কেন মেসির বদলে রদ্রি জিতলেন বিশ্বকাপের গোল্ডেন বল?

শাবাব চৌধুরী

গত রোববার রাতে নিউজার্সিতে অতিরিক্ত সময়ে গড়ানো ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জিতেছে স্পেন। সদ্যসমাপ্ত এই টুর্নামেন্টে দলটির আট ম্যাচের সবকটিতে খেলে একটিও গোল বা অ্যাসিস্ট পাননি মাঝমাঠের প্রাণভোমরা রদ্রি।

তবুও বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার গোল্ডেন বল উঠেছে এই ৩০ বছর বয়সী মিডফিল্ডারের হাতেই। এই লড়াইয়ে তিনি পেছনে ফেলেছেন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক ও মহাতারকা লিওনেল মেসিকে।

অনেকের কাছেই এই সিদ্ধান্ত বড় চমক হয়ে এসেছে। কারণ ৩৯ বছর বয়সী মেসি ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা একটি বিশ্বকাপ কাটিয়েছেন। আটটি গোল আর চারটি অ্যাসিস্ট করে তিনি একাই গতবারের চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে টানা দ্বিতীয়বারের মতো ফাইনালে তুলেছিলেন। ফাইনালের আগ পর্যন্ত প্রতি ম্যাচেই গোল বা অ্যাসিস্ট করে অবদান ছিল তার। তবে স্পেনের বিপক্ষে একপেশে ফাইনালে ১২০ মিনিটের লড়াইয়ে ধারহীন আর্জেন্টিনা একটি শটও লক্ষ্যে রাখতে পারেনি।

স্বাভাবিকভাবেই অনেকে ভেবেছিলেন, গোল্ডেন বলের যোগ্য দাবিদার তো মেসিই। তার ধারাবাহিকভাবে দারুণ পারফরম্যান্স আর ম্যাচ জেতানোর অসামান্য ক্ষমতার কারণে ফিফা যদি তাকে পুরস্কারটি দিত, তবে কেউ হয়তো কোনো প্রশ্ন তুলত না।

কিন্তু তা না ঘটে গোল্ডেন বল দেওয়া হয়েছে স্পেনের অধিনায়ক রদ্রিকে। তার পেছনে পড়েছেন মেসি, ১০টি গোল করে গোল্ডেন বুটজয়ী ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপে কিংবা ইংল্যান্ডের জুড বেলিংহ্যামের মতো তারকারা, যাদের প্রত্যেকেই দুর্দান্ত একটি আসর কাটিয়েছেন।

এই সিদ্ধান্ত অনেক ভক্তের মনে প্রশ্ন জাগিয়েছে, তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে ২০২৪ সালে রদ্রির ব্যালন ডি'অর জয়ের সময়কার বিতর্কও। একটি গোল বা অ্যাসিস্ট না করেও কীভাবে একজন মিডফিল্ডার টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় হন?

এর উত্তর লুকিয়ে আছে গোল্ডেন বল আসলে কীসের ভিত্তিতে দেওয়া হয়, তার ভেতরে।

বিশ্বকাপে একজন ফুটবলারকে গোল্ডেন বুট দেওয়া হয় কেবল সর্বোচ্চ গোলের সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে। কিন্তু গোল্ডেন বল দেওয়ার প্রক্রিয়াটা আলাদা। ফিফার টেকনিক্যাল স্টাডি গ্রুপ (টিএসজি) এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের ভোটের মাধ্যমে এটি নির্ধারিত হয়। ১৯৮২ সালের বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো পুরস্কারটি পেয়েছিলেন ইতালির স্ট্রাইকার পাওলো রসি। তখন থেকেই স্রেফ পরিসংখ্যানের চেয়ে এখানে বিচারকদের সার্বিক মূল্যায়নের গুরুত্বই বেশি।

গোল্ডেন বলজয়ীকে বাছাইয়ের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত এই প্যানেল শুধু গোল বা অ্যাসিস্ট দেখে না। তারা মূল্যায়ন করে একজন খেলোয়াড়ের ট্যাকটিক্যাল প্রভাব, পুরো টুর্নামেন্টে তার ধারাবাহিকতা, টেকনিক ও শারীরিক সামর্থ্য, নেতৃত্ব ও এমনকি শৃঙ্খলার মতো বিষয়গুলো। পাশাপাশি পাসিংয়ের নিখুঁত হার, রক্ষণ সামলাতে অবদান, বল পুনরুদ্ধার, ড্রিবলিংয়ের সাফল্য ও ওয়ার্ক রেটের মতো আধুনিক সূচকগুলোও বিশ্লেষণ করে ফিফা।

এসব বিবেচনায় নিলে রদ্রির সার্বিক পারফরম্যান্স ও স্পেনের বিশ্বকাপ জয়ে এর প্রভাব বুঝতে আর কোনো অসুবিধা হয় না।

ইংলিশ ক্লাব ম্যানচেস্টার সিটির এই ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার এবারের বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশিবার বল ছুঁয়েছেন (৯১০ বার)। সবচেয়ে বেশি পাস সফলভাবে দিয়েছেন (৭৫৬টি)। আর পাস দেওয়ার ক্ষেত্রে তার নির্ভুলতার হার ছিল ৯৩.২ শতাংশ।

