ক্রয় ব্যবস্থার গোড়ায় গলদ: সুবিধা পান না কৃষক

ঈদের আগে দেশজুড়ে কৃষকদের আহাজারি। ধানের দাম পাচ্ছেন না কৃষকেরা। ঋণ করে ধান উৎপাদন করে এখন কৃষকেরা তাদের উৎপাদন খরচও তুলতে পারছেন না। সার, কীটনাশকের দাম শোধ করার জন্য কৃষক বাধ্য হচ্ছেন ৫০০-৬০০ টাকায় ধান বেচতে।
Paddy
রাজশাহীর মোহনপুরে গুদামে নিজের ধান বিক্রির তদারকি করছেন স্থানীয় কৃষক লীগের সভাপতি। ছবি: পিনাকী রায়

ঈদের আগে দেশজুড়ে কৃষকদের আহাজারি। ধানের দাম পাচ্ছেন না কৃষকেরা। ঋণ করে ধান উৎপাদন করে এখন কৃষকেরা তাদের উৎপাদন খরচও তুলতে পারছেন না। সার, কীটনাশকের দাম শোধ করার জন্য কৃষক বাধ্য হচ্ছেন ৫০০-৬০০ টাকায় ধান বেচতে।

এ অবস্থা উত্তরণে কদিন আগে কৃষিমন্ত্রী কৃষকদের সহায়তার জন্য ১০ থেকে ১৫ লাখ টন চাল রপ্তানি, কৃষিযন্ত্রে ভর্তুকি দেওয়াসহ নানা পদক্ষেপের ঘোষণা দিলেন। চালের আন্তর্জাতিক বাজারদর যেহেতু কম সেজন্য সরকারের পক্ষ থেকে রপ্তানির ওপর ৩০ ভাগ হারে ভর্তুকিও দেওয়া হবে।

কিন্তু এসব পদক্ষেপ প্রান্তিক কৃষককে কতোটুকু সাহায্য করবে সেটা কী আমরা কখনো ভেবে দেখেছি?

বেসরকারি খাতে চাল রপ্তানি করা হলে, চাল ব্যবসায়ী ও মিল মালিকেরা তাদের মজুদ খালি করতে পারবে, তারা উপকৃত হবে। তাতে করে অবশ্য অভ্যন্তরীণ বাজারে ধানের চাহিদা বাড়বে, দামও বাড়বে। কিন্তু, যেসব প্রান্তিক কৃষক ইতোমধ্যে তার উৎপাদিত ধান মন প্রতি তিন থেকে চারশ টাকা ক্ষতিতে বিক্রি করেছেন তারা কীভাবে উপকৃত হবেন?

আসলে আমাদের বিদ্যমান খাদ্যশস্য সংগ্রহ নীতিমালা এবং কৃষকদের প্রণোদনা দেওয়ার যে ব্যবস্থা রয়েছে, তার কোনোটিই গরিব প্রান্তিক কৃষকবান্ধব নয়।

আমাদের অভ্যন্তরীণ খাদ্যশস্য সংগ্রহ নীতিমালা ২০১৭ এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যতে উৎপাদক কৃষকদের উৎসাহ মূল্য প্রদান এবং খাদ্য শস্যের বাজারদর যৌক্তিক পর্যায়ে স্থিতিশীল রাখার কথা স্পষ্ট করে বলা রয়েছে।

রাজশাহীর মোহনপুরে এক গরিব কৃষক ধান বিক্রিও করতে পারেনি এমনকী গুদামে রাখতে পারেননি। নিজের ঘরেরও সেই ধান রাখার ব্যবস্থা না থাকায় কোনো রকমে তা ঘরের বারান্দায় রেখেছেন। ছবি: পিনাকী রায়

কিন্তু, বিদ্যমান সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী আমাদের গরিব বর্গা চাষিরা সরকারের দেওয়া  কোনো সুফল আদৌ পান কি?

থানা পর্যায়ে আমাদের কৃষকদের যে তালিকা রয়েছে সেটি কতো আগে করা হয়েছিলো? এই তালিকায় কি আমাদের গরিব প্রান্তিক চাষিদের নাম আছে?

সম্প্রতি, এরকম কিছু ‘কৃষক তালিকা’ ধরে তালিকাভুক্ত কৃষকদের ঘরে ঘরে গিয়ে দেখা গেছে, তালিকার অনেকেই এখন আর নিজে কৃষিকাজে যুক্ত নন। এই তালিকায়  কৃষিকার্ডধারী যারা রয়েছেন তাদের মধ্যে সিটি কর্পোরেশনের কাউন্সিলর, ব্যবসায়ী, কন্ট্রাকটর, দোকানদার, ফড়িয়া, আড়ৎদার এসব পেশার লোক রয়েছেন।

এদের মধ্যে একজন বগুড়ার সদর উপজেলার ধাওয়াকোলা গ্রামের আলম খান। তিনি জানালেন যে তিনি কৃষিকাজ ছেড়েছেন ২৭ বছর আগে। এখন তিনি দোকানদারী করেন। অথচ সরকারি গুদামে ধান সরবরাহকারী কৃষক হিসেবে তার নাম তালিকাভুক্ত রয়েছে। আলম খান জানালেন যে তার বর্গা দেওয়া জমিতে বড়জোর এক-দেড় টন ধান হয়। কিন্তু, তালিকায় তার নামের পাশে লেখা ৫ টন ধান উৎপাদনকারী হিসাবে।

রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কমিশনার নুর মোহাম্মদ মোল্লাহ বর্তমান কমিশনারের পিতা। তিনিও কৃষক হিসেবে তালিকাভুক্ত রয়েছেন।

