অবজ্ঞা-অবহেলায় মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা

খোলা জায়গায় ফেলে রাখা মেডিকেল বর্জ্য জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি। রাজধানী ছাড়া দেশের অন্যান্য বিভাগীয় শহরগুলোতে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে ১,৩৮০টি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। প্রতিদিন এসব প্রতিষ্ঠান থেকে ২০ টনের বেশি মেডিকেল বর্জ্য উৎপাদন হয়। সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা না থাকায় যা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের বড় শহরগুলোর মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চিত্র তুলে ধরবে দ্য ডেইলি স্টার। এই পর্বে তুলে ধরা হলো ময়মনসিংহ শহরের মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা।
ময়মনসিংহের ময়লাকান্দা: যেখানে সাধারণ বর্জ্যের সঙ্গে মেডিকেল বর্জ্যও বছরের পর বছর একসঙ্গে স্তুপ করে রাখা হচ্ছে। ছবি: মো. আমিনুল ইসলাম

খোলা জায়গায় ফেলে রাখা মেডিকেল বর্জ্য জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি। রাজধানী ছাড়া দেশের অন্যান্য বিভাগীয় শহরগুলোতে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে ১,৩৮০টি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। প্রতিদিন এসব প্রতিষ্ঠান থেকে ২০ টনের বেশি মেডিকেল বর্জ্য উৎপাদন হয়। সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা না থাকায় যা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের বড় শহরগুলোর মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চিত্র তুলে ধরবে দ্য ডেইলি স্টার। এই পর্বে তুলে ধরা হলো ময়মনসিংহ শহরের মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা।

ময়মনসিংহ শহরে বেশিরভাগ স্বাস্থ্যসেবা দানকারী প্রতিষ্ঠানই মেডিকেল বর্জ্য অপসারণের যথাযথ নিয়ম মানছে না। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অবহেলা এবং সংকট সমাধানে প্রয়োজনীয় সরকারি কোনো ব্যবস্থাও নেই।

জেলা সিভিল সার্জন অফিস থেকে পাওয়া তথ্য অনুসারে, ময়মনসিংহ শহরে ২২১টি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। যার মধ্যে হাসপাতাল ও ক্লিনিক ১৩১ টি এবং ডায়াগনস্টিক সেন্টার ৯০টি।

চিকিৎসা-বর্জ্য (ব্যবস্থাপনা ও প্রক্রিয়াজাতকরণ) বিধিমালা, ২০০৮ অনুসারে, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের অবশ্যই মেডিকেল বর্জ্য পুড়িয়ে ফেলা এবং জীবাণুমুক্ত করার নিজস্ব ব্যবস্থা থাকতে হবে।

তবে শহরের কোনও হাসপাতাল, ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে এরকম কোনো ব্যবস্থাই দেখা যায়নি। বেশিরভাগ স্থানেই সিটি করপোরেশনের ডাস্টবিন এবং খোলা জায়গায় অন্যান্য বর্জ্যের সঙ্গে মেডিকেল বর্জ্য ফেলে রাখতে দেখা গেছে। বিশেষ করে শহরের চর কালীবাড়ির ময়লাকান্দার ভাগারে মেডিকেল বর্জ্য ফেলা হচ্ছে।

এ পরিস্থিতিতে, ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন (এমসিসি) এর সহযোগিতায় নব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠান গত বছরের সেপ্টেম্বরে শহরের আকুয়া এলাকায় মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার একটি ইউনিট স্থাপন করে।

ইউনিট স্থাপনে সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠানটিকে ১৮ শতক জমি বরাদ্দ দেয় বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবুল হাসনাত ইপু। সেখানে ইতিমধ্যে বর্জ্য পোড়ানোর চুল্লি (ইনসিনেটর), দুটি পিট এবং একটি বর্জ্য পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ (রিসাইক্লিং) ইউনিট স্থাপন করা হয়েছে। তিনি আরো জানান, এজন্য তাদের  নিজস্ব তহবিল থেকে ৪০ লাখ টাকা খরচ হয়েছে।

তবে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর মাত্র ১৮ দশমিক ছয় তিন শতাংশ মাসিক ফি’র বিনিময়ে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ইউনিট ব্যবহার করে বলে জানান তিনি।

“আমরা প্রতিমাসে হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর জন্য ২,০০০-৩,০০০ টাকা ফি ধার্য করেছি। এখন পর্যন্ত মাত্র ৪১টি হাসপাতাল এই সেবা নিচ্ছে", বলেন তিনি।

শহরের সবচেয়ে বড় সরকারি হাসপাতাল ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (এমএমসিএইচ) এ গিয়ে দেখা যায় মেডিকেল বর্জ্য পুড়িয়ে ফেলে না, এমনকি জীবাণুমুক্তও করে না।

এমএমসিএইচের উপ-পরিচালক ডা. লক্ষ্মী নারায়ণ মজুমদার বলেছেন, যন্ত্রপাতি বসানোর মতো অবস্থা নেই। তিনি বলেন, “ আমরা একটি জায়গায় ময়লা জড়ো করি, পরে বিকেলের দিকে সিটি করপোরেশনের গাড়ি এসে সেগুলোকে ময়লাকান্দায় নিয়ে যায়।"

