মার্কেসের অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপি টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ে

২০১৪ সালে নোবেলবিজয়ী ঔপন্যাসিক গার্সিয়া মার্কেসের মৃত্যুর পর তাহার সমুদয় পাণ্ডুলিপি ও কিছু ব্যবহার্য জিনিসপত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়  ক্রয় করিয়া লইয়াছে। ইহার মূল্য পড়িয়াছে ২.২ মিলিয়ন ডলার। ৪০টি কার্টনে ভরিয়া তাহার নানা পাণ্ডুলিপি, কাগজ, চিঠিপত্র, স্মারক দ্রব্য ইত্যাদি সংগ্রহ করা হইয়াছে। ইহার মধ্যে দশটি প্রকাশিত উপন্যাসের খসড়া পাণ্ডুলিপি রহিয়াছে। রহিয়াছে চল্লিশখানি ফটোর অ্যালবাম, কুড়িখানি স্ক্র্যাপ বুক, দুইটি কম্পিউটার এবং টাইপরাইটার। মার্কেস হাতে লিখিতেন না। টাইপ করিয়া লিখিতেন। ব্যক্তিগত স্মারকদ্রব্যের মধ্যে তাহার পাসপোর্টসমূহ অন্যতম। 

২০১৪ সালে নোবেলবিজয়ী ঔপন্যাসিক গার্সিয়া মার্কেসের মৃত্যুর পর তাহার সমুদয় পাণ্ডুলিপি ও কিছু ব্যবহার্য জিনিসপত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়  ক্রয় করিয়া লইয়াছে। ইহার মূল্য পড়িয়াছে ২.২ মিলিয়ন ডলার। ৪০টি কার্টনে ভরিয়া তাহার নানা পাণ্ডুলিপি, কাগজ, চিঠিপত্র, স্মারক দ্রব্য ইত্যাদি সংগ্রহ করা হইয়াছে। ইহার মধ্যে দশটি প্রকাশিত উপন্যাসের খসড়া পাণ্ডুলিপি রহিয়াছে। রহিয়াছে চল্লিশখানি ফটোর অ্যালবাম, কুড়িখানি স্ক্র্যাপ বুক, দুইটি কম্পিউটার এবং টাইপরাইটার। মার্কেস হাতে লিখিতেন না। টাইপ করিয়া লিখিতেন। ব্যক্তিগত স্মারকদ্রব্যের মধ্যে তাহার পাসপোর্টসমূহ অন্যতম। 

সাংবাদিক প্যাট্রিসিয়া লারা সালিভি টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের  হ্যারি র‌্যান্সম সেন্টারের অভিলেখাগারে রক্ষিত মার্কেসের সকল কিছু ঘাঁটিয়া তাহার অপ্রকাশিত ক্ষুদ্রাবয়ব উপন্যাসের পাণ্ডুলিপির কীয়দংশ আবিষ্কার করিতে সক্ষম হন। হিস্পানী ভাষায় ইহার শিরোনাম ''এন আগোস্তো নোস ভেমোস'' অনুবাদ করিলে দাঁড়ায় 'আগস্টে আবার দেখা হবে'।

২.
২০১৪ সালের ১৭ এপ্রিল গার্সিয়া মার্কেস লোকান্তরিত হইবার পর অচিরেই জানা গেল যদিও কালান্তক ব্যাধির কারণে আত্মজীবনীর দ্বিতীয়-তৃতীয় খণ্ড রচনার অবকাশ জুটিল না, কিন্তু আস্ত একখানা উপন্যাসের পাণ্ডুলিপি প্রকাশের অপেক্ষায় রহিয়া গিয়াছে। ইহার কথা একেবারেই অজানা ছিল তাহা নহে। কেহ কেহ জানিতেন।  কবে এই গ্রন্থখানি প্রকাশিত হইবে? খুব ঘনিষ্ঠ কেহ প্রশ্ন করিলে তিনি উত্তর করিতেন, ''এই তো এই আগস্টে''। 

টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিলেখাগারে রক্ষিত অপ্রকাশিত উপন্যাসের পাণ্ডুলিপির প্রথম পাতা। ছবি : লেখক

