ক্র্যাক প্লাটুনের শহীদ গেরিলা হাফিজ: বীরত্ব, বঞ্চনা আর সেতারে স্বাধীনতার সুর

মুক্তিযুদ্ধে ক্র্যাক প্লাটুনের দুর্ধর্ষ গেরিলা যোদ্ধা সৈয়দ হাফিজুর রহমান, যিনি সহযোদ্ধাদের কাছে পরিচিত ছিলেন 'মাইন হাফিজ নামে'। মাইন বসানোর অবিশ্বাস্য দক্ষতার জন্যই তিনি এই খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় এক রাতেই ঢাকার ছয়টি আলাদা স্থানে মাইন বিস্ফোরণের বীরত্বও হাফিজের।
১৯৭১ সালের জুলাই ও আগস্ট মাসে তার হাতে বসানো মাইন বিস্ফোরণে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর একাধিক কনভয় ও জিপ বিধ্বস্ত হয়। আগস্টের শেষভাগে তার সবচেয়ে বড় অপারেশনটি ছিল রামপুরার উলন পাওয়ার স্টেশনের ৩০/৪০/৫০ এমভিএ ট্রান্সফরমার বিস্ফোরণ, যা ঢাকার পুরো পূর্বাঞ্চলকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল।

পাকিস্তানিদের এ দেশীয় দোসরদের তথ্যে ৩০ আগস্ট, ১৯৭১-এর ভোরে ২০/নিউ ইস্কাটনের বাড়ি থেকে পাকিস্তানি সেনারা আটক করে হাফিজকে। বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারের পর তাকে নিয়ে যাওয়া হয় নাখালপাড়ার এমপি হোস্টেলের মিলিটারি টর্চার সেলে। সেখানে অবর্ণনীয় নির্যাতনের শিকার হন হাফিজ। তার দুই চোখ উপড়ে ফেলা হয় এবং সারা শরীরে চালানো হয় পৈশাচিক নির্যাতন।
পাকিস্তানি সেনারা প্রতিবারই তাকে বলেছিল সহযোদ্ধাদের নাম বললে তাকে ছেড়ে দেওয়া হবে। কিন্তু একবারের জন্যেও তিনি তা করেননি।
এক সাক্ষাৎকারে ক্র্যাক প্লাটুনের সহযোদ্ধা লিনু বিল্লাহ বলেছিলেন, 'হাফিজ ভাইয়ের সঙ্গে আমার শেষ দেখা হয়েছিল টর্চার সেলে। তার ওপর এতটাই টর্চার করা হয়েছে যে তার দুচোখ বেরিয়ে এসেছে। সারা শরীরে পাশবিক নির্যাতনের চিহ্ন। তিনি বারবার বলছিলেন "তোমরা আমাকে গুলি করো তাহলে আমি বেঁচে যাই"। শত নির্যাতনেও তিনি সহযোদ্ধাদের কোনো তথ্য দেননি।'
২৯ ও ৩০ আগস্টের ওই অভিযানে পাকিস্তানিদের হাতে ধরা পড়েছিলেন গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের স্বজন মিলিয়ে ৩৫ থেকে ৪০ জন। তাদের মধ্যে ছিলেন ক্র্যাক প্লাটুনের গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন বদিউল আলম বদি, মাগফার উদ্দিন চৌধুরী আজাদ, আবদুল হালিম জুয়েল, শাফী ইমাম রুমী, আবু বকর, আলতাফ মাহমুদ ও হাফিজ, মাসুদ সাদেক চুল্লু, আবুল বারাক আলভী, লিনু বিল্লাহসহ অনেকে।
তাদের মধ্যে চুল্লু, আলভী ও লিনু বিল্লাহ ফিরে এলেও বাকিরা নিখোঁজ হন। ধারণা করা হয় ৩১ আগস্ট থেকে ৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে তাদের হত্যা করা হয়।
মুক্তিযুদ্ধে অবিস্মরণীয় অবদানের জন্য নিখোঁজ সকল গেরিলাকে মরণোত্তর 'বীর বিক্রম' খেতাবে ভূষিত করা হয়েছিল, কিন্তু ব্যতিক্রম ছিলেন শহীদ হাফিজ। দীর্ঘ ৫২ বছর ধরে তার পরিবার কেবল তার শহীদ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতির জন্য লড়াই করে গেছে। ১৯৭৪ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত নয়বার আবেদন করেও তারা ব্যর্থ হন। মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ে তাদের শুনতে হয়েছিল টাকার বিনিময়ে সনদ কেনার কথা। অথচ, স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র দশম খণ্ডে তার বীরত্বের কথা বারবার উল্লেখ আছে।

