‘রাশিয়ার লক্ষ্য মূলত দুটি ইউক্রেন তৈরি করা’

পোল্যান্ডের সীমান্তবর্তী ও ইউক্রেনের পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্য লুভিউয়ের ইভান ফ্রাঙ্কো ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ইউরি মেলনিক। গণমাধ্যম, প্রযুক্তি, তথ্যযুদ্ধ এবং বিশ্বব্যাপী রাশিয়ার তথ্য বিষয়ক কর্মকাণ্ড নিয়ে তার গবেষণা।

পোল্যান্ডের সীমান্তবর্তী ও ইউক্রেনের পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্য লুভিউয়ের ইভান ফ্রাঙ্কো ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ইউরি মেলনিক। গণমাধ্যম, প্রযুক্তি, তথ্যযুদ্ধ এবং বিশ্বব্যাপী রাশিয়ার তথ্য বিষয়ক কর্মকাণ্ড নিয়ে তার গবেষণা।

গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন শুরু হওয়ার পর থেকে তিনি গণমাধ্যমের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে কাজ করছেন। ইউক্রেনের বর্তমান পরিস্থিতি কী সে বিষয়ে গত শুক্রবার ইউরি তার অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন দ্য ডেইলি স্টারের কূটনৈতিক প্রতিবেদন পরিমল পালমার সঙ্গে।

দ্য ডেইলি স্টার: লুভিউ কি এখন তুলনামূলকভাবে নিরাপদ?

ইউরি মেলনিক: বর্তমানে ইউক্রেনে কোনো নিরাপদ জায়গা নেই। এমনকি পশ্চিম ইউক্রেনের শহরগুলোও যুদ্ধের প্রথম দিনেই রকেট হামলার শিকার হয়েছে। রাশিয়ার কৌশল হলো ইউক্রেনের সামরিক ঘাঁটি এবং অন্যান্য স্থাপনাগুলোতে আক্রমণ করা। শুক্রবার সকালে আমাদের শহরবাসীদের এয়ার অ্যালার্ম বাজিয়ে বেজমেন্টে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বলা হয়েছিল। সৌভাগ্যক্রমে সেদিন হামলার ঘটনা ঘটেনি।

তবে হ্যাঁ, পূর্ব ইউক্রেন রাশিয়ানদের হামলার মূল লক্ষ্য। তারা ইউক্রেনের বাকি অংশে আক্রমণ করতে প্রস্তুত নয়। কারণ তারা মনে করে ইউক্রেনের রুশভাষী জনগণ তাদের অংশ। সেটাই তাদের লক্ষ্য, ইউক্রেনীয়ভাষী ইউক্রেন নয়।

তবে, আবারও বলছি, যেমনটা বলেছি; এখন গোটা দেশ আক্রমণের মুখে এবং সারা দেশেই মানুষ মারা যাচ্ছেন। সামরিক, বেসামরিক বহু মানুষ মারা যাচ্ছেন। পরিস্থিতি খুব ভয়াবহ। গতকাল অনেক বেসামরিক মানুষ মারা গেছেন।

ডেইলি স্টার: ইউক্রেনীয় এবং বিদেশিসহ প্রচুর মানুষ পোল্যান্ড ও রোমানিয়া সীমান্তের দিকে ছুটছেন। সেখানকার পরিস্থিতি কেমন দেখছেন?

ইউরি: আমি কিছু বিদেশিকে ইউক্রেন ছেড়ে যেতে সাহায্য করছিলাম, বিশেষ করে ইউক্রেনের কিয়েভ ও পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো থেকে। এখন এখান থেকে ট্যাক্সিতে করে একজন আমেরিকান সাংবাদিক এবং আমার আফ্রিকান বন্ধুরা দেশ ছেড়ে যেতে চান। বিদেশিরা সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন।

আমার মতো অনেক মানুষ এখানে বাস করছেন। আমি পুতিনের জন্য দেশ ছাড়ছি না। এটা আমার দেশ। এমনকি ইউক্রেন যদি সংকটেও পড়ে তবুও আমি দেশ ছাড়ব না। বিদেশিদের কথা আলাদা। তাদের চলে যাওয়ার কারণটা বুঝতেই পারছেন।

ডেইলি স্টার: কিছু সংখ্যক ইউক্রেনের নাগরিকও কি দেশ ছেড়ে যাচ্ছেন?

