দেশ জনগণের, অধিকার?

মুখের কথায় নয়, লিখিতভাবে বাংলাদেশের মালিক জনগণ। বলা যায় দেশটা জনগণের নামে রেজিস্ট্রি করা। রেজিস্ট্রির দলিল সংবিধান।
farm house inside tokyo narita airport
২০১৬ সালের ৬ ডিসেম্বর তোলা ছবিটিতে দেখা যাচ্ছে টোকিওর নারিতা বিমানবন্দরের মাঝখানে প্রাচীর দিয়ে ঘিরে রাখা একটি খামার বাড়ি। ১৯৬০ এর দশক থেকে কৃষকরা বিমানবন্দরটি নিমার্ণের বিরোধিতা করে আসছেন। শুধু তাই নয়, সেই এলাকা থেকে সরে যেতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছেন। ছবি: সংগৃহীত

মুখের কথায় নয়, লিখিতভাবে বাংলাদেশের মালিক জনগণ। বলা যায় দেশটা জনগণের নামে রেজিস্ট্রি করা। রেজিস্ট্রির দলিল সংবিধান।

জনগণ তাদের মতামতের প্রতিফলন ঘটিয়ে যাদেরকে নির্বাচিত করবেন, তারা জনগণের পক্ষে দেশ পরিচালনা করবেন। যিনি পরিচালনা করবেন দেশের মালিকানা তার যতটা, একজন দিনমজুর বা দরিদ্র কৃষকের মালিকানাও ততটা। মালিকের অধিকার ক্ষুন্ন হয়, এমন কোনো কিছু পরিচালনকারীরা করতে পারবেন না। বাস্তবে মালিক জনগণের, 'অধিকার-ক্ষমতা' কতটা?

পরিচালনকারীরা জনগণের অধিকারের বিষয়টি বিবেচনায় রাখেন কিনা? দু'একটি ঘটনার আলোকে দেখার চেষ্টা করব।

১. একজন তরুণ, গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিবিদ। বর্তমান বাংলাদেশে যারা আইটি সেক্টরে কাজ করছেন তাদের অন্যতম। আইটি সেক্টর নিয়ে কাজ করেন, সম্ভাবনার কথা বলেন, বলেন সমস্যার কথা। প্রতিবন্ধকতা বা অনিয়মগুলো তুলে ধরেন, লেখেন। পরিচিত এই তরুণের নাম ফাহিম মাসরুর। বেসিসের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। কয়েকদিন আগে তরুণ উদ্যোক্তা হিসেবে পুরস্কৃত হয়েছেন। পুরস্কার তার হাতে তুলে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। হাস্যোজ্জ্বল সেই ছবি দেখে গর্ব হয়েছে।

হঠাৎ করে জানলাম তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে ভয়ঙ্কর ৫৭ ধারায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, গণমাধ্যমের অনলাইন সংস্করণে আলোড়ন তৈরি হলো। স্বস্তির সংবাদ, কয়েক ঘণ্টা পর জানা গেল তাকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। ফাহিম মাসরুর সত্য-অর্ধসত্য এমনকি মিথ্যা কোনো মামলারও আসামি নন। অপরিচিত কেউ নন। এমন একজন মানুষকে তার অফিস থেকে গ্রেপ্তার করা হলো কেন? জানা গেল একজন অভিযোগ করেছেন, ফাহিম মাসরুর তার ফেসবুক ওয়ালে প্রধানমন্ত্রীকে কটুক্তি করেছেন। কটুক্তি জাতীয় কার্টুন বা লেখা শেয়ার করেছেন। কেউ একজন এই অভিযোগ করলেন, অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে তাকে গ্রেপ্তার করা হলো। অভিযোগের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্যেই নাকি তাকে তাৎক্ষণিকভাবে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। জিজ্ঞাসাবাদ করে তিন ঘণ্টা পর তাকে ছেড়ে দেয়া হলো। পুলিশ তার ফেসবুক ঘেটে দেখেছে 'আপত্তিকর' কিছু সেখানে পাওয়া যায়নি। প্রশ্ন হলো, গ্রেপ্তার না করেও তো 'আপত্তিকর' কিছু খুঁজে দেখা যেত। ফেসবুক ওয়াল তো গোপন কিছু না। খুঁজে না দেখেই গ্রেপ্তার করে ফেলা হলো।