ক্র্যাক প্লাটুন নিয়ে কাজ করতে গিয়ে ২০২২ সালে প্রথম জানতে পারি শহীদ হাফিজ এখনো শহীদ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পাননি। ক্র্যাক প্লাটুনের মুক্তিযোদ্ধা সংগীতশিল্পী লীনু বিল্লাহর কাছে তার পরিবারের খোঁজ পাই। তার জীবিত একমাত্র বোন থাকেন মিরপুরে। আর ভাই থাকেন বেলজিয়ামে। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারি আদ্যোপান্ত।
২০২২ সালের সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে শহীদ হাফিজের পরিবারের লড়াই নিয়ে দ্য ডেইলি স্টার তিন পর্বের একটি সিরিজ প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
প্রতিবেদনগুলো দেখে সুপ্রিমকোর্টের একজন আইনজীবী স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে হাইকোর্ট বিভাগে রিট করেন। এরপর আদালত এ বিষয়ে একটি রুল জারি করেন। ২০২৩ সালের অক্টোবরে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল থেকে শহীদ সৈয়দ হাফিজুর রহমানকে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
যন্ত্রশিল্পী থেকে গেরিলা যোদ্ধা
শহীদ হাফিজের পরিচয় কেবল একজন মুক্তিযোদ্ধার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মুক্তিযুদ্ধের আগে তিনি একজন প্রখ্যাত যন্ত্রশিল্পী ছিলেন। ১০ থেকে ১২টি বাদ্যযন্ত্র বাজাতে পারতেন, যার মধ্যে সেতারে ছিল তার বিশেষ দখল। তিনি ছিলেন বিখ্যাত সুরকার আলতাফ মাহমুদের ঘনিষ্ট সহযোগী। করাচিতে দেবু ভট্টাচার্যের সহচার্যে তিনি সংগীতচর্চা করেন এবং পরে আলতাফ মাহমুদের সঙ্গে 'ঊর্মি প্রোডাকশন' নামে একটি সংগীত প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন।
ঢাকা বেতারের তালিকাভুক্ত শিল্পী ছিলেন হাফিজ। মুক্তিযুদ্ধের আগ পর্যন্ত আলতাফ মাহমুদ বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালনা করেছেন। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রেই নেপথ্য সংগীতে কাজ করেছিলেন হাফিজ। একইসঙ্গে তৎকালীন ঢাকা বেতার থেকে প্রচারিত বহু বাংলা ও উর্দু গানে যন্ত্রসংগীত শিল্পী হিসেবে কাজ করেছেন হাফিজ।
মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ৪ এপ্রিল যশোরের বাড়িতে হাফিজের বাবা আবদুর রহমানকে নির্মমভাবে হত্যা করে পাকিস্তান সেনারা। একইসঙ্গে পুড়িয়ে দেওয়া হয় তাদের বাড়ি। বাবার নৃশংস হত্যাকাণ্ড স্তম্ভিত করে দিয়েছিল হাফিজকে।
বাবা শহীদ হওয়ার খবর পেয়ে হাফিজ বাড়িতে গিয়েছিলেন। বাবার কবর ছুঁয়ে তিনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন তিনি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেবেন।
শুরুতে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দসৈনিক হিসেবে কাজ করলেও, পরবর্তীতে তিনি সরাসরি গেরিলা যুদ্ধে অংশ নেন।
স্বাধীনতার পর শহীদ পরিবার হিসেবে সরকার হাফিজের পরিবারকে লালমাটিয়ায় একটি বাড়ি বরাদ্দ দিলেও, ১৯৭৫ সালে সরকার পরিবর্তনের পর এক দিনের নোটিশে তাদের উচ্ছেদ করা হয়। সে সময় হাফিজের ব্যবহৃত বাদ্যযন্ত্র ও গাড়ি চুরি হয়ে যায়, এমনকি তার কোনো চিঠিপত্রও আর পাওয়া যায়নি।
শহীদ হাফিজ স্মরণে একটি স্মারকগ্রন্থের কাজ শুরু হয়। যেন তার মুক্তিযুদ্ধের সহযোদ্ধারা, সংগীত ভুবনের সহকর্মীদের কথায় থেকে যায় একজন দুর্ধর্ষ শহীদ মুক্তিযোদ্ধার স্মৃতি।
গত ১৫ আগস্ট 'বাতিঘর' থেকে প্রকাশিত এই গ্রন্থের নাম—'সেতারে স্বাধীনতার সুর: বীর গেরিলাযোদ্ধা শহিদ হাফিজ'। এই গ্রন্থে তার সংগীত ও যুদ্ধের সহযোদ্ধারা, যেমন শেখ সাদী খান, আবদুল হাদি, সুজেয় শ্যাম, রথীন্দ্রনাথ রায়, হাবিবুল আলম বীর প্রতীক, লিনু বিল্লাহ, আবুল বারক আলভী এবং অভিনেত্রী সুচন্দাসহ অনেকে তার স্মৃতিচারণ করেছেন।
৫৪ বছর আগে মুক্তিযুদ্ধের আজকের ভোরে পাকিস্তানিদের হাতে ধরা পড়েছিলেন শহীদ হাফিজ। অন্তর্ধান দিবসে তার প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।
Comments