এইচএসসির প্রশ্নপত্রে সাম্প্রদায়িকতা: একদিনে হয়েছে?

এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরু হয়েছে গত ৬ নভেম্বর। ২০২২ সালে সাধারণ, মাদ্রাসা ও কারিগরি বোর্ড মিলিয়ে ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এবার মোট পরীক্ষার্থী ১২ লাখের কিছু বেশি। ২০২১ সালে ঢাকা বোর্ডে ৩ লাখ ১৪ হাজার ৭৪০ জন পরীক্ষার্থী পরীক্ষা দিয়েছিল। ধরে নিচ্ছি, ২০২২ সালেও পরীক্ষার্থীর সংখ্যা অন্তত ৩ লাখ।

এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরু হয়েছে গত ৬ নভেম্বর। ২০২২ সালে সাধারণ, মাদ্রাসা ও কারিগরি বোর্ড মিলিয়ে ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এবার মোট পরীক্ষার্থী ১২ লাখের কিছু বেশি। ২০২১ সালে ঢাকা বোর্ডে ৩ লাখ ১৪ হাজার ৭৪০ জন পরীক্ষার্থী পরীক্ষা দিয়েছিল। ধরে নিচ্ছি, ২০২২ সালেও পরীক্ষার্থীর সংখ্যা অন্তত ৩ লাখ।

৬ নভেম্বর ছিল বাংলা (আবশ্যিক) ১ম পত্র পরীক্ষা। ঢাকা বোর্ডের এই বিশাল সংখ্যক শিক্ষার্থীর কাছে প্রথম দিন কী বার্তা পৌঁছেছে তা একটু জানা দরকার।

১১ নম্বর প্রশ্নটি ছিল এইরকম— 'নেপাল ও গোপাল দুই ভাই। জমি নিয়ে বিরোধ তাদের দীর্ঘদিন। অনেক সালিশ-বিচার করেও কেউ তাদের বিরোধ মেটাতে পারেনি। কেউ কাউকে ছাড় দিতে নারাজ। এখন জমির ভাগ বণ্টন নিয়ে মামলা চলছে আদালতে। ছোট ভাই নেপাল বড় ভাইকে শায়েস্তা করতে আব্দুল নামে এক মুসলমানের কাছে ভিটের জমির এক অংশ বিক্রি করে। আব্দুল সেখানে বাড়ি বানিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। কোরবানির ঈদে সে নেপালের বাড়ির সামনে গরু কোরবানি দেয়। এই ঘটনায় নেপালের মন ভেঙ্গে যায়। কিছুদিন পর কাউকে কিছু না বলে জমি-জায়গা ফেলে সপরিবারে ভারতে চলে যায় সে।'

এরপর প্রশ্ন করা হয়েছে— (ক) মিরজাফর কোন দেশ হতে ভারত আসেন। (খ) ঘরের লোক অবিশ্বাসী হলে বাইরের লোকের পক্ষে সবই সম্ভব।— ব্যাখ্যা কর। (গ) উদ্দীপকের 'নেপাল' চরিত্রের সঙ্গে 'সিরাজউদ্দৌলা' নাটকের 'মিরজাফর' চরিত্রের তুলনা কর। (ঘ) 'খাল কেটে কুমির আনা'—প্রবাদটি উদ্দীপক ও 'সিরাজউদ্দৌলা' নাটক উভয় ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রযোজ্য।—উক্তিটির সার্থকতা নিরূপণ কর।

এই হচ্ছে সৃজনশীল প্রশ্নের নমুনা। এভাবে শিক্ষার্থীদের মনে সাম্প্রদায়িকতা ছড়ানোর জন্য অনেকদিন ধরে চেষ্টা করা হচ্ছে। সেই চেষ্টা সফল হয়েছে বলা যায়। শিক্ষা হচ্ছে জ্ঞান, দক্ষতা ও দৃষ্টিভঙ্গির বিকাশ। শিশু-কিশোরদের ছেলেবেলায় যে ধরনের শিক্ষা দেওয়া হবে তারা বড় হয়ে তার প্রতিফলন ঘটাবে। শিক্ষা হচ্ছে একটা জাতির বীজ। সেই বীজ যখন সাম্প্রদায়িকতা, উগ্রতায় ঘেরা থাকে, তখন তার ফল হয় ভয়ঙ্কর। ২০২২ সালের ঢাকা বোর্ডের প্রশ্নপত্রে সেই প্রতিফলন দেখছি, সামনেও হয়তো দেখবো।

