পরিবেশ

অবাধে চলছে বাকখালী দখল, আইনি জটিলতার কথা বলছে প্রশাসন

দীর্ঘদিন ধরেই প্রশাসনের নাকের ডগায় অবাধে চলছে কক্সবাজার জেলা শহরের প্রাণ বাঁকখালী নদীতীর দখল। তীরের প্রায় ৬০০ একর ঘন প্যারাবন ধ্বংস করে চলছে একের পর এক স্থাপনা নির্মাণের কাজ।
তীরের প্রায় ৬০০ একর ঘন প্যারাবন ধ্বংস করে একের পর এক স্থাপনা নির্মাণের কাজ চলছে। ছবি: সংগৃহীত

দীর্ঘদিন ধরেই প্রশাসনের নাকের ডগায় অবাধে চলছে কক্সবাজার জেলা শহরের প্রাণ বাঁকখালী নদীতীর দখল। তীরের প্রায় ৬০০ একর ঘন প্যারাবন ধ্বংস করে চলছে একের পর এক স্থাপনা নির্মাণের কাজ।

শুধু গত ২ মাসেই নদীর তীরের ১০০ একরের বেশি জমি দখলের পর নির্বিঘ্নে স্থাপনা নির্মাণ চলছে।

আজ মঙ্গলবার দুপুর সাড়ে ১২টায় বাঁকখালী নদী সরেজমিনে পরিদর্শন করেন বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।

বাঁকখালী নদী দখলের দৃশ্য থেকে বিস্ময় প্রকাশ করেন তিনি। নদীটিকে রক্ষায় নতুন করে আদালতে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন এই আইনজীবী।

এর কিছুক্ষণ পরেই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন কক্সবাজার সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি)।

কক্সবাজার সদর মডেল থানা থেকে প্রায় ৫০০ মিটার উত্তরে বাঁকখালী নদীর কস্তুরাঘাট এলাকা। নদীর অপর পাশে খুরুশকুল। খুরুশকুলের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের জন্য কস্তুরাঘাট পয়েন্টে বাঁকখালী নদীর ওপর নির্মাণ করা হচ্ছে একটি বড় সেতু। এই সেতুটি নির্মিত হলে খুরুশকুল ও বৃহত্তর ঈদগাঁও অঞ্চলের সঙ্গে শহরের বিকল্প সড়ক যোগাযোগ তৈরি হবে।

তবে পরিবেশ আন্দোলন কর্মীদের মতে, এই সেতুই এখন বাঁকখালী নদীর জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেতুর পাশাপাশি সংযোগ সড়ক তৈরি হওয়ায় সড়কের ২ পাশে প্যারাবন ধ্বংস করে নদী দখলের মহোৎসবে মেতে ওঠেছে প্রভাবশালী চক্র। প্রায় প্রতিদিন জেলা প্রশাসনের নাকের ডগায় অবাধে নদীতীর দখল চলছে। প্রশাসনের রহস্যজনক নীরবতার সুযোগে গত ২ মাসে নদীর ১০০ একরের বেশি জমি দখল করে তৈরি হয়েছে অসংখ্য স্থাপনা। প্রশাসনকে বারবার বলা হলেও কার্যত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। গত নভেম্বর মাসে পরিবেশ অধিদপ্তর দখলদারদের বিরুদ্ধে ২টি মামলা করলেও থেমে নেই দখল তৎপরতা। আর এসব মামলায় এখনো কাউকে গ্রেপ্তারও করা হয়নি।

আজ মঙ্গলবার সরেজমিনে বাঁকখালী নদী পরিদর্শন শেষে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান সাংবাদিকদের বলেন, 'পরিদর্শনে এসে দখলের এই দৃশ্য আমার কাছে অত্যন্ত বিস্ময়কর মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে এদেশে নদী রক্ষার যে আইনগুলো আছে, প্রতিষ্ঠানগুলো আছে, উচ্চ আদালতের যে রায়গুলো আছে সেগুলো একেবারে অর্থহীন করে ফেলা হয়েছে। আদালতের রায়ে বলা হয়েছে নদী হলো জীবন্ত সত্তা। মানুষকে হত্যা করলে যেমন শাস্তি হয়, সেরকম নদীকে হত্যা করলেও শাস্তি হবে।'

'ব্রিজ থাকে নদীর ওপরে, এখানে ব্রিজ হয়েছে বাড়ি ঘরের ওপরে। নদী রক্ষায় তৈরি করা বিশাল প্যারাবন ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে। এখানে যে ঘরবাড়ি তৈরি হচ্ছে সেখানে জোয়ারের পানি দেখা যাচ্ছে, নিধন করা প্যারাবনের গাছও দেখা যাচ্ছে। প্রকাশ্যে এ নদী হত্যায় আদালতের যে রায় আছে, তার কী বিচার হচ্ছে এটা দেখতে হবে। সরকার কেন মনে করছে এ রায় মানতে হবে না?,' বলেন তিনি।

বিষয়টি আবারও আদালতে উপস্থাপন করা হবে বলে জানান তিনি।

বেলার প্রধান নির্বাহীর বাকঁখালী নদী পরিদর্শনের পর বিকেল ৪টায় বাঁকখালী নদী তীরের দখল স্থান পরিদর্শন করেন কক্সবাজার সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাকারিয়া ও সদর উপজেলা সহকারি কমিশনার (ভূমি) মো. জিল্লুর রহমান, পরিবেশ অধিদপ্তর, বনবিভাগ ও আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। এসময় একটি নতুন স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়।

