লজ্জা-অপমানের টেলিকম বা ইন্টারনেট সেবা

বিষয়টি কতোটা লজ্জার আর কতোটা দুঃখের সেটি বুঝতেও সমস্যা হচ্ছে।
ইন্টারনেট ডেটা প্যাকেজ

বিষয়টি কতোটা লজ্জার আর কতোটা দুঃখের সেটি বুঝতেও সমস্যা হচ্ছে।

এ পর্যন্ত চারটি প্রশাসনিক বিভাগ এবং রাজধানী ঢাকার মোবাইল সেবার মান নিয়ে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের ড্রাইভ টেস্টের প্রতিবেদন বেরিয়েছে।

কোথাও মোবাইল ইন্টারনেটের নির্ধারিত ন্যূনতম যে গতি তার দেখা মেলেনি। ফোরজি সেবার ক্ষেত্রে কোনো অপারেটর কাঙ্ক্ষিত সেবা দিচ্ছেন না। থ্রিজি’র ক্ষেত্রে রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি সবচেয়ে বেশী ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে; অন্যরাও কেউ কেউ কোথাও কোথাও আছেন ব্যর্থদের তালিকায়।

অথচ দেশের মোট মোবাইল গ্রাহকের অর্ধেকেরও বেশী যে সব ভৌগলিক এলাকায় আছেন, তার সেবার মান কিন্তু মাপা হয়ে গেছে বরিশাল, খুলনা, রাজশাহী, রংপুর বিভাগ এবং ঢাকা শহর এলাকার সেবার মান জরিপের মাধ্যমে।

সরকার ফোরজি ইন্টারনেটের ক্ষেত্রে নূন্যতম ডাউনলোড গতি নির্ধারণ করে দিয়েছে সাত এমবিপিএস। আর থ্রিজিতে তা দুই এমবিপিএস। ফোরজি ইন্টারনেটের ক্ষেত্রে নূন্যতম গতির অর্ধেকও পাওয়া গেছে অনেক জায়গায়। বিটিআরসি’র প্রতিবেদন বলছে, সাত এমবিপিএস গতি তারা কোথাও পাননি। থ্রিজি’র বেলায়ও তাই।

তারপরেও হয়তো কোনো কোনো অপারেটর আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার রেফারেন্স দিয়ে বিজ্ঞাপন প্রচার করবেন যে তারাই সবচেয়ে দ্রুতগতির ইন্টারনেট সেবা দিচ্ছেন।

ড্রাইভ টেস্টে ভয়েস কলের ফল দেখেন, সেখানেও একটা পয়েন্টে কোনো অপারেটর হয়তো কোনো রকম পাস নম্বর পেয়েছে তো আরেকটা ছুটে গেছে।

কল ড্রপের সর্বোচ্চ হার ধরা আছে দুই শতাংশ। কারো কারো ক্ষেত্রে সেটি প্রায় আট শতাংশে পৌঁছেছে। তাহলে মানুষ কথা বলবে কীভাবে? ইন্টারনেট-ই বা বিরক্তিহীনভাবে কীভাবে ব্যবহার করবেন?

অথচ এর কোনো টেস্টই কিন্তু বিটিআরসি’র ইঞ্জিনিয়াররা কানাগলি বা ঘরের অন্ধকারের মধ্যে গিয়ে করেননি যে অজুহাত দাঁড় করাবেন। করেছেন ফাঁকা রাস্তায় দাঁড়িয়ে। ডিভাইসের মান নিয়ে প্রশ্ন করারও সুযোগ নেই যে বলে দেবেন ‘আপনার হ্যান্ডসেট খারাপ, তাই নেটওয়ার্ক ভালো মিলছে না।’

অত্যাধুনিক সব যন্ত্রপাতি দিয়ে পরিমাপ করা হয়েছে- একটি ভয়েস কল সফল হতে কতো সময় লাগে? কলটির গুনগত মান কেমন? কল ড্রপের হার কতো? বা ইন্টারনেট ক্ষেত্রে হলে আপলিংক বা ডাউনলিংক স্পিডটাই বা কতো?

