কিছু আন্দোলন মানুষের হাতে থাক

আমাদের আন্দোলনগুলো হাতছাড়া হয়ে যায়, লুট হয়ে যায়। কখনো বন্ধুর বেশে ঢুকে পড়ে, কখনো শত্রুর বেশে হামলে পড়ে সুযোগ নেয় অন্যরা। অনেক বছর ধরে সাধারণ মানুষের কোনো আন্দোলন চূড়ান্তভাবে আর তাদের হাতে থাকছে না।
সড়কে অনিয়ম দুর্নীতির প্রতিবাদে লাল কার্ড প্রদর্শন করেন শিক্ষার্থীরা। ছবি: পলাশ খান/স্টার

আমাদের আন্দোলনগুলো হাতছাড়া হয়ে যায়, লুট হয়ে যায়। কখনো বন্ধুর বেশে ঢুকে পড়ে, কখনো শত্রুর বেশে হামলে পড়ে সুযোগ নেয় অন্যরা। অনেক বছর ধরে সাধারণ মানুষের কোনো আন্দোলন চূড়ান্তভাবে আর তাদের হাতে থাকছে না।

সম্প্রতি পাশের দেশ ভারতে একটি সফল কৃষক আন্দোলন দেখা গেলো। সে দেশের সরকার কৃষকদের প্রতিবাদের মুখে বিতর্কিত ৩টি কৃষি আইন বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে। নতুন আইনে কৃষকদের স্বার্থ রক্ষা হয়নি, এই অভিযোগে আইনগুলো পাশ হওয়ার পরপরই সেগুলো বাতিলের দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়। টানা দেড় বছর কৃষকরা আন্দোলন করেছেন, ঘর ছেড়ে রাস্তায় থেকেছেন। অবশেষে সরকার অনমনীয় অবস্থান থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়েছে। আন্দোলনের মুখে ৩টি আইনই বাতিল করা হয়েছে। ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষের এই যে প্রতিরোধ, তার যে শক্তি, সেটা যেন আমরা দিন দিন ভুলে যেতে বসেছি। অথবা সচেতনভাবে অস্বীকার করতে চাচ্ছি।

ইস্যুভিত্তিক এই আন্দোলনকে সে দেশের সরকার বা অন্য কোনো পক্ষ বিতর্কিত করতে পারেনি। আন্দোলনের হাল নিজেদের হাতে তুলে নিতে পারেনি অন্য কেউ। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এই আন্দোলনের নেতা এবং সংগঠক ছিলেন কৃষকরাই। কৃষকদের আন্দোলনে সে দেশের বিরোধী দল কংগ্রেস সমর্থন দিয়েছে। কিন্তু আন্দোলনটি যে কৃষকদেরই হক আদায়ের সংগ্রাম, কোনো রাজনৈতিক দলের নয়, সেই পরিচয়টা নিয়ে কখনো ধোঁয়াশা তৈরি হয়নি।

ক্ষমতাসীনদের কেউ কেউ এর সঙ্গে একসময়ের বিচ্ছিন্নতাবাদী খালিস্তান আন্দোলনের যোগসূত্র খোঁজার চেষ্টাও করেছিলেন। কারণ, আন্দোলনকারীদেরকে দেশবিরোধী হিসেবে প্রমাণ করতে পারলে দমনের জন্য শক্তি প্রয়োগের যুক্তি আবিষ্কার করা যায়। ধোপে টেকেনি সেইসব কুযুক্তি। আন্দোলনকারীদের গায়ে এই রঙ লাগানোর ক্ষমতাসীনদের চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। আন্দোলন শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট ইস্যুভিত্তিক ছিল। না বিরোধী দল তাদেরকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যাবহার করতে পেরেছে, না সরকারি দল কোনো অজুহাত তুলে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নাম দিয়ে দমন করতে পেরেছে।

