আইন মানতে হয় না মোটরসাইকেলের: বাড়ছে সংখ্যা, ঝুঁকি

গণপরিবহনের অপ্রতুলতা ও যানজট এড়িয়ে চলতে গত কয়েক বছর থেকেই মোটরসাইকেলে ঝুঁকছেন নিত্য যাত্রীরা। প্রতিদিন দেশে এখন গড়ে ১,০৩৫টি মোটরসাইকেলের রেজিস্ট্রেশন নেওয়া হচ্ছে। তবে যারা এসব মোটরসাইকেল চালাচ্ছেন তাদের একটি বড় অংশেরই লাইসেন্স নেই। এই অবস্থায় বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুর্ঘটনা প্রবণ এই দুই চাকার বাহনটির ওপর লাগাম না টানলে সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
বিজয় সরণি মোড়ে ট্রাফিক সিগনালে দাঁড়িয়ে রয়েছে প্রচুর মোটরসাইকেল। গত কয়েক বছরে রাজধানীতে মোটরসাইকেল সংখ্যা ব্যাপক বৃদ্ধি পাওয়ায় এখন হর হামেশাই দেখা যায় এরকম দৃশ্য। ছবি: আমরান হোসেন/ প্রবীর দাশ

গণপরিবহনের অপ্রতুলতা ও যানজট এড়িয়ে চলতে গত কয়েক বছর থেকেই মোটরসাইকেলে ঝুঁকছেন নিত্য যাত্রীরা। প্রতিদিন দেশে এখন গড়ে ১,০৩৫টি মোটরসাইকেলের রেজিস্ট্রেশন নেওয়া হচ্ছে। তবে যারা এসব মোটরসাইকেল চালাচ্ছেন তাদের একটি বড় অংশেরই লাইসেন্স নেই। এই অবস্থায় বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুর্ঘটনা প্রবণ এই দুই চাকার বাহনটির ওপর লাগাম না টানলে সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।

রাস্তাতে মোটরসাইকেল চালকদের ওপর আইন প্রয়োগেও এক ধরনের শৈথিল্য দেখা যায় পুলিশ সদস্যদের। মোড়ে ট্রাফিক সিগনালে যখন অন্য সব গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকে তখনও দেখা যায় ফাঁক-ফোঁকর দিয়ে মোটরসাইকেলগুলো চালকরা দিব্যি বেরিয়ে যান। এ ধরনের বেপরোয়া চালকদের সিগনালে থামিয়ে রাখতে অনেক জায়গায় বাধ্য হয়ে দড়ি দিয়ে রাস্তা আটকাতেও দেখা যায় ট্রাফিক পুলিশকে। তবে ট্রাফিক সচেতনতা বাড়াতে পুলিশের বিশেষ কর্মসূচি শুরু হওয়ার পর গত কয়েক দিন ধরে মোটরসাইকেল চালকদের আইন মানতে কড়াকড়ি দেখা গেছে। পুলিশের নির্দেশনায় হেলমেটবিহীন চালকদের অনেক ফিলিং স্টেশনেই তেল দেওয়া হচ্ছে না।

স্বাধীনতার পর দেশে প্রায় ২২ লাখ ৭০ হাজার মোটরসাইকেলের রেজিস্ট্রেশন করানো হয়েছে। এর মধ্যে ২০১১ সাল থেকে চলতি বছরের জুলাই মাসের মধ্যেই রেজিস্ট্রেশন হয়েছে ১৫ লাখ ১১ হাজার মোটরসাইকেলের। কিন্তু গত ৪৭ বছরে মোটরসাইকেলের ড্রাইভিং লাইসেন্স ইস্যু করা হয়েছে মাত্র ১১ লাখ ৩২ হাজার।

তবে পরিবহন খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর বাইরেও রেজিস্ট্রেশন নেই এমন অনেক মোটরসাইকেল চলাচল করছে। বিশেষ করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে এরকম প্রচুর বিনা রেজিস্ট্রেশনের মোটরসাইকেল রয়েছে।

পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও পুলিশ বলছে, অন্য যে কোনো তিন চাকার ও চার চাকার যানবাহনের তুলনায় মোটরসাইকেল অধিক দুর্ঘটনা প্রবণ। সেই সঙ্গে ট্রাফিক আইন ভাঙার দিক থেকেও সবার ওপরে মোটরসাইকেল চালকরাই।

