মানুষের অস্তিত্বের মধ্যেই এক ধরনের দূর্দশা আছে : বুকারজয়ী পল লিঞ্চ

আইল্যান্ডের বিখ্যাত ঔপন্যাসিক পল লিঞ্চ মরণঘাতী ক্যানসার এবং ব্যক্তিগত ঝড় সামলে পেয়েছেন আকাশছোঁয়া সাফল্য। তার জন্ম ১৯৭৭ সালে, আয়ারল্যান্ডের সবচেয়ে উত্তরের উপকূল মালিন হেডে। বুকারজয়ী এই ঔপন্যাসিক এ পর্যন্ত মোট পাঁচটি উপন্যাস রচনা করেছেন। তার সর্বশেষ উপন্যাস "প্রফেট সং" (Prophet Song), যেখানে তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে আয়ারল্যান্ড ধীরে ধীরে একটি দুঃস্বপ্নের মতো স্বৈরাচারী শাসনের অধীনে চলে যাচ্ছে। কোনরকম দীর্ঘ, কাব্যিক বাক্য এবং প্যারাগ্রাফ ব্যবহার না করে লেখা এই উপন্যাসটি পাঠককে এক দমবন্ধ করা অস্বস্তিকর জগতে টেনে নিয়ে যায়।
গত বছর বুকার পুরস্কার জেতা বইটিকে অনেকেই করম্যাক ম্যাককার্থি এবং উইলিয়াম ফকনারের লেখার সাথে তুলনা করেছেন। আইরিশ সাহিত্যের নবজাগরণ এবং তাঁর 'বিষাদময় বিশ্বদর্শন' নিয়ে লেখক কথা বলেছেন এই সাক্ষাৎকারে৷
বুকার জেতার পরের জীবনটা জানতে চাই।
আমি এখন আর সপ্তাহ বা মাস হিসেব করে সময় গণনা করি না, করি সাক্ষাৎকারের সংখ্যা দিয়ে। বড়দিনের সময় সাক্ষাৎকারের সংখ্যা ১০০ পার করেছিলাম, বর্তমানে তা প্রায় ১৭০-এর কোঠায়। এখনো অবিশ্বাস্য লাগে যে বুকার পুরস্কারটা পেয়েছি। যদিও আমার আট বছরের মেয়ে এতে আর আনন্দিত নয়। সেদিন সে বললো, "রাস্তায় লোকজন তোমাকে থামিয়ে 'অভিনন্দন' বললে আমার আর একদম ভালো লাগে না।"
'অভিনন্দন' শব্দটা সে এমন তাচ্ছিল্যের সাথে বলেছে, যা শুনলে গায়ে কাঁটা দেয়।
আপনার জীবনের গত কয়েকটা বছর বেশ কঠিন ছিল, তাই না?
যেদিন আমি বুকার পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় আমার নাম থাকার খবর পাই, তার ঠিক এক বছর আগে ক্যানসারের জন্য অপারেশন টেবিলে ছিলাম। এরপর ২০১৮ সালে আমার ছেলের জন্ম হয়, আর অসুস্থতা থেকে সেরে ওঠার সময়ই অপ্রত্যাশিতভাবে আমার বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে।
বুকার জেতার কয়েক সেকেন্ড পরে তোলা একটা ছবি আছে, যেখানে আমার সম্পাদক আমাকে জড়িয়ে ধরেছেন আর আমার এজেন্ট হাততালি দিচ্ছেন। কিন্তু আমি তখন দুই হাতে মুখ ঢেকে রেখেছিলাম। কারণ ওই ছবিটি এমন একজন মানুষের, যার কাছে বাস্তবতা আর বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছিল না। তবে তার কয়েক সেকেন্ড পরেই আমি নিজেকে সামলে নিই। সৌভাগ্যবশত, আমি এখন পুরোপুরি সুস্থ এবং বাকি জীবনটা আনন্দের সাথে কাটানোর সুযোগ পেয়ে আমি অত্যন্ত খুশি।
"প্রফেট সং" লেখার আগে একটি ভুল উপন্যাস নিয়ে কাজ করছিলেন। সঠিক পথে ফিরলেন কীভাবে?
হ্যাঁ। এই উপন্যাস লেখার আগে প্রায় ছয় মাস ধরে আমি একটি ভুল উপন্যাস লিখছিলাম; মনে হচ্ছিল যেন পাথরের ওপর নিরর্থক হাতুড়ি চালাচ্ছি। একদিন বিকেলে আমি হাল ছেড়ে দিলাম। এর পরের সোমবার শান্তভাবে টেবিলে ফিরে এলাম, কী করব কোনো ধারণা ছিল না। একটি নতুন ডকুমেন্ট খুলে অপেক্ষা করতে লাগলাম। তখনই "প্রফেট সং"-এর প্রথম পাতাটি আমার মাথায় আসে এবং আমি বুঝতে পারি, এর মধ্যে সেই সারবস্তুটি আছে যা আমি এতদিন খুঁজছিলাম।
আমি জীবনে হঠাৎ পথ পরিবর্তনে বিশ্বাসী। ভাবুন তো, শয়তান যখন স্বর্গ থেকে বিতাড়িত হচ্ছিল, তখন যদি সে একটু পথ বদলে নিত, তাহলে কোথায় গিয়ে পৌঁছাত? আমার এই ধারণাটা খুব ভালো লাগে। আমাদের সবারই মাঝে মাঝে পথ বদলানো উচিত।
আপনার উপন্যাসটি ইউক্রেন যুদ্ধ এবং গাজা সংকটের কথা মনে করিয়ে দেয়, অথচ আপনি এটি লেখা শুরু করেছিলেন ২০১৮ সালে।
এই বইটি লেখার সময় আমি আধুনিক পৃথিবীর অশান্তি আর বিশৃঙ্খলাকে বোঝার চেষ্টা করছিলাম। তাই যখন মারিউপোল বা গাজাকে ধুলোয় মিশে যেতে দেখলাম, অবাক হইনি। অনেকে বলছেন আমি সময়ের প্রতিচ্ছবি এঁকেছি, কিন্তু আমার কাছে এই উপন্যাসটি একই সাথে অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যতের গল্প বলে।
মানুষের অস্তিত্বের মধ্যেই এক ধরনের দূর্দশা মিশে আছে। আমরা বারবার পৃথিবীকে ধ্বংস করি এবং টিভিতে সেই খবর দেখি।
গত বছর বুকার পুরস্কারের দীর্ঘ তালিকায় চারজন আইরিশ লেখক ছিলেন। আইরিশ সাহিত্য কেন এত ভালো করছে?
