লাভের ৮৯২ কোটি টাকা জমা সত্ত্বেও পানির দাম বাড়াচ্ছে ওয়াসা

গত সপ্তাহে, সকালে দৈনিক পত্রিকা হাতে নিয়ে ক্ষেপে গিয়েছিলেন পুরান ঢাকার পেনশনভোগী মো. বেলাল হোসেন। তিনি জানতে পারেন, পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ (ওয়াসা) পানির দাম ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে।

গত সপ্তাহে, সকালে দৈনিক পত্রিকা হাতে নিয়ে ক্ষেপে গিয়েছিলেন পুরান ঢাকার পেনশনভোগী মো. বেলাল হোসেন। তিনি জানতে পারেন, পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ (ওয়াসা) পানির দাম ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে।

গতকাল দ্য ডেইলি স্টারকে বেলাল বলেন, 'এটা কি একটা মস্করা নাকি যে, আমার কল থেকে বের হয়ে আসা এই দুর্গন্ধযুক্ত হলুদ রংয়ের পানির জন্য আমাকে আরও বেশি দাম দিতে হবে?'

তিনি জানান, খুব কম সময়ই তিনি পরিষ্কার পানি পান। কিন্তু সে ক্ষেত্রেও তা দুর্গন্ধের কারণে মুখে দেওয়ার মত অবস্থায় থাকে না।

আরও উন্নত সেবার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, 'এটা গ্রহণযোগ্য নয়। কিসের ভিত্তিতে ওয়াসা দাম বাড়াচ্ছে?'

বেলালের মত শহরের আরও হাজারো বাসিন্দা দাম বাড়ানোর পেছনের যুক্তি সম্পর্কে জানতে চাচ্ছেন। ওয়াসার দাম বাড়ানোর প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে এটি হবে গত ৩ বছরের মধ্যে তৃতীয় এবং গত ১৩ বছরে ১৬তম দাম বাড়ানোর ঘটনা। এই পুরো সময় জুড়ে রাজধানীর ২ কোটি বাসিন্দার বেশিরভাগের জন্য নিরাপদ পানির প্রতিশ্রুতি রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে ওয়াসা।

ওয়াসা আবাসিক ব্যবহারে প্রতি ইউনিটে (১ হাজার লিটার) ২১ টাকা এবং বাণিজ্যিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে ৫৫ টাকা দাম বাড়াতে চাইছে, যা যথাক্রমে ৩৮ দশমিক ৮ শতাংশ ও ৩১ শতাংশ মূল্য বৃদ্ধি।

ওয়াসার বার্ষিক প্রতিবেদনগুলো যাচাই করলে মনে হয় বাড়ানোর উদ্যোগ বাস্তবে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টা ছাড়া আর কিছুই নয়।

অডিটকৃত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে ওয়াসা ৪৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা লাভ করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৭ শতাংশ বেশি।

২০১৬-১৭ অর্থ বছরে সংস্থাটি ২২ কোটি ৬০ লাখ টাকা লাভ করেছিল। অর্থাৎ, ৫ বছরের মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানটির মুনাফা দ্বিগুণের চেয়েও বেশি হয়েছে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'আমি পানির দাম বাড়ানোর পেছনে কোনো যুক্তি দেখি না, কারণ প্রতিষ্ঠানটি বেশ কয়েক বছর ধরে লাভ করছে এবং তাদের হাতে প্রচুর সঞ্চিত মুনাফা আছে।'

সঞ্চিত মুনাফা হচ্ছে একটি প্রতিষ্ঠানের সার্বিক মুনাফার একটি অংশ, যেটি ভবিষ্যতে ব্যবহারের জন্য জমিয়ে রাখা হয়, বিশেষ করে বিনিয়োগের জন্য। ২০২০-২১ অর্থবছরের শেষে ঢাকা ওয়াসার সঞ্চিত মুনাফার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮৯২ কোটি।

পানির দাম বাড়ানো প্রসঙ্গে গত ৯ ফেব্রুয়ারি তাকসিম এ খান বলেছিলেন, সরকারের কাছ থেকে ভিক্ষা নিয়ে কোনো সংস্থা নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে না।

'যখন মূল্যস্ফীতি ইতোমধ্যেই বেড়ে চলেছে তখন ওয়াসা শুল্ক বৃদ্ধির পরিবর্তে তাদের সঞ্চিত মুনাফা খুব ভালভাবে ব্যবহার করতো পারতো,' তিনি বলেন।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ডিসেম্বরে মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক শুন্য ৫ শতাংশ, যা ১৪ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ।

কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশনস অব বাংলাদেশ (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'এখন পানির দাম বাড়ানোর সময় নয় – কারণ এর ফলে স্থির আয় এবং নিম্ন মধ্যবিত্তদের দুর্ভোগ বাড়িয়ে তুলবে তাই এমন একটি উদ্যোগ কেন নেওয়া হলো তা ভাবতে পারছি না।'

ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাকসিম এ খান শুল্ক বৃদ্ধি সময়ের প্রয়োজন বলে যুক্তি দিয়েছেন। তিনি জানান, ওয়াসার উৎপাদন খরচ ট্যারিফের চেয়ে বেশি, সরকার ভর্তুকি দিয়ে পার্থক্য তৈরি করে।

গত শনিবার তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'আমরা ভর্তুকিকে আয় হিসাবে গণনা করছি। আপনারা মূলধন ব্যয় বা বিনিয়োগ বিবেচনা করছেন না, শুধু পরিচালন ব্যয় বিবেচনা করছেন।'