এ সময় কক্সবাজার সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাকারিয়া সাংবাদিকদের বলেন, 'যে স্থাপনাটি উচ্ছেদ করা হয়েছে ওটাতে বনায়ন করতে বন বিভাগকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নদীর তীর অবৈধ দখল করে যে সকল স্থাপনা করা হয়েছে তার সব উচ্ছেদ করা হবে। তবে দখল উচ্ছেদ নিয়ে কিছু আইনী জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। কিছু জমি ব্যক্তির নামে খতিয়ানভুক্ত হওয়ায় এই জটিলতা তৈরি হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে জেলা প্রশাসক, নদী রক্ষা কমিশনসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা  হচ্ছে।'

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. আমিন আল পারভেজ বলেন, 'জেলা নদী রক্ষা কমিটির একাধিক সভায় বাঁকখালী নদী থেকে অবৈধ সকল স্থাপনা উচ্ছেদের সিদ্দান্ত নেওয়া হয়েছে। কমিটির সদস্যরা বাকখাঁলী নদী সরেজমিন পরিদর্শন ও করেছেন। বিআইডব্লিউটিএ'কে নদীর সীমানা নির্ধারণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তাদের সীমানা নির্ধারণের কাজ শেষ হলে উচ্ছেদ অভিযান শুরু করবে প্রশাসন।'

বাকখালী দখলে যাদের নাম

পরিবেশ অধিদপ্তর, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন ও বিআইডব্লিউটিএ এর পৃথক প্রতিবেদনে বাঁকখালী নদী দখলে জড়িত ১৩১ জনকে চিহ্নিত করা হয়েছে। যার মধ্যে নতুন নির্মিত সেতুকে ঘিরে দখলে জড়িত রয়েছেন আরও ৫০ জনের মতো, যাদের মধ্যে ২৩ জনের বিরুদ্ধে পরিবেশ অধিদপ্তর মামলাও করেছে।

এই প্রতিবেদনে যাদের নাম উঠে এসেছে তারা হলেন- শহরের বদরমোকাম এলাকার জসিম উদ্দিন, হোটেল তাজসেবার খাইরুল ইসলাম জিসান, নতুন বাহারছড়ার গিয়াস উদ্দিন, মাসেদুল হক রাশেদ, ঝাউতলার মোহাম্মদ আলী মুন্না, নতুন বাহারছড়ার জনি, মুজিবুর রহমান, বদর মোকাম এলাকার কফিল উদ্দিন এ্যানি, রুমালিয়ারছড়ার মো. ইসমাইল, ঝাউতলা এলাকার আনিস মোহাম্মদ টিপু, শাহীনুল হক, নেত্রকোনা থেকে আসা ওমর ফারুক, রামুর হেলালুর রশিদ, টেকনাফের মোহাম্মদ ইউনুচ বাঙ্গালী, শফিক মিয়া, ঝিলংজার নুরুল আলম, বাহারছড়ার শহীদুল হক, কাইয়ার, মেহেদী, নুরপাড়ার তায়েফ আহমদ, তাইছাদ সাব্বির, সিটি কলেজ এলাকার আবদুল মালেক ইমন, পাহাড়তলীর আরিফুল ইসলাম, খুরুশকুলের নুরুল আমিন, মহেশখালীর কুতুবজোমের মেহেরিয়াপাড়ার রোকন উদ্দিন, মহেশখালী পৌরসভার চরপাড়ার মো. ইউসুফ, সাতকানিয়া কাঞ্চনার শরিফুল আলম চৌধুরী, মহেশখালী পুটিবিলা এলাকার জাহেদুল ইসলাম শিবলু, বদরমোকাম এলাকার মো. কামাল ওরেফে কামাল মাঝি, সাতকানিয়া পশ্চিম ডলুর জসিম উদ্দিন, বাঁশখালী চনুয়ার জিয়া মো. কলিম উল্লাহ, লোহাগাড়া চৌধুরীপাড়াস্থ উত্তর হরিয়া এলাকার খোরশেদ আলম চৌধুরী, মনোহরগনজয়ের দক্ষিন সরসপুর বাতাবাড়িয়া এলাকার ফিরোজ আহমদ, বদর মোকাম এলাকার মিজানুর রহমান, চট্টগ্রামের চাদগাঁও এলাকার মাহমুদুল করিম, কক্সবাজারের লালদিঘীপাড় এলাকার আশিক, কক্সবাজার সদর উপজেলার হাজীপাড়ার আমীর আলী, রামু চাকমারকুলের মোস্তফা কামাল, বৈল্যাপাড়ার আমিন, রুমালিয়ারছড়াস্থ এবিসি ঘোনা এলাকার মো. ইসলাম ওরফে খোল বাহাদুর, বদরমোকাম এলাকার মো. ইব্রাহীম, পানবাজার সড়কের মারুফ আদনান, কস্তুরাঘাটের ইশতিয়াক আহমেদ, ইকরা রিয়েল এস্টেট হাউজিং এর মালিক আমিনুল ইসলাম আমান, খুরুশকুল মনুপাড়ার মোহাম্মদ সেলিম প্রকাশ বার্মাইয়া সেলিম, কক্সবাজার শহরের হোটেল তাজসেবার মাহবুবুর রহমান, মধ্যম বাহারছড়ার মো. রানা, লালদীঘির পাড় এলাকার ঝুমা ও মহেশখালীর শাপলাপুরের দীনেশপুর এলাকার ইকবাল হাসান।

Comments