পরাজিত হলেন শিক্ষকরা

আশঙ্কা ছিলো, আশাও ছিলো। যদিও আলামত ছিলো না আশাবাদী হওয়ার।
DU protest
ডাকসু নির্বাচনে অনিয়মের প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের পোস্টার। ছবি: পলাশ খান

আশঙ্কা ছিলো, আশাও ছিলো। যদিও আলামত ছিলো না আশাবাদী হওয়ার।

আশাবাদীরা আশা করেছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন মানে শিক্ষকরা থাকবেন ডাকসু নির্বাচনের দায়িত্বে। শিক্ষকরা নির্বাচন পরিচালনা করবেন, শিক্ষার্থীরা ভোট দিবেন। সেখানে শিক্ষকরা নিশ্চয়ই এমন কিছু করবেন না, যা শিক্ষার্থীদের কাছে তাদের সম্মানহানি ঘটায়। শিক্ষকরা সেই আশ্বাস দিয়েছিলেনও।

তাছাড়া, ডাকসুর গৌরবময় ঐতিহ্যও বলে, সারাদেশের নির্বাচনের প্রতিফলন ডাকসু নির্বাচনে প্রতিফলিত হয় না। ২৮ বছর আগে ডাকসু নির্বাচন হয়েছিলো সামরিক স্বৈরাচার এরশাদের আমলে। সেই নির্বাচন শিক্ষকরা দায়িত্বশীলতার সঙ্গে পরিচালনা করেছিলেন, শিক্ষার্থীরা কোনো বাধা ছাড়া ভোট দিয়েছিলেন। তখনও দেশে নির্বাচন বলতে কিছু ছিলো না। কিন্তু, ডাকসু নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছিলো। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের ‘রাতে বেলা ব্যালট বাক্স ভরার’ স্বীকারোক্তির পরও, অনেকে আশা করেছিলেন ডাকসু নির্বাচন সুষ্ঠু হলেও হতে পারে। বাস্তবে ডাকসু নির্বাচন নিয়ে যা ঘটলো, তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকলো শিক্ষকদের সম্মান-শ্রদ্ধা-মর্যাদার প্রসঙ্গ। এই নির্বাচন থেকে প্রাপ্তি কী? কে বা কারা হারলেন, জিতলেন কারা?

সেসব বিষয়ে দু’একটি কথা।

১. শুরুতেই দু’টি ঘটনা, দুজন শিক্ষকের প্রসঙ্গ।

ক. যে রুমে ব্যালট বাক্স রাখা, সেই রুমের ভেতরে আরেকটি দরজা। সেই দরজা দিয়ে ব্যালটবাক্স রক্ষিত রুমে ঢোকা যায়। ছাত্রীরা আশঙ্কা করছিলেন, রাতে ব্যালটবাক্স ভর্তি করে রাখা হতে পারে।

শিক্ষার্থীরা সন্দেহ করছেন শিক্ষককে। তা নিয়ে রাতেই শিক্ষকের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের কয়েকদফা তর্ক-বিতর্ক হয়। শিক্ষক বোঝানোর চেষ্টা করেছেন, আমি শিক্ষক হয়ে তোমাদের সঙ্গে এমনকিছু করব না। শিক্ষার্থীরা শিক্ষকের কথা বিশ্বাস করেননি। সমঝোতা হয়, শিক্ষার্থীরা দরজায় তালা দিয়ে রাখবেন। চাবি থাকবে শিক্ষার্থীদের কাছে। সেই অনুযায়ী দরজায় তালা দিয়ে শিক্ষার্থীরা চাবি রাখেন নিজেদের কাছে। সকালে ভোটগ্রহণ শুরুর আগে শিক্ষার্থীরা দেখেন দরজার তালা খোলা হয়েছে। শিক্ষার্থীরা সেই রুমে ঢুকতে চাইলে, শিক্ষক বাধা দেন। শিক্ষার্থীরা তবুও রুমে ঢুকে দেখেন কোনোকিছু ভর্তি অবস্থায় কয়েকটি বস্তা। খুলে দেখা যায়, বস্তা ভর্তি ভোট দেওয়া ব্যালটপেপার। শিক্ষক তার অনুগত কয়েকজন শিক্ষার্থীকে দিয়ে বস্তাগুলো সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। সম্ভবত দু’একটি বস্তা সরিয়ে নিতে সক্ষমও হন।

