পরবর্তী ‘হটস্পট’ হতে পারে সিলেট

সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার জয়নগর গ্রামের ৬০ বছর বয়সী রফিক মিয়া গত ২০ জুন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হন। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে সিলেটের একটি বেসরকারি হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) তিন দিন চিকিৎসা শেষে কিছুটা উন্নতি হলে বাড়ি ফেরেন তিনি।
করোনায় আক্রান্ত গুরুতর অসুস্থ রাবেয়া খাতুনকে নিয়ে সিলেট শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালের সামনে অ্যাম্বুলেন্সে অপেক্ষারত তার ছেলে। আইসিইউ শয্যা না পেয়ে শেষ পর্যন্ত সাধারণ শয্যা খালি হওয়ার পর সেখানেই তাকে ভর্তি করানো হয়। সম্প্রতি সিলেট শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালের সামনে থেকে ছবিটি তুলেছেন দ্য ডেইলি স্টারের আলোকচিত্রী শেখ নাসির।

সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার জয়নগর গ্রামের ৬০ বছর বয়সী রফিক মিয়া গত ২০ জুন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হন। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে সিলেটের একটি বেসরকারি হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) তিন দিন চিকিৎসা শেষে কিছুটা উন্নতি হলে বাড়ি ফেরেন তিনি।

কিন্তু, কয়েকদিনের মাথায় আবারও তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে গত বৃহস্পতিবার তাকে নিয়ে আসা হয় সিলেটে। কিন্তু, এবার কোনো বেসরকারি হাসপাতালে আইসিইউ শয্যা না পেয়ে তাকে ভর্তি করা হয়েছে সিলেট শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে। কিন্তু, সেখানেও আইসিইউতে কোনো শয্যা ফাঁকা না থাকায় সাধারণ একটি শয্যাতেই চলছে তার চিকিৎসা।

রফিক মিয়ার অবস্থায় সিলেট বিভাগের করোনাভাইরাসের বর্তমান পরিস্থিতির একটি প্রতিচ্ছবি। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে সিলেটে করোনাভাইরাস পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে।

সিলেটের দৈনিক শনাক্তের সংখ্যা, সংক্রমণের উচ্চহার, হাসপাতালে উপচে পড়া ভিড় ও শয্যা সংকট বিবেচনায় চিকিৎসকরা বলছেন, দেশের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলার পর সিলেট করোনাভাইরাসের পরবর্তী হটস্পট হতে যাচ্ছে।

আজ শনিবার সকাল পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় সিলেট বিভাগে শনাক্তের হার ৫৫ দশমিক ৪১ শতাংশ, যা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ। এর মধ্যে সিলেট জেলাতেই ৬০ দশমিক ৩৩ শতাংশ।

সিলেট বিভাগীয় স্বাস্থ্য কার্যালয়ের তথ্যমতে, সিলেট বিভাগে বিগত ২৪ ঘণ্টায় মোট ৭১১টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়। যার মধ্যে কোভিড-১৯ আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন ৩৯৪ জন।

এ ছাড়া, গতকাল বিভাগে সর্বোচ্চ শনাক্তের রেকর্ডও হয়। শুক্রবার সকাল পর্যন্ত বিভাগে ৪৩ দশমিক ১২ শতাংশ হারে মোট ৪৪২ জন শনাক্ত হয়েছেন। যা করোনাভাইরাস মহামারির প্রথম থেকে এখন পর্যন্ত একদিনে সর্বোচ্চ।

সিলেট বিভাগের হাসপাতালগুলোর মধ্যে সিলেট মহানগর এলাকায় করোনাভাইরাস চিকিৎসায় সবচেয়ে আধুনিক ও সর্বোচ্চ স্থান থাকায় বিভাগের অন্যান্য জেলা ও জেলার অন্যান্য উপজেলা থেকে প্রায় সব রোগীই এখানে আসছেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, আজ সিলেট বিভাগের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে মোট ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৫৩৩।

ভর্তি রোগীর মধ্যে কেবলমাত্র সিলেটেই ভর্তি রয়েছেন ৪৬৩ জন। এ সংখ্যা বিগত কয়েকদিনে ছিল যথাক্রমে ৪৮৬, ৪৫০, ৪৪৪ ও ৪২৬। গত ৫ জুলাই এর আগের চার সপ্তাহে সিলেট জেলায় ভর্তি রোগীর সংখ্যার গড় ছিল যথাক্রমে ৩৪৪, ২৮০, ২১৬ ও ২১২।

সিলেট বিভাগে করোনাভাইরাসে মৃত্যুর সংখ্যাও বাড়ছে প্রতিনিয়ত। গত ২৪ ঘণ্টায় ছয় জনসহ গত ১০ দিনে ৩৮ জন রোগীর মৃত্যু হয়েছে।