তিনি জানান, ঢাকা ওয়াসার বিশাল ঋণ থাকলেও সরকার ভর্তুকি বিবেচনা করে তা পরিশোধ করছে না।

তিনি বলেন, 'যদি আমরা সঠিকভাবে কিস্তি পরিশোধ করি এবং অবচয় সম্পূর্ণরূপে গণনা করি, তাহলে আমরা যে একটি লাভজনক কোম্পানি, সেই ভাবমূর্তি ভেঙে পড়বে।'

অন্যান্য রাষ্ট্র-চালিত সংস্থাগুলো তাদের ব্যালেন্স শিটে অবচয় দেখাচ্ছে না বাদ দিতে হবে এমনটা বলা হলে তাকসিম এ খান বলেন, 'আপনারা যে সংস্থাগুলোর কথা বলেছেন তাদের উপার্জনের কোনও উপায় নেই এবং কোনও ব্যবস্থাপনা নেই।'

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বোর্ডের একজন সদস্য বলেন, ওয়াসা কিছু প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে, যার ব্যয় আর্থিক প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

অডিট রিপোর্ট অনুসারে, ওয়াসার চলমান প্রকল্পগুলোর ব্যয় প্রায় ৯ হাজার ৩৬২ কোটি টাকা।

যেহেতু এই প্রকল্পগুলো এখনো সম্পূর্ণ হয়নি এবং চালু নেই তাই সুদের হার এবং অবচয় ব্যয় ব্যালেন্স শিটে গণনা করা হয় না।

তিনি বলেন, যখন সুদ, অবচয় এবং অন্যান্য খরচ যোগ করা হয়, তখন এই ধরনের মুনাফা আর্থিক বিবরণীতে দেখা যাবে না।

ড্রেনেজ প্রকল্পে ড্রেনেজ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সরকারের দেওয়া ১০ কোটি টাকার অনুদান ছাড়া সরাসরি ভর্তুকি আর্থিক প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

তিনি বলেন, আর্থিক বিবরণীতে ঋণ অন্তর্ভুক্ত হলে খরচ বাড়বে এবং ওয়াসা লোকসানে ডুবে যাবে। তখন ভর্তুকি নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।

শুল্ক বৃদ্ধির প্রস্তাবের প্রতিক্রিয়ায়, আগামীতে চলমান প্রকল্পগুলোতে সুদ ও অবচয় খরচের জন্য যে ব্যয় বাড়বে তার একটি প্রাক্কলন জমা দেওয়ার জন্য আনুমানিকভাবে নির্দিষ্ট করতে ব্যবস্থাপনা বিভাগকে নির্দেশ দিয়েছে বোর্ড যাতে করে কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়।

'সাধারণ মানুষের জানা উচিত খরচ কত বেড়েছে -- আমরা অন্ধদের হাতি দেখানোর মতো শুল্ক বাড়াতে চাই না,' তিনি যোগ করেন।

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) এক কমিশনার, যিনি আর্থিক বিশ্লেষক হিসেবে কাজ করেন দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ওয়াসা যদি বিনিয়োগ ব্যয় বা ঋণের সুদের ওপর অবচয় ব্যয় গণনা না করে তবে তারা কেবল মুনাফা বাড়িয়ে দেখাচ্ছে।

আর্থিক প্রতিবেদন দেখে কমিশনার বলেন, ওয়াসার শীর্ষ কর্মকর্তার মন্তব্য তার আর্থিক প্রতিবেদনের সঙ্গে মেলে না। কারণ প্রকল্পগুলো এখনো ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত নয়। তাই তাদের অবচয় ব্যয় এবং সুদের খরচ গণনা করা হয় না।

অন্যদিকে ১০ কোটি টাকা ছাড়া আর কোনো ভর্তুকি ব্যবহার করছে না বলে জানান বিএসইসি কমিশনার।

'সুতরাং, এটি এখন লাভজনক তবে চলমান প্রকল্পগুলো সম্পূর্ণ হলে এটি ক্ষতির মুখে পড়তে পারে,' তিনি যোগ করেন।

নগর অর্থনীতিবিদ এ কে এনামুল হক দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, মানুষ ব্যবহারের চেয়ে পানির দাম বেশি দেওয়ায় উৎপাদন খরচ বেশি হলেও ওয়াসা লাভ গুনছে।

ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির ব্যবসা ও অর্থনীতি অনুষদের ডিন এনামুল হকের মতে, ওয়াসা সিস্টেম লস উল্লেখযোগ্যভাবে কমালেও শহরবাসীদের জন্য বিল এখনও বেশি।

বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, ২০১০ সালে সিস্টেম লস প্রায় ৪০ শতাংশ ছিল। এখন তা ৫ শতাংশে নেমে এসেছে।

'ঢাকা ওয়াসা যদি শুল্ক বাড়ায় এবং একই সঙ্গে ওভারবিলিংকে সীমিত করতে পারে, তাহলে জনগণের ওপর প্রভাব পড়বে না। তাই, আমার বক্তব্য হল, সেবা প্রদানকারীর উচিত অতিরিক্ত বিলিং কমাতে চাপযুক্ত ওয়াসার পাইপলাইন নিশ্চিত করা,' তিনি যোগ করেন।

অনুবাদ করেছেন সুমন আলী

Comments

The Daily Star  | English

Personal data up for sale online!

A section of government officials are selling citizens’ NID card and phone call details through hundreds of Facebook, Telegram, and WhatsApp groups, the National Telecommunication Monitoring Center has found.

1h ago