ব্যালটবাক্স, পেপার রাতে শিক্ষকের কাছে পাঠিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে সকালে ব্যালটপেপারে ভোট দিয়ে বাক্সে ফেলবেন শিক্ষার্থীরা। শিক্ষক সেই ব্যালটপেপারে রাতে ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়ে বস্তা ভর্তি করে রেখে দিয়েছেন। সকালে সবার সামনে খুলে দেখাবেন ব্যালটবাক্স খালি। সিলগালা করে বুথে রাখবেন।ভোটগ্রহণ শুরু হলে, ভেতরের দরজা খুলে বস্তার ব্যালটপেপার ঢুকিয়ে দেওয়া হবে ব্যালটবাক্সে।

এ বক্তব্য ব্যালটপেপার উদ্ধারকারী শিক্ষার্থীদের। গণমাধ্যমের সামনে তারা একথা বলেছেন।

সাধারণত শিক্ষার্থীরা অন্যায় বা অনৈতিক কিছু করে শিক্ষকের হাতে ধরা পড়েন।

এক্ষেত্রে শিক্ষক ধরা পড়েছেন শিক্ষার্থীদের কাছে। প্রথমে সন্দেহ, তারপর হাতেনাতে ধরা। কথাগুলো শিক্ষার্থীরা ক্ষোভের সঙ্গে বলেছেন, লিখছি খুব সহজে। লেখার পর কেমন যেনো স্তব্ধ হয়ে গেলাম। শিক্ষক...? এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন জগৎবিখ্যাত বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসু, মনীষী জি সি দেবের মতো মানুষেরা!

সবার জীবনেই তো শিক্ষকের ভূমিকা আছে। আপনি একবার কল্পনা করে দেখেন তো ঘটনাটি?

বলছি কুয়েত মৈত্রী হলের কথা।

আর সেই শিক্ষকের নাম ড. শবনম জাহান। তাকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে।

খ. ‘রোকেয়া হলে উদ্ধার হলো বাক্স ভর্তি ব্যালট’ (মানবজমিন, ১১ মার্চ ২০১৯)।

রোকেয়া হলে বাক্সভর্তি ব্যালটপেপার লুকিয়ে রেখে শিক্ষার্থীদের কাছে ধরা পড়ার সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।

শিক্ষক ভোট গ্রহণ শুরুর আগে শিক্ষার্থীদের ছয়টি ব্যালটবাক্স দেখান। শিক্ষার্থীরা বলেছেন, আরও তিনটি ব্যালটবাক্স থাকার কথা, সেগুলো কোথায়? শিক্ষার্থী-শিক্ষক তুমুল তর্ক, হৈচৈ শুরু হয়েছে। দেখানো ছয়টি ব্যালটবাক্স সিলগালা করতেও রাজি হচ্ছিলেন না হল প্রভোস্ট ড. জিনাত হুদা। তৈরি হয় গোলযোগপূর্ণ পরিবেশ।

সেখানে হাজির হন কোটা আন্দোলনের নেতা নুরুল হক নূরসহ অনেকে। বন্ধ দরজা খুললে সন্ধান পাওয়া যায় ব্যালটপেপার ভর্তি তিনটি বাক্সের। হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. জিনাত হুদা দরজায় দাঁড়িয়ে রুমে ঢুকতে বাধা দিয়েছিলেন।

