ঢাকা নিয়ে দিল্লি-পিন্ডির টানাটানি

বাংলাদেশ পাকিস্তান সম্পর্ক
ঢাকায় হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরে পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারকে স্বাগত জানান বাংলাদেশের পররাষ্ট্রসচিব। ছবি: বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সৌজন্যে

ঢাকা নিয়ে টানাটানি দীর্ঘদিনের। এই টানাটানি মূলত দিল্লি ও ইসলামাবাদের মধ্যে। যদিও, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূলমন্ত্র—'সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়'। তবু বাস্তবতা হলো—বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যখন যে দল থাকে সেই দল নিজেদের সুবিধা মতো 'বন্ধু' খোঁজে দিল্লি অথবা ইসলামাবাদে। আশ্চর্যজনকভাবে, দিল্লি বা ইসলাবাদের সঙ্গে ঘনিষ্টতাই বলে দেয় ঢাকার সঙ্গে প্রতিবেশী কোন দেশের সম্পর্ক কেমন।

এমন ঘটনা আবারও ঘটতে দেখা গেল দক্ষিণ এশিয়ার বিদ্যমান রাজনৈতিক দৃশ্যপটে। গত ২৩ আগস্ট পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার দুই দিনের সফরে ঢাকা এসে যেন জনমনে আবার জাগিয়ে দিলেন সেই প্রশ্ন—ঢাকা তুমি কার?

বলা বাহুল্য, ইসহাক দারের সফর নিয়ে পাকিস্তান ও ভারতের দুই প্রভাবশালী দৈনিকের সম্পাদকীয় থেকেই এমন প্রশ্ন জেগেছে। গত ২৬ আগস্ট পাকিস্তানের ডন পত্রিকার সম্পাদকীয়-র শিরোনাম করা হয়, 'টাইস দ্যাট বাইন্ড'। মাইক্রোসফট ট্রান্সলেটরে এর অর্থ দাঁড়ায়, 'যে বন্ধন বাঁধে'।

সম্পাদকীয় শুরু করা হয় পাকিস্তান ও বাংলাদেশের সম্পর্ক নিয়ে। বলা হয়—শেখ হাসিনা ওয়াজেদের শাসনামলে তা তলানিতে এসে ঠেকেছে। ঢাকায় অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সেই সম্পর্ক ঝালাইয়ের চেষ্টা চলছে।

প্রায় ১৩ বছর পর কোনো পাকিস্তানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ঢাকা সফর করলেন—সে কথা জানিয়ে ডন সম্পাদকীয়তে বলা হয়, ইসহাক দারের জন্য ছিল উষ্ণ অভ্যর্থনা। প্রধান উপদেষ্টা ও পররাষ্ট্র উপদেষ্টা সম্পর্ক গভীর করা ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। তারা সার্ককে চাঙা করার কথাও বলেছেন।

একইসঙ্গে একাত্তরের বিয়োগান্তক ঘটনাগুলো নিয়ে দুই দেশের মতপার্থক্যকে উল্লেখ করতে ভোলেনি পাকিস্তানের এই প্রাচীন গণমাধ্যমটি।

শুধু তাই নয়, যে সশস্ত্র সংগ্রামের ভেতর দিয়ে পাকিস্তান ভেঙে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম, সেই হত্যাযজ্ঞের জন্য ঢাকা যে ইসলামাবাদের কাছ থেকে ক্ষমা প্রার্থনা আশা করে সে কথা বলতেও ভোলেনি ডন। আটকে পড়া জনগোষ্ঠীকে ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি যে সুরাহা হয়নি তা স্মরণ করিয়ে দিয়ে সংবাদমাধ্যমটি জানায়, যদিও ইসলামাবাদ মনে করে 'এসব প্রশ্নের জবাব ইতোমধ্যে দেওয়া হয়েছে'।

এতে আরও বলা হয়—বিগত শেখ হাসিনার সরকার ১৯৭১ সালের যুদ্ধকে পাকিস্তানের সঙ্গে শত্রুতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে ব্যবহার করেছে। বিপরীতে ভারতের সঙ্গে উষ্ণ করেছে বাংলাদেশের সম্পর্ক। কিন্তু, বাংলাদেশে বইছে পরিবর্তনের হাওয়া।

সেই হাওয়ায় হাসিনা সরকারের 'উড়ে যাওয়া', বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য ও তার নামাঙ্কিত প্রতিষ্ঠানে হামলা ও টাকা থেকে বঙ্গবন্ধুর ছবি সরিয়ে নেওয়ার প্রসঙ্গও এসেছে ডনের সম্পাদকীয়তে।

