বইমেলা বিশেষ-৫

‘রাজনৈতিক বিবেচনায় সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় সরকারের কাছে অগুরুত্বপূর্ণ’

বই পড়ায় তরুণ প্রজন্মের আগ্রহ খুব কম। কিন্তু সম্প্রতি পাঠক থাকুক বা না থাকুক, আমাদের লিখে যেতে হবে, প্রকাশ করে যেতে হবে।

প্রতিদিনই নতুন নতুন বই আসছে অমর একুশে বইমেলায়। মেলার মাঝামাঝি প্রতীক প্রকাশনী থেকে প্রকাশ হয়েছে গবেষক ফয়জুল লতিফ চৌধুরীর 'জীবনানন্দ দাশের সাতাশ নম্বর কবিতার খাতা'। নতুন বই, গবেষণা ও বইমেলা নিয়ে দ্য ডেইলি স্টারকে নিজের ভাবনার কথা জানিয়েছেন ফয়জুল লতিফ চৌধুরী।

জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে গবেষণা করছেন দীর্ঘদিন। এখনো তাকে কতটা অনাবিষ্কৃত বলে মনে হয়?

ফয়জুল লতিফ চৌধুরী: আমার পক্ষে বলা মুশকিল। তবে, কবির ভাতিজা অমিতানন্দ দাশ এবং কবি ভূমেন্দ্র গুহের সঙ্গে আলোচনা করে মনে হয়েছে, আর বিশেষ কিছু আবিষ্কারের নেই।

অমিতানন্দ দাশ আকস্মিক ও অপ্রত্যাশিতভাবে ৬৩টি কবিতার একটি গ্রন্থ প্রকাশ করেন ২০১৪ সালে। কবিতাগুলো ১৯৩৮ সালের সেপ্টেম্বরে পৃথক একটি খাতায় লেখা ছিল। খাতাটি ভারতের জাতীয় গ্রন্থ কেন্দ্রে সংরক্ষিত ৪৮টি খাতার বাইরের।

যোগাযোগ করলে অমিতানন্দ দাশ বলেছিলেন যে কবিকন্যা মঞ্জুশ্রী অনেক পাণ্ডুলিপির খাতা, বিশেষ করে ডায়েরি রেখেছিলেন রত্না রায় নামে একজনের বাসায়। সম্ভবত এগুলো ১৯৯৪ সালে সংগ্রহ করা হয়। ভূমেন্দ্র গুহ ধীরে ধীরে পাঠোদ্ধার করছিলেন। অমিতানন্দ দাশ জানান যে এই খাতাটি ভূমেন্দ্র গুহের কোনো সহকারী সরিয়ে রেখেছিলেন। পরে তা উদ্ধার করে তিনি প্রকাশ করেন। এরকম আরও খাতা কেউ উদ্ধার করলে নতুন কবিতা প্রকাশ পেতে পারে।

এটি গেল একটি দিক। কলকাতার জাতীয় গ্রন্থাগারে যে খাতাগুলো আছে তার সব কবিতার পাঠোদ্ধার হয়নি এখনো। গত চার বছরে খুঁজে খুঁজে পাঁচটি কবিতা পাঠোদ্ধার করে প্রকাশ করেছি। প্রথম পাঠোদ্ধার করি যে কবিতাটি তার প্রথম পঙক্তি 'যাদের ক্ষমা অক্ষমা সাধ অন্ধকারে ফুরিয়ে গেছে আজ'। এটি ৪০ সংখ্যক কবিতার খাতায় পেয়েছিলাম। আমার ধারণা, এরকম কবিতা আরও কিছু আছে। হয়তো সংখ্যায় খুব বেশি নয়। আমি খুঁজে যাচ্ছি।

আপনার কথাসাহিত্যও প্রশংসা পেয়েছে গত বইমেলায়৷ মেলা ছাড়া বই প্রকাশ হয় না কেন?

ফয়জুল লতিফ চৌধুরী: সম্প্রতি গবেষণার কাজ কমিয়ে কথাসাহিত্যে মনোনিবেশ করেছি। গল্প সারা বছরই প্রকাশ করা যায় এবং করি। উপন্যাসের জন্য প্রথম মাধ্যম 'ঈদ সংখ্যা'। তারপর বই। 'অন্যদিন' ঈদ সংখ্যায় প্রকাশ করেছিলাম 'উনিশ শ একাত্তুর'। বইটি মেলায় আসতে পারে। সামনে দুটি উপন্যাস ও ‍দুটি গল্প লিখব। গল্প সংকলন 'আপনার বান্ধবীকে কি আজ সন্ধ্যার জন্য ধার পেতে পারি' এখনও প্রকাশিত হয়নি। প্রকাশক এই শিরোনামে বই প্রকাশে আগ্রহী না। কী আর করা! কথাসাহিত্য রচনা আনন্দময় একটি কাজ। চাপের মুখে লিখতে পারি না। নিজের মতো লিখি।

গবেষণায় আপনার গুরুত্বপূর্ণ কাজের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের মূল্যায়ন আসেনি। পুরস্কার নিয়ে কি ভাবেন, আপসোস হয়?