প্রভোস্ট যদিও বলছেন- এগুলো নিরাপদ রাখার জন্যেই ঐ রুমে রাখা হয়েছিলো।

রোকেয়া হলে ভোট গ্রহণ শুরু হয় দেড়-দুই ঘণ্টা দেরিতে।

রোকেয়া হলের পাঁচজন শিক্ষার্থী নির্বাচনে কারচুপির প্রতিবাদে, পুনরায় নির্বাচন এবং প্রভোস্ট ড. জিনাত হুদার পদত্যাগের দাবিতে অনশন করছেন। আরও কয়েকজন শিক্ষার্থী অনশন করছেন রাজু ভাস্কর্যের সামনে।

কুয়েত মৈত্রী হলের বস্তা-ভর্তি ব্যালটপেপারে ছাত্রলীগ প্রার্থীদের পক্ষে ভোট দেওয়া ছিলো। রোকেয়া হলের ব্যালটপেপারে ভোট দেওয়া ছিলো না।

৩. ডাকসু নির্বাচনে বড় রকমের এই অন্যায়-অনৈতিক কর্মকাণ্ডগুলো দৃশ্যমান হয়েছে। অন্য তিনটি মেয়েদের হলেও প্রতিরোধ হয়েছে, নির্বাচন পরিচালনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা যা ধারণা করেছিলেন তার চেয়ে বহুগুণ বেশি। শামসুন নাহার হলে শিক্ষার্থীরা সারারাত জেগে পাহারা দিয়েছেন, শিক্ষকও অনৈতিক পথে হাঁটেননি। শিক্ষক শিক্ষকের মতো দায়িত্ব পালন করেছেন। ফলে বস্তা-ভর্তি বা ব্যালটবাক্স আগে থেকে ভর্তির ঘটনা ঘটেনি। শিক্ষার্থীরা ভোট দিয়ে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচিত করতে পেরেছেন। ছাত্রীরা যেভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন, ছাত্র হলগুলোতে তেমন প্রতিরোধ দেখা যায়নি।

৩. ছাত্ররা কী প্রতিরোধ করতে পারেননি?

ছাত্র হল আর ছাত্রী হলের পরিবেশ-পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। ছাত্রী হলে ছাত্রলীগ একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। বাম সংগঠনগুলোর কার্যক্রম সক্রিয় আছে। এক সময় ছাত্রলীগ করতেন বা ছাত্রলীগ ভাবাপন্ন বহু ছাত্রী এক ধরণের স্বতন্ত্র অবস্থান নিয়েছেন ছাত্রলীগের বিগত দিনের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ স্বরূপ।

ছাত্রদের হলে ছাত্রলীগ একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। সেখানে অন্য কোনো দল-মতের শিক্ষার্থীদের প্রায় প্রবেশাধিকার নেই। গণরুম-গেস্টরুম নিপীড়ন চলে মূলত ছাত্রদের উপর। ছাত্রীদের মতো বহু ছাত্র যারা ছাত্রলীগ করতেন বা ভাবাপন্ন, তারা ছাত্রলীগ থেকে দূরে সরে গেছেন। ছাত্রলীগ তাদের আদর্শ বা ভালোবাসা দিয়ে কাছে টানতে চায়নি। ক্ষমতা দিয়ে বশে রাখতে গিয়ে ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করেছে। নতুন শিক্ষার্থীরা ছাত্রলীগে যোগ দেওয়ার কথা ভাবেন না। অমানবিক গণরুমে থাকার বিনিময়ে বাধ্য হয়ে ছাত্রলীগের মিছিল-মিটিংয়ে যান।

এমনকি, নির্বাচনের সময়ও ছাত্রলীগ তাদেরকে শ্রমিকের মতো কাজ করিয়েছে। প্রথম আলো শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে সংবাদ প্রকাশ করেছে।

ছাত্রমত ছাত্রলীগের পক্ষে না থাকলেও, হলের নিয়ন্ত্রণ ঠিকই থেকেছে। নিয়ন্ত্রণ থাকার ক্ষেত্রে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী ও হলের দায়িত্বপ্রাপ্ত দলীয় শিক্ষকরা ছাত্রলীগকে সহায়তা করেছেন।

সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিপীড়নের বিরুদ্ধে এসব শিক্ষকরা কখনো কোনো অবস্থান নেননি।

বাম এবং ছাত্রদলসহ অন্যান্য সকল সংগঠন নির্বাচনের আগের কয়েকদিন এবং নির্বাচনের দিন সমগ্র ক্যাম্পাসে সক্রিয় থাকলেও, হলগুলোতে সক্রিয় থাকতে পারেননি। প্রচারণা কাজে হলে গিয়ে আবার বেরিয়ে আসতে হয়েছে। নির্বাচনের দিন তারা হলে ঢুকতে পারেননি বললেই চলে। ফলে নির্বাচনের যে চিত্র ছাত্রী হলগুলোতে দৃশ্যমান হয়েছে, ছাত্র হলগুলোর ক্ষেত্রে তেমন হয়নি। প্রকৃত অর্থে জানা যায়নি ছাত্র হলগুলোর ভেতরে কী ঘটেছিলো। প্রতি মুহূর্তে ক্যাম্পাসে বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে। যদি গণমাধ্যমের স্বাধীন প্রবেশাধিকার থাকতো, তাহলে এই বিভ্রান্তি তৈরি হতো না। ছাত্রী হলের মতো ভোটের চিত্র যদি ছাত্র হলে না ঘটে থাকে, সেটাও জানা যেতো।

৪. নির্বাচনের প্রস্তুতিকালীন সময় থেকেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এমন কিছু সিদ্ধান্ত নিচ্ছিলেন, যা শুধু প্রশ্নের পর প্রশ্ন জন্ম দিচ্ছিলো। তারা শিক্ষক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারছিলেন না, দলীয় কর্মী বা নেতার মতো হয়ে যাচ্ছিল তাদের আচরণ। কয়েকটি নমুনা-

ক. ছাত্রলীগ ছাড়া সকল সংগঠনের চাওয়া ছিলো ভোটকেন্দ্র হলে নয়, একাডেমিক ভবনে স্থাপন করতে হবে। ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রণে থাকা হলগুলোতে শিক্ষার্থীরা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবে না। একথা কারো অজানা ছিলো না। কিন্তু, শিক্ষকরা ছাত্রলীগের চাওয়া অনুযায়ী ভোটকেন্দ্র হলে রাখার সিদ্ধান্ত নিলেন। এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা ছিলো অধ্যাপক মিজানুর রহমানের। তিনি ঐতিহ্য বিবেচনায় নিয়েছেন, সাধারণ শিক্ষার্থীরা ভোট দিতে যেতে পারবেন কী না, তা বিবেচনায় নেননি।

হলে ভোট কেন্দ্র রাখার সিদ্ধান্ত যে সুষ্ঠু নির্বাচনের অন্তরায় ছিলো, নির্বাচনের দিন তা দৃশ্যমান হয়েছে।

খ. অন্য সব সংগঠনের দাবির প্রেক্ষিতে হলগুলো থেকে বহিরাগতদের বের করে দেওয়া ও সহাবস্থান নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিয়েছিলো বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। উদ্যোগের প্রথম দিন জসীম উদ্দীন হল থেকে ছাত্রলীগের বিরোধিতার মুখে পিছিয়ে আসেন শিক্ষকরা। ফলে সহাবস্থান নিশ্চিত করার আর কোনো উদ্যোগ নিতে দেখা যায়নি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে।

গ. বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা স্বাধীন, মুক্তচিন্তার মানুষ হিসেবে পরিচিত। তারাই গণমাধ্যমের উপর অতিরিক্ত কড়াকড়ি আরোপ করেছেন। যে গণমাধ্যম শিক্ষকদেরও প্রতিটি ন্যায্য দাবির পক্ষে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছে।

ঘ. প্রায় ৪৩ হাজার ভোটারের ভোট সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টার মধ্যে নেওয়া কঠিন হবে। এই যুক্তিতে ভোট গ্রহণের সময় ৪টা পর্যন্ত করার দাবি জানিয়েছিলো ছাত্রলীগ ছাড়া প্রায় সবগুলো সংগঠন। যৌক্তিক হলেও সেই দাবি মানেনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

