মতামতঃ পাঠ্যবইয়ের ভুল, শুধুই কি ভুল নাকি সর্ষেতে ভূত

নতুন পাঠ্যবইয়ের ভুল নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন মিডিয়া ও মহলে দারুণ হৈচৈ শুরু হওয়ার পর ঘুম ভেঙেছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি )-র। অবশেষে তারা পাঠ্যপুস্তকের ভুল সংশোধনে কমিটি গঠন করেছে।

নতুন পাঠ্যবইয়ের ভুল নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন মিডিয়া ও মহলে দারুণ হৈচৈ শুরু হওয়ার পর ঘুম ভেঙেছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি )-র। অবশেষে তারা পাঠ্যপুস্তকের ভুল সংশোধনে কমিটি গঠন করেছে।

সমালোচনার মুখে পড়া ভুলগুলো সংশোধনের পাশাপাশি নতুন শিক্ষাবর্ষের সব বই পরিমার্জনের দায়িত্বও দেওয়া হয়েছে এই সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের। খুবই ভাল কথা। ভুল হলে তো সেটা সংশোধন হতেই পারে। কিন্তু এই ভুলতো অত্যন্ত ব্যয়সাপেক্ষ ভুল। কারণ আমরা যখন ছোটখাট পর্যায়ে কোন ভুল করে থাকি, তখন সুযোগ থাকলে স্টিকার লাগিয়ে, রিপ্রিন্ট করে বা কপি উইথড্রো করে ভুলের একটা সমাধান করি। তাতেও বেশ হাঙ্গামা ও আর্থিক ক্ষতি জড়িত থাকে।

এবার নতুন বছরের প্রথমদিনে উৎসব করে ৪ কোটি ৩৩ লাখ ৫৩ হাজার ২০১ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৩৬ কোটি ২১ লাখ ৮২ হাজার বই বিতরণ করেছে সরকার। এসব বইয়ের ভিতরে চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা তথ্যগত ও বানানের ভুল চোখে পড়ছে মানুষের। যত বেশি অনুসন্ধান করা যাবে, তত বেশি ভুল হয়তো চোখে পড়বে।

এনসিটিবি এখন কীভাবে এই ভুল শুধরাবে? এতগুলো বই ত্রুটিমুক্ত করে পুনরায় তা ছাপিয়ে দেশের আনাচে-কানাচে থাকা ছাত্রছাত্রীদের হাতে সেই বই পৌঁছে দেয়া কতটা সম্ভব? এই কাজে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ কতটা হতে পারে? কতটা সময় লাগতে পারে? এই ক্ষতির দায়ভার কাদের? যদি নতুন করে বই ছাপিয়ে এসব ত্রুটির সংশোধন করা না হয়, তাহলে কীভাবে এর সমাধান হবে?

এই বিষয়গুলো জানতে চাইছি। এক হাঁড়ি দুধের ভেতর যদি এক ফোঁটা ময়লাও পড়ে, তাহলে কি পুরো দুধটাই নষ্ট হয়ে যায়না? পুরোনো প্রবাদ বলে যে নষ্ট হয়ে যায়। এনসিটিবি-র এই ভুলও ঠিক সেরকম। যা বছরের প্রথম দিবসে কোটি কোটি শিক্ষার্থীর হাতে বই তুলে দেয়ার সরকারের অসাধারণ সাফল্যকে ম্লান করে দেয়।

বছরের প্রথমদিনই শিশুদের হাতে বোর্ডের নতুন টেক্সট বই আসার ছবি দেখতে না দেখতেই শুরু হয়ে গেল এই বই নিয়ে নানা হট্টগোল। ভুলভ্রান্তি ছাড়াও এই বইতে এমন অনেক কিছু বাদ দেয়া বা যোগ করা হয়েছে, যা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে।

