মধ্যরাতে ঢাকার অনেক চেকপোস্টই থাকে ফাঁকা

‘নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলে কিছু নেই।’

রাজধানীতে গড়ে প্রতি ২ দিনে অন্তত একটি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। বছরের প্রথম ৩ মাসে করা মামলার ওপর ভিত্তি করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) এই তথ্য জানিয়েছে।

তবে প্রকৃত সংখ্যাটি আরও বেশি হতে পারে। কারণ অনেক ভুক্তভোগীই হয়রানির আশঙ্কায় মামলা করেন না।

তা ছাড়া, থানার কিছু কর্মকর্তা ভুক্তভোগীদের মামলার পরিবর্তে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে উত্সাহিত করেন। ফলে পুলিশের তথ্যে ছিনতাইয়ের ঘটনাগুলোর উল্লেখ কম থাকে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তারা জানান, তদন্ত ও কাগজপত্রের চাপ কমাতে তারা এই পরামর্শ দেন।

কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মধ্যরাত থেকে ভোর পর্যন্ত অপরাধীরা সবচেয়ে বেশি সক্রিয় থাকে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুলিশ টহল বাড়িয়েছে ও চেকপোস্ট বসিয়েছে।

২০২২ সালে রাজধানীতে অন্তত ১ হাজার ৬০৩টি চুরি, ১৪৫টি ছিনতাই ও ২৭টি ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। আর এ বছরের মার্চ পর্যন্ত ঢাকায় ১৯২টি চুরি, ৩৪টি ছিনতাই ও ২টি ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে।

তবে মধ্যরাতের পর অনেক চেকপোস্ট সরেজমিনে পরিদর্শন করে পুলিশের উপস্থিতি পাননি দ্য ডেইলি স্টারের সাংবাদিকরা।

ডিএমপি জানায়, গত ২ দিনে রাজধানীর বিভিন্ন স্থান থেকে ১৪৫ জন সন্দেহভাজন ছিনতাইকারী, চোর ও ডাকাতকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খন্দকার মহিদ উদ্দিন জানান, ঈদের আগে ১ হাজার ৭৬৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

ঈদের ৪ দিনের ছুটিতে ঢাকার রাস্তাগুলো তুলনামূলকভাবে জনশূন্য ছিল। ছিনতাইকারী, ডাকাত ও চোররা এই সুযোগকে পুরোপুরি কাজে লাগায় বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।

'আমাদের একটা বিষয় বুঝতে হবে—নিজের সম্পদ নিজেকেই রক্ষা করতে হবে। রাষ্ট্রের অবশ্যই নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব আছে। কিন্তু হাঁটার সময় কেউ যদি মোবাইল ফোনে কথা বলে... অথবা জানালা খোলা রেখে গাড়িতে বসে কথা বলে, তাহলে একজন চোর পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে ফোন চুরি করবে এবং পালিয়ে যাবে', যোগ করেন খন্দকার মহিদ।

ঈদের ছুটি শেষে শেরপুরের নিজ গ্রাম থেকে রাজধানীতে ফেরার পথে শনিবার ভোরে ফার্মগেট এলাকায় পুলিশ কনস্টেবল মনিরুজ্জামান তালুকদার ছিনতাইয়ের শিকার হন। ছিনতাইকারীরা তাকে ছুরিকাঘাত করে। পরে তিনি মারা যান।

এর আগে গত বৃহস্পতিবার রাতে রামপুরায় বিটিভি কার্যালয়ের সামনে রাকিবুল হাসান রানা (৩০) নামে এক বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের সাংবাদিককে ছুরিকাঘাত করে ছিনতাইকারীরা। বর্তমানে তিনি জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (নিটোর) চিকিৎসাধীন।

মাহিদ জানান, ঈদের মতো বড় উৎসবের সময় তারা বিশেষ অভিযান পরিচালনা করেন। এবারও এর ব্যতিক্রম হয়নি। তা সত্ত্বেও এ ধরনের কিছু ঘটনা ঘটেছে।

'নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলে কিছু নেই', যোগ করেন তিনি।

তিনি বলেন, পুলিশ কনস্টেবল হত্যার সঙ্গে জড়িত ৩ ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং যেসব অপরাধী সাংবাদিককে ছুরিকাঘাত ও ছিনতাই করেছে, তাদেরকেও চিহ্নিত করা হয়েছে।

পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মহিদ বলেন, এই ২ ঘটনায় পুলিশ গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে ডিএমপি কমিশনার সব থানার উপকমিশনার ও ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছেন।

তিনি আরও জানান, ঢাকার যেসব এলাকায় এসব ঘটনা ঘটেছে, সেখানে দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যদের কোনো ধরনের গাফিলতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে ছিনতাই ও ডাকাতির সঙ্গে ৬ হাজারের বেশি মানুষ জড়িত। এর মধ্যে ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িত ১ হাজার ৭৩৭ জন এবং ডাকাতির সঙ্গে জড়িত ৪ হাজার ৪৬১ জন।

২০২২ সালে রাজধানীতে অন্তত ১ হাজার ৬০৩টি চুরি, ১৪৫টি ছিনতাই ও ২৭টি ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত ঢাকায় ১৯২টি চুরি, ৩৪টি ছিনতাই ও ২টি ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে।

তথ্য অনুযায়ী, ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটে তেজগাঁও এলাকায়।

বিভিন্ন চেকপোস্টের পরিস্থিতি

শেষ রাতে ঢাকার নিরাপত্তা ব্যবস্থা যাচাই করতে রোববার দিনগত রাত সাড়ে ১২টা থেকে আড়াইটার মধ্যে ঢাকার ৭টি চেকপোস্ট সরেজমিনে পরিদর্শন করেন দ্য ডেইলি স্টারের সাংবাদিকরা।

প্রতিবেদক প্রথমে মানিক মিয়া এভিনিউ এলাকা পরিদর্শন করেন, যেখানে কৌশলগতভাবে ৪টি চেকপোস্ট স্থাপন করা হয়েছে। তবে মাত্র ১টি চেকপোস্টে পুলিশ কর্মকর্তারা সক্রিয়ভাবে দায়িত্ব পালন করছিলেন এবং তারা এই প্রতিবেদকের গাড়ি না থামিয়ে চলে যেতে দেন। অন্যান্য চেকপোস্টগুলোতে পুলিশের উপস্থিতি দেখা যায়নি।

গুলশান ১ মোড়ে পৌঁছানোর আগে গাড়ি থামিয়ে দেয় পুলিশ। সাংবাদিকের পরিচয় যাচাইয়ের পর সামনে এগিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হয়।

পুলিশ প্লাজার বিপরীতে আরেকটি চেকপোস্ট দেখা যায়। তবে এখানে কোনো বাধা পাননি সাংবাদিকরা।

দয়াগঞ্জ মোড়ে চেকপোস্ট থাকলেও সেখানে পুলিশের উপস্থিতি ছিল না।

অবশেষে রাত আড়াইটার দিকে সাংবাদিকরা দীননাথ সেন রোডে পৌঁছালে পুলিশের একটি টহল দল তাদের কিছু প্রশ্ন করে আবারও এগিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেয়।

ধানমন্ডির হাবিবুর রহমান ও অন্যান্যরা রাজধানীর বিভিন্ন অংশে বাড়তি নিরাপত্তা দেখেছেন বলে ডেইলি স্টারকে জানিয়েছেন। এ ধরনের এলাকার মধ্যে আছে ফার্মগেট আনন্দ সিনেমা হল, পান্থপথ সিগন্যাল, স্কয়ার হাসপাতাল, রাসেল স্কয়ার ও মেট্রো শপিং মল।

Comments