ভোট গ্রহণ চলাকালীন অনিয়ম প্রকটভাবে দৃশ্যমান হওয়ার পর ছাত্রলীগ ছাড়া অন্য প্রায় সব সংগঠনের প্রার্থী-কর্মীরা নির্বাচনে অনিয়ম, বস্তাভর্তি ব্যালটপেপারসহ নানা বিষয় নিয়ে প্রধান রিটার্নিং অফিসার অধ্যাপক মাহফুজুর রহমানের কাছে গেছেন। তিনি অভিযোগগুলোর কোনোটাই অস্বীকার করেননি। এক ধরণের অসহায়ত্ব প্রকাশ পেয়েছে তার কথায়।বলেছেন, ‘আমি বিব্রত’। ন্যায়ের প্রতি দৃঢ়তার সন্ধান পাওয়া যায়নি তার বক্তব্যে। বলেছেন ‘আমি একা কিছু করতে পারব না। তোমরা মামলা করো। দায়িত্বশীলদের কাছে তোমাদের কথা পৌঁছে দেব।’

যিনি নিজে প্রধান রিটার্নিং অফিসার, যিনি সব সংগঠনকে সুষ্ঠু নির্বাচনের নিশ্চয়তা দিয়ে নির্বাচনে এনেছিলেন। নির্বাচন বিষয়ে যে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার তার আছে। অথচ তিনি তার শিক্ষার্থীদের কাছে ‘বিব্রত’ হয়ে ‘মামলা’ করার পরামর্শ দিয়ে দায়িত্ব শেষ করেছেন! আবার এই সময়েই উপাচার্য বলেছেন, ‘দু’একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে।’

৫. এবার আসি ফলাফল প্রসঙ্গে। ভিপি নির্বাচিত হয়েছেন নুরুল হক নুর। ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী কোটাসংস্কার আন্দোলনের নেতা নুরুল হক নুরকে ছাত্রলীগ যে কতোবার পিটিয়ে আহত- রক্তাক্ত করেছে, সেই হিসাব সম্ভবত ছাত্রলীগের কাছেও নেই।

নির্বাচনের দিনও ছাত্রলীগ নুরুলকে পিটিয়ে হাসপাতালে পাঠিয়েছিলো। প্রক্টর গোলাম রাব্বানী সবকিছু দেখেছেন, জেনেছেন। গণমাধ্যমের প্রশ্নের উত্তরে বলেছেন, ‘নুরকেই জিজ্ঞেস করেন, কেনো ছাত্রী হলে গিয়েছিলো’।

এতো প্রতিকূলতার মুখেও বিষ্ময়করভাবে নুরুল তার অবস্থান থেকে কখনো সরে যাননি। ধৈর্য-সাহস-দায়বদ্ধতা-নৈতিকতার প্রতিটি পরীক্ষায় নুরুল প্রতিবার উত্তীর্ণ হয়েছেন। নুরুল ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। মুহসীন হল ছাত্রলীগের উপ-মানবসম্পদবিষয়ক সম্পাদক ছিলেন।

নির্বাচনের আগেই লিখেছিলাম, ছাত্রলীগ ছাত্রদলকে নিয়ে চিন্তিত থাকলেও, তাদের জন্যে চিন্তার কারণ হয়ে উঠতে পারেন কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীরা।

