নদী থেকে প্রতি মাসে গড়ে ৪৩ মরদেহ উদ্ধার, দ্বিতীয় অবস্থানে ঢাকা

সারা দেশে নদী এলাকা থেকে মরদেহ উদ্ধারের সংখ্যা বাড়ছে। হত্যার পর প্রমাণ লোপাট ও আইনের চোখ ফাঁকি দিতে মরদেহ ফেলে দেওয়ার জন্য অপরাধীরা নদী বেছে নিচ্ছে।
বুড়িগঙ্গা নদী থেকে গত ২৩ আগস্ট উদ্ধার অজ্ঞাতপরিচয় নারী ও শিশুকে প্রথমে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছিল। পরে তাদের মরদেহ নদীতে ফেলে দেয় দুর্বৃত্তরা। ময়নাতদন্তে প্রাথমিকভাবে বিষয়টি উঠে এসেছে।
এ ঘটনায় সদরঘাট নৌ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের হয়েছে। পাঁচ দিন পার হলেও আঙুলের ছাপ মুছে যাওয়ায় নিহতদের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। পুলিশের ভাষ্য, কেউ মরদেহ নিতেও আসেনি।
পুলিশ দুজনের ডিএনএ সংরক্ষণ করেছে। কেউ মরদেহ শনাক্ত করতে এলে মিলিয়ে দেখা হবে। পাশাপাশি বিভিন্ন থানায় নিখোঁজ ডায়েরির সঙ্গে ওই নারী ও শিশুর তথ্য মিলিয়ে দেখা হচ্ছে।
সদরঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সোহাগ রানা বৃহস্পতিবার দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'সাধারণত পরিচয় জানা সম্ভব না হলে তদন্তে অগ্রগতি হয় না। হত্যার সূত্র খুঁজে পেতে পরিচয় শনাক্ত করা জরুরি। আমরা তাদের পরিচয় জানার চেষ্টা করছি।'
কর্মকর্তারা জানান, নদী থেকে উদ্ধার মরদেহ শনাক্ত করতে প্রায়ই পুলিশকে হিমশিম খেতে হয়। এটি একটি নিয়মিত চ্যালেঞ্জ। পুলিশ ও অপরাধতত্ত্ব বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাধারণ গ্রেপ্তার এড়াতে অপরাধীরা মরদেহ নদীতে ফেলে দেয়।
চলতি বছর প্রতি মাসে নৌ পুলিশ গড়ে ৪৩টি মরদেহ উদ্ধার করেছে। গত বছর প্রতি মাসে ৩৬টি মরদেহ উদ্ধার হয়েছিল।
নৌ পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুসারে, এ বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশজুড়ে অন্তত ৩০১ নারী-পুরুষ ও শিশুর মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জে সর্বোচ্চ সংখ্যক, ৩৪টি মরদেহ পাওয়া গেছে। এর পরের অবস্থানে রয়েছে ঢাকা; ৩২টি মরদেহ উদ্ধার হয়েছে এই সময়ে। এর মধ্যে ২০৯ জনের পরিচয় জানা গেলেও ৯২ জন এখনো অজ্ঞাত।
গত বছর নদী থেকে অন্তত ৪৪০টি মরদেহ উদ্ধার হয়েছিল, যার মধ্যে ১৪১ জনের পরিচয় এখনো শনাক্ত হয়নি। মরদেহ উদ্ধারের পর এ বছর বিভিন্ন থানায় অন্তত ৪১টি হত্যা মামলা দায়ের হয়েছে।
গত বছর ৫৩টি মামলা হয়েছিল।
নৌ পুলিশ কর্মকর্তাদের মতে, মরদেহের অবস্থা ও পারিপার্শ্বিক প্রমাণ সাপেক্ষে সন্দেহজনক মনে হলে তারা হত্যা মামলা দায়ের করেন। তবে হত্যার প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি।
গতকাল নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যায় একটি মস্তকহীন মরদেহ পাওয়া যায়। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) সহায়তায় আঙুলের ছাপ মিলিয়ে দেখা যায়, নিহত ব্যক্তির নাম হাবিব (২৭)। তিনি সোনারগাঁ উপজেলার মধ্য কাঁচপুর এলাকার বাসিন্দা।