প্রথম শ্রেণির বাংলা বইতে লেখা আছে “ছাগল গাছে উঠে আম খাচ্ছে”–এই লেখা ও ছবি দিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে একজন মন্তব্য করেছেন, এতে কী আর এমন ভুল লেখা আছে? কারণ আমরাতো জানিই “ছাগলে কিনা খায়?” তাই এখানে দেখানো হচ্ছে ছাগল গাছে উঠে আম খাচ্ছে।

তবে হৈচৈ হলেও তথ্যটিকে কিন্তু একেবারে ভুলও বলা যাবেনা। ছাগলতো ঘাস লতাপাতা এসবই খায়, আর সুযোগ পেলেই  ছাগল ছোট ছোট ফুল গাছ বা সবজি বাগানে ঢুকে পাতা ছিঁড়ে ছিঁড়ে খায়। তবে ছাগল ঠিক এভাবে বানরের কায়দায় গাছের মগডালে বসে আম খায় কিনা সে প্রশ্ন উঠতেই পারে। শুনেছি বন্যার পানি এলে বা অন্য কোন বিপদে পড়লে ছাগল গাছে উঠে যেতে পারে অনায়াসেই। শুধু ছাগলই বা একা পাতা খায় নাকি? কুকুরও কিন্তু ঘাস-পাতা খায় নিয়মিত। এটা তাদের দরকার হয় হজম প্রক্রিয়াকে চালু রাখার জন্য। তাই শিশুদের বইতে যদি এটা লেখা হয় কখনও, তা লেখা হতেই পারে। শিশুদের গতানুগতিক শিক্ষার বাইরে নতুন কিছু শেখানো ভাল কিন্তু সেই তথ্য ও ছবি ব্যবহার হতে হবে খুবই যথাযথ ও পূর্ণাঙ্গভাবে।

এখানেই শেষ নয় প্রথম শ্রেণির ‘আমার বাংলা বই’-এর বর্ণ শিখি অধ্যায়ে ‘ও’ বর্ণ শেখাতে গিয়ে একটি কন্যাশিশুর গায়ে ওড়না জড়িয়ে থাকার ছবি দেয়া হয়েছে। যার নীচে লেখা হয়েছে ‘ওড়না চাই’। একটি ক্লাস ওয়ানে পড়া শিশু ওড়না চাইছে, এটা কতটা যুক্তিসঙ্গত? ওড়না কন্যাশিশুর পোষাক নয়। শুধু কন্যাশিশুই বা বলি কেন, এটা এমন শব্দ যা ঠিক অক্ষরজ্ঞান শেখানোর তালিকায় থাকার মত নয়। তাছাড়া বইটি ছেলে শিশু, মেয়ে শিশু সবাই পড়ছে। সেক্ষেত্রে ওড়না ছেলেরা পরার জন্য চাইবে কেন? অবশ্য ইদানীং ছেলেরাও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ওড়না পরছে। তাই হয়তো পুস্তক রচয়িতারা ওড়নার উদাহরণ দিয়েছেন একবারে বাল্যশিক্ষাতে! তবে এনসিটিবি-র চেয়ারম্যান নারায়ণ চন্দ্র সাহা প্রথম আলোকে বলেছেন, যারা এই বইটি লিখেছেন, তারা কোন দৃষ্টিতে এই উদাহরণ দিয়েছেন, সেটা কথা বলে দেখতে হবে।

আমরা কিন্তু ‘ও’ দিয়ে পড়েছি ‘ওল খেয়োনা ধরবে গলা’। যদিও বড় হয়ে বুঝেছি ওল অতিশয় মজাদার ও খাদ্যগুণ সম্পন্ন একটি সবজি এবং এটা খেলে সবসময় গলা ধরে না। কাজেই শিশুদের ছোটবেলাতেই ওল খাওয়া নিয়ে ভয় দেখানোটা কি উচিৎ? ‘ও’ দিয়ে অন্য শব্দ কি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না? যারা শিশুদের জন্য বই লিখছেন তাদের অবশ্যই শিশুর বুদ্ধি বিকাশের বিভিন্ন স্তর, তাদের শব্দ গ্রহণ ক্ষমতা, কোন শব্দ প্রয়োজনীয়, কোন তথ্য দেয়া উচিৎ বা উচিৎ নয়, তা ভেবেই বই প্রকাশনার কাজে হাত দেয়া উচিৎ।

