চুরি ধরতে প্রযুক্তিই সমাধান, ঠেকাতেও

আগে খবর আসতো ত্রাণের চাল চুরির। এখন আসছে প্রধানমন্ত্রীর ‘ঈদ উপহার’র আড়াই হাজার টাকা নিজের মোবাইল ওয়ালেটে ঢোকানোর চেষ্টার খবর।
প্রতীকী ছবি। (সংগৃহীত)

আগে খবর আসতো ত্রাণের চাল চুরির। এখন আসছে প্রধানমন্ত্রীর ‘ঈদ উপহার’র আড়াই হাজার টাকা নিজের মোবাইল ওয়ালেটে ঢোকানোর চেষ্টার খবর।

এ পর্যন্ত নানান সংখ্যাই এসেছে। ৪০ বা ২০০— যেখানে বলা হচ্ছে, তালিকায় দুস্থদের নাম-ঠিকানা দিলেও নিজের মোবাইল নম্বরটি ঠিকই এতগুলো নামের পাশে বসিয়ে দিয়েছেন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বা সদস্যদের কেউ!

এটি তো আর কিছুই নয়, চুরির ডিজিটালাইজেশন। ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে যদি চুরিটা করা যায়, তাহলে সে এক মোক্ষম উপায়। মওকা বুঝে সহজেই লুফে নেওয়া যায় হাজার, লাখ, কোটি বা শতশত, হাজার-হাজার কোটি টাকা। ছোট চোর ছোট চুরি করে, বড়রা রুই-কাতলাই ধরে।

তবে, চুরি যত ছোট বা বড়ই হোক না কেনো, সেখানে যদি প্রযুক্তির ছোঁয়া থেকে থাকে, তাহলে সেটি ধরার ব্যবস্থাও কিন্তু থাকেই। এমনকি নিরাপত্তা ব্যবস্থা ত্রুটিযুক্ত থাকলেও চুরির তথ্য থেকেই যায়। এটা হলো ‘এক্কেবারে করোনাভাইরাসের মতো’। ছোঁয়া লাগল, তো দাগ থেকে গেল। হাত ধুয়ে ভাইরাস হয়তো দূর করতে পারবেন, কিন্তু এই হিসাবের চিহ্ন বা অঙ্কে কিন্তু কোনোদিন বদলানো যাবে না, যদি কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে সেটি ডিলিট করে না দেয়।

ডিজিটাল প্রযুক্তির এই চুরি ঠেকাতে দরকার কেবল কৌশলগত কিছু পরিকল্পনা আর কার্যকর কিছু প্রচেষ্টার। যেটি নিয়ে আলাপ করছি, চলেন সে ‘প্রধানমন্ত্রীর ঈদ উপহার’ নিয়েই কথা বলি।

এ পর্যন্ত যতটা দেখেছি, তাতে কতজনের নামের সঙ্গে চেয়ারম্যান-মেম্বারদের মোবাইল নম্বর জুড়ে দেওয়া হয়েছে সেই আলোচনাই এসেছে। কিন্তু, কতটি যে ভুয়া নাম তালিকায় জুড়ে দিয়ে তার সঙ্গে ইচ্ছে মাফিক মোবাইল নম্বর জুড়ে দেওয়া হয়েছে, সেই খবর কিন্তু এখনো মেলেনি।

পেশাগত দায়িত্বের অংশ হিসেবে যতটা জানতে পেরেছি, যত নাম জেলা পর্যায় থেকে এসেছে, তার অন্তত ১৫ শতাংশের মধ্যে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) অপারেটরগুলো নিজেরাই (নগদ, বিকাশ, রকেট বা শিওরক্যাশ) নানান রকম গলদ পেয়েছেন।

যে সব মোবাইল নম্বরে আগে থেকেই অ্যাকাউন্ট আছে, আগের অ্যাকাউন্টের সঙ্গে টালি করতে গিয়ে দেখা গেছে, সেখানে নাম-ঠিকানা মিলছে না। আর যে মোবাইল নম্বরগুলোতে এমএফএস অ্যাকাউন্ট নেই, সেগুলোর অ্যাকাউন্ট খুলতে গিয়ে জাতীয় পরিচয়পত্রের ডেটাবেজের সঙ্গে তথ্য মেলাতে গিয়ে দেখা গেছে, সেখানেও গড়মিল।