স্বাভাবিকভাবেই সকলের কৌতূহল ছিল অপ্রকাশিত উপন্যাসটি কবে নাগাদ লিখিত হইয়াছে। প্রকাশনা সংস্থা র‌্যা-ম হাউজের ক্রিস্ট্রোবাল পেরা যিনি দীর্ঘকাল মার্কেসের নানা গ্রন্থ সম্পাদনা করিয়াছেন অবহিত করিলেন এই গ্রন্থটি মার্কেস দীর্ঘকাল ধরিয়া লিখিয়াছেন। তাহার সর্বশেষ উপন্যাস ক্ষীণতনু "আমার বিষণ্ণ বেশ্যাদের স্মৃতিকথা" প্রকাশিত হইয়াছিল ২০০৪ সালে। পরের বৎসরই মার্কেস তাহার মোহিকান লেখক-বন্ধু হোমেরো আরিদিয়াসকে জানাইয়াছেন, খেল্ খতম, লেখার পাট চুকিয়াছে, তিনি আর লিখিবেন না। "আমার বিষণ্ণ বেশ্যাদের স্মৃতিকথা" লিখিত হইয়াছিল ১৯৯৯-এর মধ্যেই।

ঘনিষ্ঠজনেরা অনুমান করিতেছেন সমসাময়িক কালেই অপ্রকাশিত উপন্যাসটি লিখিত হইয়াছে কেননা মার্কেস ১৯৯৯ সালেই মাদ্রিদে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ইহার প্রথম অধ্যায়টি স্বকণ্ঠে পাঠ করিয়া শুনাইয়াছেন। তাহার জীবনীকার মার্টিন জিরাল্ড জানাইতেছেন বস্তুত: পাঁচটি পৃথক গল্প হিসাবে এই রচনাগুলি একটি গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হইবার কথা ছিল। সম্ভবত: মার্কেস পরবর্তীকালে এইগুলি একসূত্রে গাঁথিয়া একটি উপন্যাসের রূপ দিতে মনস্থ করেন।
পাঁচটি অধ্যায়ে বিভক্ত উপন্যাসটি এক প্রৌঢ়া রমণীর কাহিনী যিনি প্রতি বৎসর নিয়ম করিয়া কলম্বিয়ার একটি দ্বীপে সমাহিত মায়ের কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণ করিয়া থাকেন। পাঁচটি অধ্যায়ের প্রতিটিই ছোটগল্পের ন্যায় স্বয়ংসম্পূর্ণ; প্রতিটিই পৃথক পৃথকভাবে পাঠ করিলে রসাস্বাদনে পাঠকের সমস্যা হইবে না। 

সে যাহাই হউক, প্রশ্ন হইল সেই ১৯৯৯ সালে রচিত গোটা উপন্যাসটি মৃত্যু অবধি অপ্রকাশিত রহিল কেন। মার্কেসের সাংবাদিক বন্ধু হোসে সালগার জানাইয়াছিলেন, ২০০৮সালেই মার্কেস মুদ্রণের জন্য পাণ্ডুলিপি চূড়ান্ত করিয়াছিলেন। কিন্তু শেষাবধি ইহা অপ্রকাশিত রহিয়া গিয়াছে। ঘনিষ্ঠজনদের কাহারও কাহারও কাছে মার্কেস শেষ অধ্যায়টির কাহিনী লইয়া স্বীয় অসন্তোষের কথা উত্থাপন করিয়াছেন। তিনি শেষ অধ্যায় তথা কাহিনীর পঞ্চম পর্বটি পুনর্লিখনের জন্য সংকল্প করিয়াছিলেন। শারীরিক অসুস্থতার বাধা ঠেলিয়া তিনি ছয়-ছয় বার পঞ্চম পর্বটি পুনর্লিখন করিয়াছেন; ইতোমধ্যে বৎসরের পর বৎসর কাটিয়া গিয়াছে, তথাপি গ্রন্থের শেষ গল্পটি  তৃপ্তিকরভাবে লিখিয়া উঠিতে পারেন নাই।

মার্কেস অতিশয় খুঁতখুঁতে প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। পাঠক জানেন এমনও নজীর রহিয়াছে যে একটি উপন্যাস তিনি ১২ দফা পুনর্লিখন করিয়া তবে ক্ষান্ত হইয়াছেন। সর্বমোট তের দফা লিখিতে তিনি না আলস্য না ক্লান্তি বোধ করিয়াছেন। যতক্ষণ না কোনও রচনা প্রকাশযোগ্য মনে করিয়াছেন ততক্ষণ তাহা প্রকাশ হইতে পারে নাই; পুনর্লিখনের স্বার্থে ছাপাখানা হইতে পাণ্ডু-লিপি অক্লেশে পুনরায় লেখার টেবিলে আসিয়া পৌঁছিয়াছে। সারা দিনে একটি মাত্র অনুচ্ছেদ লিখিয়া তৃপ্ত থাকিয়াছেন তবু ঈপ্সিত মানের ব্যাপারে রেয়াত করিতে প্রস্তুত ছিলেন না।  

