আমাদের কালের বাতিঘর আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ 

তিনি প্রায়ই তো বলেন, মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়। কিন্তু মাঝে মাঝে মনে হয় একজন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ তো স্বপ্নের চেয়েও বড়।  একজন সাহিত্যিক কতোখানি পরিবর্তন করতে পারেন? একজন কবি কিংবা সাহিত্যের সাথে সংশ্লিষ্ট মানুষ কতোখানি পরিবর্তন করতে পারেন একটি দেশে, একটি ভাষায়, একটি সংস্কৃতিতে? তিনি যা করেছেন তা আজ থেকে পাঁচশো বছর পরেও থাকবে। এক বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র, তার উদ্দীপনার কণ্ঠ শত শত বছর থাকবে। যার সংখ্যা কোটি নয়, যার সংখ্যা অগণিত।
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ।

তিনি প্রায়ই তো বলেন, মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়। কিন্তু মাঝে মাঝে মনে হয় একজন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ তো স্বপ্নের চেয়েও বড়।  একজন সাহিত্যিক কতোখানি পরিবর্তন করতে পারেন? একজন কবি কিংবা সাহিত্যের সাথে সংশ্লিষ্ট মানুষ কতোখানি পরিবর্তন করতে পারেন একটি দেশে, একটি ভাষায়, একটি সংস্কৃতিতে? তিনি যা করেছেন তা আজ থেকে পাঁচশো বছর পরেও থাকবে। এক বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র, তার উদ্দীপনার কণ্ঠ শত শত বছর থাকবে। যার সংখ্যা কোটি নয়, যার সংখ্যা অগণিত।
১৯৭৮ সালে ফিরে যাই। আর দশটা পাঠচক্রের মতো এক প্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু। কিন্তু যার হাতে যাত্রা শুরু তার নিজের ভাষ্যেই বলা ভালো, 'আমার একটা ব্যক্তিগত সমস্যা আছে। কোনো কিছুই ছোট পরিসরে আমি চিন্তা করতে পারি না। তাই পাঠচক্রটির সাফল্যের পর মনে হতে লাগলো পাঠচক্রটি ছড়িয়ে পড়ুক সারা দেশে। সেই সময় আমাদের জাতির মধ্যে অজ্ঞতার যে দুঃখময় চিত্র দেখেছিলাম, সেখান থেকেই যাত্রা শুরু হয়েছিল এ স্বপ্ন। তখন মনে হয়েছিল, আমাদের জাতির ভেতরে জ্ঞান চাই, আলো চাই। গোটা পৃথিবীর উন্নত সভ্যটার সমান্তরালে আমাদের একই রকম মননের বিকাশ চাই।' সেই স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান "বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র" আজ গোটা দেশে ছড়িয়ে আছে। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের মধ্য দিয়ে তিনি যে জ্ঞান আর বইপাঠের জোয়ার সৃষ্টি করেছেন তা অতুলনীয়।
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র গড়ে তোলার পেছনেও কম ঝক্কি ছিল না। এই যে আজকের এতো বৃহৎ পরিসরে চলমান এক কার্যক্রম তার পেছনে যুগের পর যুগ শ্রম, নিষ্ঠা আর একাগ্রতা অবিশ্বাস্য মনে হওয়ার মতোই। কেমন ছিল সেই ব্যর্থতার গল্প। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ নিজেই বললেন, 'প্রথম দিকে যত স্কুলে বইপড়া কর্মসূচি চালু করতে গেছি, তার ৮০ ভাগেই ব্যর্থ হয়েছি। কখনো হয়তো কোনো হেডমাস্টারকে আপ্রাণ বোঝানোর চেষ্টা করেছি যে শিক্ষার্থীদের শুধু পাঠ্যবইয়ের মধ্যে আটকে রাখা ঠিক নয়, তাদের সুন্দর সুন্দর কল্পনাসমৃদ্ধ বই পড়তে দেওয়াও উচিত। তাকে উপমা দিয়ে বলেছি, এই যে আমাদের এই পৃথিবী—এ শক্ত মাটির হলেও এর ওপরে আছে এক বিশাল ফাঁকা আকাশ। আকাশটাকে মাটি দিয়ে ভরে দিলে আমাদের তো নিশ্বাস বন্ধ হয়ে যাবে। আমাদের জীবনের মধ্যেও অমনি একটা বড় ফাঁকা জায়গা দরকার। না হলে আমাদের সত্যিকার বিকাশ হবে না। কথা বলার সময় মনে হতো তিনি সব বুঝছেন, মাথা ঝুঁকিয়ে প্রতিটি কথায় সায় দিচ্ছেন। কিন্তু সব শোনার পর বলতেন, 'এই সব বই পইড়া পড়া নষ্ট।' হায় রে কপাল!' এভাবে কত স্কুল থেকে যে ফিরে এসেছি, তার ঠিক নেই।'

ষাটের দশকের কোনো এক দিনে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। ছবি:সংগৃহীত

