দুর্নীতির সাথে বসবাস!

দুর্নীতি জনজীবনে কী পরিমাণ বিপর্যয় বয়ে আনতে পারে তার দুটি সাম্প্রতিক উদাহরণ হল-পাহাড় ধসে দেড় শতাধিক মানুষের মৃত্যু এবং ফসল রক্ষা বাঁধ ভেঙে সুনামগঞ্জের হাওরে হাজার কোটি টাকার ফসলহানি।
haor disaster
হাওরে আকস্মিক বন্যায় তলিয়া যাওয়া ফসল হাতে এক কৃষক। স্টার ফাইল ফটো

দুর্নীতি জনজীবনে কী পরিমাণ বিপর্যয় বয়ে আনতে পারে তার দুটি সাম্প্রতিক উদাহরণ হল-পাহাড় ধসে দেড় শতাধিক মানুষের মৃত্যু এবং ফসল রক্ষা বাঁধ ভেঙে সুনামগঞ্জের হাওরে হাজার কোটি টাকার ফসলহানি।

স্থানীয় প্রশাসনে অনিয়ম দুর্নীতির কারণে অবৈধ পাহাড় কাটা এবং ঘরবাড়ি নির্মাণ থামানো যায়নি। পাহাড়ের উপর চলেছে অবিরাম নিপীড়ন। টিকতে না পেরে গত জুনে তিন জেলায় পাহাড় ধসে পড়েছে। প্রাণহানি ঘটার পাশাপাশি অনেক মানুষ আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনিয়ম দুর্নীতির সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে কারো বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তদন্তের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়ার লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে ইতিমধ্যে পাহাড় ধসের নতুন কারণও আবিষ্কার হয়েছে। তারা বলছেন, বজ্রপাতের কারণে নাকি পাহাড় ধস হয়েছে। তাহলে কি বজ্রপাতের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে?

অতীতেও পাহাড় ধসে অনেক প্রাণহানি ঘটেছে; তখনও স্থানীয় প্রশাসনের দায়িত্ব পালনে গাফিলতির বিষয়টি আলোচিত হয়েছে। কিন্তু দোষীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার নজীর নেই।

সুনামগঞ্জে গত এপ্রিল মাসের পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টিতে ফসল রক্ষা বাঁধ ভেঙে ১৫৪টি হাওরের বোরো ফসল তলিয়ে যায়। অভিযোগ ওঠে ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে বাঁধগুলো মজবুত হয়নি। হাওরে প্রাণহানির ঘটনা নাই। তবে ফসলহানি হাওরবাসীদের নিঃস্ব করে রেখে গেছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের পক্ষ থেকে দায়ের করা মামলায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের স্থানীয় কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি, ঠিকাদারদের সঙ্গে অবৈধ যোগসাজশের অভিযোগ আনা হয়েছে। আর ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে ঠিক সময়ে কাজ শেষ না করে কৃষকদের ক্ষতিসাধনের অভিযোগ আনা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যাবে কি না তাতেও সন্দেহ আছে, কারণ পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় শুরু থেকেই তাদের অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বাঁচাতে উঠে পরে লেগেছে। ফসল রক্ষা বাঁধ ভাঙার দায় মন্ত্রণালয় ইঁদুরদের উপর চাপিয়ে দিয়েছে। মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য মতে, ইঁদুর বাঁধে গর্ত করেছিল এবং অতি বৃষ্টির কারণে নাকি বাঁধ ভেঙে গেছে।

আরও পড়ুন: রাজনীতিতে ফখরুল অচল!

দুর্নীতির কারণে জনজীবনে বিরূপ প্রভাবের আরও অনেক উদাহরণ দেওয়া যায়। বলা যাবে আরও অনেক ঘটনার কথা যেখানে দুর্নীতির কারণে গেছে কত শত মানুষের প্রাণ। তবু আমরা টিকে আছি; যেন দুর্নীতিও আমাদের সয়ে গেছে।

উদ্ভূত পরিবেশ পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কোনো প্রকার অনিয়ম-দুর্নীতির সাথে না জড়াতে সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের সতর্ক করেছেন। রবিবার সচিবালয়ে সচিবদের সাথে অনুষ্ঠেয় এক বৈঠকর শুরুতে তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে তার অবস্থান তুলে ধরেন। সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদেরকে সততার সাথে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে, কোনো প্রকার দুর্নীতি হওয়া উচিত নয়।

প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্যর গুরুত্ব নিয়ে দ্বিমত করার কিছু নেই। দুর্নীতিবিরোধী যে কোনো মানুষ প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্যর প্রতিটা শব্দের সাথে একমত পোষণ করবেন। তবে এ মন্তব্যর পর কেউ কেউ বলতে পারেন তাহলে দুর্নীতি দমন ইস্যুটা এখনও সরকারের এজেন্ডায় আছে। কয়েক দিন আগে জাতীয় সংসদে পাস হওয়া নতুন অর্থবছরের বাজেটে দুর্নীতি দমনে তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো পরিকল্পনার কথা বলা হয়নি। তাতে মনে হয়েছিল, দুর্নীতি দমন বুঝি সরকারের কাছে আর অত বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়!