৩. আখ্যানভাগ
''এন আগোস্তো নোস ভেমোস''এর কাহিনী কি? আমরা কেবল প্রথম অধ্যায়টি পাঠের সুযোগ লাভ করিয়াছি। তাহা সংক্ষেপে বলা যাইতে পারে।  
প্রথম অধ্যায়ে কাহিনী শুরু হইয়াছে ১৬ই আগস্ট, দুপুর ২টায়।

কলম্বিয়ার একটি দ্বীপের ফেরীঘাটে স্টিমার আসিয়া ভিড়িয়াছে। কাহিনীর মূল চরিত্র অ্যানা মাগদালেনা এই স্টিমারের যাত্রী। তাহার বয়স বায়ান্ন হইয়াছে। কুড়ি বৎসর পূর্বে লেখাপড়ার পাট চুকাইয়া ফেলিবার আগেই যখন তাহার বিবাহ হইয়াছিল তখনও সে কাহারও প্রেমে পড়ে নাই; তদাবধি সে অক্ষতযোনি ─ পাকেচক্রে কাহারও অঙ্কশায়িনী হইয়া সতীত্ব বিসর্জ্জনের অঘটন ঘটে নাই। তাহার কুড়ি বৎসরের বৈবাহিক জীবন তৃপ্তিতে ভরপুর। তাহার পিতা সঙ্গীতের শিক্ষক, মাতা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। মৃত্যুর দিন তিনেক পূর্বে মা বলিয়াছিলেন তাহাকে যেন কলম্বিয়া সাগরের নির্দিষ্ট একটি দ্বীপে সমাধিস্থ করা হয়। অ্যানার পিতা স্ত্রীর এই শেষ ইচ্ছা অপূর্ণ রাখেন নাই। 

তবে যেই দিন মরদেহ সমাহিত করিবার উদ্দেশ্যে ঐ দ্বীপে লইয়া যাওয়া হয় সেই দিন অ্যানাকে সঙ্গে লওয়া হয় নাই পাছে সে তীব্র শোকে ভাঙ্গিয়া পড়ে। তবে মৃত্যুর প্রথম বার্ষিকীতে পিতা কন্যাকে সঙ্গে লইলেন। যন্ত্রচালিত ডিঙ্গী নৌকা আথাল-পাথাল সমুদ্রে চার ঘণ্টা আছড়াইতে আছড়াইতে পিতা-কন্যাকে ঐ দ্বীপে পৌঁছাইয়া দিল, সে এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। পিতা-কন্যার যৗথ উদ্যোগে অ্যানার মায়ের সমাধিতে নামফলক গাঁথা হইল। অনন্তর প্রতি বৎসর মায়ের মৃত্যু বার্ষিকীতে এক তোড়া পুষ্পস্তবক লইয়া ভালোবাসা জানাইতে পরলোকগত মায়ের সমাধিতে আসিতে সে কদ্যপি ইতস্তত: করে নাই। আগস্ট একই সঙ্গে অত্যধিক গরম এবং ভারী বর্ষণের মাস। তথাপি সমুদ্র পাড়ি দিয়া এই দ্বীপে সে আসিতো একাই। এমনকি বিবাহের সম্বন্ধ ঠিক হইবার সময়ই সে হবু স্বামীর নিকট খোলাসা করিয়া লইয়াছিল যে প্রতি বৎসর ঐ দ্বীপে গিয়া মায়ের কবরে সে একাই পুষ্পস্তবক অর্পণ করিবে; ইহা তাহার একান্তই নিজস্ব বিষয়।

ঊনত্রিশ বৎসর আগে মাতার তিরোধান হইয়াছে, আঠাশ বৎসর যাবত সে ব্যত্যয়হীন নিষ্ঠায় এই স্বআরোপিত কর্তব্যটি করিয়া চলিয়াছে। অপরাহ্ণে ফেরী আসিয়া তাহাকে দ্বীপে পৌঁছাইয়া দেয়, ফেরিঘাটে এক গাল হাসি দিয়া অভ্যর্থনা করে দীর্ঘ দিনের পরিচিত ট্যাক্সিচালক, সে উঠে এলাকার সবচেয়ে প্রাচীন, জীর্ণ হোটেলটিতে যাহা তাহাকে ঠিক মানায় না। 