আমার একটা স্মৃতির কথা উল্লেখ করি। আমাদের বিদ্যালয়ে অধিকাংশেরই সাহিত্য পড়ার সূচনা হয়েছিল বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের মাধ্যমে। ছাত্ররা তো বটেই শিক্ষকেরাও উম্মুখ হয়ে থাকতো বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের পাঠানো বইয়ের জন্য। গণগ্রন্থাগার ছিল বটে কিন্তু তাতে পড়ার পরিবেশ ছিল অনেকটা গোয়ালঘরের মতোই। আজ এই যে জেলায় জেলায়, প্রতিটি উপজেলায় ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরির মাধ্যমে বই পড়ার উপযোগিতা ও সুস্থ প্রতিযোগিতা তা যেন এক উৎসব যজ্ঞ। আজকের পৃথিবীতে বাংলাদেশের দিকে তাকালেই বোঝা যায়। অধিকাংশ তরুণ , শিশু- কিশোর যখন ইন্টারনেট আর গেমিংয়ের জগতে মাতোয়ারা, অসুস্থ এক প্রতিযোগিতা যেন অজগরের মতো আমাদের গিলছে, তার মধ্যে একপশলা বৃষ্টির মতো বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রই যেন আশ্রয়দাতা হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
জনপ্রিয়তার ব্যাপারে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের একটা ব্যাখ্যায় ফিরে যাই। তার জনপ্রিয়তার মোহ কখনোই ছিল না। তিনি বললেন, 'আমার কোনোদিন জনপ্রিয়তার মোহ ছিল না। কিন্তু মানুষ একটু জানুক, একটু দেখুক! মানুষের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই- এই জনপ্রিয়তা তো সবাই আশা করে। মরিতে চাহি না আমি এই সুন্দর ভুবনে মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই- কথাটার মধ্যে একটা মৃত্যু আক্রান্ত মানুষের আকুতি, কান্নার শব্দ শোনা যায়। এই পৃথিবীতে সবই থাকবে অথচ আমি থাকবো না। কিন্তু একটা মাত্র উপায় আছে পৃথিবীতে বেঁচে থাকার যদি হৃদয় মাঝে স্থান করে নেওয়া যায়। সুতরাং মানুষের হৃদয়ের মাঝে আমি বাঁচতে চাই। এটা জনপ্রিয়তা নয়, অমরত্ব লাভের আকাঙ্ক্ষা। জনপ্রিয়তার আকুতি আর অমরত্বের আকুতি এক নয়। জনপ্রিয়তা ক্ষণস্থায়ী। অমরত্ব দীর্ঘস্থায়ী। জনপ্রিয়তা একটা বাজারের বিষয়। অধিকাংশ সময় এটা ব্যবসার বিষয়ও।'
তার আজীবনের স্বপ্ন ছিল তিনি শিক্ষক হবেন। তবে তা তথাকথিত শিক্ষকের সেই ছাত্রদের প্রতি ধমক, বাক্যবাণ আর কটূক্তি নয়। মুন্সিগঞ্জের হরগঙ্গা কলেজের শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে যে যাত্রা শুরু, সে যাত্রা সিলেট মহিলা কলেজ, রাজশাহী কলেজ, সরকারী বিজ্ঞান কলেজ, বুয়েট হয়ে ঢাকা কলেজে এসে পূর্ণতা পেল। সেসময়ের ইন্টারমিডিয়েট টেকনিক্যাল কলেজ বা আজকের বিজ্ঞান কলেজে তো ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষও ছিলেন দু বছর। মজার বিষয় হলো তখন তার বয়স মাত্র ২৩। শিক্ষকতা যেন তার রক্তে। কখনোই ক্লাসে রোলকল করতেন না। রোলকলকে তার কাছে মনে হতো সময়ের অপব্যয়৷ তাই বছরের পয়লা ক্লাসেই ঘোষণা করে দিতেন রোলকল না করার। ঢাকা কলেজে  ছাত্রদের কাছে তিনি ছিলেন সবচেয়ে জনপ্রিয় শিক্ষক। ছাত্র শিক্ষক সম্পর্ক নিয়ে তিনি বলেন, 'ছাত্রের জীবনের রক্তের কণায় কণায় একজন শিক্ষকের থাকা উচিত। শিক্ষক ছাত্রের মধ্যে ব্যক্তিগত সম্পর্কও থাকা জরুরি।' নিজের সম্পর্কে বলেন আমি যত কাজই করেছি মূলে কিন্তু আমি একজন শিক্ষক। যে তার আশপাশের সবার সমৃদ্ধি কামনা করেন।'
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদকে বলা যায় সর্বসফল ব্যক্তিত্ব। তার কাছে সফলতার অর্থ কী?  বললেন, 'সবাই শুধু সাফল্য সাফল্য বলে চিৎকার করে। কিন্তু আমার ধারণা সাফল্য খুব কাম্য জিনিস হলেও বড় জিনিস নয়। সাফল্য একটা দক্ষতা। চোর-বাটপারও অনেক সময় সফল হয়ে যেতে পারে। আমাদের দেশের সফল লোকদের মাঝে ৮০ ভাগই তো দুর্বৃত্ত। এমন জিনিস নিয়ে পাগল হওয়ার কী আছে। তারকা হবার নেশা যার মধ্যে আছে সে তারকা হয় না। এটা আমার ধারণা। ক্লোজআপ ওয়ান প্রথম পর্বের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে আমাকে একবার কথা বলতে হয়েছিল। তখন আমি তাদেরকে বলেছিলাম তারকা হবার চেষ্টা করবে না। তারকা হলেই কিছুদিনের মধ্যে হারিয়ে যাবে। তোমরা গায়ক হবার চেষ্টা করো। সত্যিকারের সঙ্গীতশিল্পী হও তাহলে চিরদিন তারকা মর্যাদা পাবে। আলাদাভাবে যে তারকা হবার চেষ্টা করে তার পতন অনিবার্য।