সুতরাং না চাইতেও একটা ফিল্টারিং কিন্তু শুরুতেই হয়ে গেছে। দেখা যাচ্ছে, কোনোরকম বাড়তি প্রচেষ্টা ছাড়াই প্রযুক্তি ১৫ শতাংশ চুরি ঠেকিয়ে দিল। চুরি ঠেকানোর আরও আরও উপায় কিন্তু আছে। এখানেই দরকার হবে উদ্যোগ আর প্রচেষ্টার।

দুস্থ পরিবারের তালিকা করতে গিয়ে এমএফএস অপারেটরদেরকে সঙ্গে নেওয়া একটি উপায় হতে পারে। তাদের কাছে কোটি গ্রাহকের শতশত কোটি তথ্য আছে। আর পৃথিবীতে যেহেতু বিগডেটা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স (এআই) নামক প্রযুক্তির ব্যবহার চালু হয়েছে, প্রযুক্তির অ্যানালাইসিসই বের করে দেবে দরিদ্র মানুষদের তথ্য।

সুতরাং এমএফএস সেবা ব্যবহার করে এমন দরিদ্র মানুষদের (সামান্য হলেও) একটি অংশ আসতে পারে এখান থেকে। চাইলে মোবাইল অপারেটরদের কাছ থেকেও হতদরিদ্র মানুষের তথ্য নেওয়া যায়। তাদের তথ্যভান্ডার বাংলাদেশের সবচেয়ে বড়।

তালিকা প্রণয়নের দ্বিতীয় পর্যায়টায় আমার প্রস্তাব— ধরেন, একটি খসড়া তালিকা আসলো জেলা পর্যায় থেকে। সেটি এমএফএস অপারেটরদের কাছে দেওয়া হলো যাচাইয়ের জন্যে। তালিকায় নিশ্চয়ই অনেক মোবাইল নম্বর মিলবে যেখানে আগে থেকেই অ্যাকাউন্ট খোলা আছে এবং লেনদেনও হয়। লেনদেনের ছয় মাস বা এক-দুই বছরের ধরন দেখেও কিন্তু দেখবেন অনেক ‘দুস্থের’ সচ্ছলতার প্রমাণ বেরিয়ে আসবে। এই ডেটাবেজও তালিকাটাকে ছেঁকে পরিষ্কার করতে সহায়তা করবে। এই ডেটাবেজ থেকে এমনকি এও বলে দেওয়া সম্ভব যে এই লোকটির পেশা কী? তার আয় কেমন? কোথা থেকে তার টাকা আসে? তার কোনো রেমিট্যান্স আসে কি না?

সুতরাং প্রথমে তালিকায় দুস্থ ব্যক্তিদের যুক্ত করা এবং চিহ্নযুক্ত ‘দুস্থ!’দের বাদ দিতেও এমএফএস অপারেটর সরকারকে সহায়তা করতে পারে। আর আমার বিশ্বাস সেটি হলে সমস্যার অনেকখানিই সমাধানের পথ পেরিয়ে আসবে। ১৫ শতাংশ চুরি ঠেকানোর সঙ্গে পরিমাণটা আরও একটু বাড়তে পারলেই তো আমরা পরিশুদ্ধির খুব কাছাকাছি চলে আসতে পারি।

মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে গিয়ে যেমন প্রতিদিন আমরা ব্যবহারকারীরা শতশত তথ্যেরে জন্ম দেই— এটা তো সেই একই প্রযুক্তি। মোবাইল ফোন অপারেটর জানে কোন গ্রাহককে ৩০ জিবি ডেটা কেনার অফার দিতে হবে আর কাকে ১০০ মিনিট কেনার অফার দিতে হবে। অফারটা আবার ঠিক কখন দিতে হবে। এসবই প্রযুক্তির খেলা।

এমএফএস সেবা নিতে গিয়েও গ্রাহক তার অজান্তেই অসংখ্য তথ্যের জন্ম দিয়ে চলেন। আর এই সব তথ্যই তার প্রমাণ হিসেবে হাজির হয়ে যাবে কে দুস্থ আর কে দুস্থ নয়। কে প্রধানমন্ত্রীর ঈদ উপহার পাওয়ার যোগ্য আর কে ভুয়া।