আয়ারল্যান্ড এখন একটি সামাজিক বিপ্লবের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যা আমাদের শিল্পের ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে। একসময় আমরা ধর্মের ছায়ায় বাস করতাম, কিন্তু এখন আমরা বিশ্বজনীন ইউরোপীয়। আমরা একটি ক্যাথলিক প্রভাবমুক্ত সমাজ তৈরি করছি যাতে বিশ্বায়নের এই যুগে 'আইরিশ' পরিচয়ের নতুন মানে দাঁড় করাতে পারি। মূলত এই অনুভূতিকে ধারণ করতে আমাদের শিল্প-সাহিত্য যেন দারুণভাবে জেগে উঠেছে।
"প্রফেট সং" একটি বৈশ্বিক উপন্যাস, কিন্তু নিঃসন্দেহে এটি আইরিশ।
আপনি কি ভালো ছাত্র ছিলেন?
যখন আমার বয়স বারো, তখন গণিতের একটি সমস্যার জন্য একজন শিক্ষক আমাকে প্রচণ্ড মেরেছিলেন। এরপর থেকেই স্কুলের ওপর থেকে আমার মন উঠে যায়। আমার ইংরেজি শিক্ষক তো আমাকে ক্লাস থেকেই বের করে দিয়েছিলেন, কারণ আমাদের মধ্যে একদমই বোঝাপড়া ছিল না। পরে আমার মা-সহ আরও কয়েকজন শিক্ষকের অনুরোধে প্রধান শিক্ষক আমাকে আবার ক্লাসে ফিরিয়ে আনেন। আমি তাঁদের কাছে কৃতজ্ঞ। পরবর্তী দুই বছরে আমি টমাস হার্ডি, টি.এস. এলিয়ট, শেক্সপিয়রের মতো লেখকদের লেখা গোগ্রাসে গিলেছি, যা আমার সত্তার অংশ হয়ে গেছে এবং আমাকে আজকের আমি বানিয়েছে।
আবার কি লেখালেখিতে ফিরেছেন?
যেদিন সাক্ষাৎকার বা ভ্রমণ থাকে না, সেদিন কিছু একটা লেখার চেষ্টা করি। কিন্তু সত্যি বলতে, আমার মানসিক শক্তি এখন খুব কম। বুকার জেতার পর সবাই বলে যে এক বছর লেখা যায় না।
সম্প্রতি বুকার বিজয়ী কয়েকজন লেখকের সাথে দেখা হয়েছে, তারা বলেছেন যে এর চেয়েও বেশি সময় লাগতে পারে। এত বড় একটি পুরস্কারের মানসিক প্রভাবকে ছোট করে দেখার কোনো সুযোগ নেই।
যখন লেখেন না, তখন কী করেন?
একটি অদ্ভুত ব্যাপার হলো, আমি সুপারমার্কেটে অনেক বেশি সময় কাটাই। আমি রান্না করতে ভালোবাসি এবং বেশিরভাগ খাবারই নিজে তৈরি করি। অবসর সময়ে বা যখন বাচ্চারা কাছে থাকে না, তখন আমি জ্যাজ সংগীত শুনি, ক্লাসিক সিনেমা দেখি, বই পড়ি আর ঘুরে বেড়াই। টিভি খুব একটা দেখা হয় না। তাই আমার প্রিয় শো নিয়ে আলোচনা করতে চাইলে আমি হয়তো কিছুই বলতে পারব না, তবে আমি "দ্য বেয়ার" (The Bear) সিরিজটির ভক্ত।
আপনি আপনার বিশ্বদর্শনকে 'বিষাদময়' বলেছেন। আমাদের জন্য কি কোনো আশা আছে?
দস্তয়েভস্কি জানতে চেয়েছিলেন, একজন মানুষের মধ্যে কতটা মনুষ্যত্ব থাকে। এটাই আমার লেখার মূল বিষয়। আমার পাঁচটি বই-ই এই বিষাদময় বিশ্বদর্শনের অংশ। এই বইগুলো জীবনের আধ্যাত্মিক দিক এবং নশ্বর পৃথিবীতে দুঃখ ও হারানোর অনিবার্যতা নিয়ে কথা বলে। এই ধারণাগুলো পুরনো মনে হতে পারে, কিন্তু আমাদের এই বুদ্ধিহীন আধুনিক সময়ে এগুলো নিয়ে ভাবা উচিত। ঈডিপাস বা কিং লেয়ারের মতো ট্র্যাজেডিগুলো আজও কেন টিকে আছে, তার পেছনে যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
একটি কৌতুক বলুন
একটি কাঠঠোকরা পাখি বারে ঢুকে বসে বলল: "মাফ করবেন, বারটেন্ডার কি এখানে
আছেন?"
Comments