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ প্রায়ই বলেন, থামার কথা, নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর কথা। কখনোবা প্রকৃতির মাঝে বিলীন হওয়ার কথা। একবার এক বক্তৃতায় বললেন, 'থামো। দৌড়াও, কিন্তু থামতে শেখো। দাঁড়াতে শেখো। গাছ হতে শেখো। গাছের মতো সমুন্নত, গাছের মতো পোশাক-আবহ, গাছের মতো পাতায় ভরা, ফুলে ভরা, সৌন্দর্যে ভরা। তাহলে এই পৃথিবীতে সত্যিকারভাবে কিছু দিতে পারবে। তা না হলে হাততালি এবং শিস দেওয়া ছাড়া আর কিছুই করার থাকবে না।'
একজন তাকে জিজ্ঞেস করেছিল 'আপনার কথা শুনতে এত ভালো লাগে কেন?' উত্তরে প্রশ্ন কর্তাকে বলেছিলেন- 'আমার জীবনের চেষ্টাই হচ্ছে সুন্দরকে খোঁজা। আমার শরীর যদি একটু ভালো থাকে তখন আমি যে শব্দগুলো ব্যবহার করি চেষ্টা করি আরো আনন্দময়, আরও আনন্দময় করে তোলার। আর একটি বিষয়- মানুষকে আমি কখনোই শক্তিমান মনে করি না। গম্ভীর কথা, ভারী কথা আমি নিজেও বুঝতে পারি না এবং টের পাই অন্যেরা তা বুঝতে পারে না। আর তাই সবসময় চেষ্টা করি কীভাবে সবচেয়ে সহজভাবে কথা বলা যায়।'
বাঙালির মধ্যে সংগঠন গড়ে তোলার মানসিকতাটি যেন অপ্রতুল। শোষিত বাঙালি আজীবন কেবল শোষিত হয়েই এসেছে। যে ধারণাটা পাল্টে দিয়েছিলেন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। তার নিজেরও সংগঠন গড়ার পিছনে তেমন পেশাদারী পড়াশোনা ছিল না। এক অপ্রস্তুত ও খাবি খাওয়া অবস্থায় হাতে নাতে কাজ করতে করতে তিনি দেখেছেন। শিখেছেন বারে বারে। আজকের যে এই বিশাল কর্মক্ষেত্র আর বই পড়ার যজ্ঞ তা আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের বছরের পর বছর ধরে রক্ত জলে গড়া সৃষ্টি। বারে বারে তিনি ভেঙেছেন বটে কিন্তু মচকাননি। বিপুল বিক্রমে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন।
অসুস্থ প্রতিযোগিতা আর হতাশায় মগ্ন হয়ে ক্রমশ আমরা যখন ব্যর্থতার চোরাবালিতে ডুবে যাচ্ছি তখন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদদের মতো মহৎপ্রাণেরাই পথ দেখিয়ে যাচ্ছেন আমাদের। তার বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র যেন প্রতিনিয়ত বাতিঘরের মতো বলছে, 'ফিরে যাও সৃষ্টির মহত্ত্বে।' আর সেই মহাত্মা পুরুষই আমাদের কালের বাতিঘর আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ।
আজ আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের জন্মদিন। জন্মদিনে তার প্রতি জানাই শ্রদ্ধা ও শুভকামনা।
তথ্যসূত্র- 
সংগঠন ও বাঙালি / আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ
ভাঙো দুর্দশার চক্র/ আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ
আমি না থাকলেও কেন্দ্র যেন নিজস্ব গতিতে এগোতে পারে/ আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের সাক্ষাৎকার, আলতাফ শাহনেওয়াজ
আমার জীবনের চেষ্টাই হচ্ছে সুন্দরকে খোঁজা/ আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের সাক্ষাৎকার, আনন্দ আলো।

আহমাদ ইশতিয়াক  [email protected]

Comments

The Daily Star  | English
Loss and damage is a far more complicated concept than it sounds. It has far-reaching impacts, some of which are often overlooked.

Can we finally put the Loss and Damage Fund to use?

Although the proposal for the Loss and Damage Fund was adopted at COP27, the declaration to operationalise it came at COP28.

4h ago