জীবনযাপন

সময় যেন কাটে না! সময় কেন কাটে না?

টাইম ইউ ওল্ড জিপসি ম্যান, উইল ইউ নট স্টে, পুট আপ ইওর ক্যারাভান জাস্ট ফর ওয়ান ডে?
Lockdown
ছবি: ফিরোজ আহমেদ/ স্টার ফাইল ফটো

টাইম ইউ ওল্ড জিপসি ম্যান, উইল ইউ নট স্টে, পুট আপ ইওর ক্যারাভান জাস্ট ফর ওয়ান ডে?

সময়কে থামিয়ে রাখতে ব্রিটিশ কবি রালফ হগসন কী আকুতিই না করেছিলেন। সময় সে তো বয়ে চলে ঘড়ির কাঁটায় টিক টিক শব্দ করে। কিন্তু, সময়ের এই বয়ে চলা ধরা পড়ে থাকে মানুষের কাজে-কর্মে, ব্যস্ততায়। সে কারণেই হগসন বোধহয় আরও বলেছিলেন- গেলো সপ্তায় ছিলে ব্যবিলন, গতরাতে রোম, আর সকালে এসে আছড়ে পড়েছো সেন্টপলের গম্বুজে। হে সময় তুমি একটু থামো। একটু বেড়িয়ে যাও। তোমার জন্য স্বর্ণকার আংটি বানাবে, ময়ূর তোমায় করবে কুর্নিশ, ছোট্ট বালকেরা গাইবে গীত। বালিকারা দোলাবে নানা রঙের ফেস্টুন। সময়- হে বৃদ্ধ বেদুইন। কেন তুমি ছুটছো অমন করে, থেমে যাও একটি দিন। কিন্তু সময় কী থেমেছে কখনো? বরং দিনে দিনে তার ব্যস্ততাই বেড়েছে। মানুষের জীবনে, তাদের কাজে এমনসব ব্যবস্থা, রকমফের এসেছে, যেখানে এভরি সেকেন্ড কাউন্টস। সবশেষ তথ্যপ্রযুক্তির যুগে এসে সময়ের হিসাব নিকাশ তো মিলি সেকেন্ডে গিয়ে ঠেকেছে। সে ভাবেই চলছিলো সবকিছু। কিন্তু, এ কোন করোনাক্রান্তি এলো যখন অনেকেই বলছেন তাদের সময় যেন থমকে আছে।

মার্চ মাসটা বেশ দীর্ঘ ছিলো। ৩১ দিনে মাস। একটু দীর্ঘ তো লাগবেই। কিন্তু এপ্রিল সেও তো যেন কাটতেই চায় না। ঘরে বসে হাঁপিয়ে ওঠা মন এখন শুধুই বলছে— সময় যেন কাটে না। না কোন বিরহী কবির আকুতি নয়, যা বেজে উঠবে কোন গানের সুরে। এ আকুতি এখন গোটা বিশ্বের প্রতিটি মানুষের। আমাদের সম্মুখে সবকিছু স্থবির-স্তব্ধ হয়ে পড়ে আছে। চরাচরে যে স্তব্ধতায় একদা ঔদার্য দেখেছিলেন রবি ঠাকুর। লিখেছিলেন— শব্দহীন, গতিহীন স্তব্ধতা উদার। কিন্তু, সে উদারতাও এখন আর আমাদের ভালো লাগছে না।

কেনই বা লাগবে? করোনাভাইরাস তার বিস্তার কি কমিয়েছে? না। যেটুকু কমে আসছে তাকে কম বলা চলে না। বিশ্ব এখনও আগ্রাসী মহামারির করতলে বন্দি। এরই মধ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে— একবার আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হয়ে ওঠা মানে এই নয় যে একই ব্যক্তি আরেকদফা করোনার শিকার হবে না। দ্বিতীয়দফা আক্রান্তের সংখ্যা যেমন বাড়ছে, মৃত্যুও হচ্ছে। আমাদের ঘরে থাকা প্রলম্বিত হচ্ছে।