দুস্থ প্রতি আড়াই হাজার করে টাকার অনেকটাই চলে গেছে। এখনো কিন্তু প্রযুক্তিগত একটি অডিট করা সম্ভব যে যারা টাকা পেয়ে গেলেন তাদের সবাই-ই কি এই ভাতা পাওয়ার যোগ্য কি না। কয়েকটি নম্বরে আমি নিজে কথা বলেছি। যেখানে সত্যিকারের দুস্থ মানুষ যেমন পেয়েছি; আবার মোটামুটি একটি চাকরি করছেন, দুই ছেলে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে, এমন ব্যক্তিও এই আড়াই হাজার টাকা পেয়েছেন। যিনি আমার বিবেচনায় দুস্থ বা হতদরিদ্রদের তালিকায় থাকতে পারেন না।

অডিটটা হলে আরও অনেক ঝামেলাই কিন্তু বেরিয়ে আসবে তখন। চাইলে টাকা ফেরত আনা সম্ভব। কিন্তু সেই ঝক্কি-ঝামেলায় না গেলেও অন্তত এটা তো বের করা সম্ভব যে কোথায় কোথায় সমস্যা হয়েছে এবং সামনের দিনে কোথায় কোথায় মনোযোগ দিতে হবে?

প্রতি বছর সরকারের প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা নগদ সহায়তা হিসেবে দুস্থদেরকে সামাজিক নিরাপত্তার খাতে দেওয়া হয়। এর কিছু অংশ এখন এমএফএস অপারেটরের মাধ্যমে দেওয়া হচ্ছে, বিশেষ করে শিক্ষা আর নারী খাতে। সামাজিক নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় অংশ খরচ করে সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়। তাদের প্রবল বাধা ‘বরাদ্দ ডিজিটালি খরচ করার ক্ষেত্রে’। কেনো বাধা সেটা বোঝাই যায়।

সামাজিক নিরাপত্তার সব বিতরণ যদি এমএফএস চ্যানেলে চলে আসে বা একটি বৃহৎ ডেটাবেজ তৈরি করা যায়, তাহলে কিন্তু সেটির মাধ্যমেও বেরিয়ে আসবে যে একই ব্যক্তি কত জায়গা থেকে সুবিধা পাচ্ছেন বা এদের মধ্যে কতজন ‘ভুয়া’।

এখন আলোচনাটা হলো— এমএফএস অপারেটরকে সরকার দুর্নীতিমুক্তির ছাঁকনি হিসেবে ব্যবহার করতে চায় কি না?

আমার মতে, ভালো কাজকে আরও ভালো করতে এমএফএস অপারেটরগুলোকে এক্ষেত্রে কাজে লাগাতে হবে। মনে রাখা দরকার, আমরা কিন্তু বিশ্বে এমএফএস সেবার ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিচ্ছি। সুতরাং চুরি ঠেকাতেও আমরা যে এমএফএস প্রযুক্তি কাজ লাগাতে পারি সেই উদাহরণও আমরাই তৈরি করতে পারি। অন্য কেউ উদাহরণ তৈরি করে দেবে আর আমরা সেই পথে হাঁটবো, তেমনটা হওয়ার সুযোগ এখানে নেই। নেতাকেই পথ তৈরি করতে হবে। তাকেই উদাহরণ তৈরি করতে যে আপনি চোরকে পুষবেন নাকি শাস্তি দেবেন?

যতটা জানি, প্রধানমন্ত্রীর ঈদ উপহারের সাড়ে ১২ শ কোটি টাকা এমএফএস অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে দেওয়ার প্রস্তুতি পর্বের কোনো পর্যায়েই বিষয়গুলো নিয়ে অপারেটরদের সঙ্গে আলোচনা করা হয়নি। বাস ড্রাইভার কিন্তু জানে, কোন রাস্তা মসৃণ আর কোনটা বাম্পি। ড্রাইভারের সহায়তা নিলে দেখবেন উপহার চুরির খবর আর আসবে না।

লেখক: মুহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম, দ্য ডেইলি স্টারের সিনিয়র রিপোর্টার।

[email protected]

Comments

The Daily Star  | English

How Lucky got so lucky!

Laila Kaniz Lucky is the upazila parishad chairman of Narsingdi’s Raipura and a retired teacher of a government college.

6h ago