নূর জানালেন, তিনি ধান চাষ করেন না গত চার-পাঁচ বছর ধরে। এখন তিনি তার জমিতে মাছের চাষ করছেন। অথচ তিনিও সরকারি তালিকাভুক্ত বোরো কৃষক।

মান্ধাতার আমলে তৈরি করা সেই কৃষক তালিকা ধরেই কৃষকদের ব্যাংক একাউন্ট করা হয়েছে, কৃষকদের ভর্তুকিও দেওয়া হয় সেই তালিকা অনুযায়ী। আর লোক দেখানো ধান সরবরাহকারী কৃষকের তালিকাও করা হয়, এই তালিকা থেকে নিয়ে। তালিকায় যেসব কৃষকের নাম রয়েছে তাদের বেশিরভাগই জানেনও না যে তাদের নাম সেই তালিকায় রয়েছে।

বগুড়া সদরে ধানের আর্দ্রতা মাপা হচ্ছে। ছবি: স্টার

আসল কথা হচ্ছে, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের পছন্দের লোক বা স্থানীয় সরকারি দলের লোকজনই আসলে সরকারি গুদামে ধান সরবরাহের সুযোগ পায়। আর তারা কেউই প্রান্তিক কৃষক নন। ক্ষেত্র বিশেষে তারা গরিব কৃষকের ধান কম দামে কিনে বেশি দামে সরকারি গুদামে সরবরাহ করে থাকেন।

এই গোড়ায় গলদের কারণে, প্রান্তিক কৃষক সরকারের দেওয়া সুযোগ-সুবিধা কতোটুকু ভোগ করতে পারেন তা কি নীতিনির্ধারকরা ভেবে দেখেছেন?

কৃষকদের সাহায্য করার জন্য সরকার কৃষকদের কাছে থেকে ধান কেনার যে নীতিমালা করেছে সেটিও কিন্তু কৃষকবান্ধব নয়।

রাজশাহী, নওগাঁ ও বগুড়ার প্রান্তিক কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, যদি ‘কৃষক তালিকা’ রাজনৈতিক প্রভাব মুক্ত হয়ও, তবুও আমাদের খাদ্যশস্য সংগ্রহের নির্দেশনায় যেসব শর্ত রয়েছে সেগুলো প্রান্তিক কৃষকরা পূরণ করতে পারেন না।

ধান কেনার সময় শর্তের মধ্যে রয়েছে– ধানের আর্দ্রতা হতে হবে সর্বোচ্চ ১৪ শতাংশ। এছাড়াও ধানে বিজাতীয় পদার্থ থাকবে দশমিক পাঁচ ভাগ, ভিন্ন জাতের ধানের মিশ্রণ সর্বোচ্চ ৮ ভাগ, অপুষ্ট ও বিনষ্ট দানা ২ ভাগ ও চিটা ধান দশমিক ৫ ভাগ।

তারা বাড়িতে ধান শুকিয়ে খাদ্য গুদামে সরবরাহ করতে গেলে বেশির ভাগ সময় তা ফেরৎ দেওয়া হয়। কারণ ধান যথেষ্ট শুকনো নয়।

কৃষিকর্মকর্তা, খাদ্য কর্মকর্তা সবাই একবাক্যে বলছেন, ইচ্ছা থাকলেও তারা অনেক সময় কৃষকদের কাছ থেকে ধান কিনতে পারেন না। কারণ কৃষকেরা বাড়ির মাটির উঠানে ধান শুকালে তার আর্দ্রতা ১৫ বা ১৬ শতাংশের নিচে সাধারণত নামে না। ধানের আর্দ্রতা ১৫ এর নিচে নামাতে গেলে সে ধান শুকাতে হবে চাতালে অথবা যে কোনো কংক্রিটের চত্বরে।

এই সত্য জানা থাকার পরেও, দুই বছর আগে বানানো খাদ্য শস্য সংগ্রহ নীতিমালায় এই শর্ত কীভাবে ঠাই পায়?

অথচ আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গে কৃষকদের কাছ থেকে ধান সংগ্রহের সময় আর্দ্রতার পরিমাপ করা হয় না। গুদামজাত করার আগে সরকার নিজ দায়িত্বে ধান শুকিয়ে নেয়।

এবছর সরকার আগে আগে ধানের দাম মন প্রতি ১,০৪০ টাকা দরে নির্ধারণ করে ধান কেনার ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু, সরকার কিনছে কতোটুকু ধান? ঘোষণা অনুযায়ী মোট উৎপাদিত বোরো ধানের মাত্র এক ভাগ সরকার সরাসরি কৃষকদের থেকে কিনে নিবে।

সেই এক ভাগ ধানও বিদ্যমান ব্যবস্থায় প্রকৃত কৃষকরা সরাসরি সরকারকে দিতে পারছে না। বরং কৃষকদের কাছ থেকে কম দামে কিনে নিয়ে দালালও মধ্যস্বত্বভোগীরা সরবরাহ করছে সরকারি গুদামে।

কিন্তু কৃষিভিত্তিক বাংলাদেশে, যারা আমাদের খাদ্য শস্য উৎপাদন করে তারা যদি বাঁচতে না পারেন, তারা যদি আমাদের অর্থনৈতিক উন্নতির সুফল না পান, তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন না ঘটে, তাহলে আমাদের অর্থনীতি যতোই মজবুত হোক না কেনো, বুঝতে হবে এ উন্নয়নে গলদ রয়েছে। এ উন্নয়ন মেকি।

পিনাকী রায়, প্রধান প্রতিবেদক, দ্য ডেইলি স্টার

[email protected]

Comments