একাত্তরকে কেন্দ্র করে দুই দেশের বিভেদ নিয়েও কথা বলেছে ডন। ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশকে পাকিস্তানের স্বীকৃতি ও ২০০২ সালে বাংলাদেশ সফরে এসে হত্যাযজ্ঞের জন্য জেনারেল পারভেজ মোশাররফের 'দুঃখ' প্রকাশের প্রসঙ্গটিও এসেছে। ডন মনে করে, ১৯৭১ সালের বিয়োগান্তক ঘটনাটি সব পক্ষের মেনে নেওয়া উচিত। এ কারণে ইসলামাবাদ ও ঢাকার শত্রুতা চিরস্থায়ী হবে তা কাম্য নয়। তবে বিষয়টি নিয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট দিক নিদের্শনা আসেনি ডনের সম্পাদকীয়তে।

এ ছাড়াও, আঞ্চলিক সংস্থা সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করার বিষয়ে ঢাকার প্রস্তাবে ডন সদিচ্ছা দেখছে। তবে ভারতের একগুঁয়েমির কারণে এই মুহূর্তে তা অবাস্তব বলে মনে করছে গণমাধ্যমটি। বরং জোর দিয়েছে চীন, পাকিস্তান ও বাংলাদেশকে নিয়ে ত্রিদেশীয় সহযোগিতার ধারণাকে।

এতো গেল এক দিকের কথা। অন্যদিকে ভারতের প্রভাবশালী গণমাধ্যম দ্য হিন্দু একই দিনে সম্পাদকীয় লিখে—'ফ্রেন্ডস অ্যান্ড ফোস: অন বাংলাদেশ-পাকিস্তান টাইস' শিরোনামে। বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যকার বন্ধুত্ব ও শত্রুতা নিয়ে প্রকাশিত এ সম্পাদকীয়তেও ১৩ বছর পর প্রথম পাকিস্তানি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ঢাকা সফরের কথা উল্লেখ করা হয়।

এতে আরও বলা হয়, ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে শেখ হাসিনা ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকিস্তানিদের পক্ষ নেওয়া ব্যক্তিদের শাস্তি দেয়। এটি ঘিরে ইসলামাবাদের সঙ্গে ঢাকার সম্পর্ক তিক্ত হয়। আসে ১৯৭৫ সালে হাসিনার পিতা ও পরিবারের অধিকাংশ সদস্যের হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গও।

জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার প্রেক্ষাপটে ২০১৫ সালে বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানি কূটনীতিককে বহিষ্কার করা ও পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশি হাই কমিশনারকে ফেরত আনার প্রসঙ্গও আসে সম্পাদকীয়র শুরুতে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট হাসিনা সরকারের পতনের পর ঢাকা ও ইসলামাবাদ ভাঙা সম্পর্ক জোড়া লাগানোর চেষ্টা করছে। এই প্রক্রিয়ায় চীনের অবদানের কথাও 'হিন্দু'র সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে। তবে, ১৯৭১ সালের গণহত্যা নিয়ে পাকিস্তানের ক্ষমা চাওয়া, আর্থিক ক্ষতিপূরণ ও আটকে পড়া উর্দুভাষী পাকিস্তানিদের ফেরত পাঠানোর বিষয়ে ইউনূস সরকার উদ্যোগ নিতে অস্বীকার করেছে; যে দাবিগুলো কয়েক দশকের পুরোনো।

সম্পাদকীয়তে আরও বলা হয়, পাকিস্তানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারের সঙ্গে বৈঠকে ড. মুহাম্মদ ইউনূস আঞ্চলিক সহায়তা সংস্থা সার্ককে গতিশীল করার বিষয়ে গুরুত্ব দেন। তবে ভারত ইসলামাবাদ ও ঢাকার মধ্যে সম্পর্ককে সন্দেহের চোখে দেখছে। গত বছর হাসিনাবিরোধী আন্দোলনে জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠনকে পাকিস্তানি কূটনীতিকরা সমর্থন দিয়েছিলেন বলে এতে উল্লেখ করা হয়।

বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তানের সামরিক ও গোয়েন্দা যোগাযোগ নিয়ে উদ্বেগ আছে বলেও সম্পাদকীয়তে জানানো হয়।

নয়াদিল্লিকে ঢাকায় দীর্ঘদিনের বন্ধুর পতন ও দীর্ঘদিনের শত্রুর উত্থান পরিস্থিতিকে বাস্তবতার নিরিখে দেখার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে। এ প্রসঙ্গে গত এপ্রিলে নরেন্দ্র মোদি ও মুহাম্মদ ইউনূসের মোলাকাত এবং ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টার বৈঠকের কথা তুলে ধরা হয়েছে।

যেহেতু আগামী ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচনের ঘোষণা এসেছে সেহেতু বৃহৎ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে নয়াদিল্লির যোগাযোগ রাখা উচিত বলেও মনে করে দ্য হিন্দু।

দৈনিকটির ভাষ্য, বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ায় কার্যত কোনো জোট নেই বলে ঢাকা ও ইসলামাবাদের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে নয়াদিল্লির প্রভাব ফেলা কষ্টকর।

Comments

The Daily Star  | English

Judicial inquiry ordered into attack on Nur

No force can prevent the national election, scheduled for early February, says CA's press secretary

2h ago