অপারেশন থিয়েটারের বর্জ্য মাটিতে পুতে ফেলা হয় বলেও তিনি জানান।

সিটি করপোরেশন তাদের ট্রাকে সব ধরনের বর্জ্য একসঙ্গে নিয়ে যায়, তাই মেডিকেল বর্জ্য আলাদা করে রাখলেও তেমন সুবিধা পাওয়া যায় না, জানান ডা. নারায়ণ।

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পরিদর্শনের সময় হাসপাতাল চত্বরে সাধারণ এবং মেডিকেল বর্জ্য (ব্যবহৃত সিরিঞ্জ, সূঁচ, কাঁচের নল, ব্যান্ডেজ প্রভৃতি) একসঙ্গে পরে থাকতে দেখা যায়।

বাংলাদেশ বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার মালিক সমিতির সম্পাদক ডা. এইচ এ গোলন্দাজ জানান, বেসরকারি হাসপাতালগুলো সিটি করপোরেশনকে বর্জ্য অপসারণের জন্য মাসিক ফি দেয়। তাই তারা অনেক সময় অন্য প্রতিষ্ঠানকে ফি দিতে চায় না।

ক্লিনিক মালিকদের বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় উৎসাহ দেয়া হয় বলে জানিয়েছেন তিনি।

“বিষয়টি নিয়ে আমরা সিটি কর্পোরেশন এবং নব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা লিমিটেডের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করেছি”, যোগ করেন তিনি। 

অল্প সময়ের মধ্যেই এই সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে বলেও আশা করছেন তিনি।

তাদের নিজস্ব ব্যবস্থাপনা নেই কেনো, জানতে চাইলে তিনি জানান, শহরের কোনও ক্লিনিকেরই এ জাতীয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সামর্থ্য নেই। 

যারা সঠিকভাবে মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করে না তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে জানতে চাইলে ময়মনসিংহের সিভিল সার্জন ডা. এ বি এম মশিউল আলম জানান, তাদের কয়েকবার নোটিশ দেয়া হলেও কোনো কাজ হয়নি।

পরিবেশ অধিদপ্তরও নোটিশ দেয়া ছাড়া আর কিছুই করতে পারছে না। বিভাগীয় পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক ফরিদ আহমেদের সঙ্গে কথা বলার সময় এ কথাই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

সিটি মেয়র ইকরামুল হক টিটু বলেছেন, প্রতিদিন হাসপাতাল ও ক্লিনিক থেকে উৎপাদিত তিন টন মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করা বিশাল চ্যালেঞ্জের। তিনি জানান, প্রতিটি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান নিজেরাই

তাদের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য দায়বদ্ধ।

বিষাক্ত মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সিটি করপোরেশনের দক্ষ জনবল নেই বলেও স্বীকার করেন মেয়র।

 

ময়লাকান্দার অবস্থা

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজসহ প্রায় সব হাসপাতাল ও ক্লিনিকের বর্জ্য ডাম্পিং গ্রাউন্ডে স্তুপ করা হয়েছে। এতে পরিবেশ ও স্বাস্থ্যগত নানা ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, ভাগাড় সংলগ্ন ফসলি জমিতেও বর্জ্য ছড়িয়ে পড়ছে।

ময়লাকান্দার বাসিন্দা শফিকুল ইসলাম জানান, বর্জ্যের কারণে গত দুই বছর ধরে তিনি সরিষা চাষে লোকসান গুনছেন। আরেক সরিষা চাষি আবদুল মালেকও একই কথা জানান।

এ ছাড়া দুর্গন্ধের কারণে আশেপাশের এলাকায় লোকজনের বসবাসও কঠিন হয়ে উঠেছে।

স্থানীয় বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী মুক্তা ও সুবর্ণা জানায়, দুর্গন্ধের কারণে খাবার খেতে কষ্ট হয় তাদের। 

এমএমসিএইচের অবসরপ্রাপ্ত মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. রঞ্জন কুমার মজুমদার বলেন, মেডিকেল বর্জ্যের কারণে সেখানকার বাসিন্দাদের হাঁপানি, ডায়রিয়া, অ্যালার্জি ও চোখের সমস্যাসহ নানা ধরনের রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

বর্ষা মৌসুমে বর্জ্য বৃষ্টির পানিতে মিশে ব্রহ্মপুত্র নদে চলে যায় বলে জানিয়েছেন ময়মনসিংহ পরিবেশ রক্ষা ও উন্নয়ন আন্দোলনের সম্পাদক শিব্বির আহমেদ লিটন।

তিনি বলেন, নদীদূষণ ঠেকাতে সঠিকভাবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করতে হবে।

“কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই মেডিকেল বর্জ্য সঠিকভাবে অপসারণের উদ্যোগ নিতে হবে। নিয়ম না মানার জন্য হাসপাতাল ও ক্লিনিকের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া জরুরি,” বলেন লিটন।

 

Comments

The Daily Star  | English
MP Azim’s body recovery

Feud over gold stash behind murder

Slain lawmaker Anwarul Azim Anar and key suspect Aktaruzzaman used to run a gold smuggling racket until they fell out over money and Azim kept a stash worth over Tk 100 crore to himself, detectives said.

8h ago