ফয়জুল লতিফ চৌধুরী: রাষ্ট্রের কাজ সাহিত্যের মূল্যায়ন করা না। সে ক্ষমতা রাষ্ট্রের নেই। রাষ্ট্র সে কাজ করতে গিয়ে বড় ধরনের ভুল করছে, সমালোচনা হচ্ছে।

আমি জানি আমি কী করেছি, কতটা করতে পেরেছি। কলকাতায় জীবনানন্দের প্রবন্ধ সংগ্রহ প্রকাশিত হয় ২০০৯ সালে। আমরা ঢাকা থেকে এ কাজটি করি ১৯৮৯ সালে। মান্নান সৈয়দ ভাই সহায়তা করেছিলেন।

কলকাতায় জীবনানন্দের পত্রসংগ্রহ প্রকাশিত হয় ২০১৭ সালে। আমরা ঢাকা থেকে এ কাজটি করি ২০১৫ সালে। কলকাতা থেকে ১৯৫৭ সালে প্রকাশিত 'রূপসী বাংলা' কাব্যে জীবনানন্দের লেখা কিছু শব্দ বাদ দেওয়া হয়েছিল। কিছু নতুন শব্দ ঢোকানো হয়েছিল। কলকাতা থেকে নয়, ঢাকা থেকে ২০১৯ সালে 'রূপসী বাংলা' কাব্যের সংশোধিত ও মূলানুগ সংস্করণ প্রকাশ করা হয়।

কোনো কাব্যে সংগ্রন্থিত নয় এরকম ১১৭টি কবিতা নিয়ে প্রকাশ করেছি 'সূর্য-অসূর্যলোক'। জীবনানন্দের কবিতা ছড়িয়ে দিতে চেয়েছি। এরকম কাজ আরও অনেক আছে। আমাদের রসদ সীমিত। তার মধ্যেও আমরা যা করেছি তার মূল্যায়ন করবেন জীবনানন্দের পাঠক।

জীবনানন্দের কবিতার পাণ্ডুলিপি ও চিঠির ক্ষেত্রে একটা কথা শোনা যায়—যথাযথ সংগ্রহে রেফারেন্স ব্যবহার করেননি। বিষয়টি পরিষ্কার করবেন।

ফয়জুল লতিফ চৌধুরী: অভিযোগটি আংশিক ন্যায্য। তবে জীবনানন্দের পাণ্ডুলিপিভিত্তিক কাজ পাঁচটি। সেগুলো হলো—'রূপসী বাংলা' কাব্যের মূলানুগ সংস্করণ, জীবনানন্দ দাশ কর্তৃক পরিকল্পিত 'বাংলার ত্রস্ত নীলিমা', 'জীবনানন্দ দাশের কবিতার পাণ্ডুলিপি চিত্র', 'জীবনানন্দ দাশের একত্রিশ নম্বর কবিতার খাতা' এবং সদ্য প্রকাশিত 'জীবনানন্দ দাশের সাতাশ নম্বর কবিতার খাতা।'

প্রতিটির ভূমিকায় লেখা আছে, কলকাতায় অবস্থিত ভারতের জাতীয় গ্রন্থ কেন্দ্রে সংরক্ষিত ৪৮টি খাতার কোনটি ভিত্তি করে পাণ্ডুলিপি প্রণীত। এসব কবিতা লেখার অবিকল ডিজিটাল অনুলিপি আমার কাছে আছে। সেসব দেখেই পাণ্ডুলিপি তৈরি করেছি। ভূমিকায় সবিস্তারে বর্ণনা করা আছে। 'জীবনানন্দ দাশের সাতাশ নম্বর কবিতার খাতা' গ্রন্থটির ভূমিকায় দেখবেন ৪০টি কবিতার প্রতিটির পাঠোদ্ধারের সমস্যা নিয়ে যথাসাধ্য আলোচনা আছে।

জীবনানন্দ দাশের যেসব চিঠিপত্র সংকলনভুক্ত করা হয়েছে, করা যায়, তার রেফারেন্স হলো প্রথম প্রকাশের সূত্র। সেগুলো দেওয়া কঠিন কিছু না। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। সূত্র, গ্রন্থপঞ্জি ইত্যাদির জন্য গবেষণা সহকারী প্রয়োজন। পাওয়া যায় না।

মান্নান সৈয়দ ভাই অন্তত ২৮টি চিঠির ফটোকপি দিয়ে সাহায্য করে গেছেন। কৃতজ্ঞতার নিদর্শন স্বরূপ 'জীবনানন্দ দাশের সাতাশ নম্বর কবিতার খাতা' গ্রন্থটি তাকে উৎসর্গ করেছি। প্রভাত দা-ও (প্রভাত কুমার দাস) ২০১২ সালে কিছু চিঠি দিয়েছিলেন। অধিকন্তু এ যাবৎ ২৫টি চিঠি আমি জীবনানন্দের ডায়েরির খাতা থেকে পাঠোদ্ধার করেছি। ভূমেন্দ্রদার বাসায় গিয়ে ক্যামেরা দিয়ে ছবি তোলা।

সংস্কৃতি খাতে আমাদের বাজেট এক শতাংশেরও কম৷ অথচ সাহিত্য-সংস্কৃতির মাধ্যমে সামাজিক মূল্যবোধ ছড়ায়। তাহলে এই খাতে বাজেট এতো কম কেন?