গত কয়েক বছর আগের পহেলা বৈশাখে টিএসসি এলাকায় নারী নিপীড়ন, নিপীড়নবিরোধী শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, নিরাপদ সড়কের দাবিতে স্কুল-শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, ভ্যাটবিরোধী আন্দোলন, কোটাসংস্কার আন্দোলনসহ যতোগুলো জনসম্পৃক্ত দাবিতে শিক্ষার্থীরা সোচ্চার হয়েছেন, প্রতিটি ক্ষেত্রে ছাত্রলীগ তার বিরোধিতা করেছে। আন্দোলনকারী ছাত্রীদের নিপীড়ন করেছে, যৌন নিপীড়ন করেছে। ছাত্রী হলগুলোতে যে এতোটা প্রবল প্রতিরোধ দৃশ্যমান হলো, এর নেপথ্যে ভূমিকা রেখেছে ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ড। ছাত্রলীগ কখনো হেলমেটবাহিনী, কখনো হাতুড়িবাহিনী রূপে আবির্ভূত হয়ে শিক্ষার্থীদের নির্যাতন করেছে।

বাম সংগঠনগুলো সব আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে থেকেছে। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে, অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে বাম সংগঠনগুলোর ভালো করার সম্ভাবনা ছিলো।

এখন নুরুল ভিপি নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে কী প্রমাণ হয় না যে, নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে, কারচুপির যে অভিযোগ এসেছে তা সত্যি নয়? বস্তাভর্তি ব্যালটপেপার এবং ব্যালটবাক্স ভর্তির ঘটনা তো ঘটেছে মাত্র দু’টি হলে। অন্য হলগুলোতে নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে।

গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ। অনেকেই তুলছেন, সামনেও তুলবেন।

যে বাস্তবতায় ছাত্রী হলের অনিয়ম দৃশ্যমান হয়েছে, ছাত্র হলের চিত্র দৃশ্যমান হয়নি- তা লিখেছি। একটি নির্বাচনে কখনো প্রতিটি কেন্দ্রের অনিয়মের চিত্র তুলে ধরা যায় না। আর নির্বাচন পরিচালনাকারীরা যদি অনিয়মের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হয়ে পড়েন, তাহলে অনিয়মের চিত্র তুলে ধরা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। এক্ষেত্রে অনিয়ম তুলে ধরার সকল দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে, নির্বাচনে অংশ নেওয়া সংগঠনের নেতাকর্মীদের। তাদের এজেন্টও দিতে দেওয়া হয়নি।

যদি গণমাধ্যমের গতিবিধি এতোটা নিয়ন্ত্রণ করা না হতো, তবে সব কেন্দ্রের মোটামুটি একটি চিত্র পাওয়া যেতো। অত্যন্ত সীমিত সুযোগের মধ্যে গণমাধ্যম যখন কেন্দ্রের বাইরের অপেক্ষমাণ লাইনের নানা অনিয়ম তুলে ধরেছে, তখন শিক্ষককে দেখা গেছে গণমাধ্যম কর্মীদের সঙ্গে রূঢ় আচরণ করতে। ভোটকেন্দ্রের বাইরে যারা এমন আচরণ করেছেন, ভোটকেন্দ্রের ভেতরে (বুথের কথা বলছি না) যেখানে গণমাধ্যমের প্রবেশাধিকার ছিলো না (থাকলে ভোট গ্রহণে কোনো সমস্যা ছিলো না) সেখানে তারা সুষ্ঠু ভোটের পরিবেশ নিশ্চিত করেছেন, কাউকে কি তা বিশ্বাস করানো যাবে?

দেশের সকল নির্বাচনে স্বচ্ছ ব্যালটবাক্স ব্যবহার করা হয়। কর্তৃপক্ষ একরোখা থাকলেন নিজেদের ঐতিহ্য, নিজেদের অস্বচ্ছ স্টিলের ব্যালটবাক্সই তারা ব্যবহার করলেন। অনিয়মের চিত্রগুলো দৃশ্যমান হওয়ার পরে, শিক্ষকদের সম্পর্কে ছাত্রদের তো বটেই জনমানুষের মনেও কী এই বিশ্বাস স্থায়ী হয়ে গেলো না যে, রাতে ভোট দিয়ে ব্যালটবাক্স ভরে রাখার জন্যেই অস্বচ্ছ ব্যালটবাক্স ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিলো?