সিগনালে মোটরসাইকেল থামাতে রাস্তায় দড়ি বাঁধছেন এক ট্রাফিক পুলিশ। গতকাল বিজয় সরণি মোড়ের চিত্র। ছবি: আমরান হোসেন/ প্রবীর দাশ

তবে মোটরসাইকেল বিক্রি বেড়ে যাওয়ার পেছনে মূল কারণ যে গণপরিবহন ব্যবস্থার করুণ দশা ও ঢাকা শহরের যানজট- সেটাও তারা মানছেন। চালকরাও মনে করেন, একমাত্র মোটরসাইকেলের সাহায্যেই যানজট এড়িয়ে চলাচল করা সম্ভব। সেই সঙ্গে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সড়ক নেটওয়ার্ক বিস্তৃত হওয়ার ফলেও সারাদেশে মোটরসাইকেলের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মির রেজাউল আলম বলেন, ট্রাফিক নিয়ম ভঙ্গ করার দিক থেকে সবচেয়ে এগিয়ে মোটরসাইকেল চালকরা। মোড়ের কাছের জেব্রা ক্রসিংয়ে প্রত্যেক যানবাহনের থামার কথা থাকলেও অধিকাংশ মোটরসাইকেল চালকই সেটা মানেন না। ‘এদের নিয়ন্ত্রণে রাখা খুবই কঠিন কাজ। তবু আমরা আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছি এবং এর ফলাফলও পাওয়া যাচ্ছে। এখন ৯৫ শতাংশের বেশি চালক ও পেছনের যাত্রী হেলমেট পরছেন।

গত ৫ আগস্ট থেকে শুরু হওয়া ট্রাফিক সপ্তাহের ১০ দিনে ফিটনেসবিহীন যানবাহন ও বেপরোয়া চালকদের বিরুদ্ধে মোট ৮৩ হাজার মামলা দিয়েছিল পুলিশ। এর মধ্যে ৪৪ হাজার মামলাই ছিল মোটরসাইকেল চালকদের বিরুদ্ধে। আর মোটরসাইকেল আটক করা হয় মোট ১,৭৪২টি।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্য অনুযায়ী, গত ঈদুল আযহার সময় ১৬ আগস্ট থেকে পরবর্তী ১৩ দিনে দেশজুড়ে ২৩৭টি দুর্ঘটনায় ২৫৯ জন নিহত ও ৯৬০ জন আহত হন। এসব দুর্ঘটনার ১৬ দশমিক ৭২ শতাংশ ক্ষেত্রে মোটরসাইকেল ছিল।

বিআরটিএ’র মুখপাত্র ও সড়ক নিরাপত্তা পরিচালক মাহবুব-ই-রব্বানী বলেছেন, মোটরসাইকেল সংখ্যা যে হারে বাড়ছে সেটা নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ থাকলেও যেসব মোটরসাইকেলের রেজিস্ট্রেশন করানো হয়েছে তাদের চলাচল সীমিত করা সম্ভব নয়। সড়ক নিরাপত্তা বাড়াতে আইন প্রয়োগের দিকেই বেশি জোর দিচ্ছেন তারা। নতুন মোটরসাইকেল রেজিস্ট্রেশনেও কোনো ধরনের বিধিনিষেধ দেওয়া হয়নি বলে তিনি উল্লেখ করেন।

বিশিষ্ট পরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, মানসম্মত গণপরিবহন ব্যবস্থা না থাকায় রাজধানীতে মোটরসাইকেল সংখ্যা বাড়ছে। গণপরিবহনে উন্নতি না করা পর্যন্ত সরকারের পক্ষে এটি ঠেকানো সম্ভব নয়।

জেব্রা ক্রসিংয়ে পথচারী পারাপারের মধ্যেও থামছে না মোটরসাইকেল। ফলাফল হিসেবে বাড়ছে দুর্ঘটনা। গতকাল রোববার, বাংলামোটর এলাকার দৃশ্য। ছবি: আমরান হোসেন/ প্রবীর দাশ

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সাবেক এই পরিচালক আরও বলেন, মোটরসাইকেল ঝুঁকিপূর্ণ বাহন। এর সংখ্যা বাড়তে থাকলে পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাবে। আর শহরের মতো এলাকায় যেখানে প্রচুর সংখ্যক মানুষ বসবাস করেন সেখানে মোটরসাইকেল বাড়লে অবস্থা শোচনীয় হতে পারে।

Comments