পেছনে ফিরি। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহের ঘটনা। আমাদেরই একজন প্রিয় সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দুঃখ করেই লিখেন, তার একমাত্র ছেলে সহপাঠী দ্বারা সাম্প্রদায়িক আক্রমণের শিকার হয়েছে। অথচ এই সহপাঠীর জন্য সবসময় সে খাবার নিয়ে যেত। সেই সহপাঠীই তাকে নোংরাভাবে সাম্প্রদায়িক আক্রমণ করে বসে। স্কুলে জানাজানি হওয়ার পরে সেই ঘটনার সমাধান হয়েছে। আদৌ কি সমাধান হয়েছে?

বাসায় যখন সাম্প্রদায়িক চর্চা হয়, তা শিশুদের মনে সরাসরি প্রতিফলিত হয়। সেই শিক্ষার্থী ও তার অভিভাবকদের ডেকে স্কুল কর্তৃপক্ষ কথা বলেছে। কিন্তু সাম্প্রদায়িক বীজ কি তাদের মন থেকে উধাও হয়েছে? শিক্ষার্থীর মনে এটা কি একদিনে তৈরি হয়েছে? অবশ্যই না।

ঢাকা বোর্ডের বাংলা প্রশ্নে যখন এই ধরনের প্রশ্ন করা হয়, তখন বোঝা যায় সাম্প্রদায়িক বিষ কতদূর পৌঁছে গেছে। অবশ্য, শিক্ষামন্ত্রী খুব গুছিয়ে সবসময়ের মতো এবারও বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, 'শিক্ষার্থীদের মনে যারা সাম্প্রদায়িক উসকানির বীজ বপন করতে চায়, তাদের ভবিষ্যতে এসব কাজের সঙ্গে (প্রশ্নপত্র সেটিং-মডারেটিং) আর সম্পৃক্ত করা হবে না। একইসঙ্গে প্রশ্নপত্রে যারা সাম্প্রদায়িক উসকানি দিয়েছে, তাদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'

মাননীয় মন্ত্রী, আমার বক্তব্য সরল। যারা সাম্প্রদায়িক উসকানি দিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে আপনি ব্যবস্থা নিচ্ছেন। কী করবেন? হয়তো তাদের প্রশ্ন করতে দেওয়া হবে না। কিন্তু যে সাম্প্রদায়িক ভাবনা শিক্ষকের মাথায় গেঁথে গেছে, তা দূর করবেন কীভাবে? সেই শিক্ষক ক্লাস নেওয়ার সময় যে সাম্প্রদায়িক শিক্ষা দেবেন না, সেই নিশ্চয়তা আপনি দেবেন কীভাবে? ঢাকা বোর্ডের লাখো শিক্ষার্থীর মগজে-মননে সৃজনশীল প্রশ্নের নামে উসকানি সমৃদ্ধ যে বাজে চিন্তা ভর করল, তা দূর করবেন কীভাবে? এই শিক্ষার্থীরা জেনেছে, 'হিন্দুর বাড়ির সামনে গরু কোরবানি দিয়ে তার মন ভেঙে দেওয়া যায়, তাকে উচ্ছেদ করা যায়'— এই নোংরা বিষয় দূর করবেন কীভাবে? এর উত্তর আপনি কেন, দেশের রাষ্ট্রনায়কও দিতে পারবেন কি না সন্দেহ।

এভাবে একটা একটা করে লোম বাছতে কম্বল উজাড় হয়ে যাবে। সাম্প্রদায়িকতা বা ধর্মান্ধতা এক দশক ধরে চর্চিত হয়ে আসছে দেখেই তা আজ এই রূপ নিয়েছে। এটা কি সুইচ চাপলেই দূর করা সম্ভব?

