মধ্যবিত্তের ইন্টেরিয়র

ইন্টেরিয়র। অন্দরসজ্জা। এক সময়ে উচ্চবিত্তের মধ্যে বিষয়টি সীমাবদ্ধ ছিল। বর্তমানে প্রযুক্তির উৎকর্ষ, বিভিন্ন জিনিসের সহজলভ্যতা আর মধ্যেবিত্তের মানুষের ক্রয়সাধ্য বৃদ্ধি ইন্টেরিয়র ডিজাইনকে দিনকে দিন জনপ্রিয় করে তুলেছে।
ইন্টেরিয়র
মডেল: কোনাল; ছবি: শাহরিয়ার কবির হিমেল

ইন্টেরিয়র

‘Good buildings come from good people &

All problems are solved by good design’

প্রায় একশ’ বছরের পুরনো এই ইন্টেরিয়র ডিজাইন বিষয়ক কর্মকা-। মূলত শুরু হয়েছিল মিসরে। মিসরীয়রা তাদের ঘরদোর প্রথম পশুপাখির চামড়া ইত্যাদি দিয়ে তৈরি আসবাব, ফুলদানি, চিত্রকর্ম দিয়ে প্রয়োজনের বাইরেই সজ্জিত করা শুরু করে। এক সময়ে রোমান ও গ্রিকরা ধনী-দরিদ্রের পার্থক্য বোঝানোর তাগিদেও আসবাবপত্রে রুপার কাজ, আইভরির কাজ ইত্যাদি দিয়ে নকশায় আরো নতুনত্ব দেয়ার চেষ্টা করে। রোমানরা প্রথম নকশার সঙ্গে আরামের বিষয়কেও নজরে আনার প্রয়াস পায়।

যে কোনো দেশের এই অন্দরসজ্জার ব্যাপারটি আসলে ঠিক কেমন হবে, তা নির্ধারিত হয় ওই দেশের ভৌগোলিক অবস্থান অর্থাৎ শীত অথবা গ্রীষ্ম প্রধান কিনা, ওই দেশের ঐতিহ্য এবং পরবর্তী সময়ে আসে ব্যক্তিগত রুচিবোধ। বাংলাদেশে গত ৮-১০ বছরে মানুষের সৌখিনতায় এসেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। সবাই চাইছে তার বাসযোগ্য গৃহকে তার যোগ্যতার ঊর্ধ্বে নিয়ে সজ্জিত করতে।

একজন স্থপতি একটি বাড়ি নির্মাণ করে তার মৌলিক স্থানগুলো নির্ধারিত করে দেন; কিন্তু যে ব্যক্তিরা সেখানে অবস্থান করবেন, নিজেদের রুচি, পেশা, ঐতিহ্য, ক্রয়ক্ষমতা ইত্যাদির মিশেলে অন্দরসজ্জা সম্পন্ন করেন। বাসগৃহ ও কর্মস্থল এই দুই ক্ষেত্রেই প্রয়োজন হয় সঠিক পরিকল্পনার।

ইন্টেরিয়র

বর্তমান সময়ের ম্যাটেরিয়াল

প্রাথমিক পর্যায়ে একটি নির্মিত স্থানকে সজ্জিত করতে আমাদের প্রয়োজন পড়ে হরেক পদের টাইলস, মার্বেল, ওয়ালপেপার, সিলিং প্যানেলিং, পাথর, কাঠ, গ্লাস ও মেটাল ইত্যাদি। এই ম্যাটেরিয়াল সিলেকশনে গিয়েই একজন মানুষ মূলত একজন পেশাদার ডিজাইনারের শরণাপন্ন হন। তার যৌক্তিক কারণও আছে, কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই একজন ব্যক্তির রুচিবোধ ভুল আবেগ দ্বারা তাড়িত হয়ে বেশ কিছু ভুল সিদ্ধান্তে অর্থের অনিষ্ট সাধন হয়। কেননা কোন ম্যাটেরিয়ালের ব্যবহার কোথায় হবে সেটা জানা সম্ভব তাদের পক্ষে যাদের কেবল টেকনিক্যাল বিষয়ে জ্ঞান আছে এবং সেই বিষয়ে দক্ষ।