আটাইশ বৎসর যাবত সে একই হোটেলে উঠিয়াছে, রাত্রিবাসের জন্য একই কক্ষ বাছিয়া লইয়াছে: হোটেল হইতে পুনরায় ট্যাক্সিতে সমাধিস্থলের দিকে একই পথে গমন করিয়াছে, একই কৃষ্ণাঙ্গ মহিলার নিকট হইতে পুষ্পস্তবক ক্রয় করিয়াছে।

বিকাল পাঁচটার আগেই দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীর্ণ-করুণ সমাধিস্থলে পৌঁছিয়া ঘাস-জঙ্গল সরাইয়া মায়ের কবরটি খুঁজিয়া বাহির করিতে হয়। গ্ল্যাডিওলাসের স্তবকটি  মাতার পাদদেশে অর্পণ করিয়া সে নি:শব্দে কথোপকথন শুরু করে: মাকে সংসারের খবরাদি দেয়, গোপন বিষয়াদিও অকপটে চাউর করে এবং কোন পরামর্শ থাকিলে স্বপ্নে আসিয়া জানান দিবার অনুরোধ জ্ঞাপন করে। অতঃপর হোটেল প্রত্যাবর্তন এবং পরবর্তী দিন সকাল নয়টা অবধি ফিরতি ফেরীর জন্য অপেক্ষা। এই একইভাবে সাতাশটি বৎসর গিয়াছে; এই বার আঠাশ দফায় ১৬ আগস্ট শুক্রবার সন্ধ্যায় ব্যতিক্রম ঘটিতে শুরু করিল। 

হোটেলের নিজস্ব পানশালায় একাকী রাতের আহারাদি সারিতে সরিতে সে লক্ষ্য করিল অন্য একটি টেবিলে বসা একজন মধ্যবয়সী পুরুষ তাহার দিকে এক পলকে তাকাইয়া রহিয়াছে। অতঃপর যাহা হইবার তাহাই হইল। ঐ ভদ্রলোকের সহিত দ্রুত পরিচয় হইল এবং অ্যানা মাগদালেনা অল্প সময়ে তাহার ঘনিষ্ঠ হইল। আগন্তুক পুরুষটি এই হোটেলের বাসিন্দা নহে। অতএব হোটেলের তৃতীয় তলার অ্যানা মাগদালেনার ২০৩ নম্বর কক্ষেই অন্তরঙ্গ সাক্ষাতের সিদ্ধান্ত হইল। 

প্রথমে কক্ষে প্রত্যাবর্তন করিল অ্যানা মাগদালেনা, কিছুক্ষণ পর সদ্যপরিচিত ভদ্রলোক। ইত্যবসরে অ্যানা  দ্রুত পোশাক ছাড়িয়া, স্নানাগারে গিয়া পায়ের আঙ্গুল, বগল ও যোনীদেশ ধৌত করিয়া, হালকা প্রসাধন করিয়া প্রস্তুত হইয়াছে। পোশাক ছাড়িবার শেষ পর্যায়ে ভদ্রলোক যখন আন্ডারপ্যাণ্ট খুলিতেছেন তখন অ্যানা আড়চোখে ঘরের আবছা আলোয় নির্ভুল লক্ষ্য করিল ঐ জিনিসটি তাহার স্বামীর মতো ততটা বড়সড় নহে।  

মধ্যরাতের  নি:স্তব্ধতা ভাঙ্গিয়া সারসগুলির সজোর পাখা ঝাপাটানো ভদ্রলোকের অপরিচিত, অ্যানা সমুদ্রসারসের এই জন্মগত অভ্যাসটি ব্যাখ্যা করিয়া দিল। প্রথম মিলনের পর দ্বিতীয় মিলন ছিল অনিবার্য। অ্যানা ভাবিয়া অবাক হইল কী অল্প সময়ে পুরুষমানুষটি কয়েকটি মাত্র অঙ্গুলির ক্ষিপ্র দক্ষতায় তাহার দেহে পুনর্বার উত্তেজনার বান ডাকিয়া আনিয়াছে। বাহিরেও তখন ঝড়, আকাশ ঘিরিয়া বিদ্যুতের চমকানি। চরমানন্দ, কিছু কথাবার্তা, এক সময় শ্রান্ত ভদ্রলোক নিদ্রায় ঢলিয়া পড়িলেন, তাহার নাক ডাকিবার শব্দ যুগপৎ পরিশ্রম ও পরিতৃপ্তির জানান দিতে থাকিল।

প্রদোষের আধো অন্ধকারে যখন অ্যানার ঘুম ভাঙ্গিল তখন ─ সে সারা জীবনের সতীত্ব বিসর্জন দিয়া পরপুরুষের অঙ্কশায়িনী হইয়াছে ─ এই চিন্তা উদয় হইয়া তাহাকে কিঞ্চিৎ কাতর করিয়া ফেলিল। কিন্তু সে কোথায়?

