বিএনপির প্রতি নমনীয় হতে পারে সরকার

বিরোধী দলের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের প্রতি কঠোর মনোভাব প্রকাশের কারণে সরকার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে ‘চাপের’ মুখে আছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ইঙ্গিত দিয়েছে যে, তারা বিএনপির চলমান বিক্ষোভ কর্মসূচি কৌশলে সামলানোর চেষ্টা করবে।

বিরোধী দলের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের প্রতি কঠোর মনোভাব প্রকাশের কারণে সরকার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে 'চাপের' মুখে আছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ইঙ্গিত দিয়েছে যে, তারা বিএনপির চলমান বিক্ষোভ কর্মসূচি কৌশলে সামলানোর চেষ্টা করবে।

গত মাসের শেষের দিকে বিরোধী দলগুলো নিত্যপণ্য ও জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে আন্দোলন শুরু করেছে। ইতোমধ্যে বিরোধীদলের মিছিল ও বিক্ষোভে কোনো ধরনের সহিংস আচরণে না জড়াতে আওয়ামী লীগের ওপরমহল থেকে নেতা-কর্মীদের প্রতি নির্দেশ এসেছে বলে জানিয়েছেন দল সংশ্লিষ্টরা। 

বিষয়টি সম্পর্কে জানেন এমন একটি সূত্র জানিয়েছেন, পুলিশকেও পরিস্থিতি 'নিয়ন্ত্রণের বাইরে না যাওয়া' পর্যন্ত বিএনপি নেতা-কর্মীদের গণহারে গ্রেপ্তার করা থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে।

সোমবার আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের দলের সভাপতির ধানমন্ডি অফিসে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে বলেন, 'আমি আমাদের দলের নেতাকর্মীদের বলছি, নেত্রীর (শেখ হাসিনা) নির্দেশের বাইরে কেউ যদি হামলায় জড়িয়ে পড়েন, তাদের ছাড় দেওয়া হবে না। এসব করে সরকারের ওপর এসে দায় পড়বে, এটা কিন্তু আমরা ছাড় দেব না। কোনো খারাপ কাজ আমাদের নেত্রী সহ্য করেন না।'

ওবায়দুল কাদের পরের দিন একই সতর্কবাণীর পুনরাবৃত্তি করেন এবং বিএনপির উদ্দেশ্যে বলেন, 'আন্দোলন করতে চাইলে শান্তিপূর্ণভাবে রাজপথে আন্দোলন করুন। আন্দোলনের নামে কোনো ধরনের নৈরাজ্য সৃষ্টি করবেন না।'

সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে আশ্বস্ত করা হয়, বিএনপির আন্দোলনে কোনো ধরনের বাধা দেওয়া হবে না। ২২ আগস্ট থেকে আবারও বিএনপির বিক্ষোভ কর্মসূচি শুরু হয়।

তা সত্ত্বেও বিএনপির কর্মসূচিতে ক্ষমতাসীন দলের সহিংস হামলার ঘটনাগুলো বারবার পত্রিকার শিরোনামে এসেছে এবং দলটির নেতা-কর্মীরা গ্রেপ্তার হয়েছেন। এসব হামলায় ইতোমধ্যে ৪ বিএনপিকর্মী নিহত এবং আরও অনেকে আহত হয়েছেন।

বুধবার মুন্সিগঞ্জে পুলিশ ও বিএনপি কর্মীদের সংঘর্ষে ১ যুবদল নেতা প্রাণ হারান।

আওয়ামী লীগ কর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, ১৭ সেপ্টেম্বর ঢাকার বনানীতে বিক্ষোভ চলাকালীন তারা বিএনপির নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা চালিয়েছেন।

দলীয় সূত্রে জানা যায়, এসব ঘটনা সরকারকে দেশের ভেতরে ও বাইরে চাপের মুখে ফেলেছে। তারা বলছেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল সোমবার আওয়ামী লীগ সভাপতির ধানমন্ডি কার্যালয়ে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে দেখা করেন এবং জানতে চান, বিএনপির চলমান বিক্ষোভে পুলিশের ভূমিকা কী হবে?