এনসিটিবি-র চেয়ারম্যান অবশ্য বলেছেন পাঠ্যবইয়ের সব ভুল-ত্রুটি ঠিক করে সংশোধনী দেয়া হবে। এতো কাজের মধ্যে ভুল হতেই পারে। তিনি আরো জানিয়েছেন যে প্রতিবছরই নাকি নতুন বই প্রকাশের পর তা পরিমার্জন করা হয়।

২০১২ সালের কারিকুলাম অনুযায়ী ২০১৩ তে যে বই হাতে পেয়েছিল শিক্ষার্থীরা, সে সময়ও বইতে ভুল-ত্রুটি ছিল এবং তা সংশোধনও করা হয়েছিল। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে ঐ ২০১২ এর কারিকুলাম অনুযায়ী ২০১৭ সালে এসে বই প্রকাশিত হলেও ভুলের ভুতকে ঘাড় থেকে নামানো গেলনা। কিন্তু কেন ও কীভাবে এই ভুল হয়? কেন প্রতিবছর সবচেয়ে জরুরি একটি ব্যাপারে, অর্থাৎ শিশুদের পাঠ্যবইতে ভুল থাকবে? পর্যালোচনা কমিটি গঠিত হয়েছে, তারা সময় নিয়ে পর্যালোচনা করবেন, এরপর প্রতিবেদন প্রকাশ করবেন আর তারপর প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে। এটা নতুন নয়, প্রতিবছরই এমনটা হয় কিন্তু দোষীরা চিহ্নিত হয় না, তাদের কোন শাস্তি হয়না। “সরকার কি মাল দরিয়া মে ঢাল”-এই স্টাইলে বছরের পর বছর এই ভুল চলতে থাকে।

ছাপাখানায় যে ভুত থাকে, সে কিছু কিছু ভুলকে নিয়েই চলে। আমরা যতই এডিটিং ও প্রুফরিডিং করিনা কেন, এইরকম কিছু ভুল থেকেই যায়, আর ছাপা হওয়ার পর তা চোখে পড়ে। কিন্তু তাই বলে ‘Hurt’ এর জায়গায় `Heart’ শব্দ লিখে ফেলাটা কি ছাপাখানার ভুল? নাকি এটা আমাদের বই প্রণেতাদের অজ্ঞতা? এইসব ভুল বারবার হতে দেখে পাঠ্যবই প্রণেতাদের যোগ্যতা, দক্ষতা ও দায়িত্বশীলতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বছরের পর বছর চলে যাচ্ছে, আর তারা ভুলে ভরা পাঠ্যবই শিশুদের হাতে তুলে দিচ্ছে, এটা কোনভাবেই মেনে নেয়া যায়না।

আমরা মনে করি, শিশুকে ইচ্ছাকৃতভাবে বা নিছক উদাসীনতা থেকে ভুল কিছু শেখানোটা রীতিমত অপরাধ। এর শাস্তি হওয়া উচিৎ। আমি জানি না বিশ্বের আর কোন সভ্য দেশে শিশুদের পাঠ্যবইতে ভুল থাকে কিনা? কেন, দেশে কি এমন যোগ্য লোক নেই যারা শুদ্ধ বাংলা জানেন, জানেন ইংরেজি, জানেন সমাজবিজ্ঞান, বিজ্ঞান, গণিত এবং অন্য আরো কিছু? এমন মানুষ কি নেই যারা শিশুদের জন্য, শিশুদের মত করে বই লিখতে পারেন না? এমন মানুষ নেই যারা শিশুদের জন্য শিশুতোষ, ভালো লেখা যাচাই-বাছাই করতে পারেন? আছেন কিন্তু ইচ্ছা করেই এসব মানুষকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়, যাতে শিশুরা আলোকিত মানুষ না হয়ে অন্ধ হয়ে বড় হয়। কিছু কিছু ভুল বা তথ্য বিভ্রাট থাকে, যা থাকাটা রীতিমত অন্যায় এবং কিছুটা ইচ্ছাকৃত বলে মনে হয়। পাঠ্যপুস্তকে যে ভুলগুলো দেখতে পারছি, তা ঠিক ছাপাখানার ভুতের কাজ নয়। যেমন তৃতীয় শ্রেণির বাংলা বইয়ে কুসুমকুমারী দাশ রচিত ‘আদর্শ ছেলে’ কবিতাটি বিকৃত করা হয়েছে।