একজন দেশের মালিকের 'অধিকার' এত কম হতে পারে না। আর রাষ্ট্রের মালিকেরা তাদের পক্ষে দেশ পরিচালনাকারীদের সমালোচনা বা কার্টুন প্রকাশ করতে পারবেন না? মালিকদের এই অধিকার থাকবে না? যে ব্যক্তির অভিযোগে পুলিশ গ্রেপ্তার করল, সেই অভিযোগের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া গেল না। তার অর্থ অভিযোগটিই অসত্য। অসত্য অভিযোগ যিনি করলেন, পুলিশ কি তাকে গ্রেপ্তার করবে বা তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে? জানি নেবে না। কারণ অভিযোগকারী দেশ পরিচালনাকারীদের অংশ।

পরিচালনাকারীরা মালিকদের 'অধিকার' অস্বীকার করার প্রবণতা নিয়ে দেশ পরিচালনা করছেন।

২. একজন মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৭১ সালে ঢাকা শহরে অপারেশন করে পাকিস্তানি বাহিনীকে যে গেরিলারা হত্যা করতেন, তাদের একজন। খালেদ মোশাররফ, মেজর হায়দারের প্রিয় গেরিলা। মানসিকতায় এখনও টগবগে তরুণ। বহু বছর ধরে তাকে চিনি-জানি। ১৯৭১ সালে যখন মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন, তখন ছিলেন ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থী। ইস্কাটনে নিজেদের বাড়ি। বাবা-মা বোনদের না জানিয়ে চলে গিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধে। তার অনুমতি না নেয়ায় নাম উল্লেখ করছি না।

স্বাধীন বাংলাদেশে তিনিসহ তার বন্ধুরা সবাই প্রতিষ্ঠিত, সুপরিচিত। এক-দেড় বছর আগে হঠাৎ একদিন জানলাম র‌্যাব তাকে ধরে নিয়ে গেছে। বিস্মিত নয়, তার চেয়ে বেশি কিছু হলাম। তারপর জানলাম ছেড়ে দেয়া হয়েছে, বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে যাওয়া হয়েছে। ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি বিষয়ে কিছু একটা জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্যে নাকি তাকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। জিজ্ঞাসাবাদে তার কোনো ধরনের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি। তদন্তের জন্যে আইনশৃঙ্খলাবাহিনী যে কাউকে জিজ্ঞাসাবাদ করতেই পারে। জিজ্ঞাসাবাদ তো ধরে না নিয়েও করা যায়। এত গুরুত্বপূর্ণ সম্মানিত- শ্রদ্ধেয় একজন মুক্তিযোদ্ধার থেকে যা জানার, তা তো তার অফিসে এসেও জানা যেত। ধরে নিয়ে না গেলে কোনো ক্ষতি ছিল না।

এখানেই মালিকদের 'অধিকার'-এর বিষয়। পরিচালনকারীরা তা যখন স্বীকার করতে চায় না বা বিবেচনায় নেয় না, তখন ধরে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে।

এই গেরিলারা ১৯৭১ সালে দেশের জন্যে কিনা করেছেন! একটা ঘটনা বলি। গেরিলারা সিদ্ধান্ত নিলেন পাকিস্তানি বাহিনীকে বোকা বানাবেন। গেরিলাদের মা-বোনদের স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা বানানোর কাজে লাগিয়ে দিলেন। সেই পতাকা গ্যাস বেলুনের সঙ্গে বেঁধে মানিক মিয়া এভিনিউসহ আরও দু'একটি জায়গা থেকে উড়িয়ে দিলেন। বেলুনের সঙ্গে বাংলাদেশের পতাকা। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মাথা খারাপ। তারা বেলুন লক্ষ্য করে গুলি করতে শুরু করলেন। ঘটনাটি তিনি তার বইয়ে লিখেছেন। তার মুখে শুনেছি, বইয়ে পড়েছি। যত সহজে তিনি লিখেছেন, যত সহজে এখন লিখছি, আপনি একটু হলেও হাসছেন। একটু চিন্তা করে দেখেন তো ঘটনাটি ১৯৭১ সালের প্রেক্ষাপটে। কতটা ভয়ঙ্কর ছিল সেই পরিস্থিতি। সেই মানুষদের 'অধিকার'-এর বিষয়টি যদি এমন হয়, অন্যদের অবস্থা কেমন!