ইউরি: হ্যাঁ, অনেক মানুষ ইউক্রেন ছেড়ে চলে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। এখন সেটা আরও বেশি কঠিন হয়ে পড়ছে। ইউক্রেনে সাধারণ যুদ্ধপ্রস্তুতির ব্যবস্থা আছে। এর অর্থ হলো, যাদের বয়স ১৮ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে তাদের সেনাবাহিনীতে যাওয়ার কথা, দেশ ছেড়ে যাওয়ার কথা নয়। সরকার সব স্বেচ্ছাসেবকদের কাজ করার আমন্ত্রণ জানিয়েছে। স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করা খুব সহজ। আপনি পাসপোর্ট নিয়ে এসে একটি অস্ত্র গ্রহণ করুন এবং রাশিয়ান বাহিনীর সঙ্গে লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত হন।

ডেইলি স্টার: আপনিও তো সেই বয়সের আওতায় পড়েন। এখন তাহলে কী ভাবছেন?

ইউরি: আমি স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করতে পারব। বর্তমানে সাংবাদিক হিসেবে কাজ করছি। আমি একজন অধ্যাপক। আমার কোনো সামরিক প্রশিক্ষণ নেই। সত্যি বলতে, কীভাবে অস্ত্র ব্যবহার করতে হয় জানি না। কোনো প্রশিক্ষণ নেওয়ার মতো সময়ও এখন নেই। তাই, তথ্য প্রচারের কাজ করে জনগণ ও সাংবাদিকদের সাহায্য করছি।

ডেইলি স্টার: ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট বলেছেন, পশ্চিমা দেশগুলো ইউক্রেনকে তেমন সাহায্য করছে না। তার এই বক্তব্যের বিষয়ে আপনি কী মনে করেন? রাশিয়া চারপাশ থেকে আক্রমণ করছে, এই পরিস্থিতিতে সামনে কী ঘটতে চলেছে?

ইউরি: এটা খুব সহজ কথা। ইউক্রেনে যা ঘটছে, তার বেশিরভাগ দায়ভার পশ্চিমা দেশগুলোর। হামলার আগের দিনও মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল যে, রাশিয়া হামলা করলে তিনি ইউক্রেনকে সমর্থন করবেন কি না। বাইডেন বলেছিলেন, তিনি ব্যাপকভাবে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবেন, কিন্তু ইউক্রেনে সেনা পাঠাবেন না। এটি ছিল চরম ভুল। তিনি বলতে পারতেন, 'আমি জানি না... সব বিকল্প পথ খোলা আছে, আমরা পরে সিদ্ধান্ত নেব।' এটা করে তিনি রুশ আগ্রাসন বন্ধ করতে পারতেন। তিনি বলেছিলেন, আমেরিকানরা অংশ নেবে না। এটা রাশিয়ানদের আক্রমণের জন্য আরও আত্মবিশ্বাসী করে তোলে।

যদি আগামী কয়েক দিনের মধ্যে ইউক্রেনের পতন ঘটতে থাকে তাহলে সেটা শুধু আমার দেশের জন্য নয়, পশ্চিমা বিশ্বের জন্যও বিপর্যয়েরা কারণ হবে। যার অর্থ হলো, এই শতাব্দীতে এসেও কেউ তার প্রতিবেশী দেশ আক্রমণ করতে পারে, সেনাবাহিনী ও জনগণকে হত্যা করতে পারে এবং সেটাকে তাদের ভূখণ্ডে অন্তর্ভুক্ত করতে পারে।