ফয়জুল লতিফ চৌধুরী: বই পাঠে মানুষের মনোজগত বিকশিত হয়। এ ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করা উচিৎ। অর্থবছরের শেষে শিক্ষা মন্ত্রণালয় যে অব্যয়িত অর্থ প্রত্যর্পণ করে, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ তারচেয়ে অনেক কম। সরকার চলে রাজনীতিতে। রাজনৈতিক বিবেচনায় সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় সরকারের কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয় বলে অনুমান করা যায়।

এখন মনে হয়, মানুষ সরকারি নীতি অনুসরণ করছে। বই পড়ায় তরুণ প্রজন্মের আগ্রহ খুব কম। কিন্তু সম্প্রতি পাঠক থাকুক বা না থাকুক, আমাদের লিখে যেতে হবে, প্রকাশ করে যেতে হবে। অনাগতরা হয়তো বই পাঠে আগ্রহী হবে। তাদের কথা মনে রেখে লেখা ও প্রকাশনায় মনোযোগ বাড়াতে হবে।

অধিকাংশ পাঠকের মাথাপিছু আয় কম, কিন্তু ব্যয় বেশি। তাই সরকারি গ্রন্থাগারের জন্য বাজেট বাড়ানো জরুরি। বাংলা একাডেমি যেন বছরে কমপক্ষে ২০০ বই প্রকাশ করে, সে রকম লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দেওয়া যায়। তবে এ কথাও মনের রাখা উচিৎ যে সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ক সরকারি প্রতিষ্ঠানে বাজেট বাড়ালেই তা খরচ হবে, তা নয়। সরকারি কর্মকর্তারা অনেকেই অর্থব্যয়ের পদ্ধতিই জানেন না।

আপনার কাজের ধরন একাডেমিক না, কিন্তু কার্যকরী। এমন গবেষণার পদ্ধতিটা কী?

ফয়জুল লতিফ চৌধুরী: ১৪ বছর যাবৎ একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি ও গবেষণা পদ্ধতি পড়াচ্ছি। অর্থনীতিবিষয়ক একাডেমিক কাজ করি। ২০০৭ সালে প্রকাশিত Corrupt Bureaucracy and Privatization of Tax Enforcement in Bangladesh পৃথিবীর অন্তত ৩০টি বড় ও গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থাগারে পাওয়া যায়।

একাডেমিক কাজের একটি ছক আছে। একজন সৃজনশীল লেখকের পক্ষে এ ধরণের কাজ করা মানসিক যন্ত্রণার ব্যাপার। এ যন্ত্রণা সহ্য হয় না। আমার কাজ ছকে বাঁধা না হলেও একে কোয়ালিটেটিভ গবেষণা বলা যায়। জীবনানন্দের 'মাল্যবান' উপন্যাসের ফ্রয়েডিয় বিশ্লেষণ সম্ভব। ওসব বিশ্ববিদ্যালয়ের জুনিয়র অধ্যাপকদের কাজ। তারা নিশ্চয় করছেন। আমরা মালমসলা তৈরি করে যাচ্ছি।

এখন কী কাজ করছেন যা ভবিষ্যতে প্রকাশিত হবে?

ফয়জুল লতিফ চৌধুরী: জীবনানন্দের ইংরেজি প্রবন্ধের সংকলন এবং অনূদিত কবিতার সংকলন যথাক্রমে On Language and Literature  এবং Time Stars Woman প্রকাশের অপেক্ষায় আছে। জীবনানন্দ দাশের সনেট সমগ্র এবং জীবনানন্দের দীর্ঘতম কবিতা 'সোমেশ্বর মুস্তাফীর পৃথিবী' প্রকাশিত হবে অচিরেই।

জীবনানন্দের একটি ডায়েরির অনুবাদ করেছি; কিয়দংশ দুবছর আগে একটি ঈদ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে। এটাই বই আকারে প্রকাশ করব। জীবনানন্দের দিনপঞ্জিও প্রায় তৈরি। এ ছাড়া, আরও কয়েকটি পাণ্ডুলিপির খাতা টেক্সটসহ প্রকাশের ইচ্ছা আছে।

এখন ১৯৭১ নিয়ে গবেষণা করছি। এ ব্যাপারে এপ্রিল থেকে বেশি সময় দেবো। প্রথম গ্রন্থের নাম হবে 'মার্চ ১৯৭১'। আরেকটি প্রকল্প হলো, বাংলা গ্রন্থে আছে কিন্তু কোনো বাংলা অভিধানে নেই, এরকম এক হাজার শব্দের একটি অভিধান করেছিলাম ১০-১১ বছর আগে। সেটি এ বছর অবশ্যই প্রকাশ করতে চাই। আয়ু ফুরিয়ে আসছে। এ কথা ভুললে চলবে না।

Comments