সড়কে নিরাপত্তার দাবিতে শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলনের এমন একটা উপসংহার দেখা যাবে, সেটাই প্রত্যাশা। কিন্তু আগের অনেক আন্দোলনের মতো গত কয়েকদিন ধরে এটাকে রাজনৈতিক রঙ দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। সেটা করা হচ্ছে সরকারি দল ও সরকার বিরোধী উভয়পক্ষ থেকেই। সরকার বিরোধীরা তাদের ইস্যুতে নিজেরা সংগঠিত আন্দোলন করতে পারেনি অনেক দিন। সাধারণ মানুষের, শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনকে তাদের এজেন্ডার আন্দোলন বলে প্রমাণ করতে পারলে তাদের লাভ। তারা সে চেষ্টা করছেন। বলার চেষ্টা করছেন, জনগণ তাদের কথাই বলছে। আদর্শ পরিস্থিতিতে হওয়ার কথা ঠিক উল্টোটা—তারা বলবেন জনগণের কথা।

এটা সরকারকে এক ধরনের সুবিধা করে দেয়। এই দাবি আসলেই জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত দাবি কি না, এই প্রশ্ন তারা এখন তুলছেন। দু-একজন মন্ত্রী তো রামপুরায় এতো মানুষ জড়ো হওয়াটা স্বতঃস্ফূর্ত, নাকি পরিকল্পিত— সেই প্রশ্ন করতে শুরু করেছেন। কথা শুনে মনে হচ্ছে যে তারা বোঝাতে চাচ্ছেন, এটা সরকার বিরোধী ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আন্দোলন; সড়ক নিরাপত্তা মূল ইস্যু নয়। এসব কথাবার্তার ভয়ের দিকটি হচ্ছে, তারা হয়তো ব্যাপক প্রচার করতে পারেন যে আন্দোলনকারীরা স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণকারী না। তারা ব্যবহৃত হচ্ছে কারো রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের হাতিয়ার হিসেবে। এর মধ্য দিয়ে সরকার 'রাষ্ট্রের শক্তি দিয়ে' আন্দোলনকারীদের ওপর শক্ত হাতে দমন-নিপীড়ন চালানোর যুক্তি দাঁড় করাতে পারে। যদিও প্রতিবাদ-বিক্ষোভ, তা সে রাজনৈতিক হোক বা অরাজনৈতিক, করার অধিকার সব নাগরিকের আছে। এ অধিকার রাষ্ট্রের সংবিধান কর্তৃক স্বীকৃত।

আন্দোলনের গায়ে রাজনৈতিক রঙটি লেগে গেলেই, অর্থাৎ আন্দোলনকারীদেরকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ প্রমাণ করতে পারলেই, ক্ষমতাসীন দলের মদদপুষ্টরা তখন এটি নির্মূলে শক্তি দিয়ে নেমে পড়তে পারেন। যদিও আন্দোলন সরকার বিরোধী হলেও সেখানে হামলা করার কোনো অধিকার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের নেই।

২ বছর আগের সড়ক নিরাপত্তার আন্দোলনের যে রূপবদল হয়েছিল সেটা মনে করা যেতে পারে। এক পর্যায়ে সরকার বিরোধীরা এটাকে সরকার পতনের দাবির বহিঃপ্রকাশ বলে প্রচার করতে লাগলেন। সরকার বলতে লাগল, এই আন্দোলন যতটা 'জনগণের আন্দোলন' তার চেয়ে বেশি সরকার বিরোধীদের উসকানির ফসল। একসময় আন্দোলনের মধ্যে ঢুকে পড়ল দু-চারজন চাপাতিওয়ালা। ওদিকে নেমে গেলো হেলমেট বাহিনী। রাজপথে শুরু হলো মারামারি, সংঘর্ষ। এইসবের মধ্যে যারা নেই, দাবি আদায়ের জন্য যারা রাস্তায় নেমেছিলেন তেমন অনেক শিক্ষার্থী সন্ত্রাস-সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে গেলেন। তারা হতাশ হলেন, অনেকে মাঠ ছাড়লেন। এইসব মারামারি, বিশৃঙ্খলা, ভাঙচুর দমনের অজুহাতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কঠোর অবস্থান নিলো।

এর মধ্যে দু-একজন হেভিওয়েট সুশীল সমাজ প্রতিনিধি তাদের এজেন্ডা নিয়ে নেমে গেলেন। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে মূলধন করতে চাইলেন তারা। অধিকার আদায়ে মানুষকে সংগঠিত করার প্রতিশ্রুতি তাদের থাকে। নিজেদের কাজের মধ্য দিয়ে সেটা অর্জন করা সবসময় সহজ হয় না। একেবারে তৈরি অবস্থায় হাতে পাওয়া আন্দোলনকে তারা কাজে লাগানোর চেষ্টা করলেন। কিছু মিডিয়া সেই এঙ্গেলটাকেই হাইলাইট করতে থাকল।