রাশিয়া যদি এটা করতে পারে, অন্যরা কেন পারবে না? চীন কেন তাইওয়ান আক্রমণ করবে না? এর মাধ্যমে একটি প্যান্ডোরার বাক্স খুলে গেছে এবং রাশিয়া আরও শক্তিশালী হতে চলেছে। তারা আরও অনেক কিছু করবে। এখন তারা মনে করবে, আমরা ইউক্রেনে সফল হয়েছি, এরপর কেন ইউরোপ নয়, বাল্টিক রাষ্ট্রগুলোতে নয়।

ইউক্রেন ন্যাটোর সদস্য হলে এ হামলা হতো না। এত বছর ধরে আমরা ন্যাটো জোটে থাকার চেষ্টা করেও কেন জোটের অংশ নয়? এর কারণ পশ্চিমা রাজনীতিবিদদের ওপর রাশিয়ার চাপ। ইউক্রেনকে ন্যাটোর সদস্য হতে না দেওয়ার পেছনে রাশিয়ার স্বার্থ রয়েছে।

আজ যদি ইউক্রেনের পতন হয়, তাহলে সেটা সমগ্র পশ্চিমা দেশ এবং এই গ্রহের জন্য অত্যন্ত গুরুতর পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে চলেছে। আমরা গতকাল যেভাবে বেঁচে ছিলাম, আগামীকাল সেই ধরনের পৃথিবীতে বসবাস করব না।

ডেইলি স্টার: যুক্তরাষ্ট্র অস্ত্র পাঠানোয় ইউক্রেনীয়রা আগের চেয়ে শক্তিশালী। তাহলে, ইউক্রেনের কি পতন ঘটবে, নাকি রুশদের প্রতিহত করবে?

ইউরি: আমরা যদি অন্তত আগামী কয়েকদিন আগ্রাসন প্রতিহত করতে পারি, তাহলে আমাদের পক্ষে বিজয় অর্জন করা অনেক সহজ হবে। রাশিয়ানরা কয়েক ঘণ্টার যুদ্ধের হিসাব করেছে। কিন্তু তারা শুধু উত্তর, দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চল থেকে কিছু ছোট ছোট শহর দখল করতে পারে, এটা চিন্তা করা প্রত্যাশিত নয়। তারা রাজধানীর কাছাকাছি আসছে।

ইউক্রেন যদি এই আগ্রাসন প্রতিহত করে, আমরা যদি তাদের পিছু হঠাতে পারি তাহলে একটি ফ্রন্টলাইন পাওয়া যাবে। যেটা ইউক্রেনকে ২ অংশে ভাগ করবে। যার একটি অংশ রাশিয়া অধিকৃত এবং আরেকটি থাকবে মুক্ত অঞ্চল। তারপর পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে আলোচনা হবে, সমঝোতা হবে, শান্তিপূর্ণ চুক্তি হবে।

সুতরাং, এখন জরুরি বিষয় হলো রাজধানী বাঁচানো। যদি রাজধানীর পতন হয়, তাহলে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টকে বন্দি করা হবে এবং রাশিয়ানরা তাদের একজন পুতুল রাষ্ট্রপতির ঘোষণা দিতে পারে। তিনি রাশিয়ানদের দেওয়া যেকোনো নথিতে সই করতে পারেন। কিয়েভকে সুরক্ষিত রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আশা করি আমরা সেটি করতে পারব।

ডেইলি স্টার: শেষ পর্যন্ত পুতিন একটি রাশিয়াপন্থী সরকার প্রতিস্থাপন করতে চান?

ইউরি: হ্যাঁ, এটাই সত্য। ইউক্রেনের কিছু অংশ দখল করে রাশিয়ার অন্তর্ভুক্ত করবে এবং নিজেদের মতো একটি পুতুল রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব তৈরি করবে—এটাই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত বিষয় যা পুতিন করতে পারেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসি জার্মানি এটাই করেছিল। ইউক্রেনীয় গোয়েন্দাদের পাওয়া পরিকল্পনা অনুযায়ী রাশিয়া দৃশ্যত একই কাজ করতে চায়। তাদের লক্ষ্য মূলত দুটি ইউক্রেন তৈরি করা।

ডেইলি স্টার: এখন ইউক্রেনের সাধারণ নাগরিকদের কী অবস্থা? তারা কী করছেন এবং কী ভাবছে?