তবে, ইন্টারনেট ব্যবহারে গ্রাহকের কাছে যেহেতু ডাউনলিংকই বেশী গুরুত্বপূর্ণ সুতরাং ডাউনলিংকে নূন্যতম স্পিড না থাকলে সেটা নিয়ে কথা বাড়ানোর সুযোগ নেই।

বিটিআরসিকে ধন্যবাদ বলতেই হবে, যে সংস্থাটির প্রতিষ্ঠার দেড় যুগের মাথায় এসে তারা প্রথমবারের মতো এমন সেবা পরিমাপের আয়োজন করেছেন এবং তার প্রতিবেদন প্রকাশ করেছেন। না হলে মোবাইল ফোন ব্যবহারে মানুষের যে ভোগান্তি, যে ত্যক্ত-বিরক্তিকর অভিজ্ঞতা তা কেবল অনির্ধারিত আলোচনার বিষয় হিসেবেই থেকে যেতো। যদিও টেস্ট করে তা প্রকাশ করাই বিটিআরসির কাজ নয়। মোবাইল অপারেটররা যাতে সেবা দিতে বাধ্য হন, তা দেখার দায়িত্ব বিটিআরসির। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, জনস্বার্থে বিটিআরসিকে এক্ষেত্রে কখনো কার্যকর উদ্যোগ নিতে দেখা যায় না। কখনও কখনও কিছু কথা বলার মধ্যে তাদের দায়িত্ব সীমিত রাখেন।

মোবাইল ফোন যারা ব্যবহার করেন তাদের এমন কাউকেই হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে না, যার সেবার মান নিয়ে কম-বেশী অভিযোগ নেই। কিন্তু এতোদিন কে শুনতো কার কথা। অপারেটররাই কি খুব একটা গুরুত্ব দিয়েছে সাধারণের অভিযোগের? বা মিডিয়ার রিপোর্টের?

যতোদূর মনে পড়ছে, ২০১০ সালেই হয়তো প্রথম প্রতিবেদন লিখেছিলাম যে বিটিআরসি সেবার মান পরিমাপের এমন বন্দোবস্ত করছে এবং সেবার মানের ওপর ভিত্তি করেই তারা অপারেটরদের র‌্যাংকিংও করবে।

মাঝখানে আট বছর পেরিয়ে গেছে, সেটা নিয়ে আক্ষেপ না করলেও শেষ পর্যন্ত বিষয়টি যে সামনে এসেছে সেটাও কম বড় নয়।

তবে, বিষয়টি নিয়ে দুশ্চিন্তাও আছে। বিটিআরসি’র ড্রাইভ টেস্ট যেভাবে দুর্গন্ধ তুলে আনছে তাতে এরপরও কি তারা এমন পরীক্ষা করার সাহস আর দেখাবে? পেছনে আছে উদাহরণ। বছর দুয়েক আগের কথা, বিটিআরসি সেবার সেবার নাম নিয়ে গণশুনানির আয়োজন করেছিল। সেটিও ছিল বিটিআরসি’র আয়োজনে ওই ধরনের প্রথম কোনো জন বা গণশুনানি।

আরও এমন গ্রাহকশুনানি আয়োজনের কথা ছিল। কিন্তু ন্যাড়া তো আর বেল তলায় বারবার যায় না।

গল্পটা এখানেই শেষ করে দিলে এটি অর্ধেক গ্লাস পানির মতো হয়ে যাবে। সে কারণে আরও একটু এগিয়েও যাওয়া দরকার।

এটা কিন্তু সত্যিই যে মোবাইল ফোন অপারেটররা এখন আর তাদের নিজেদের ইচ্ছে বা প্রয়োজন মতো নেটওয়ার্ক তৈরি করতে পারছে না। আবার আগে যেখানে মোবাইল সেবার ক্ষেত্রে ফাইবার অপটিক কেবল জরুরি ছিল না, এখন পরিস্থিতি একেবারেই ভিন্ন। ফাইবার অপটিক ছাড়া কোনো কিছুই করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। অথচ এর অধিকার মোবাইল ফোন অপারেটরের হাতে নেই। বিষয়টি অনেকটা এমন যে কাঁচামাল সরবরাহের দায়িত্ব আরেকজনের, কিন্তু সেবার মানের জন্যে মোবাইল অপারেটরদেরকেই গালমন্দ করে যাচ্ছি।

একটা সময় অপারেটররা তাদের নিজেদের প্রয়োজনীয় মোবাইল টাওয়ার তৈরি করতে পারতো। কিন্তু এটিও তাদের হাত থেকে ছুটে গেছে। এখানেও নতুন লাইসেন্স এসেছে। সুতরাং কোথাও গ্রাহক বেড়ে গেলে অল্প সময়ের মধ্যে নেটওয়ার্ক বাড়িয়ে বা ফাইবার বসিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সেটি আর তাদের হাতে নেই। মোবাইল অপারেটরদেরকে এখন তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে আরেক কোম্পানির বিনিয়োগের দিকে।