গত ২১ মার্চ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মানুষকে ঘরে ঢুকে পড়ার নির্দেশনা দেন। এরপর একটি মাস গত হয়েছে। আমরা লক ডাউনের পঞ্চম সপ্তাহটি পার করছি। এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে পবিত্র রমজান মাস। প্রধানমন্ত্রী আবারও উচ্চারণ করেছেন একই আহ্বান— রমজান মাসে ঘরে বসে ইবাদত করুন। ঈদের নামাজও আমরা পড়তে যেতে পারবো না তেমনটাই ইঙ্গিত তিনি দিয়েছেন তার কথায়। সেটাই স্বাভাবিক। সেটাই উচিতও বটে। কিন্তু মানুষতো হাঁপিয়ে উঠছে। মানুষ এতদিন এক ঘোরের মধ্যে ছিল। ছিল ভয়েও। তারা দেখতে পেয়েছে মানুষ মারা যাচ্ছে হাজারে হাজার। লাখ লাখ হচ্ছে করোনায় আক্রান্ত। কিন্তু, এখন ঘোর কেটেছে, কেটেছে হয়তো ভয়ও। জেগেছে শঙ্কা। বেড়েছে মনের চাপ।

কিন্তু, হলে কী হবে। কোন কথা বলার মতো সময় এখনো আসেনি। দেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত কেউ ধরা পড়ার পর ৫১তম দিন ছিলো গত ২৭ এপ্রিল। প্রথম দফা লকডাউনের সময়সীমা ছিলো ৫ এপ্রিল পর্যন্ত। সেটি দুই দফা বাড়ানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী আবারও বলেছেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে, সেপ্টেম্বর অবধি স্কুল-কলেজ বন্ধ রাখা যেতে পারে।

আন্তর্জাতিকভাবেও পরিস্থিতি একইরকম। অনেকেই বলছেন, অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে গোটা গ্রীস্ম পার করেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে কিনা। এ অবস্থায় বিশ্লেষকরা বলছেন, করোনা পরিস্থিতি আমাদের সামনে সময় নিয়ে ভাবনার এক নতুন দিক তুলে ধরছে। সময় ব্যবস্থাপনা নিয়েও আমাদের বোধ হয় ভাবতে হবে। এ কথা এই জন্যই যে, করোনার সংকটকাল দীর্ঘায়িত হচ্ছে। সেটাও যে কত দীর্ঘ তা বোধগম্য নয়। সুতরাং নতুন জীবনের সঙ্গে হাতের ঘড়ির কাঁটার নতুন সমন্বয় ঘটাতে হবে।

সবকিছুই নির্ভর করছে কোভিড-১৯ এর বিরুদ্ধে ভ্যাকসিন আবিস্কার ও তার যথার্থ প্রয়োগের ওপর। এই হচ্ছে, হয়ে যাচ্ছে বলে কথাবার্তা উঠলেও কেউ বলতে পারছেন না কবে হবে। এই বছর না পরের বছর। ভ্যাকসিনের প্রতিটি আপডেট রাখেন নিউইয়র্ক টাইমসের হেলথ করেসপন্ডেন্ট ডোনাল্ড ম্যকনিল। রিপোর্টে তিনি লিখেছেন, এ বছরের শেষভাগের মধ্যে ভ্যাকসিনবিষয়ক সুখবর আশা করা যায়। কিন্তু, ম্যকনিল অন্য এক সাক্ষাতকারে বলছেন, এই জুনে তার নাতি জন্ম নিচ্ছে, কিন্তু নাতির বয়স দুবছর হওয়ার আগে পর্যন্ত তিনি তাকে দেখতে পাবেন এমন কোনও সম্ভাবনা দেখছেন না।

সবার জন্য চ্যালেঞ্জটা বোধ হয় এখানেই। একমাস, দুই মাস বছরান্ত কোনও একটা সময়ে আমরা হয়তো কাজে-কর্মে কিছুটা ফিরতে পারবো। যে যার মতো গা বাঁচিয়ে কাজ শুরু করে দিতেও হবে। মানুষের প্রাণের পাশাপাশি অর্থনীতিটাকেও তো বাঁচিয়ে রাখতে হবে। এরই মধ্যে তৈরি পোশাক কারখানাগুলোতে, সীমিত ন্যূনতম পরিসরে কাজ শুরুর উদ্যোগ নেওয়াও হচ্ছে। যার ধারাবাহিকতায় হয়তো অন্য খাতগুলোও ধীরে ধীরে কাজ শুরু করবে।