বাজারে আমদানি ম্যাটেরিয়াল বেশি দামে বিক্রি হওয়ার পরও তার চাহিদা অনিশেষ; কেননা দেশীয় ম্যাটেরিয়ালের চাহিদা বাজারে থাকলেও বাণিজ্যিক উৎপাদনে না যাওয়ার কারণে, সঠিক

সময়ে পরিমাণের চাহিদা অনুযায়ী কখনই ক্রেতাকে সরবরাহ করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। পর্দা থেকে শুরু করে একটি ফুলদানি পর্যন্ত এখনো বিত্তবানদের জন্য আমদানি হওয়া পণ্যের চাহিদা সবচেয়ে বেশি।

টাইলসের ক্ষেত্রে আমাদের দেশীয় ব্র্যান্ডগুলো অনেক এগোচ্ছে, কিন্তু জাতিগতভাবে বিদেশি জিনিসে আগ্রহ বলে এগিয়ে যেতে কষ্ট হচ্ছে। স্যানিটারি ওয়্যারে আধুনিক সময়ে বিশ্বজুড়েই ডিজাইনে আসছে অনেক নতুনত্ব, কখনো ভিক্টোরিয়ান, কখনো সমকালীন।

আসবাবপত্রে রয়েছে আমদানি করা চামড়া, গদির সোফা। আসবাবপত্রে দেশীয় ফার্নিচার শিল্প কাঠের পাশাপাশি এমডিএফ, মেটাল ইত্যাদিও এগিয়ে।

ইন্টেরিয়র

মধ্যবিত্তের অন্দরসজ্জা

ইতিহাস ঘেঁটে আমরা সব সময়েই পাই, যে কোনো সৌখিন শিল্প গড়ে ওঠে বিত্তবানদের চাহিদা অনুযায়ী; কিন্তু সমাজের নিয়মানুযায়ী বিত্তবানদের সঙ্গে সঙ্গে মধ্যবিত্তের মানেও তৈরি হয় গৃহসজ্জার আবেগ। বর্তমান সময়ে মধ্যবিত্তের রঙে প্রাধান্য পাচ্ছে, সব মৌলিক এবং উজ্জ্বল রঙ।

পর্দায় সবুজ, গাঢ় নীল, কমলা, আসবাবেও হলুদ, লাল। লাইটিংয়ের ক্ষেত্রে টিউবলাইট থাকলেও ডেকোরেটিভ ডিজাইন্ড ল্যাম্পের ব্যবহার বেড়েছে অনেক। দেশীয় শতরঞ্জি, পাটের ম্যাট, তাঁতের ল্যাম্প এগুলো দিয়ে গৃহসজ্জার বেশ আগ্রহ চোখে পড়ার মতো।

ইন্টেরিয়র

ব্যক্তিগত অভিমত

গৃহসজ্জায় আমাদের রঙ এবং লাইটিং প্ল্যান খুব বেশি জরুরি, কারণ এই দুটো পরিকল্পনা আপনার ঘরকে মৌলিকভাবে সজ্জিত করে ফেলবে এবং ঘর ও লাইটিং সচরাচর পরিবর্তন করা সম্ভব হয় না। কিছু ফার্নিচার, ফ্লোর ম্যাট ইত্যাদি উৎসব ঘিরে বা বিভিন্ন আয়োজনে পরিবর্তন করা যেতেই পারে। ব্যক্তিগত রুচির সঙ্গে মাথায় রাখা জরুরি রঙ এবং আলো। আমাদের বাসগৃহে বসবাসকারী মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য, আনন্দ, ভালোলাগা ইত্যাদির সঙ্গে জড়িত। রঙের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ রঙ ব্যবহার করাই বুদ্ধিমানের কাজ। যেমন- সাদা, ছাই, অফ-হোয়াইট, লাইট সাধারণত ওয়ার্ম হলে ভালো, কেবল স্টাডিরুমে এবং কিচেনে সাদা বাতি ব্যবহার করা যেতে পারে।

