১৪ ব্যাংকিং সেবায় বাড়তি ফি’র প্রস্তাব, ক্ষোভ গ্রাহকদের

মো. মেহেদী হাসান
মো. মেহেদী হাসান

ব্যাংকের ১৪টি সেবায় নতুন ও বাড়তি ফি চালুর প্রস্তাব দিয়েছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশ (এবিবি)। প্রস্তাব অনুযায়ী, নির্দিষ্ট সীমার বেশি নগদ টাকা তুললে ফি দিতে হবে। পাশাপাশি সুপ্ত (ডরম্যান্ট) হিসাব পুনরায় চালু করা, হিসাব রক্ষণাবেক্ষণসহ বিভিন্ন সেবার খরচও বাড়বে। এ প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছেন গ্রাহক, ব্যবসায়ী ও বাণিজ্য সংগঠনের নেতারা।

সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দেওয়া প্রস্তাব অনুযায়ী, বর্তমানে বিনা খরচে পাওয়া কিছু সেবার জন্যও ভবিষ্যতে টাকা দিতে হতে পারে। যেমন মাসে যতবার ইচ্ছা নগদ টাকা তোলার সুযোগ আর বিনা খরচে থাকবে না।

এবিবির দাবি, মূল্যস্ফীতির কারণে পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সেবামূল্য সমন্বয় করা প্রয়োজন।

তবে এ প্রস্তাবের সমালোচনা করেছেন সাধারণ গ্রাহক, ব্যবসায়ী সংগঠন ও বাণিজ্য খাতের নেতারা। তাদের মতে, এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে ছোট আমানতকারী, ঋণগ্রহীতা, ব্যবসায়ী, আমদানিকারক ও রপ্তানিকারক—সবাইকে বাড়তি খরচ বহন করতে হবে।

অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, এমন সময়ে এ প্রস্তাব কেন দেওয়া হলো, যখন ব্যাংক খাত আস্থার সংকটে রয়েছে এবং খেলাপি ঋণের পরিমাণ ক্রমেই বাড়ছে।

অন্যদিকে কঠোর মুদ্রানীতির কারণে ঋণের সুদহারও এখন বেশি। এতে ব্যবসা পরিচালনার খরচ বেড়েছে।

বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। একই সঙ্গে অনেক ব্যাংকের বিরুদ্ধে গ্রাহকসেবায় দুর্বলতার অভিযোগও রয়েছে।

প্রস্তাব অনুযায়ী, মাসে নির্ধারিত সংখ্যার বেশি নগদ টাকা তুললে প্রতি লেনদেনে ১০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত ফি নেওয়া হবে।

সঞ্চয়ী হিসাবে মাসে প্রথম তিনবার নগদ টাকা তোলা যাবে বিনা খরচে। চতুর্থ থেকে দশমবার পর্যন্ত প্রতিবার টাকা তুলতে ১০০ টাকা ফি দিতে হবে। একাদশবার থেকে প্রতিবার উত্তোলনে ফি হবে ৩০০ টাকা।

চলতি হিসাবে মাসে ২০তম থেকে ৫০তম উত্তোলনের জন্য প্রতিবার ১০০ টাকা ফি নেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। ৫১তম উত্তোলন থেকে প্রতিবার ১৫০ টাকা ফি দিতে হবে।

সুপ্ত (ডরম্যান্ট) হিসাব পুনরায় চালু করতে ৫০০ টাকা ফি নেওয়ারও প্রস্তাব দিয়েছে এবিবি।

এ ছাড়া ঋণ ব্যবস্থাপনা, ঋণ তদারকি, ঝুঁকি প্রিমিয়াম, নির্ধারিত সময়ের আগে ঋণ পরিশোধ, এলসি খোলা, এলসির নথি ব্যবস্থাপনা ও নথির সত্যায়িত কপির জন্য নতুন ফি চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে।

রপ্তানি এলসি বাতিল, বায়ার্স ক্রেডিটের ব্যবস্থা, চুক্তি কাঠামো তৈরি, ঝুঁকি প্রিমিয়াম ও নগদ বৈদেশিক মুদ্রা বিক্রির কমিশনেও নতুন চার্জ আরোপের প্রস্তাব রয়েছে।

ব্যাংকের সলভেন্সি সনদের ফি ২০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫০০ টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। চেক ফেরত যাওয়ার ফি ৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০০ টাকা করারও প্রস্তাব রয়েছে।

এ ছাড়া হিসাব রক্ষণাবেক্ষণ, ঋণ প্রক্রিয়াকরণ, এলসি, ব্যাংক গ্যারান্টি, ডিমান্ড ড্রাফট, পে-অর্ডারসহ আরও বিভিন্ন সেবার ফি বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানো চিঠিতে এবিবি বলেছে, সর্বোচ্চ নির্ধারিত সীমার মধ্যে থেকে প্রতিটি ব্যাংক যেন নিজেদের ব্যবসায়িক কৌশল, সেবার ধরন ও ব্যয়ের ভিত্তিতে ফি নির্ধারণ করতে পারে।