সূত্র আরও জানায়, এ সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আগামী দিনগুলোতে তার মন্ত্রণালয়ের অবস্থান কী হবে- সে বিষয়েও জানতে চান।

এ সময় ওবায়দুল কাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে 'ধীরে চলার' পরামর্শ দেন এবং যতক্ষণ পর্যন্ত বিএনপির কর্মসূচিগুলো শান্তিপূর্ণ থাকে, ততক্ষণ পর্যন্ত সেগুলো চলতে দিতে বলেন।

এ বিষয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'পুলিশ বিরোধীদলের কোনো শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে বাধার সৃষ্টি করবে না এবং এটি একইসঙ্গে সরকার ও (ক্ষমতাসীন) দলের অবস্থান…তবে পুলিশ আন্দোলনের নামে নৈরাজ্য সৃষ্টির প্রচেষ্টা সহ্য করবে না।'

মুন্সিগঞ্জে পুলিশ ও বিএনপি কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের বিষয়ে মন্ত্রী জানান, তিনি জেলার পুলিশ সুপারকে এই ঘটনার কারণ খুঁজতে বলেছেন।

বুধবার বিএনপি কর্মীরা মুন্সিগঞ্জে একটি মিছিলে অংশ নিতে গেলে সংঘর্ষে বিএনপি নেতা-কর্মী ও পুলিশসহ অন্তত ৫০ জন আহত হন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের এক শীর্ষ কর্মকর্তা দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, পুলিশের সব ইউনিটকে বলা হয়েছে বিক্ষোভকারীদের প্রতি নমনীয় আচরণ করতে এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্রগুলোর ভাষ্য, আগের সরকারবিরোধী আন্দোলনগুলোতে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়া বিএনপি নেতা-কর্মীদের একটি তালিকা তৈরি করছে পুলিশ।

এছাড়া যাদের বিরুদ্ধে আগে মামলা দায়ের করা হয়েছে, তাদেরও তালিকা করছে পুলিশ। সূত্র বলছে, কর্মকর্তারা এখন গুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলোর অসম্পূর্ণ তদন্ত শেষ করার দিকে নজর দিচ্ছেন।

সূত্র অনুসারে, যদি বিএনপি নৈরাজ্য সৃষ্টির চেষ্টা চালায়, তবে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা কঠোর হবেন এবং তালিকাভুক্ত নেতাদের গ্রেপ্তার করবেন।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, পুলিশ বিরোধীদলীয় নেতা-কর্মীদের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহের নামে ঘরে ঘরে গিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে।

বিএনপির দাবি, সম্প্রতি দলটির ১ হাজার নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং গত মাসে বিভিন্ন জেলায় তাদের বিরুদ্ধে প্রায় ১৫০টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এর মধ্যে ৫২টি কর্মসূচিতে হামলা চালানো হয় এবং ১৮ জায়গায় বিএনপি নেতা-কর্মীদের বাসস্থানে ভাংচুর চালানো হয়।

এদিকে আওয়ামী লীগ বিএনপির কর্মসূচির বিষয়ে 'ধীরে চলার' নীতি নিলেও দলটি তাদের দীর্ঘদিনের মিত্র জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদেরের প্রতি কঠোর হওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে। তাদের বিশ্বাস, কাদের সরকারবিরোধী আন্দোলনে যোগ দেওয়ার জন্য বিএনপির সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছেছেন।

জিএম কাদের এবং জাতীয় পার্টির মহাসচিব মো. মুজিবুল হক চুন্নু সাম্প্রতিক দিনগুলোতে সরকারের সমালোচনা করছেন।

শুক্রবার জিএম কাদের জানান, জাতীয় পার্টি কোনো জোটে নেই।

২০১৪ ও ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগের নির্বাচনী মিত্র হিসেবে অংশ নেয়।

অনুবাদ করেছেন মোহাম্মদ ইশতিয়াক খান

Comments