আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস ও বাংলাদেশের বাস্তবতা

প্রতি বছর ৩০ আগস্ট আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস পালিত হয়। জাতিসংঘ ঘোষিত দিবসটির লক্ষ্য হলো, বিশ্বব্যাপী গুম ও জোরপূর্বক নিখোঁজের মতো ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি, ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর প্রতি সংহতি প্রকাশ ও রাষ্ট্রকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা।
পৃথিবীজুড়ে জোরপূর্বক গুমকে শুধু একটি মানবাধিকার লঙ্ঘন নয়, বরং মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই দিবসটি তাই বিশ্বের প্রতিটি রাষ্ট্রকে স্মরণ করিয়ে দেয়—নাগরিকের নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের এবং কোনো নাগরিককে গুম করার মতো অনৈতিক ও বেআইনি কর্মকাণ্ড সহ্য করা যায় না।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে গুম ইস্যুটি দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত এবং একই সঙ্গে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার। গত দেড় যুগ ধরে মানবাধিকার সংগঠন, গণমাধ্যম ও গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারগুলো অভিযোগ করে আসছিল, সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক কর্মী কিংবা সরকারবিরোধীরা হঠাৎ করেই নিখোঁজ হয়ে যাচ্ছেন এবং তাদের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। বিগত সরকারের আমলে সরকারের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্তরা বরাবরই এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন কিংবা সদুত্তর না দিয়ে প্রসঙ্গ এড়িয়ে গেছে।
অথচ গুমের শিকার অনেকেই পরবর্তীতে ফিরে এসেছেন, কাউকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে, আবার অনেকের খোঁজ আজও অজানা। এসব ঘটনায় ভুক্তভোগী পরিবারগুলো বছরের পর বছর অনিশ্চয়তা, শোক ও মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে বসবাস করছে। সন্তান হারানো মা, বাবা বা স্ত্রী, সন্তানেরা প্রতিদিন প্রতিমুহূর্তে প্রিয়জনের ফেরার আশায় দরজায় চোখ রাখেন। অথচ তাদের কাছে কোনো সঠিক তথ্য পৌঁছাচ্ছে না।
পরিবারগুলো তাদের স্বজনদের সন্ধান চেয়ে মানবিক আবেদন নিয়ে জাতিসংঘ থেকে দেশের সরকার এবং রাস্তায় পর্যন্ত দাঁড়িয়েছে। তাদের দাবি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নেওয়ার পর থেকে সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। বিগত সরকার তাদের এই আবেদনকে রাজনৈতিক ইন্ধনসহ নানা অযাচিত মন্তব্যে বিদ্ধ করেছে। এমনকি পরিবারগুলোকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে হয়রানির মতো অভিযোগও আমরা দেখেছি।
এমন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য ২০২৪ সাল ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। এ বছর বাংলাদেশ জাতিসংঘের 'জোরপূর্বক নিখোঁজ হওয়া থেকে সুরক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক কনভেনশন'-এ সই করেছে। দীর্ঘদিন ধরে মানবাধিকার সংগঠন ও আন্তর্জাতিক মহলের আহ্বানের পরিপ্রেক্ষিতে এই সনদে সই নিঃসন্দেহে ইতিবাচক একটি উদ্যোগ।
এর মাধ্যমে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, আর কোনো নাগরিক জোরপূর্বক গুমের শিকার হবেন না এবং যেসব ঘটনা অতীতে ঘটেছে, তার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করা হবে।
তবে কেবল আন্তর্জাতিক সনদে সই করাই যথেষ্ট নয়। বাস্তবে পরিবর্তন আনতে হলে প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, জবাবদিহিতা ও আইনের শাসন। গুমের ঘটনার প্রতিটি অভিযোগের নিরপেক্ষ ও কার্যকর তদন্ত হওয়া উচিত।
আশার কথা হলো, অন্তর্বর্তী সরকার গুম সংক্রান্ত কমিশন গঠন করেছে। কমিশনে গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করার সুযোগ পাচ্ছে।
এ ছাড়া, গুম কমিশন বহুল সমালোচিত আয়নাঘর, টর্চার সেল, গোপন বন্দীশালার বেশকিছু জায়গার সন্ধান পেয়েছে বলে প্রকাশিত সংবাদ সূত্রে জানা যাচ্ছে।
বন্দীশালা থেকে মুক্তি পাওয়া বা ফেরত আসা ব্যক্তিদের গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাতকারে উঠে এসেছে অকল্পনীয় সব নিপীড়নের চিত্র। তাদের বর্ণিত তথ্য দেশের মানুষকে ব্যথিত করেছে। দেশের নাগরিকের প্রতি এ ধরনের যন্ত্রনাপ্রদ আচরণ আমাদের হতবাক করেছে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, গুম শুধু ব্যক্তির জীবনের প্রতি আঘাত নয়, এটি গোটা সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনে। একটি সমাজে যখন নাগরিকরা আশঙ্কা করতে থাকে, কোনো ভিন্নমত পোষণ করলে বা রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হলে তারা গুম হয়ে যেতে পারে—তখন স্বাভাবিকভাবেই মত প্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হয়, গণতন্ত্র দুর্বল হয় এবং ভয় ও অনিশ্চয়তার সংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়ে। এটি রাষ্ট্রের সামাজিক বন্ধনকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং নাগরিকদের রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা কমিয়ে দেয়।
আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসে আমাদের প্রতিজ্ঞা হোক—অতীতের সব গুমের ঘটনার সত্য উদঘাটন, দায়ীদের বিচার নিশ্চিত এবং ভবিষ্যতে এমন কোনো ঘটনা না ঘটার মতো শক্তিশালী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক গুম সংক্রান্ত সনদে সই করার মাধ্যমে বাংলাদেশ যে দায়িত্ব গ্রহণ করেছে, তা কার্যকরে যেসব ব্যবস্থা নিচ্ছে, তা ইতিবাচক বলে বিবেচিত হচ্ছে। আমাদের মনে রাখতে হবে, গুমের মতো অপরাধ-মুক্ত বাংলাদেশ কেবল ঘটনার শিকার ও ভুক্তভোগী পরিবারের জন্য নয়, বরং গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও রাষ্ট্রের মর্যাদার জন্যও অপরিহার্য।
আমাদের প্রত্যাশা, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে স্পষ্ট বার্তা আসবে যে, আর কোনো নাগরিক গুম হবে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী থেকে শুরু করে প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব সবাই মিলেই এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলবেন, যেখানে ভিন্নমতকে সম্মান জানানো হবে, নাগরিক নিরাপত্তা সুরক্ষিত থাকবে এবং মানবাধিকারের মর্যাদা সর্বাগ্রে স্থান পাবে।
আবু আহমেদ ফয়জুল কবির, মানবাধিকার কর্মী
Comments