'এটি নৃশংস হত্যাকাণ্ড। নিহত ব্যক্তির পরিচয় যেন শনাক্ত করা সম্ভব না হয়, সে উদ্দেশ্যে হত্যাকারীরা শিরশ্ছেদের পর মাথা অন্যত্র লুকিয়ে রাখে। লাশটি বেশি পচে না যাওয়ায় এবং দ্রুত ভেসে ওঠায় পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। তবে এখনো মাথা উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি,' বৃহস্পতিবার ডেইলি স্টারকে বলেন কাঁচপুর নৌ ফাঁড়ির ইনচার্জ (পরিদর্শক) আব্দুল মামুদ।
পুলিশ কর্মকর্তারা আরও বলেন, পানিতে দেহ পচে যায়, প্রমাণ নষ্ট হয়ে যায়। কখনো কখনো মাছের কামড় বা জাহাজের আঘাতে সৃষ্ট ক্ষতের কারণে তদন্তকারী কর্মকর্তা ও ফরেনসিক চিকিৎসকরা বিভ্রান্ত হন।
প্রাথমিক তদন্তে হত্যা মনে না হলে লাশ উদ্ধারের পর পুলিশ সাধারণত অস্বাভাবিক মৃত্যুর (ইউডি) মামলা করে। তদন্তে বা ময়নাতদন্তে হত্যার প্রমাণ পাওয়া গেলে পরে সেটি হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়, জানান তারা।
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধতত্ত্ব ও পুলিশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ওমর ফারুক বলেন, অপরাধীরা প্রমাণ নষ্ট করতে ও আইনের চোখ ফাঁকি দিতে হত্যার পর মরদেহ ফেলার জন্য নদী ও রেলপথ বেছে নেয়।
'মূলত সংঘবদ্ধ অপরাধের ক্ষেত্রে এ রকম ঘটে। অপরাধীরা হত্যার আগেই নির্ধারণ করে নদী এলাকার কোথায় মরদেহ ফেলা হবে,' বলেন তিনি।
ফারুক আরও বলেন, 'অনেক লাশ পাওয়া যায় যেগুলো অনেক বেশি পচে গেছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে নিহত ব্যক্তির ঠিকানা থেকে অনেক দূরের এলাকায় মরদেহ ফেলে দেয় অপরাধীরা। কখনো কখনো লাশ ভাসতে ভাসতে অনেক দূরে চলে যায়, পরে পরিবার খোঁজ না পায়। ফলে লাশ অজ্ঞাত থেকে যায়, তদন্তে অগ্রগতি হয় না এবং পরিবার ন্যায়বিচার বঞ্চিত হয়।'
ঢাকা জেলা নৌ পুলিশ সুপার (এসপি) আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, 'যখন আমরা পরিচয় শনাক্ত করতে পারি না এবং দীর্ঘ সময় পরও মামলার অগ্রগতি হয় না—তখন সদর দপ্তরের সঙ্গে আলোচনা করে অন্য কোনো সংস্থাকে তদন্তের ভার দেওয়া হয় অথবা আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়।'
'তবে, কেউ মরদেহ শনাক্ত করতে এলে মিলিয়ে দেখার জন্য আমরা ডিএনএ নমুনা সংরক্ষণ করে রাখি,' বলেন তিনি।
অতিরিক্ত আইজিপি ও নৌ পুলিশ প্রধান কুসুম দেওয়ান বলেন, 'নদী থেকে মরদেহ উদ্ধার হলে পরিচয় শনাক্ত করাই তদন্ত এগিয়ে নেওয়া ও ন্যায়বিচার নিশ্চিতের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।'
তিনি বলেন, 'অনেক ক্ষেত্রে মরদেহ পচে যাওয়ায় শনাক্ত করা যায় না। আবার অনেক ক্ষেত্রে লাশ এক জেলা থেকে অন্য জেলায় ভেসে যায় কিংবা প্রমাণ নষ্ট করতে অপরাধীরা অন্য কোথাও হত্যার পর মরদেহ নদীতে ফেলে দেয়। প্রতিটি মামলায় পরিচয় শনাক্ত করতে নৌ পুলিশ সর্বোচ্চ চেষ্টা করে।'
Comments