ঘুরে আসুন পর্তুগিজদের ফিউশন রাজ্য গোয়া

পর্তুগিজদের স্মৃতি বিজড়িত স্থান গোয়া। গোয়ায় পৌঁছানোর পর মনে হবে আপনি বুঝি এসে পড়েছেন পর্তুগিজদের কোন এলাকায়। পর্তুগিজরা ১৬ শতকের শুরুতে সওদাগর হিসেবে এখানে এসে ঘাঁটি গাড়লেও, পরে তারাই এই রাজ্য শাসন করেছে সাড়ে চারশো বছর ধরে। যাহোক, গোয়ার রাজধানী পানজি বা পানজিমে নেমেই আমরা ছুটে গেলাম সাগরে। কারণ এই সাগর সৈকতের কথা শুনতে শুনতেই গোয়াতে এসেছি আমরা। আরব সাগরের পাশে, পর্তুগিজ ইতিহাস নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে-- গোয়া ভারতের সবচেয়ে ছোট কিন্তু ধনী রাজ্য।

পর্তুগিজদের স্মৃতি বিজড়িত স্থান গোয়া। গোয়ায় পৌঁছানোর পর মনে হবে আপনি বুঝি এসে পড়েছেন পর্তুগিজদের কোন এলাকায়। পর্তুগিজরা ১৬ শতকের শুরুতে সওদাগর হিসেবে এখানে এসে ঘাঁটি গাড়লেও, পরে তারাই এই রাজ্য শাসন করেছে সাড়ে চারশো বছর ধরে। যাহোক, গোয়ার রাজধানী পানজি বা পানজিমে নেমেই আমরা ছুটে গেলাম সাগরে। কারণ এই সাগর সৈকতের কথা শুনতে শুনতেই গোয়াতে এসেছি আমরা। আরব সাগরের পাশে, পর্তুগিজ ইতিহাস নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে-- গোয়া ভারতের সবচেয়ে ছোট কিন্তু ধনী রাজ্য।

ঝকঝকে তকতকে সমুদ্র সৈকত, উজ্জ্বল দিন, সাগরের নীল জলরাশি আমাদের সব ক্লান্তি দূর করে দিল মুহূর্তেই। সাগর তীরে গিয়ে দেখলাম সেখানে কেউ গায়ে রোদ মাখছে, কেউবা দলেবলে দাঁড়িয়ে গরম গরম মাছ ভাজা খাচ্ছে, লেবু মাখিয়ে ভুট্টা খাচ্ছে, বাচ্চারা ছোটাছুটি করে বেলুন ওড়াচ্ছে বা বল খেলছে, কেউ বই পড়ছে, কেউ কেউ ওয়াটার স্কি, জেট-স্কি করছে, ওয়াটার স্কুটার-রাইড নিচ্ছে। চারিদিকে যেন আনন্দের বন্যা বয়ে যাচ্ছে।

আরও পড়ুন: মারমেইড বীচ রিসোর্ট: হৃদয়ে যার সাগরের সুরজাল

এত আনন্দের মাঝে বিপত্তিটা বাঁধল শুধু আমাদের। গোয়ার সৈকত যে জুন জুলাই মাসে খানিকটা বিপদজনক হয়ে ওঠে, তা আমাদের জানা ছিল না। আর এই না জানার খেসারত দিতে হল আমাদের। আর তাই প্রথমেই মুখোমুখি হলাম সেই বিপদের। সাগর সৈকতে নামার পরপরই আমার মেয়ে অনসূয়াকে জেলি ফিশ এমনভাবে হামলা চালিয়ে কাহিল করে ফেললো যে, তাকে হাসপাতালেও নিতে হয়েছিল কিছুক্ষণের জন্য। প্রথমে বুঝতে পারিনি, কী থেকে কী হল। ওর পায়ে দেখলাম নীল সুতার মত কি যেন কামড়ে ধরে আছে। আর ও ব্যথায় চিৎকার করছে। ওষুধ দিয়েও কাজ হচ্ছেনা দেখে হাসপাতালে ছুটলাম।

সেখানে গিয়ে দেখি জেলি ফিশ আক্রান্ত আরও ২৫/৩০ পর্যটক চিকিৎসা নিচ্ছে। পরে ওখানকার চিকিৎসক জানালেন এসময়টাতে সৈকতে ছোট জেলি ফিশের উপদ্রব থাকে। এমনি কোন বিপদ নেই। তবে শরীরে এলকোহল থাকলে আক্রান্ত ব্যক্তি কষ্ট পায় বেশি। এমনকি হাসপাতালে থেকে স্যালাইনও পুশ করতে হয়। সেদিনের অসহ্য ব্যথার কথা ভেবে বাকি দিনগুলোতে আর সাগরে নামেনি আমার মেয়ে।

অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি এই গোয়াতে নামার পরপরই মনে হয়েছিল, এই জায়গাটা বুঝি ভারতের অংশ নয় বা আধুনিক কোন শহর নয়। এটা ইতিহাসের কোন অংশ। ঠিক তাই, আমাদের এই মনে হওয়াটা খুব একটা ভুল নয়। পানাজি গোয়ার রাজধানী হলেও সবচেয়ে বড় শহর ভাস্কো-দা-গামা। ঐতিহাসিক শহর মারগাও। শোনা যায় এই গোয়া নাকি সেই খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতকে ‘আপারান্থা নগর’ নামে পরিচিত ছিল এবং গ্রিক ভূগোলবিদ টলেমিও এর নাম উল্লেখ করেছেন তার লেখায়।

আরও পড়ুন: ‘রডোডেনড্রন’ মানে শেষের কবিতা

ভাবাই যায় না যে, প্রায় ২০ থেকে ৩০ হাজার বছর আগের ঐতিহাসিক নিদর্শনের খোঁজ পাওয়া গেছে গোয়াতে। গোয়াতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে তখন, যখন আর্য ও দ্রাবিড়রা এখানে এসে স্থানীয় মানুষদের সাথে মিশে গিয়েছিল। গোয়ানিজ সংস্কৃতির গোড়াপত্তন হয়েছিল তখনই। এর অনেক বছর পর গোয়া দিল্লির অধীনে এলেও, ১৫১০ সালে পর্তুগিজরা গোয়া দখল করে নেয়। তাদের শাসন চলেছিল ১৯৬১ সাল অব্দি। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা চলে যাওয়ার পর গোয়া, দমন ও দিউ আলাদা ইউনিয়ন হিসেবে থেকে গিয়েছিল। গোয়াতে ৬টি বড় শহর থাকলেও শুধুমাত্র পানাজিতেই রয়েছে সিটি কর্পোরেশন।

গোয়া উপকূলীয় প্রদেশ হলেও, এখানে রয়েছে সাতটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ নদী। আর সেকারণে গোয়ায় পা দেয়া মাত্র আপনি পাবেন পানির গন্ধ, ভেজা ভেজা শীতল বাতাসের ছোঁয়া, নারকেল-পাম গাছের পাতার ঝিরিঝিরি শব্দ। যদিও আরব সাগরের পাশেই এর অবস্থান বলে এখানকার আবহাওয়া বছরের অধিকাংশ সময়ই গরম ও জলীয় বাষ্পপূর্ণ থাকে। তবে বেড়ানোর জন্য ভালো সময় অক্টোবর থেকে এপ্রিল।

মারগাওতে রয়েছে অসংখ্য পর্তুগিজ স্থাপত্য। পুরনো শহরটা দেখলে মনে হবে বুঝি ঘুরে বেড়াচ্ছি পর্তুগিজ কোন কলোনিতে। ঘরবাড়িগুলোও রক্ষা করা হয়েছে সেই স্টাইলেই। পুরনো গোয়ার ঘরবাড়িগুলো পুরনো ধাঁচের হলেও খুব নকশাদার ও রঙিন। পর্যটকদের কাছে একদম অন্যরকম। পুরনো শহরটাকে, পুরনো চার্চের শহরও বলা যায়। ১৬০৫ সালে তৈরি ‘দ্য ব্যসিলিকা অব বম জিসাস’ শুধু একটি উপাসনা গৃহই নয়, অনেক পুরনো একটি স্থাপত্য। অপূর্ব এর নির্মাণশৈলী। এখানে রয়েছে সেইন্ট ফ্রান্সিস জেভিয়ারের মরদেহ। শোনা যায় উনি জাগ্রত সাধু। এটি ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের অংশ। চারিদিকে অসংখ্য চার্চের পাশাপাশি আছে অনেক সুন্দর সুন্দর মন্দির। আছে মিউজিয়াম, ন্যাশনাল পার্ক।

আরও পড়ুন: মেলা থেকে তালপাতার এক বাঁশি কিনে এনেছি

আর নতুন শহরটি সাজানো হয়েছে একেবারে ইউরোপীয় ধাঁচে। অসাধারণ সুন্দর ও আধুনিক সব ঘরবাড়ি। সাথে বাগান, রাস্তাঘাট ঝকঝকে। মানদভি নদীতে ঘুরতে ঘুরতে দেখে নেওয়া যায় চারপাশটা। নদীতে বেশ বড় বড় নৌযান আছে পর্যটকদের জন্য। গোয়ানিজ নাচ-গান-খাবার সবকিছুর স্বাদ নিতে নিতে দেখে নিতে পারেন নতুন ও পুরনো গোয়া।