সবুজ ভাবনায় যারা উৎসাহী তারা বাসগৃহ ও কর্মস্থান পরিকল্পনায় অবশ্যই প্রচুর গাছের ব্যবহার করতে পারেন, এতে পরিবেশ নির্মল থাকবে।

ফার্নিচারের ক্ষেত্রে ছোট বাসা হলে অবশ্যই হালকা বাঁশ, বেত, কেরোসিন কাঠের ফার্নিচার তৈরি করে নিতে পারেন, বড় সোফা হলে গদির সোফা, এমডিএফের তৈরি ফার্নিচার ব্যবহার করতে পারেন।

ইন্টেরিয়র ডিজাইন একটি মানুষের কর্মস্থল এবং বাসস্থানকে স্বস্তি দেবে, এমন কোনো নকশা পরিকল্পনা করা যাবে না, সেখানে রঙ, আলো ইত্যাদিতে একজন মানুষের ক্লান্তি আসে।

নকশা পরিকল্পনা মানবজীবনকে সাধারণ করবে, মানবজীবনকে জটিল থেকে সরল করবে। বর্তমান সময়ে এই রুচিতে যেমন ডিজাইনাররা কাজ করছেন, একই সঙ্গে আছে জমকালো সজ্জা পছন্দ করেন এমন পরিকল্পনাকারীও। ডিজাইন যেহেতু একটি আপেক্ষিক ব্যাপার, কোনোটাকেই আপনি ভুল বলতে পারবেন না, তাই জরুরি সবার অবস্থান ও রুচির সচেতনতা।

ইন্টেরিয়র

বাড়ি, অ্যাপার্টমেন্ট, করপোরেট হাউস সব ক্ষেত্রেই কাচের ব্যবহার বেড়েছে। অথচ, কাচ একটি শীতপ্রধান দেশের ব্যবস্থাপনা। আমাদের এই ধরনের ভুলের বা রুচির কারণে, পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনের অতিরিক্ত এয়ারকন্ডিশন ব্যবহার করতে হয়, কেননা কাচে ঘেরা ঘরে প্রবেশ করা তাপ দীর্ঘস্থায়ী হয়, অথচ আমরা গ্লোবাল ওয়ার্মিং বিষয়ক সচেতনতার কথা না ভেবেই পরিবেশের তাপমাত্রা বৃদ্ধি করছি কয়েকগুণ।

গৃহসজ্জা পরিকল্পনাকারী এবং বসবাসকারী, উভয়পক্ষের সচেতনতায় সম্ভব একটি সুস্থ ও নান্দনিক স্পেস উপভোগ করা। উপভোগ্য, বাসযোগ্য, আরামদায়ক অন্দরসজ্জায় মনযোগী হলে দেশীয় শিল্পও বাঁচে, বেঁচে যায় শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য। অন্দরসজ্জা মানেই ঝলমলে, বিদেশি ঝাড়বাতি, ভিনদেশি কার্পেট নয়। আর এই ধারণা থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে পারলেই মঙ্গল।

ইন্টেরিয়র

‘What is the use of a

house if you

don’t have a

decent planet to

put in on?’

-Henry David Thoreau

 

 

লেখক : স্বত্বাধিকারী, স্টুডিও গ্রিন

ছবি : শাহরিয়ার কবির হিমেল, সাজ্জাদ হোসেন, স্টুডিও গ্রিন

 

Comments

The Daily Star  | English

Clashes rock Shanir Akhra; 6 wounded by shotgun pellets

Panic as locals join protesters in clash with cops; Hanif Flyover toll plaza, police box set on fire; dozens feared hurt

1h ago