রাতের বেলা হলে ব্যালটপেপার ও বাক্স পাঠানোর বিরোধিতাও করেছিলো সব সংগঠন, ছাত্রলীগ ছাড়া। শিক্ষকরা তাদের দাবির প্রতি কর্ণপাত না করে যে সিদ্ধান্ত নিলেন, ব্যালটপেপারের বস্তা আবিষ্কারের পর শিক্ষার্থীরা কী ভাবলেন? দেশের মানুষ কী ভাবলেন?

শিক্ষক সমিতি বিবৃতি দিয়ে বলেছে, কুয়েত মৈত্রী ও রোকেয়া হলের ঘটনা গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ। শিক্ষকের জিম্মায় থাকা ব্যালটপেপারে রাত ভোট দিয়ে বস্তা ভর্তি করা হলো। ভোট কারা দিলেন, বস্তা ভর্তি কারা করলেন? শিক্ষক কী করলেন?

ষড়যন্ত্র করলেন কারা? যড়যন্ত্রই বা কীসের?

সুতরাং ভিপি হিসেবে নুরুলের বিজয় এবং অনিয়মের দৃশ্যমানতা সাপেক্ষে ‘নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে’ তা বলার সুযোগ আছে কী না, সেই সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্যে গবেষণার প্রয়োজন হয় না।

নুরুল ভিপি নির্বাচিত হওয়ার পর, ছাত্রলীগও এই নির্বাচনকে প্রহসন বলেছে। পুনরায় নির্বাচন চেয়েছে। হাসপাতাল থেকে ফেরা নুরুলকে আবারও ধাওয়া দিয়েছে। তারপর ছাত্রলীগের ভিপি প্রার্থী শোভনের নেতৃত্বে নুরুলকে ভিপি হিসেবে মেনে নিয়েছে। নুরুলও এখন পুনরায় নির্বাচন চাইছেন।

যে আটজন শিক্ষক নিজস্ব উদ্যোগে পর্যবেক্ষকের দায়িত্ব পালন করেছেন, তারা বহুবিধ অন্যায়-অনিয়ম প্রত্যক্ষ করেছেন।

অনুষ্ঠিত হয়ে যাওয়া নির্বাচন বাতিল করে, নতুন নির্বাচন দেওয়ার সুপারিশ করেছেন পর্যবেক্ষণকারী শিক্ষকরা।

নির্বাচনের পূর্ণাঙ্গ ফলাফল কোথাও দেখা যাচ্ছে না। কোন হলে কে কত ভোট পেলেন, কোথায় কে বেশি বা কম ভোট পেলেন, তা জানা যাচ্ছে না। ফলে নির্বাচনটি নিয়ে আরও বহুবিধ প্রশ্ন ও সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

৬. ২৮ বছর পরের ডাকসু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে কয়েকটি দিক উন্মোচিত হলো-

ক. ডাকসুর সবচেয়ে সম্মানজনক ভিপি পদে বিজয়ী নুরুল হক নুর এবং সমাজসেবায় কোটা আন্দোলনের আকতার ছাড়া অন্য সব পদ ছাত্রলীগের। পরাজিত হলেন কারা? পরাজিত হলেন শিক্ষকরা। কোটাসংস্কার আন্দোলনের একজন নেতা বলছিলেন, ‘ছাত্রলীগ নয়, আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন নির্বাচন পরিচালনার সঙ্গে সম্পৃক্ত শিক্ষকরা। ছাত্রলীগকে শিক্ষার্থীরা ভোট দিবে না জানতাম। কিন্তু, শিক্ষকরা ছাত্রলীগকে রাতে ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। তবুও নুরুল আর আকতারকে হারাতে পারেনি। চিন্তা করে দেখেন আমরা কতো বেশি ভোট পেয়েছি, আর ছাত্রলীগ কতো কম ভোট পেয়েছে।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা নৈতিকতার মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হতে ব্যর্থ হলেন। শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং দেশের মানুষকে লজ্জায় ফেলে ইমেজ হারালেন। মানুষ দেখলেন ‘রাতে ভোট’র মতো নৈতিক স্খলনজনিত কর্মকাণ্ডের সঙ্গে শিক্ষকরাও সম্পৃক্ত। আবার মানুষ এটাও জানলেন, সংখ্যায় কম হলেও কিছু শিক্ষক এখনো আছেন যারা নীতি-নৈতিকতার সঙ্গে কোনো প্রকার আপোষ করেন না।