যারা দেড় দুই দশক ধরে মোবাইল ব্যবহার করছেন, এটা স্বীকার করবেন যে শুরুর সময়ে কলড্রপ, কল ফেইলর বা কল আনসাক্সেসফুল এসব কোনো শব্দ তখন ছিল না। তখন সময়ের তুলনায় সেরা সেবাটাই পেয়েছেন আমাদের গ্রাহকরা।

১৯৯৬ সালে যখন তিনটি বড় অপারেটর এক সঙ্গে যাত্রা করে তখন অপারেটরদের অপরিহার্য যে কাঁচামাল স্পেকট্রাম সেটি তারা পেয়েছেন বিনা পয়সায়। এরপর ২০০৮ সালে প্রথম তাদের ৮০ কোটি টাকা প্রতি মেগাহার্টজ করে কিনতে হয়েছে স্পেকট্রাম নামের এই অদৃশ্য বস্তু। ২০১১ সালে লাইসেন্স নবায়নের সময় এর দাম ধরা হয় প্রতি মেগাহার্টজ দেড়শ কোটি টাকা করে, সঙ্গে ১৫ শতাংশ ভ্যাট। তখন প্রত্যেক অপারেটরের কাছে ১৫ মেগাহার্টজের ওপরে স্পেকট্রাম ছিল। সুতরাং কতো টাকা সরকার পেয়েছে সেই হিসেবটাও করতে হবে।

২০১১ সালের ধাক্কাতেই বাংলাদেশে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশী দামের স্পেকট্রামের দেশের স্বীকৃতি পেয়ে যায়। যদিও তার আগে মেলে সবচেয়ে কম রেটে কল করার স্বীকৃতি। এরপর ২০১৩ সালে এসে স্পেকট্রামের দাম গেল আরও খানিকটা বেড়ে। ফলে এই ১৬ কোটি কার্যকর মোবাইল সংযোগকে সামলাতে অপারেটরদের যে পরিমাণ স্পেকট্রাম লাগার কথা সেটা আর তারা নিচ্ছেন না দামের কারণে।

শেষ পর্যন্ত ব্যাপারটা যা দাঁড়ালো তার পুরোটা গেল গ্রাহকের ওপর দিয়ে। কতো কম খরচে সেবা পাচ্ছি তার চেয়ে বড় প্রশ্ন তো এখন সেবাটি কি আসলে পাচ্ছি যা দিয়ে সন্তুষ্টির সঙ্গে কাজ করা যায় বা দেশকে ডিজিটাল করার পথে জোর কদমে হাঁটা যায়?

দিন কয়েক আগে এক নেটওয়ার্ক ভেন্ডর কোম্পানির এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলছিলেন, এই একই প্রযুক্তি দিয়ে ভারত, শ্রীলংকা বা সিঙ্গাপুরের গ্রাহকরা অনেক বেশী গতির ইন্টারনেট আর গুনগত সেবা পায়, কিন্তু বাংলাদেশে পায় না।

কেনো সেবাটি পায় না তার উত্তর রয়ে গেছে সরকারের নীতির মধ্যে। সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা কী চায়? গ্রাহক সন্তুষ্টি নাকি একটা ব্যবসা ভেঙে মাঝখানে কয়েকটি মধ্যস্বত্বভোগী বসিয়ে তাদেরকেও ব্যবসার সুযোগ করে দেওয়া। অথবা যেখান থেকে সহজে টাকা পাওয়া যায় সেখান থেকেই বারবার রাজস্ব বের করে নেওয়া।

এইসব প্রশ্নের উত্তর না মেলালে সন্তুষ্ট হওয়ার মতো টেলিকম সেবা হবে সুদূর পরাহত এক স্বপ্ন।

লেখক: সিনিয়র রিপোর্টার, দ্য ডেইলি স্টার।

[email protected]

Comments

The Daily Star  | English

Lifts at public hospitals: Horror abounds

Shipon Mia (not his real name) fears for his life throughout the hours he works as a liftman at a building of Sir Salimullah Medical College, commonly known as Mitford hospital, in the capital

3h ago