আমার কাছে এখনও স্পষ্ট নয় কেন কবি হুমায়ুন আজাদের লেখা ‘বই’ নামের অপূর্ব একটি কবিতা পাঠ্যপুস্তক থেকে বাদ দেয়া হল? কবিতাটি হুমায়ুন আজাদ লিখেছেন বলে? কবিতাটিতে অন্ধকারের বিরুদ্ধে কথা বলা হয়েছে বলে? কবিতাটি এতো চমৎকার যে বাচ্চাদের জন্য তা একবারে যথার্থ। কবি যা বলেছেন, তার সারাংশটা এরকম “যে বই আলো জ্বালায়, যে বই স্বপ্ন দেখায়, ভালোবাসতে শেখায়, যে বইয়ে সূর্য উঠে, যে বই গোলাপ ফোটায় – সে বই শিশুরা পড়বে। আর যে বই ভয় দেখায়, যে বই মানুষকে অন্ধ করে, বদ্ধ করে সে বই শিশুরা ধরবেও না।” এত সুন্দর একটি কবিতা বাদ দেয়া কাদের কাজ হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়। মৌলবাদী গোষ্ঠী সবসময়ই চেষ্টা করে যাচ্ছে শিক্ষা ব্যবস্থার ভেতর সাম্প্রদায়িক চিন্তা ঢুকিয়ে দিতে। ভুলে গেলে চলবেনা যে, এদেশে একটা কালো অধ্যায় ছিল, যে অধ্যায়ে একজন যুদ্ধাপরাধী আমাদের শিক্ষামন্ত্রী ছিল। ঐ সময়ে অথবা এরও আগের অন্ধকার সময়ে অবশ্যই স্বাধীনতাবিরোধী চক্র ও সাম্প্রদায়িক মানসিকতার মানুষ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ পেয়েছিল এবং যারা বহাল তবিয়তে এখনও এইসব কাজ করে যাচ্ছে। শুধু বছরের প্রথম দিন শিশুদের হাতে বই তুলে দেয়াটাই বড় কথা নয়, বড় কথা হচ্ছে একটি নির্ভুল, সহজ, সরল, শিশুদের উপযোগী জ্ঞানসম্পন্ন বই প্রকাশ করা। এমন বই প্রকাশ করা যা শিশুদের অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে বিকশিত করবে, মৌলবাদী চিন্তাকে প্রতিহত করবে।

বাজারে বোর্ডের বইয়ের পাশাপাশি এমন সব বই আছে যা অক্ষরজ্ঞান দেয়ার নামে শিশুদের মনে সাম্প্রদায়িক চিন্তার বীজ বপন করছে। কোন কোন স্কুল তাদের পছন্দ অনুযায়ী পাঠ্যবই হিসেবে এসব বইই বেছে নিচ্ছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচিৎ এদিকেও দৃষ্টি দেয়া। শুধু ছাপাখানার ভুত নয়, তাড়াতে হবে সরষের ভেতরের ভুতকে।

Comments

The Daily Star  | English
Corruption Allegations Against NBR Official Matiur's Wife, Laila Kaniz Lucky

How Lucky got so lucky!

Laila Kaniz Lucky is the upazila parishad chairman of Narsingdi’s Raipura and a retired teacher of a government college.

11h ago