করোনাভাইরাস চিকিৎসায় বিশেষায়িত সিলেট শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) মো. মিজানুর রহমান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘সপ্তাহখানেকের বেশি সময় ধরে আমাদের এখানে সাধারণ বা আইসিইউ শয্যা ফাঁকা থাকছে না। প্রতিদিনই রোগীদের চাপ বাড়ছে আর কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীদের অর্ধেকই সিলেট শহরের বাইরের বিভিন্ন উপজেলা কিংবা বিভাগের অন্যান্য জেলা থেকে আসছেন। শয্যা ফাঁকা না থাকায় প্রতিদিন অনেক রোগীকে ফিরিয়ে দিতে হচ্ছে।’

সিলেটের সরকারি হাসপাতালে করোনাভাইরাস রোগীদের চিকিৎসার জন্যে নির্ধারিত রয়েছে মোট ৩২৪টি সাধারণ শয্যা। কিন্তু, আইসিইউ শয্যা রয়েছে ২৪টি।

সাধারণ শয্যার মধ্যে সিলেট শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে ৮০টি, এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৮২টি এবং খাদিমপাড়া হাসপাতাল ও দক্ষিণ সুরম হাসপাতালে ৩১টি করে।

২৪টি আইসিইউ শয্যার মধ্যে শহীদ শামসুদ্দিন হাসপাতালে ১৬টি ও ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আটটি। এই মুহূর্তে দুই হাসপাতালের কোনোটিতেই আইসিইউ শয্যা বাড়ানোর কোনো সম্ভাবনা নেই বলে জানিয়েছেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

শামসুদ্দিন হাসপাতালের আরএমও ডা. মিজানুর রহমান ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘আমাদের ১০ হাজার লিটারের অক্সিজেন প্ল্যান্ট বর্তমানে সর্বোচ্চ ক্যাপাসিটিতে চলছে। রোগীদের অক্সিজেনের চাহিদা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে কয়েকগুণ। তাই আমাদের এখানে এই মুহূর্তে আইসিইউ শয্যা বাড়ানো সম্ভব না। অক্সিজেন প্ল্যান্টের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়লে তা থেকে দুর্ঘটনাও ঘটতে পারে।’

তবে, ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৭০টি সাধারণ শয্যা বাড়ানোর পরিকল্পনা চলছে বলে জানিয়ে হাসপাতালটির উপ-পরিচালক ডা. হিমাংশু লাল রায় ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘সিলেট বিভাগের সব রোগীদের শেষ ভরসাস্থল এই হাসপাতাল। কিন্তু, করোনা উপসর্গ নিয়ে আসা ও আক্রান্ত রোগীদের স্থান সংকুলান করতে আমাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। আমাদের পর্যাপ্ত অক্সিজেন সরবরাহ করার মতো প্ল্যান্ট থাকলেও এই মুহূর্তে আইসিইউ শয্যা বাড়ানোর জন্যে পর্যাপ্ত সক্ষমতা নেই।’

‘প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি পাওয়া গেলে হাসপাতালে আইসিইউ শয্যা বাড়ানো সম্ভব। এ ছাড়াও, হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা, বাইপ্যাপ, সিপ্যাপ, ভেন্টিলেটরসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম বরাদ্দ পেলে আইসিইউ ছাড়াও অনেক রোগীকে পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া যাবে’, বলেন তিনি।

সরকারি হাসপাতালের বাইরে সিলেটের বেসরকারি হাসপাতালে কোভিড-১৯ চিকিৎসায় অনেক বেশি পরিমাণ সাধারণ শয্যা ও আইসিইউ থাকলেও তা বর্তমানে সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতিতে চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল।

সিলেট মহানগরীর বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে মোট ২৪১টি সাধারণ শয্যা ও ৫৬টি আইসিইউ শয্যা রয়েছে। কিন্তু, অতিরিক্ত রোগীর চাপে কোনো হাসপাতালেরই আইসিইউ শয্যা ফাঁকা নেই। গত কয়েকদিন ধরে সাধারণ শয্যা পাওয়াও দুর্লভ হয়ে গেছে।

বেসরকারি হাসপাতালের মধ্যে নর্থ-ইস্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৪৮টি, মাউন্ট এডোরা হাসপাতালে ২৬টি, জালালাবাদ রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৪৮টি, সিলেট উইমেন্স মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৬৫টি, পার্ক ভিউ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৮টি, নুরজাহান হাসপাতালে ২৩টি ও ওয়েসিস হাসপাতালে ১৩টি সাধারণ শয্যা রয়েছে। এ হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ শয্যা রয়েছে যথাক্রমে ১৬, নয়, ১০, ১০, চার, ছয় ও একটি।

সিলেট বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার মালিক সমিতির সভাপতি এবং নুরজাহান হাসপাতালের চেয়ারম্যান ডা. নাসিম আহমদ ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি আমরা কোভিড-১৯ চিকিৎসায় সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি। কিন্তু, রোগীর চাপ প্রতিদিন এত বেশি বাড়ছে যে আমরা উদ্বিগ্ন। এই অবস্থায় সরকারি চিকিৎসাসেবাও আরও অনেকটুকু বাড়ানো প্রয়োজন।’

Comments

The Daily Star  | English

Coastal villagers shifted to LPG from Sundarbans firewood

'The gas cylinder has made my life easy. The smoke and the tension of collecting firewood have gone away'

1h ago