শুধু তাই নয়, আক্রমণভাগের শেষ অংশে (ফাইনাল থার্ডে) তিনি দিয়েছেন টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ ২০৪টি পাস। এতেই বোঝা যায়, স্পেনের প্রতিটি আক্রমণ গড়ে উঠত তাকে ঘিরেই। ডিফেন্সিভ পজিশনে খেলে থেকেও সুযোগ তৈরির দিক থেকে তিনি ছিলেন ১৫তম। এটি প্রমাণ করে, খেলা নিয়ন্ত্রণ করার পাশাপাশি তিনি আক্রমণভাগেও সমান কার্যকর ছিলেন।

যখন বল প্রতিপক্ষের পায়ে থাকত, রদ্রি তখনও ছিলেন সমান প্রভাব বিস্তারকারী। টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ ২৬টি ট্যাকল করেছেন তিনি। এছাড়া, প্রতিপক্ষের কাছ থেকে বল কেড়ে নেওয়ার দিক থেকে (মিডল ও অ্যাটাকিং থার্ডে) ছিলেন সেরা চার খেলোয়াড়ের একজন।

এই সংখ্যাগুলো মূল গল্পের খণ্ড খণ্ড চিত্র মাত্র। রদ্রি ছিলেন স্পেনের মাঝমাঠের স্পন্দন, ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করতেন। তার কারণেই ফাবিয়ান রুইজ ও দানি ওলমোর মতো আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডাররা অনেকটা স্বাধীনভাবে মাঠের ওপরের দিকে খেলতে পেরেছেন। তার পজিশনাল ডিসিপ্লিনের কারণে পুরো টুর্নামেন্টে স্পেনের দলগত পারফরম্যান্স ছিল সবচেয়ে গোছানো ও ভারসাম্যপূর্ণ।

পুরো আসরে বল দখলে ভীষণ আধিপত্য দেখিয়েছে স্পেন। আট ম্যাচের সাতটিতেই জাল অক্ষত রেখে তারা গোল খেয়েছে মাত্র একটি। ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে রীতিমতো উড়িয়ে দিয়েছে তারা, যেখানে মেসির দল একটি শটও লক্ষ্যে রাখতে পারেনি। স্পেনের এমন প্রতিটি সাফল্যের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন এই রদ্রিই, যদিও গোল বা অ্যাসিস্ট পাননি।

আর ঠিক এ কারণেই ফিফার টেকনিক্যাল প্যানেল ও সাংবাদিকরা মিলে তাকে টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে বেছে নিয়েছেন।

তবুও এই বিতর্ক অমূলক নয়। আর্জেন্টিনা দলে মেসির প্রভাব তো অস্বীকার করার উপায় নেই। বিশ্বকাপে তাদের ১৯টি গোলের ১২টিতেই ছিল তার অবদান। বেশ কয়েকটি ম্যাচ তিনি একাই জিতিয়েছেন।

১০টি গোলের সঙ্গে চারটি অ্যাসিস্ট নিয়ে এমবাপেও কাটিয়েছেন দারুণ একটি আসর। আর সাতটি গোল ও একটি অ্যাসিস্ট করা বেলিংহ্যাম প্রমাণ করেছেন বিশ্বসেরা মিডফিল্ডারদের একজন হিসেবে তিনি কতটা পাকাপোক্ত।

তাই অনেকেই কেন মনে করছেন, মেসির প্রভাব বেশি ছিল, যার কারণও পরিষ্কার। রদ্রির নেতৃত্ব ও ট্যাকটিক্যাল প্রভাব যেমন দারুণ ছিল, তেমনি মেসি নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি সরাসরি একাই ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দিয়েছেন।

গোল্ডেন বল নিয়ে বিতর্ক এ কারণে থামছে না। গোল্ডেন বুটের মতো এখানে কোনো পাকা ফর্মুলা নেই। একদল সব সময় গোলদাতা ও ম্যাচ উইনারদের বড় করে দেখবেন। অন্য দলের মতে, খেলা নিয়ন্ত্রণ করা, ছন্দ তৈরি করা এবং পুরো দলকে একসঙ্গে সচল রাখাও কম মূল্যবান নয়।

এবার ফিফার স্বীকৃত ভোটাররা বেছে নিয়েছেন দ্বিতীয় পথটি।

রদ্রি কি সত্যিই ২০২৬ বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়, নাকি স্রেফ চ্যাম্পিয়ন দলের সেরা খেলোয়াড়— এই তর্ক স্পেনের উৎসবের রেশ কেটে যাওয়ার পরেও বহু দিন চলবে। আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসি এই আসরকে উপহার দিয়েছেন কিছু অবিস্মরণীয় মুহূর্ত। বিপরীতে, রদ্রি স্পেনকে দিয়েছেন ছন্দ ও কার্যকারিতা। শেষ পর্যন্ত ভোটাররা কোন ভূমিকাকে বেশি মূল্যায়ন করেছেন— গোল্ডেন বল তারই রায়।