ভিআইপি ট্রিটমেন্ট

করোনায় আক্রান্ত ভিআইপিদের জন্য আলাদা হাসপাতাল বা হাসপাতালে বিশেষ ব্যবস্থা হচ্ছে— এরকম সংবাদ গণমাধ্যমে এলে তা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে। বস্তুত রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে ভিআইপিদের চিকিৎসার জন্য এরকম বিশেষ সুবিধা দেওয়া সংবিধানের অন্তত পাঁচটি অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন।
প্রতীকি ছবি। ছবি: সংগৃহীত

করোনায় আক্রান্ত ভিআইপিদের জন্য আলাদা হাসপাতাল বা হাসপাতালে বিশেষ ব্যবস্থা হচ্ছে— এরকম সংবাদ গণমাধ্যমে এলে তা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে। বস্তুত রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে ভিআইপিদের চিকিৎসার জন্য এরকম বিশেষ সুবিধা দেওয়া সংবিধানের অন্তত পাঁচটি অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন।

সরকার যদি সত্যি সত্যিই করোনায় আক্রান্ত ভিআইপিদের চিকিৎসার জন্য বিশেষ হাসপাতাল তৈরি করে বা কোনো হাসপাতালে তাদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা চালু করে, তাহলে সেটি সংবিধানের এই বিধানগুলোর আলোকে চ্যালেঞ্জযোগ্য। অর্থাৎ যেকোনো নাগরিক চাইলে এই সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে রিট আবেদন করতে পারবেন।

সংবিধানের ৭ (১) অনুচ্ছেদ বলছে, ‘প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ এবং জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতার প্রয়োগ কেবল এই সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্বে কার্যকর হইবে।’ ১৯ (১) অনুচ্ছেদ বলছে, ‘সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা নিশ্চিত করিতে রাষ্ট্র সচেষ্ট হইবে।’

২৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।’ ২৮ (১) অনুচ্ছেদ বলছে, ‘কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারীপুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোনো নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করিবেন না।’ সুতরাং জনগণ যেখানে প্রজাতন্ত্রের মালিক, রাষ্ট্র যেখানে সকল জনগণের জন্য সুযোগের সমতা নিশ্চিত করতে বাধ্য সেখানে বিশেষ কোনো গোষ্ঠীর চিকিৎসায় রাষ্ট্র কী করে বিশেষ সুবিধার সৃষ্টি করবে? এটি স্পষ্টতই এই অনুচ্ছেদগুলোর লঙ্ঘন। সংবিধানে ১৫ (ক) অনুচ্ছেদেও বলা হয়েছে, ‘জনগণের অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ জীবনধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা করা রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব।’ এখানে জনগণের চিকিৎসার ব্যবস্থা করার কথা বলা হয়েছে। আলাদা করে বিশেষ কারো জন্য বিশেষ ব্যবস্থার কথা উল্লেখ নেই। সুতরাং রাষ্ট্র যদি কারো জন্য বিশেষ চিকিৎসার উদ্যোগ নেয়, সেটা প্রকারান্তরে এই অনুচ্ছেদেরও লঙ্ঘন।

বস্তুত আমাদের দেশে ভিআইপি কালচার নতুন কিছু নয়। অন্যকে ডিঙিয়ে আগে ফেরি পার হওয়া থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের সব সুযোগ সুবিধায় তাদের অগ্রাধিকার। বাংলাদেশে একজন উপসচিব পদমর্যাদার সরকারি কর্মচারীও যেসব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন, যেরকম গাড়ি-পিয়নচাপরাশি-ফ্ল্যাট-ব্যাংক ঋণ সুবিধা পান— তা অনেক উন্নত দেশের সরকারি কর্মচারীরা কল্পনাও করতে পারেন না।

আমাদের দেশের সরকারি কর্মচারী, বিশেষ করে যারা নিজেদেরকে কর্মকর্তা ও ভিআইপি ভাবতে পছন্দ করেন, তারা যেরকম দাপট ও ক্ষমতা ভোগ করেন, তা বিশ্বের বহু দেশেই অকল্পনীয়। রাষ্ট্রের প্রতিটি বিষয় এই কল্পনাতীত ক্ষমতাবানরাই মূলত নিয়ন্ত্রণ করেন। যে কারণে প্রতিটি ক্ষেত্র থেকে তারা নিজেদের ও নিজেদের পরিবারের জন্য সর্বোচ্চ সুযোগসুবিধা নিশ্চিত করার চেষ্টা করেন। করোনার মতো বৈশ্বিক মহামারি থেকে বাঁচতেও যে তারা সেই ক্ষমতার প্রয়োগ করবেন— তাতে বিস্ময়ের কিছু নেই।

