুল - তাই বিরল।

বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, 'সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান সুরক্ষা পাওয়ার অধিকারী।' ২৮ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, (১) শুধুমাত্র ধর্ম, জাতি, বর্ণ, লিঙ্গ বা জন্মস্থানের ভিত্তিতে রাষ্ট্র কোনো নাগরিকের প্রতি বৈষম্য করবে না। এবং (২) রাষ্ট্র ও জনজীবনের সকল ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমান অধিকার থাকবে। অথচ বাস্তবে বৈষম্য দূর করে, সমান কর্মসংস্থানের সুযোগের ধারণাটি বাংলাদেশে সঠিকভাবে প্রয়োগ হয় না। বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস নিয়োগ বিধিমালা, ১৯৮১; সিনিয়র সার্ভিসেস পুল, ১৯৭৯; বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস (পরিষেবার শর্তাবলী) বিধিমালা, ১৯৮০, এবং সরকারি কর্মকর্তা (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ১৯৮৫ এখনও সমান কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করতে প্রতিবন্ধক।

অনুচ্ছেদ ২৯ অনুযায়ী সাংবিধানিক বিধান রয়েছে যা ধর্মের উপর ভিত্তি করে যে কোনো ধরনের বৈষম্যকে নিষিদ্ধ করে। প্রয়োজন অনুযায়ী নাগরিকদের জন্য বিশেষ কোটা সংরক্ষণের জন্য ইতিবাচক বৈষম্যের ব্যবস্থা এবং সরকারি নীতিগুলিও নিশ্চিত করা হয়েছে বাংলাদেশের সংবিধানে। দেওয়ানি এবং ফৌজদারি কার্যবিধি-তে জাতি, ধর্ম বা বর্ণ নির্বিশেষে দেশের সকল নাগরিকের জন্য সমান অধিকার প্রদান করে যে কোনো ধরনের বৈষম্য বা সহিংসতার বিরুদ্ধে ব্যক্তিকে রক্ষা করার কথা বলা হয়েছে।

বাংলাদেশের সংবিধানে নারীদের সমান অধিকার নিশ্চিত করা হলেও সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কারণে এখনও তারা তাদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অধিকন্তু, তারা নিরাপত্তাহীন এবং বিভিন্ন ধরনের যৌন শোষণ ও নির্যাতন এবং যৌন হয়রানির শিকার। সংবিধানের দ্বারা স্বীকৃত সমতার নীতি অনুপস্থিত, যখন অনুচ্ছেদ ১০ অনুযায়ী জাতীয় জীবনের সকল ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। অনুচ্ছেদ ১৯ অনুযায়ী রাষ্ট্র সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা নিশ্চিত করার চেষ্টা করবে। নারীর বিরুদ্ধে সকল প্রকার বৈষম্য দূরীকরণ সংক্রান্ত জাতিসংঘ কনভেনশন ১৯৮৪ এবং ঐচ্ছিক প্রটোকল ১৯৯৮ বাংলাদেশকে নারী ও পুরুষের মধ্যে সমতা বজায় রাখতে এবং জাতীয় আইনে এর বিধান নিশ্চিত করতে এবং নীতিগত পদক্ষেপের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করতে বাধ্য করেছে।

বৈষম্যের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক ছাত্র ও জনগণের আন্দোলনের পর, কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার আগে, রাষ্ট্রকে অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে বৈষম্য এখনও সমাজের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। নীতি এবং আইনগুলোর যথাযথ পর্যালোচনা এবং সংশোধন করা যথাশীঘ্র প্রয়োজন যাতে সমান এবং ন্যায়ানুগ নিয়মগুলো নিশ্চিত করা যায়। ইতিবাচক পদক্ষেপ, যেখানে প্রয়োজন, এখনই শুরু করা উচিত। সকল সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং কর্মকর্তাদের বৈষম্যহীনতার প্রকৃত অর্থ এবং আইনের অধীনে এই লক্ষ্যে তাদের বাধ্যবাধকতা উপলব্ধি করার জন্য উদ্যোগ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

বৈষম্যহীন মূল্যবোধ প্রচারের জন্য গণমাধ্যম এবং সামাজিক মাধ্যমগুলো ব্যবহার করা উচিত। সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মধ্যে সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য পদ্ধতিগত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। গৃহীত সমস্ত পদক্ষেপের অগ্রগতি নিরীক্ষণের জন্য একটি মনিটরিং ব্যবস্থা থাকা উচিত। ছাত্র ও জনগণের দ্বারা যে বীজ বপন করা হয়েছিল, তা বাংলাদেশকে সেই শপথের দিকে রূপান্তরিত করবে যা বাংলাদেশের সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদে প্রতিজ্ঞা করা হয়েছে, অর্থাৎ, 'প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতা জনগণের' - এবং শুধুই জনগণের!

ফাইয়াজউদ্দিন আহমদ: আইনজীবী এবং সামাজিক-আইন গবেষক

Comments

The Daily Star  | English
Mirza Fakhrul on polls

Efforts on to make polls questionable and delayed: Fakhrul

Says Chief Adviser Yunus has assured BNP that the election will be held in February 2026

4h ago