কিন্তু, সবার জন্য চ্যালেঞ্জ একটাই— স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে আমাদের সময় অনেক লাগবে। কেউ কেউ তো এটাও বলছেন গত ফেব্রুয়ারিতে যে পৃথিবীটিতে আমরা ছিলাম তেমন পৃথিবীতে মানবসভ্যতার আর ফিরে যাওয়া হবে না। সেটি ভিন্ন কথা। কিন্তু, চ্যালেঞ্জটা এই জন্য যে, একটি দীর্ঘমেয়াদী লকডাউন মানেই হচ্ছে আমাদের সামনে নতুন সময় ব্যবস্থাপনার চাপ। আর আমাদের ধরেই নিতে হবে এই যে একটা বদ্ধজীবন, এ কোনও সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য নয়।

এই বদ্ধজীবনে সময়টা কাটতেই চায় না। ‘বাড়ি থেকে আর নয়, খুব দ্রুত অফিসে বসে কাজ করতে চাই। এই অনিশ্চিত ছুটি, অবসর কিছুই আর ভালো লাগে না’– সামাজিক মাধ্যমে একজন সংবাদকর্মীর আকুতি। যার কমেন্ট বক্সে অপর সংবাদকর্মী লিখছেন- ‘কী আশ্চর্য আমার মনটাও অফিস অফিস করছে।’

যখন একটি দিন থেকে অপর দিনটি আলাদা কিছু হয় না। তখন সময়টা বেশ ঘন হয়ে ওঠে, থকথকে লাগে। একইভাবে সময়টা ছাড়া-ছাড়া হয়েও থাকে। ঠিক এখন যেমনটি হয়ে রয়েছে। কয়েদির বন্দি জীবনের সঙ্গে এর তুলনা হয়তো সরাসরি চলে না। কারণ, আমরা লকডাউনে থাকলেও নিজের বাড়িতেই আছি। ছাদে কিংবা বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশ দেখছি। প্রকৃতির পরিবর্তন মাপছি চোখের আন্দাজে। মিলিয়ে নিচ্ছি মিডিয়ায় পাওয়া সংবাদগুলোর সঙ্গে। যেখানেই আছি পরিবারের সঙ্গেই আছি। দরকারে এক-আধবার বাইরে বের হয়ে অতি প্রয়োজনীয় বাজার-সওদাও করতে পারছি। তারপরেও বলছি আমাদের সময় কাটে না।

বলা হয়, সময় হচ্ছে বহতা নদীর মতো। সে তার নিজের মতো চলতে থাকে। মানুষ সময়কে ধরে রাখে তার কর্মে। উৎসব-পার্বণ দিয়েও ধরা পড়ে থাকে সময়। এই যে মার্চ গেলো। ছিলো জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী। কতো আয়োজনের ডালাই না সাজানো হয়েছিল তার উদযাপনে। কিন্তু, হলো না। এ মাসেই চলে গেলো মহান স্বাধীনতা দিবস। সে উদযাপনও হলো না। আর এপ্রিল— সে তো বাঙালির প্রাণের উৎসব বাংলা নববর্ষ। সে আয়োজনও হলো না। ফলে দুটো মাসের কোনটিই এবার ধরা পড়ে থাকলো না উৎসবে আয়োজনে। বরং সময়টি ধরা পড়ে থাকলো প্রতিদিন নতুন নতুন মৃত্যুর সংবাদে। নতুন করে করোনাভাইরাস আক্রান্ত হওয়ার পরিসংখ্যান বেড়ে চলার সংবাদে। এতে সময়টি ধরা পড়ে থেকেছে ভয়ে। বলা হয় ভয়ের সময় দীর্ঘ মনে হয়।

লকডাউন শেষ হলে কী করবেন— এ নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনা শুরু করেছেন অনেকে। সামাজিক মাধ্যমে একটি খেলা চলছে— কার সঙ্গে প্রথম কে, কী করতে চায় এইসব। কিন্তু, সে লকডাউন ঠিক কবে শেষ হবে? সহসাই যে নয়, তা বোধ হয় এখন অনেকেই আঁচ করতে পারছেন। তাই লকডাউনের পরে কী হবে তা নিয়ে নয় বরং দীর্ঘায়িত সময়ের লকডাউনে সময়কে কীভাবে সক্রিয় করে তোলা যায় সে ভাবনাই এখন ভাবতে হবে। ঘড়ির কাঁটায় কিংবা ক্যালেন্ডারের পাতায় নতুনভাবে সাজাতে হবে জীবনের অধ্যায়।

Comments

The Daily Star  | English

Through the lens of Rafiqul Islam

National Professor Rafiqul Islam’s profound contribution to documenting the Language Movement in Bangladesh was the culmination of a lifelong passion for photography.

18h ago