অ্যানা শয্যায় একা, তাহার রাতের সঙ্গী ইতোমধ্যে প্রস্থান করিয়াছে। অথচ ভদ্রলোকের নামটি পর্যন্ত জানা হয় নাই। রাত্রির স্মৃতি বলিতে ভদ্রলোকের ব্যবহৃত ল্যাভেন্ডারের মৃদু গন্ধ ঘরের বাতাসে তখনও জীয়মান। কিছুক্ষণ পর ফিরতি যাত্রার প্রস্তুতিকালে যখন সে খাটের মাথার কাছে রাখা বইটি সুটকেসে ভরিতে গেল তখন দেখিল ভদ্রলোক কুড়ি ডলারের একখানা নোট রাখিয়া গিয়াছেন। ঐ দিন ফেরিতে করিয়া যে অ্যানা মাগদালেনা প্রত্যাবর্তন করিল সে সম্পূর্ণ ভিন্ন মানুষ। 

সন্দেহ নাই প্রথম অধ্যায়ের এই কাহিনী পাঠককে তৃপ্ত করিবে। পরের চারিটি অধ্যায়ে অ্যানার অনুরূপ চারিটি অপ্রত্যাশিত অভিজ্ঞতার বয়ান রহিয়াছে। শুধু কহিনী নয়, বয়ানের চিত্রল গাঁথুনি পাঠককে আবিষ্ট করিবে।

৪. 
''এন আগোস্তো নোস ভেমোস''  সর্বসাকুল্যে ১৫০ পাতার ক্ষুদ্রাবয়ব উপন্যাস। এই উপন্যাসের ভাষা মার্কেসের পাঠকের নিকট অপরিচিত প্রতিভাত হইতে পারে। শুরুর দিকটা বাদ দিলে পরবর্তী অংশের বাক্যগঠন রীতি মার্কেসীয় জটিলতা হইতে মুক্ত বলিলে ভুল হইবে না। তবে যাহারা "আমার বিষণ্ণ বেশ্যাদের স্মৃতিকথা"  পড়িয়াছেন তাহার অনুধাবন করিবেন প্রায় একই সময়ে রচিত এই দুইটি উপন্যাসে মার্কেসের রচনাশৈলী  ও ভাষাভঙ্গী অভিন্ন; দুইটিতেই কাহিনীর ওপর গুরুত্ব বেশী। ইহা ঠিক ''এই তো এই আগস্টে'' যৌনতার গন্ধ পরিব্যাপ্ত কিন্তু ইহাও স্পষ্ট যে তাহা কেবল মানুষের ব্যক্তিত্বের লুকায়িত, অন্ধকারাচ্ছন্ন দিকটিতে আলোকসম্পাতেরই স্বার্থে। 

পাঠক সম্পূর্ণ উপন্যাসটি গ্রন্থকারে প্রকাশের অপেক্ষা করিতে পারেন এইরূপ আশার কারণ নাই। কারণ ইতোমধ্যে জানিয়াছি মার্কেসের পরিবার উপন্যাসটি প্রকাশের বিষয়ে সম্মত নহে। মার্কেসের পরিবারের সদস্য অর্থাৎ মার্কেসের স্ত্রী মার্সেইডিজ বার্চা, দুই পুত্র রডরিগো গার্সিয়া বার্চা এবং গনযালো গার্সিয়া বার্চা সকলের মিলিত সিদ্ধান্ত এই যে তাহারা উপন্যাস প্রকাশ করিবেন না।

''এন আগোস্তো নোস ভেমোস'' মার্কেসের 'অসমাপ্ত' এবং 'অগ্রস্থিত' রচনা হিসাবেই থাকিয়া যাইবে। এই পাণ্ডুলিপির স্বত্ব টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়কে দান করে নাই। সাংবাদিক প্যাট্রিসিয়া লারা সালিভির মতে পাণ্ডুলিপিতে মার্কেসের করা সম্পাদনা সামান্য। ইহাকে সম্পূর্ণ পাণ্ডুলিপি গণ্য করা যাইতে পারে।

Comments

The Daily Star  | English

Cyclone Remal: Elderly man dies en route to shelter in Satkhira

He slipped and fell on the road while going to Napitkhali shelter with his wife on a cycle around 6:30pm

1h ago