ঢাকা বোর্ডের বাংলা প্রথম পত্রের প্রশ্নে শুধু ১১ নম্বর প্রশ্নেই সাম্প্রদায়িকতা ছিল তা নয়। আরও ছিল। ৪ নম্বর প্রশ্ন। প্রশ্নে লেখা— '১০ মার্চ, ১৯৭১। রাস্তায় রাস্তায় পাকিস্তানি মিলিটারি। গুয়াতলী গ্রামের হিন্দু জনগোষ্ঠী ভয়ে ভারতে পাড়ি জমায়। শুধু ভিটে আঁকড়ে পড়ে থাকে কেষ্টবাবু। পাশের গ্রামে ছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ক্যাম্প। স্থানীয় রাজাকার কাশেম মোড়ল কেষ্টবাবুকে সন্দেহের চোখে দেখে। সে মনে করে কেষ্টবাবু মুক্তি বাহিনীর লোক। এক বৃষ্টিমুখর দিনে গুয়াতলী গ্রামে মিলিটারি প্রবেশ করে এবং কাশেম মোড়লের ইশারায় হানাদার বাহিনী তাকে ধরে নিয়ে পার্শ্ববর্তী রাস্তার পাশে জীবন্ত পুঁতে রেখে চলে যায়।'

এরপর প্রশ্ন করা হয়েছে— (ক) 'রেইনকোট' গল্পটি কত সালে প্রকাশিত হয়?  (খ) 'রাশিয়ার ছিল জেনারেল উইনটার, আমাদের জেনারেল মনসুন।'—ব্যাখ্যা কর। (গ) উদ্দীপকের কেষ্টবাবু 'রেইনকোট' গল্পের কোন চরিত্রকে স্মরণ করিয়ে দেয়? বুঝিয়ে দাও (ঘ) "উদ্দীপকটি 'রেইনকোট' গল্পের একটি খণ্ডচিত্র মাত্র।"—উক্তিটির সত্যতা যাচাই কর।

মুক্তিযুদ্ধের এই ধরনের গল্প বলা বা সৃজনশীল কৌশল দেখেই বোঝা যায় স্বাধীনতা আসলে কাদের হাতে। মুক্তিযুদ্ধে এত এত গল্পের মধ্যে এই ধরনের গল্প যে শিক্ষক বলেন, তার কাছ থেকে শিক্ষার্থীরা কী শিখবে?

গবেষক আফসান চৌধুরীর 'হিন্দু জনগোষ্ঠীর একাত্তর' বইটা বোধহয় এই শিক্ষক পড়েননি। ১৯৭১ সালের সবচেয়ে বেশি নিপীড়িত হয়েছে হিন্দু জনগোষ্ঠী। চুকনগর গণহত্যা, শাঁখারিবাজারের গণহত্যার দলিলসহ আরও অসংখ্য দলিল তার প্রমাণ দেয়। হিন্দু জনগোষ্ঠী ভয়ে ভারতে পাড়ি জমায়, এর বদলে বলা যেত ১ কোটি শরণার্থী ভারতে আশ্রয় নিয়েছে। এই বোধ যদি শিক্ষকদের না থাকে তাহলে তারা শিক্ষক নয়। তারা বরং স্বাধীনতার প্রকৃত ইতিহাস ধ্বংসে ব্যস্ত আর শিক্ষার্থীদের মগজে সাম্প্রদায়িক উসকানি দেওয়ার জন্য প্রশ্নপত্রে গরু কোরবানি দেওয়ায় ব্যস্ত।

২০১৭ সালে হেফাজতের ২৯টি দাবির পরিপ্রেক্ষিতে শিশুদের পাঠ্যবইয়ে ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়। হিন্দু ও প্রগতিশীল লেখকদের লেখা সরিয়ে ফেলা হয়। সেই সময় তা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। আলোচনার রেশ এখনো সজীব। পাঠ্যবই পরিবর্তনে যিনি দায়িত্বে ছিলেন তিনি আমাদের পরিচিত।

অনেকদিন পরে হেফাজতের ২৯টি দাবির পরিপ্রেক্ষিতে পাঠ্যবই কেন পরিবর্তিত হয়েছে তা জানতে চাই তার কাছে। তার উত্তরে তিনি যা বললেন তা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রনায়কের ইশারা ছাড়া এই দেশে কিছু কি সম্ভব? ধরুন, হেফাজত পাঠ্যপুস্তক পরিবর্তনের দাবি জানাল। হেফাজত কেন, জামায়াতও দাবি জানাতে পারে। কিন্তু সেটা বাস্তবায়ন করবে কে? সরকার বা জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। ধরুন, এনসিটিবি চেয়ারম্যান পাঠ্যপুস্তক পরিবর্তন করতে অনিচ্ছুক, কিন্তু তিনি সরকারের আদেশ মানতে বাধ্য। এর বাইরে তার যাওয়ার সুযোগই নেই।