সবকিছু মিলে আন্দোলনের চরিত্র গেল বদলে। ইস্যুভিত্তিক সুনির্দিষ্ট আন্দোলনটিকে ঘোলা জলে পরিণত করে ফেললেন সবাই মিলে এবং এইসব কুশীলবরা ঘোলা জলে জাল ফেলে যার যা উদ্দেশ্য তার মতো করে অর্জন করার চেষ্টা করলেন।

প্রকৃত আন্দোলনকারীদের এতে হতাশ হওয়ারই কথা। তাহলে কি তারা ধরে নেবেন, 'এসব করে-টরে কিছু হয় না; আমাদের মাথায় কাঁঠাল রেখে সবাই কোষ খেয়ে যায়?' সাধারণের মনে এরকম ধারণা সৃষ্টি হলে 'জনস্বার্থে জনগণের কণ্ঠস্বর' ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হবে।

অনেক সময় আন্দোলন-সংগ্রামকে, হামলা-ভাঙচুরকে বিদেশি মদদপুষ্ট বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা দেখা যায়। কোনো ঘটনার সঙ্গে ভারত বা পাকিস্তানের দূরবর্তী হলেও সংযোগ আছে—এরকম ধোঁয়া তোলার চেষ্টা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব প্রচারকদের থাকে। সেটা রাজনৈতিক বা সামাজিক আন্দোলন হোক; অথবা মানুষের উপাসনালয়, বাড়িঘরে হামলার ঘটনা হোক—তত্ত্ব নিয়ে অনেকে প্রস্তুত থাকেন। এইসব তত্ত্ব দিয়ে একটা আলোচনা তুলে আন্দোলনকারীদের ভূমিকা, তাদের ইস্যুর যৌক্তিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়। আর যদি হামলা-সন্ত্রাস-অপরাধের ঘটনা হয়, সেখানে অপরাধীদের দায়কে গৌণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। কখনো এতে আন্দোলনকারীরা প্রাপ্য কৃতিত্ব হারান, কখনো হামলাকারীরা অপরাধের দায় এড়ানোর সুযোগ পান। চলমান সড়ক নিরাপত্তা আন্দোলন নিয়ে এখনো বিদেশি ষড়যন্ত্র বিষয়ক তত্ত্ব কেউ দেননি, এটা ভালো খবর।

আন্দোলন হাতবদল হয়ে যাওয়ার অথবা হাত ফসকে বেরিয়ে যাওয়ার এই প্রবণতা ক্ষতিকর। এর মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষের মনে আন্দোলনের শক্তির ওপর অনাস্থা তৈরি হয়। তারা আন্দোলন বিমুখ হয়ে যান। সেটি দীর্ঘমেয়াদে দেশের জন্য ভালো খবর নয়।

কিছু আন্দোলন 'মানুষের আন্দোলন' হিসেবে থাক। সাধারণ মানুষের অসীম ক্ষমতা। পরিস্থিতি বা সময়ের কারণে কখনো কখনো নিষ্প্রভ মনে হলেও, সেই ক্ষমতায় বিশ্বাস রাখা জরুরি। আর সেটা নিয়ে রাজনীতিবিদ হোক, সুশীল সমাজ হোক, তাত্ত্বিক হোক—কারোরই খেলার অধিকার নেই।

তাপস বড়ুয়া, ফ্রিল্যান্স কলাম লেখক

(দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদকীয় নীতিমালার সঙ্গে লেখকের মতামতের মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির আইনগত, মতামত বা বিশ্লেষণের দায়ভার সম্পূর্ণরূপে লেখকের, দ্য ডেইলি স্টার কর্তৃপক্ষের নয়। লেখকের নিজস্ব মতামতের কোনো প্রকার দায়ভার দ্য ডেইলি স্টার নেবে না।)

Comments

The Daily Star  | English

US supports a prosperous, democratic Bangladesh

Says US embassy in Dhaka after its delegation holds a series of meetings with govt officials, opposition and civil groups

4h ago