সরকারি কর্মচারীদের দুর্নীতি না করার কারণ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তাদের বেতন ভাতা বাড়ানোর কথা বলেছেন। কিন্তু শুধু বেতন ভাতা বাড়িয়ে কি প্রশাসন থেকে দুর্নীতির বিষবৃক্ষের মূলোৎপাটন করা যাবে?

কম বেশি সবাই জানেন সরকারি প্রশাসনে দুর্নীতি আছে। অনেকেই সেটার ভুক্তভোগী। অনেকেই অনেক ঘটনারও সাক্ষী। তবে আমাদের সরকারি প্রশাসনে দুর্নীতির মাত্রা কতটা তা পরিমাপের উপায় নেই। দুর্নীতির দায়ে সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের সাজা হবারও তেমন নজীর নেই। সে দিক বিবেচনা করলে বলতে হবে তারা দুর্নীতি করে না।

তবে আমাদের প্রধান বিচারপতির একটি মন্তব্য ভিন্ন ধারণা দেয়। গত মে মাসে টাঙ্গাইল সার্কিট হাউজে বিচার বিভাগীয় সম্মেলনে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বলেন বর্তমানে উন্নয়ন প্রকল্পের একশ টাকার মধ্যে ৪০ টাকার কাজ হয় আর বাকি ৬০ টাকার কোনো হদিস থাকে না।

আরও পড়ুন: দুঃখিত স্যার আরেফিন সিদ্দিক, খবরটা ভুয়া মনে হয়েছিল

তিনি বিস্তারিত কিছু বলেননি। তবে যতটুকু ইঙ্গিত দিয়েছেন তাতেই আমাদের পিলে চমকানোর কথা। কিন্তু আমাদের পিলে চমকায়নি। এ সব খবর যেন আমাদের গা-সওয়া হয়ে গেছে। সে কারণে দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর হুশিয়ারি নিয়েও আমাদের মধ্য তেমন আলোড়ন সৃষ্টি হয়নি। যেমন একের পর এক সরকারি ব্যাংকের টাকা পয়সা লুটপাট হয়ে গেলেও এক সময় সবার দৃষ্টি অন্য দিকে চলে যায়, সরকার জনগণের দেওয়া করের টাকায় সেসব ব্যাংকগুলোকে আবার স্বাস্থ্যবান করে তোলার উদ্যোগ নিলেও আমরা তেমন ‘রা’ করি না। যেন সরকারের সংগৃহীত রাজস্ব কোথায় কিভাবে ব্যয় হল তা নিয়ে জনগণের মাথা ব্যথা নেই।

প্রায় ২৩০০ বছর আগে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দুর্নীতি প্রসঙ্গে প্রাচীন ভারতের গুপ্ত বংশের বিখ্যাত সম্রাট দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের অর্থমন্ত্রী কৌটিল্যের মন্তব্য এখনও আলোচনার দাবী রাখে। তার মতে, “রাজস্ব সংগ্রহ করলেই অর্থনীতি পুষ্ট হয় না, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনাই শক্তিশালী অর্থনীতির প্রধান শর্ত। সরকারকে খুবই সতর্ক থাকতে হবে, যেন সংগৃহীত রাজস্ব তার কর্মচারীরাই আত্মসাৎ করে খেয়ে না ফেলে।”

সরকারি কর্মচারীদেরকে উপদেশ দিয়ে তিনি বলেছেন, “আপনি যেমন মধু এবং বিষ একই সময়ে জিহ্বায় রেখে দুটোরই স্বাদ আস্বাদন করতে পারেন না, একই ভাবে সরকারের বেতনধারী অর্থ বিভাগের কর্মচারী হয়ে আপনি রাষ্ট্রীয় টাকার স্বাদ নিতে পারেন না।”

আবার তিনি তার আশঙ্কার কথাও বলেছিলেন, “পানিতে বসবাসকারী মাছ কখন পানি পান করে সেটা যেমন আপনি জানা অসম্ভব, তেমনি রাষ্ট্রের কর্মচারীরা কখন রাষ্ট্রের টাকা নিজের জন্য নিয়ে নেয় তাও জানা অসম্ভব।”

সরকারি প্রশাসনে দুর্নীতি দমন যেকোনো সরকারের এক নম্বর এজেন্ডা হওয়া উচিত। সেটা কি কখনও হয়েছে? সরকারে যারা, তারা দুর্নীতি দমনে সকল শক্তি প্রয়োগের দাবি করতে পারেন। বাস্তবতায় সে সবের কোন ছাপ খুঁজে পাওয়া মুশকিল। তবু আমরা যেন মেনে নিয়েছি; সব কিছু আমাদের গা সওয়া হয়ে গেছে। দুর্নীতির কারণে ভোগান্তি পোহানোও আমাদের সয়ে গেছে।

Comments

The Daily Star  | English

Personal data up for sale online!

Some government employees are selling citizens’ NID card and phone call details through hundreds of Facebook, Telegram, and WhatsApp groups, the National Telecommunication Monitoring Centre has found.

7h ago