ইউরি: আমার এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা করেছি। যে তখন সামরিক বাহিনীতে যোগ দেওয়ার জন্য নিয়োগ অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে। সে পুরোপুরি প্রস্তুতি নিয়ে এসেছিল এবং ফলাফলের বিষয়েও নিশ্চিত ও খুবই আশাবাদী। সে আমাকে বলে, তারা রাশিয়ানদের থামাবে এবং আমাদের ভূখণ্ডে প্রবেশ করতে দেবে না।

একই সময় আমি কিছু সেনা এবং তাদের পরিবারকে দেখেছি, যারা এক অপরকে বিদায় জানাচ্ছেন এবং কাঁদছেন। সেই দৃশ্যগুলো ছিল খুবই আবেগঘন। ভাবুন, বাবা যুদ্ধে যাচ্ছেন, সন্তানরা তাকে জড়িয়ে ধরে চুমু দিল। আমি তাদের সঙ্গে কথা বলছি। একজন অফিসার জানান, তিনি তার বাচ্চাদের বলছেন যে তিনি যুদ্ধে যাচ্ছেন। বড় মেয়ে বুঝতে পেরে কাঁদছিল, কিন্তু ছোট ছেলে শান্ত ছিল।

গতকালের মতো, মানুষ এখনো হতবাক। কেউ কেউ সাহায্য চাইছেন। এটি সাধারণ দৃশ্য।

ডেইলি স্টার: বিশ্বের প্রতি আপনার জরুরি বার্তা কী?

ইউরি: আমাদের বার্তা হলো—বিশ্ব যদি পরিস্থিতিটিকে এমনভাবে দেখে যে, এটি একটি টিভি শো বা গ্ল্যাডিয়েটর শো তাহলে এটা ইউক্রেন এবং বিশ্বের বাকি দেশগুলোর জন্য চরম বিপর্যয় ডেকে আনছে। সুতরাং, দূরে থাকবেন না। নানাভাবে আপনি ইউক্রেনের সেনাবাহিনী, বেসামরিক নাগরিকদের সমর্থন করতে পারেন, তাদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করতে পারেন এবং রাশিয়ান আগ্রাসনের নিন্দা করতে পারেন।

আমার আহ্বান, দূরে থাকবেন না, দর্শক হবেন না। আপনারা ব্যবস্থা নিন। আপনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখতে পারেন, শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দিতে পারেন, প্রতীকী তহবিলের মাধ্যমে ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনীকে সমর্থন করতে পারেন, রুশ আগ্রাসনের নিন্দা করতে পারেন, রুশ দূতাবাসে গিয়ে আপনার মনোভাব দেখাতে পারেন। বেশ কয়েকটি দেশ এসব করছে। দয়া করে আপনিও করুন। কেবলমাত্র এমনভাবে তাকাবেন না যেন, এটি আপনাকে উদ্বিগ্ন করছে না।

ডেইলি স্টার: ইউক্রেনে প্রচুর হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। সেখানে কি যথেষ্ট পরিমাণ জরুরি পরিষেবার ব্যবস্থা আছে?

ইউরি: অবশ্যই যথেষ্ট নয়। আমরা আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোসহ বিশ্বের বাকি দেশগুলোর কাছ থেকে সাহায্য আশা করি। আমাদের মানবিক সহায়তা, সাহায্য দরকার। এখন পর্যন্ত শতাধিক মানুষ নিহত ও আহত হয়েছেন। যদি কয়েক হাজার মানুষের চিকিৎসা সরবরাহের প্রয়োজন হয়, আমরা একা সেটি করতে পারব না। আমাদের এখন আপনাদের সাহায্য দরকার!

Comments

The Daily Star  | English

Submarine cable breakdown disrupts Bangladesh internet

It will take at least 2 to 3 days to resume the connection

1h ago