কিন্তু, রাষ্ট্র যেখানে জনগণকেই সব ক্ষমতার মালিক বলেছে, সেখানে আলাদা করে কেনো একটি গোষ্ঠীর জন্য বিশেষ সুবিধা দেওয়া হবে? আর সেই সুবিধাগুলো দেওয়া হবে কার পয়সায়? জনগণের করের পয়সায়ই তো। জনগণের করের পয়সায় ভিআইপিদের জন্য বিশেষ হাসপাতাল বা হাসপাতালে বিশেষ সুবিধা নিশ্চিত করা হবে, অথচ সেই জনগণ এ হাসপাতাল ও হাসপাতাল ঘুরে ঘুরে বিনা চিকিৎসায় মারা যাবে, এমনকী, একজন মুক্তিযোদ্ধাকেও এরকম বিনা চিকিৎসায় মরে যেতে হবে— তা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

বরং করোনার চিকিৎসায় সরকারি-বেসরকারি যেসব হাসপাতাল নির্ধারণ করা হয়েছে, সেসব জায়গায় যাতে সাধারণ মানুষ সর্বোচ্চ চিকিৎসা পায়, অর্থাৎ একজন দিনমজুরও যাতে ভিআইপির মতো চিকিৎসা পান, সেটি নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আর ভিআইপিরা যদি নিজেদের পয়সায় কোনো হাসপাতাল তৈরি করে বিশেষ সেবা নিশ্চিত করতে চান এবং সেখানে যদি জনগণের পয়সার কোনো অংশ না থাকে, তাহলে কারো আপত্তি করার কথা নয়।

কিন্তু, জনগণের পয়সায় ভিআইপিরা ফুটানি করবেন আর সেই জনগণ বিনা চিকিৎসায় কিংবা হাসপাতালে অবহেলায় মরে যাবেন— তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় এবং এটি হলে নিশ্চয়ই কেউ না কেউ উচ্চ আদালতে গিয়ে এটি চ্যালেঞ্জ করবেন।

মুশকিল হলো, সামান্য সর্দি-জ্বরেও আমাদের ভিআইপিরা সিঙ্গাপুর-থাইল্যান্ড যান। কিন্তু বিপত্তি বাঁধিয়েছে করোনা। এটি এমন রোগ যে, দেশের বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আবার কেউ ব্যক্তিগত বিমান নিয়েও যদি বিদেশে যান, সেখানেও এ মুহূর্তে কোনো হাসপাতাল তাকে ভর্তি করবে— এমন নিশ্চয়তা নেই। ফলে এই প্রথম ভিআইপিদের জন্য এমন একটি বাজে পরিস্থিতি তৈরি হলো যে, তারা পয়সা আর ক্ষমতা থাকলেও বিদেশে গিয়ে চিকিৎসা নিতে পারছেন না। বাঁচা মরা যাই হোক, দেশের মাটিতেই।

যেহেতু তারা এই নির্মম বাস্তবতাটি বুঝে গেছেন এবং যেভাবে করোনার সামাজিক সংক্রমণ হচ্ছে, তাতে যে অনেকেরই শেষরক্ষা হবে না, তাও যেহেতু পরিষ্কার— অতএব আক্রান্ত হলে অন্তত চিকিৎসাটা যাতে তারা পান, যাতে সাধারণ মানুষের মতো তাদের বিনা চিকিৎসায় অথবা উপযুক্ত চিকিৎসার অভাবে মৃত্যু না হয়, সেই চেষ্টাটি যে তারা করবেন, সেটিই স্বাভাবিক। বরং এটাকে এখন এক অর্থে ইতিবাচকভাবে দেখা যায় যে, এই উসিলায়ও যদি এই ভিআইপিরা দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার প্রকৃত চিত্রটা উপলব্ধি করেন এবং ভবিষ্যতে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা উন্নত করতে ভূমিকা রাখেন, সেটিই হবে করোনার শিক্ষা।

আমীন আল রশীদ: কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স এডিটর, রংধনু টেলিভিশন

[email protected]

 

(দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদকীয় নীতিমালার সঙ্গে লেখকের মতামতের মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির আইনগত, মতামত বা বিশ্লেষণের দায়ভার সম্পূর্ণরূপে লেখকের, দ্য ডেইলি স্টার কর্তৃপক্ষের নয়। লেখকের নিজস্ব মতামতের কোনো প্রকার দায়ভার দ্য ডেইলি স্টার নিবে না।) 

Comments

The Daily Star  | English
IMF loan conditions

3rd Loan Tranche: IMF team to focus on four key areas

During its visit to Dhaka, the International Monetary Fund’s review mission will focus on Bangladesh’s foreign exchange reserves, inflation rate, banking sector, and revenue reforms.

12h ago