মুগ্ধ হলাম ১৬১২ সালে তৈরি ফোর্ট আগুয়াদা দেখে। এর মানে পানি। মূলত ডাচ ও মারাঠি নৌযানের ওপর চোখ রাখার জন্য এটি তৈরি করা হলেও ইউরোপ থেকে আসা নৌযানগুলো এটা দেখে পথ চিনতো। এখানে ছিল একটি সুপেয় পানির বিশাল জলাধার। এপথ দিয়ে যাতায়াতকারী নৌযানগুলো এই জলাধার থেকে পানি নিতো। এখানে একটি অস্ত্রভাণ্ডার ও লাইটহাউজও ছিল। অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে গোয়াতে এখনও তিনশোরও বেশি পানির ট্যাংক আছে, যা তৈরি করেছিল কাদামবা শাসকরা ১০১৫ সালের পরে।

যারা জঙ্গল ভালবাসেন, ভালবাসেন ট্রেকিং করতে তাদের জন্য গোয়ার বিশাল বনভূমি ও জীববৈচিত্র্য স্বর্গের মত মনে হবে। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক ম্যাগাজিন এখানকার জীববৈচিত্র্যকে ১৯৯৯ সালে একে তুলনা করেছিল আমাজান ও কঙ্গো অববাহিকার সাথে। এখানে আছে উদ্ভিদের ১৫১২টিরও বেশি প্রজাতি, ২৭৫ এর বেশি রকমের পাখি এবং ৬০ ধরনের বেশি সরীসৃপ। আমরা গোয়াতে গিয়ে দেখেছি প্রচুর বিদেশি পর্যটকের পাশাপাশি অনেক ভারতীয় পর্যটক। এদের অনেকেই গেছে ট্রেকিং করবে বলে।

যারা নাইটলাইফ উপভোগ করতে চান, তারাও যেতে পারেন গোয়াতে। কারণ সাড়ে চারশো বছরেরও বেশি সময় ধরে পর্তুগিজ শাসন গোয়ার সংস্কৃতিতে একটা ফিউসন সৃষ্টি করেছে -- যেখানে পূর্ব ও পশ্চিমের সংস্কৃতির সম্মিলন ঘটেছে। বিশ্বের ১০টি নাইটলাইফ নগরীর মধ্যে গোয়ার অবস্থান ৬ষ্ঠ। পানিতে খেলতে চাইলে চলে যান বাগা ও ক্যালানগুটে সৈকত, যেখানে আছে ওয়াটার স্কি, জেট-স্কি, প্যারাসাইক্লিং, বানানা বোট রাইড, ওয়াটার স্কুটার-রাইডসহ আরও অনেক কিছু।

গোয়ার মশলা বিশ্বখ্যাত। গোয়াতে পাবেন নানাধরনের মশলা মিক্স ও হার্ব। যারা রাঁধতে ভালবাসেন, তাদের কাছে ব্যাপারটা খুবই আনন্দের। মশলা কিনেই ব্যাগ ভরিয়ে ফেলা যাবে। গোয়ার খাওয়া দাওয়া বৈচিত্র্যপূর্ণ, খুবই মজাদার এবং ঝাল। এমনকি পথের পাশের খাবারও। খাদ্যতালিকায় পাওয়া যায় নানাধরনের মাছ, কাঁকড়া, অক্টোপাস, স্কুইড, শামুক, ঝিনুক এবং মাংস। বিভিন্ন মানের হোটেল, মোটেলের অভাব নেই গোয়ায়। ঢাকা থেকে কলকাতা-মুম্বাই হয়ে গোয়া যেতে সময় লাগবে কিছুটা। খরচও আছে মোটামুটি ধরনের। কিন্তু তারপরও এই বেড়ানোটা যে একটি দারুণ মজাদার অভিজ্ঞতা হয়ে থাকবে, এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত।

ট্রেনে চেপে মুম্বাই থেকে গোয়া যাওয়ার পথটুকুও দুর্দান্ত সুন্দর। সুড়ঙ্গের ভেতর দিয়ে ট্রেন চলার অভিজ্ঞতাও পেয়ে গেলাম এই পথে। যেতে যেতে অনেক কিছু দেখার আছে চারপাশে। আর ট্রেন জার্নিটাও খুব মজার। একটা টিপস দিতে পারি, যাত্রার আগে দেখে নেয়া যেতে পারে ‘ফ্রম বোম্বে টু গোয়া’ সিনেমাটি।

Comments

The Daily Star  | English

Pm’s India Visit: Dhaka eyes fresh loans from Delhi

India may offer Bangladesh fresh loans under a new framework, as implementation of the projects under the existing loan programme is proving difficult due to some strict loan conditions.

3h ago