খ. আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় থাকার সুযোগে ছাত্রলীগ দৃশ্যমানভাবে আছে, বিএনপির ছাত্রদল অদৃশ্য হয়ে গেছে। ছাত্রদল সাংগঠনিকভাবে নেই, সমর্থনে কতোটা আছে তা বোঝা যেতো সুষ্ঠু নির্বাচন হলে। ছাত্রলীগের দৃশ্যমান দাপট আর সমর্থনে যে ব্যাপক ফারাক, তা বুঝতে কষ্ট হয় না।

গ. ছাত্রলীগ-ছাত্রদলের প্রচলিত ধারার ছাত্র রাজনীতির প্রতি যে শিক্ষার্থীদের মোহ কেটে গেছে- তা মোটামুটি পরিষ্কার হয়েছে।

ছাত্রদলের অনুপস্থিতিতে, ছাত্রলীগের প্রবল বিরোধিতা উপেক্ষা করে, বাম ছাত্র সংগঠন ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা সফল আন্দোলন করেছেন।

শিক্ষার্থীদের পক্ষ নিয়ে অধিকার আদায়ের সংগ্রামে সরব থাকায় কোটাসংস্কার আন্দোলনকারীরা শিক্ষার্থীদের কাছে জনপ্রিয় ছাত্রনেতায় পরিণত হয়েছেন। বাম ছাত্রনেতারা তাদের ইমেজ বৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়েছেন।

ঘ. ভিন্নমত হলেই ‘জামায়াত-রাজাকার’ আখ্যা দেওয়ার নীতি যে শিক্ষার্থীরা প্রত্যাখ্যান করেছেন, তা কিছুটা হলেও বোঝা গেছে। নির্বাচন সুষ্ঠু হলে তা আরও বড়ভাবে বোঝা যেতে পারতো।

৭. নির্বাচন বর্জন করেও, ঘোষিত ফলাফল অনুযায়ী ভিপি নুরুল হক নুর। বর্জন করেছেন আরও চারটি প্যানেলের সঙ্গে সম্মিলিতভাবে, নির্বাচিত হয়েছেন ভিপি পদে নুরুল ও সমাজসেবা সম্পাদক পদে আকতার হোসেন। নুরুলের জন্যে এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার কঠিন পরীক্ষা। নুরুল ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে আন্দোলনে থাকতে পারেন অন্যদের সঙ্গে। আবার ভিপি পদে থেকে একই সঙ্গে ভেতরে-বাইরে আন্দোলনে সক্রিয় হতে পারেন। শিক্ষার্থীদের অধিকার ও অন্যায্য দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকতে পারেন।

সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে নুরুলের চেয়েও বেশি বিচক্ষণতার পরিচয় দিতে হবে বর্জনকারী অন্যান্য সংগঠনের নেতৃবৃন্দকে।

ডাকসু নির্বাচনের মতো একটি নির্বাচন পরিচালনা করলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। কিন্তু, সমাজে বিশ্বাসযোগ্যতা পেলো না যে, তারা নৈতিকতা বজায় রেখে সুষ্ঠু নির্বাচন করতে পেরেছেন।

একটি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সমাজে কোন পরিচয়ে নিজেদের পরিচিত করলেন, তা কী ভেবে দেখার মতো সময় তাদের আছে!

Comments

The Daily Star  | English
Awami League's peace rally

Relatives in UZ Polls: AL chief’s directive for MPs largely unheeded

Ministers’ and Awami League lawmakers’ desire to tighten their grip on grassroots seems to be prevailing over the AL president’s directive to have their family members and relatives withdrawn from the upazila polls. 

43m ago