কলকাতায় বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য সরানোর দাবির বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ মমতা

বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য সরানোর দাবি মানা হবে না বলে জানিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি: রয়টার্স

কলকাতায় বেকার হোস্টেল থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আবক্ষ ভাস্কর্য সরানোর দাবির বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বুধবার সন্ধ্যায় রাজ্য সচিবালয় নবান্ন থেকে কালীঘাটের বাড়িতে ফেরার পথে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বঙ্গবন্ধুকে ‘ঐতিহ্য’ বলে উল্লেখ করে বলেন, ঐতিহ্যের কোনও ইজারা হয় না।

বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য সরানোর দাবি বরদাস্ত করা হবে না উল্লেখ করে মমতা বলেন, “বঙ্গবন্ধু দুই বাংলার কাছেই শ্রদ্ধেয়, স্মরণীয়। মুক্তিযুদ্ধ আমাদের প্রেরণা। তাঁর স্মৃতি শ্রদ্ধার সঙ্গে সংরক্ষণ করাই আমাদের কর্তব্য।”

“এর কোনও রকম বিরোধিতাকে বরদাস্ত করা হবে না। কেউ প্রতিরোধ তৈরি করতে চাইলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে,” বলেও হুঁশিয়ার করেন মুখমন্ত্রী।

শুধু মুখ্যমন্ত্রী মমতা নন, রাজ্যের উচ্চ শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ও এই দাবিতে ভিত্তিহীন বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, আমাদের কাছে এমন কোনও দাবি কেউ জানায়নি তবে পত্রপত্রিকায় এই খবর পাওয়া যাচ্ছে। আমরা এই ধরণের কোনও দাবিকে সমর্থন করবো না।

১৮ মার্চ পশ্চিমবঙ্গের মুসলমান ছাত্র-যুবদের একটি সংগঠন ‘সারা বাংলা সংখ্যালঘু যুব ফেডারেশন’ এর পক্ষ থেকে ভারতের পরাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজকে চিঠি দিয়ে ৮ নম্বর স্মিথ রোডের বেকার হোস্টেলের চতুর্থ তলার বঙ্গবন্ধু স্মৃতি কক্ষ থেকে বঙ্গবন্ধুর আবক্ষ মূর্তি সরানোর দাবি জানায়।

সংগঠনের সম্পাদক মুহম্মদ কামরুজ্জামানের বক্তব্য, মূর্তি প্রতিষ্ঠা ইসলাম ধর্মের আদর্শ বিরোধী। বেকার হোস্টেল রাজ্যের মুসলিম ছাত্রদের অন্যতম বড় আবাসিক হল। এখানে একটি মসজিদও রয়েছে, তাই ধর্মী অনুভূতি রক্ষার স্বার্থে এই দাবি তুলেছেন তারা।

সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক সংগঠন বলে দাবি করা এই সংগঠনটির জন্ম ২০০৪ সালে। সংগঠনের সম্পাদক মুহম্মদ কামরুজ্জামান দাবি করেন, তারা এই মূর্তি প্রতিষ্ঠার খবর আগে জানতেন না। ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে বিমান বসু বেকার হোস্টেল গিয়ে মাল্যদান করেন। সেই ছবি পরদিন পত্রিকায় দেখে তারা মূর্তির বিষয়টি অবগত হন এবং পরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে লিখিত আবেদন জানান। 

তিনি বলেন, বেকার হোস্টেলের আবাসিকদের মধ্যেও বিষয়টি ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। 

যদিও বেকার হোস্টেলের তত্ত্বাবধায়ক দাবীর আহমেদ জানান, তিনি এই ধরণের ক্ষোভ বিক্ষোভের কোনও আঁচ পাননি। এমন কি তার কাছে কেউ লিখিতভাবে কোন আবেদনও করেননি।

বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য সরানোর দাবি তোলা সংগঠনটি নিয়ে খোদ পশ্চিমবঙ্গেই বিতর্ক রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মানবতাবিরোধী অপরাধের সাথে যুক্ত রাজাকার-আলবদরদের প্রতি তাদের সমর্থন রয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে ঢাকার শাহবাগে আন্দোলন শুরু হলে আন্দোলনের বিরোধিতা করে কলকাতায় বিক্ষোভ মিছিল আয়োজন করার অভিযোগ রয়েছে এই সংগঠনের অনেক নেতার বিরুদ্ধে।

তবে কামরুজ্জামান বলছেন, বাংলাদেশে স্বাধীনতা বিরোধীদের শাস্তির বিরোধী নন তারা। শুধুমাত্র মাওলানা দেলোয়ার হোসেন সাইদীর শাস্তির বিরোধিতা করেছিলেন।

“বঙ্গবন্ধুর মূর্তি সারানোর দাবি সঙ্গে কেউ কেউ আমাদের বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিরোধী শক্তির সঙ্গে মিলিয়ে ফেলার চেষ্টা করছেন সেটা ঠিক নয়। বঙ্গবন্ধুকেও আমরা সবাই শ্রদ্ধা করি,” যোগ করেন তিনি।

আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে ভারত সফরে যাবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ঠিক এই সময় এই ধরণের একটি দাবি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কিনা জানাতে চাইলেন এই প্রতিবেদককে কামরুজ্জামান বলেন, “বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের সঙ্গে এই দাবির কোনও সম্পর্ক নেই।”

২০১১ সালে ২৩ ফেব্রুয়ারি ৮ নম্বর স্মিথ রোডে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আবাসিক হল বেকার হোস্টেলে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মণি। এর কিছু দিন আগে বেকার হোস্টেলের দুটি কক্ষকে (২৩ এবং ২৪ নম্বর) “বঙ্গবন্ধু স্মৃতি কক্ষ” হিসাবে রাজ্য সরকার স্বীকৃতি দেয়। ওই স্মৃতি কক্ষে বঙ্গবন্ধু ছাত্র থাকাকালীন সময়ে যে চেয়ার, চৌকি ও টেবিলে পড়াশোনা করতেন সেসব সংরক্ষণ করা রয়েছে। বঙ্গবন্ধু পড়তেন এমন কিছু পাঠ্য পুস্তকও সেখানে রাখা হয়েছে।

বঙ্গবন্ধুর মূর্তি সরিয়ে নেওয়ার দাবি সম্পর্কে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও কলকাতার বাংলাদেশ উপ-দূতাবাসের ডেপুটি হাইকমিশনারের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তবে উপ-দুতাবাসের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেছেন, মঙ্গলবার পুলিশ নিজেই মিছিলকারীদের উপ-দূতাবাসের চৌহদ্দিতে প্রবেশ করতে দেয়নি। অফিসিয়ালভাবেও বিষয়টি উপ-দূতাবাস জানে না বলেও উল্লেখ করেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মকর্তা।

বঙ্গবন্ধু ভাস্কর্য সরানোর দাবির বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামবে ভাষা ও চেতনা সমিতি 

কলকাতার প্রভাবশালী সামাজিক সংগঠন ‘ভাষা ও চেতনা সমিতি’র পক্ষ থেকে বঙ্গবন্ধুর মূর্তি সরানোর দাবির তীব্র নিন্দা ও এর বিরোধিতা করার কথা জানানো হয়েছে। তারা মনে করে, বঙ্গবন্ধু শুধু বাংলাদেশ নয় গোটা বাঙালি জাতির সম্পদ তাই তার এই আবক্ষ মূর্তি সরানোর দাবি পুরপুরি রাজনৈতিক অভিসন্ধিমূলক। সংগঠনের সম্পাদক ইমানুল হক বলেন, যারা এই দাবি করলেন তারা কি টেলিভিশনের কোনও ছবি দেখেন না, ফেসবুক হোটাসঅ্যাপ চালান না, নিজেদের ছবি তুলে কলেজের ভর্তি পরীক্ষার ফরম পূরণ করেন না।

ধর্মনিরপেক্ষ সংগঠনের ওই নেতা আরও বলেন, আমরা আর কিছুদিন দেখবো, এরপরও ওরা যদি দাবি প্রত্যাহার না করে তবে আমরাও রাস্তায় নেমে এই দাবির বিরোধিতা করবো। ইমানুল হক জানান, সারা বাংলা সংখ্যালঘু যুব ফেডারেশনের সম্পাদক মুহম্মদ কামরুজ্জামানের কাছে আমরা এই দাবি থেকে সরে আসার আহবান জানিয়ে চিঠি লিখেছিলাম। তিনি যদি তার দাবি থেকে সরে না আসেন তো আমরা আমাদের মতো গণতান্ত্রিকভাবে আন্দোলন করবো। 

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, শাহবাগ আন্দোলনের সময় কলকাতায় ভাষা ও চেতনা সমিতি আন্দোলনের পক্ষে কলকাতায় বেশ কিছুদিন মিছিল সমাবেশ করেছে। মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতামুক্ত বিশ্ব গড়ার ডাকে পশ্চিমবঙ্গে সংগঠনটি বরাবরই সরব ভূমিকা নিয়েছে।

ভাষা ও চেতনা সমিতির ওই নেতা মনে করেন, শাহবাগ আন্দোলনের সময়ও সারা বাংলা সংখ্যালঘু যুব ফেডারেশন বিরোধিতা করেছিল। এমনকি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়াতেও তাদের তীব্র বিরোধিতার সাক্ষী কলকাতার মানুষ।

Comments

The Daily Star  | English
cyber security act

A law that gagged

Some made a differing comment, some drew a political cartoon and some made a joke online – and they all ended up in jail, in some cases for months. This is how the Digital Security Act (DSA) and later the Cyber Security Act (CSA) were used to gag freedom of expression and freedom of the press.

8h ago