এবার আরেকপক্ষের স্বীকারোক্তি বলি। পাঠ্যপুস্তক যে সময়ে পরিবর্তিত হয় সেই সময়ে কর্মরত যেসব অধ্যাপক ছিলেন, তাদের একজনের সঙ্গে আমার আলাপ হয়। হেফাজতের ২৯টি দাবির পরিপ্রেক্ষিতে কেন পাঠ্যবই পরিবর্তিত হয়েছে, তা জানতে চাই। তিনি বলেন, আমরা যেসব প্রস্তাব দেই তা এনসিটিবি শোনে এবং নোট করে, কিন্তু বাস্তবায়নের সময় তারা উপরের নির্দেশ মানে। এই ঘটনা প্রমাণ করে রাষ্ট্র পরিচালনাকারীরা না চাইলে শিক্ষা ব্যবস্থায় সাম্প্রদায়িকতা ঢোকার কোনো সুযোগই নেই।

সম্প্রতি আমি ব্যাঙ্গালোরের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্টের (আইআইএম) ক্যাম্পাসে গিয়েছিলাম। তাদের চিন্তাধারা জানার সুযোগ হয়েছে। তারা যে জায়গায় নিজেদের নিয়ে গেছে, তার থেকে আমরা অনেক দূরে। এই আইআইএমের প্রতিষ্ঠাতা হচ্ছেন বিখ্যাত কার্ডিয়াক সার্জন দেবী শেঠি। তার উদ্দেশ্যই হচ্ছে শিক্ষা ও গবেষণায় সর্বোচ্চ বিনিয়োগ করা। এতে করে জাতি যেমন শিক্ষিত হয়, তেমনি দক্ষ ও যোগ্য হয়।

আমাদের দেশে শিক্ষা, গবেষণা, বিজ্ঞান হচ্ছে অবহেলিত বিষয়। এই দেশে বিজ্ঞান শিক্ষকেরা ক্লাসে বিজ্ঞান পড়াতে চান না ভয়ে, গবেষণার জন্য বিজ্ঞানী খুঁজে পাওয়া যায় না, বিজ্ঞানীরা দেশে থাকতে চান না আর বিজ্ঞানী গণমাধ্যমে লাঞ্ছিত হয়। এই দেশে কীভাবে শিক্ষা উন্নত হবে? কীভাবে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা অসাম্প্রদায়িক হবে? কীভাবে আমরা সুশিক্ষিত জাতি হবো?

এক দশক ধরে জাতিকে যেভাবে সংস্কৃতি বিমুখ করা হয়েছে, সংস্কৃতিকে ধর্মের বিপরীতে দাঁড় করানো হয়েছে, তাতে এই দেশে শিক্ষাব্যবস্থায় সাম্প্রদায়িকতা থাকবে সেটা নিশ্চিত। সেই বিষ সরাতে যে বৃহৎ পরিকল্পনা প্রয়োজন, তা আসলে রাষ্ট্রের নেই। তাই প্রশ্নপত্রে এই দুর্গতি দেখতে হচ্ছে। এই সংকট নিরসনে ১১ ধারার শিক্ষাব্যবস্থায় অবশ্যই বিজ্ঞান, সংস্কৃতি, সংগীত, শারীরিক শিক্ষা অবশ্যই পাঠ্য হওয়া জরুরি। সেই সদিচ্ছা কি আমাদের আছে?

বিনয় দত্ত, কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক

[email protected]

(দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদকীয় নীতিমালার সঙ্গে লেখকের মতামতের মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির আইনগত, মতামত বা বিশ্লেষণের দায়ভার সম্পূর্ণরূপে লেখকের, দ্য ডেইলি স্টার কর্তৃপক্ষের নয়। লেখকের নিজস্ব মতামতের কোনো প্রকার দায়ভার দ্য ডেইলি স্টার নেবে না।)

Comments