৩. পরিচিত-প্রখ্যাত মানুষদের ক্ষেত্রে যা ঘটে, তাদের 'অধিকার' যেভাবে লঙ্ঘিত হয়, সাধারণ মানুষের অবস্থা কেমন, তা বুঝতে কষ্ট হওয়ার কথা নয়।

ইচ্ছে হলো, সংস্কার আন্দোলনের নেতাদের চোখ বেঁধে ধরে নিয়ে গেল, ছেড়ে দিয়ে বলল 'ভুল বোঝাবুঝি'।

ধরে নিয়ে যাওয়ার পর মিলনদের লাশ পাওয়া যায়, কারও লাশও পাওয়া যায় না। ছবি বুকে নিয়ে স্বজনরা হাহাকার করেন।

মানুষের 'অধিকার' বিষয়ক একটা গল্প দিয়ে লেখা শেষ করি। 'দেশের মালিক জনগণ'- জাপানের সংবিধানে তা লেখা আছে কিনা জানি না। তবে তাদের 'অধিকার' কতটা, তা জানি।

'নারিতা' জাপানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দর। অনেক বছর আগে প্রথমবার যখন উড়োজাহাজে অবতরণ করেছিলাম, রানওয়ের মাঝে একটি বাড়ি জাতীয় কিছু চোখে পড়েছিল। রানওয়ের সঙ্গে বাড়ি হতে পারে না, অন্য কিছু হবে হয়তো। এয়ারপোর্টে উপস্থিত প্রবাসী বাঙালিরা নিশ্চিত করলেন, যা দেখেছি সেটা একজন জাপানির বাড়ি। তিনি বিমানবন্দর নির্মাণের জন্যে তার জায়গা দিতে রাজি হননি। সে কারণে রানওয়ের সঙ্গে তার বাড়িটি এভাবে রয়ে গেছে। সত্যতা নিয়ে কিছুটা সন্দেহ ভেতরে ছিলই। কয়েকদিন আগে দেখলাম জাপান প্রবাসী কিয়ুসু বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক আশির আহমেদ ঘটনাটি লিখেছেন। সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হলাম। নিশ্চিত হলাম জাপানিদের 'অধিকার' বিষয়ে।

নারিতা বিমানবন্দরে প্রতিদিন প্রায় ৭০০ উড়োজাহাজ উঠা-নামা করে। আরেকটি রানওয়ে বানানো গেলে আরও কমপক্ষে ৭০০ উড়োজাহাজ উঠানামা করতে পারে। চাহিদা সেরকমই। পুরো বিমানবন্দরের সেই সক্ষমতা আছে। কিন্তু রানওয়ে না থাকায় তা সম্ভব হচ্ছে না। রানওয়ের মাঝখানে যার জমি, তিনি সরকারকে তা দিচ্ছেন না। তিনি মারা গেছেন। তার বংশধররাও দিচ্ছেন না। সরকার গত ৫০ বছর ধরে বুঝিয়ে জমিটি কিনে নিতে চাইছে। কোনোভাবেই মালিকেরা দিতে রাজি না। এই বাড়িতে যে মালিকেরা নিয়মিত থাকেন, তাও নয়।

একজন এক টুকরো জমি না দেয়ার কারণে, আরেকটি বিমানবন্দর বানাতে হয়েছে। অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক রূপ দিতে হয়েছে। একজন এক টুকরো জমি না দেয়ায় কী পরিমাণ বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে, সরকার কতটা বিপদে পড়েছে! তারপরও এই বাড়িতে পানি, বিদ্যুৎ, টেলিফোন সব সুবিধা সরকারকে নিশ্চিত করতে হয়েছে। আইন অনুযায়ী জনগণের তা 'অধিকার' সরকার দিতে বাধ্য।

মালিক সরকারকে জমি দেননি, কারণ বিমানবন্দর নির্মাণের জায়গা ঠিক করার আগে, তার সঙ্গে আলাপ করা হয়নি বা তাকে জানানো হয়নি। তিনি টেলিভিশনের সংবাদ দেখে জেনেছেন যে, এই এলাকায় বিমানবন্দর নির্মিত হবে। এতে তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে জমি না দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তার বংশধরেরা সরকারের প্রতি সেই ক্ষুব্ধতা ধরে রেখে প্রাচীর দিয়ে বাড়িটি ঘিরে রেখেছেন।

জনগণের 'অধিকার' বিষয়ে আরও একটি তথ্য দিই। নারিতা বিমানবন্দর তৈরি হওয়ার পর এলাকার মানুষ উপলব্ধি করলেন, উড়োজাহাজের শব্দে রাতে তাদের ঘুমের সমস্যা হচ্ছে। তারা সরকারকে জানালেন। সিদ্ধান্ত হলো, নারিতা বিমানবন্দরে রাতে উড়োজাহাজ উঠা-নামা করবে না।

Comments

The Daily Star  | English

An April way hotter than 30-year average

Over the last seven days, temperatures in the capital and other heatwave-affected places have been consistently four to five degrees Celsius higher than the corresponding seven days in the last 30 years, according to Met department data.

7h ago