মূল্যস্ফীতি, প্রযুক্তি ব্যয় ও সেবা প্রদানের খরচ বাড়ার সঙ্গে মিল রেখে প্রতিবছর সর্বোচ্চ ফি ১০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর অনুমতি দেওয়ারও প্রস্তাব করা হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে এবিবির চেয়ারম্যান মাশরুর আরেফিন বলেন, গত ছয় থেকে সাত বছরে ব্যাংক পরিচালনার ব্যয় অনেক বেড়েছে। সেই বাস্তবতায় সেবামূল্য সমন্বয়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, ২০২০-২১ সালে যখন বর্তমান সেবামূল্যের তালিকা নির্ধারণ করা হয়েছিল, তখনকার সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা করতে হবে।

সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকও দায়িত্বে থাকা মাশরুর আরেফিন বলেন, এ সময়ে ডলারের দাম ৮৭ টাকা থেকে বেড়ে প্রায় ১২৩ টাকায় উঠেছে। কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে মূল্যস্ফীতিও বেশি।

তিনি বলেন, ২০২০-২১ সালে প্রিন্টারের টোনারের দাম কত ছিল, আর এখন কত—একবার ভেবে দেখুন। ছয়-সাত বছর ধরে বছরে অন্তত ৭ শতাংশ মূল্যস্ফীতি হয়েছে। একই সময়ে ডলারের দামও অনেক বেড়েছে। আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে আমাদের মতো অনেক ব্যাংক নতুন শাখা, উপশাখা, এজেন্ট ব্যাংকিং কেন্দ্র ও এটিএম স্থাপনে বড় বিনিয়োগ করেছে। ২০২০ সালে আমাদের সেবার পরিধি যত ছিল, এখন তার চেয়ে অনেক বেশি।

তিনি আরও বলেন, তখনকার পরিচালন ব্যয় আর বর্তমান ব্যয়ের তুলনা করলে বোঝা যাবে, সেবামূল্যের তালিকা সংশোধনের প্রয়োজন কেন হয়েছে। এতে গ্রাহকদের আরও ভালো সেবা দেওয়া সম্ভব হবে।

তবে এ প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেছেন গ্রাহক ও ব্যবসায়ী নেতারা।

এনসিসি ব্যাংকের গ্রাহক সোহেল মাহমুদ বলেন, চাকরিজীবীরা ব্যাংকে টাকা রাখলেও খরচ, তুললেও খরচ—দুই দিক থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

এবিবির প্রস্তাব অনুযায়ী, সঞ্চয়ী হিসাবে ত্রৈমাসিক গড় স্থিতি (কোয়ার্টারলি অ্যাভারেজ ব্যালেন্স) ২৫ হাজার টাকার বেশি হলে ৩০০ টাকা ফি দিতে হবে।

তিনি বলেন, এর অর্থ হলো ব্যাংকগুলোর নিজেদের দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও খেলাপি ঋণের বোঝা এখন সাধারণ গ্রাহকের ওপর চাপানো হচ্ছে। সুপ্ত হিসাব চালু করতে ৫০০ টাকা, ব্যালেন্স সনদের জন্য ৩০০ টাকা এবং চেক ফেরত ও সলভেন্সি সনদের ফি বাড়ানো কোনোভাবেই ন্যায্য নয়। এভাবে চলতে থাকলে ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর মানুষের যে সামান্য আস্থা আছে, সেটিও নষ্ট হয়ে যাবে।

বেসরকারি চাকরিজীবী এবং আইএফআইসি ব্যাংক ও স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের গ্রাহক এম এ জামান বলেন, এটা হাস্যকর। নিজের টাকা তুলতে কেন আমাকে অতিরিক্ত ফি দিতে হবে? চাকরিজীবী হিসেবে প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন সময়ে টাকা তুলতে হয়। এমন চার্জ আরোপ করা অন্যায্য।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি ও ইফাদ গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান  তাসকিন আহমেদ বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে এ প্রস্তাব অযৌক্তিক, তড়িঘড়ি করা এবং গ্রহণযোগ্য নয়।

তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতি ও উচ্চ সুদহারের কারণে ব্যবসায়ীরা এমনিতেই চাপে আছেন। এর সঙ্গে নতুন চার্জ যোগ হলে ব্যবসার খরচ আরও বাড়বে।

তাসকিন আহমেদের মতে, ব্যাংক খাতের কাঠামোগত দুর্বলতা, খেলাপি ঋণ ও পরিচালন ব্যয়ের বোঝা ব্যবসায়ী ও গ্রাহকদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়।

তিনি বলেন, ব্যাংকগুলোর উচিত প্রশাসনিক ব্যয় কমানো, অলাভজনক শাখা বন্ধ করা, সুশাসন নিশ্চিত করা এবং খেলাপি ঋণ আদায়ে জোর দেওয়া।

অন্যথায় দেশের বাণিজ্য ও শিল্পখাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে তিনি সতর্ক করেন।

চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিও (সিসিসিআই) নতুন ব্যাংকিং চার্জ অনুমোদন না দিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।

সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানকে পাঠানো এক চিঠিতে সিসিসিআই সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের অনুরোধ জানান।

চেম্বারের ভাষ্য, ব্যাংকিং সেবার খরচ বাড়লে বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব পণ্যের দাম বাড়ার মাধ্যমে সাধারণ ভোক্তাদের ওপরই পড়বে।