সাধারণ অসুস্থরা চিকিৎসা পাবেন না?

সংজ্ঞা অনুসারে স্বাস্থ্যসেবার অধিকার সব মানুষের।
অন্তঃসত্ত্বা ২৪ বছর বয়সী ঝুমা গতকাল বুধবার ভোর ৫টায় রাজধানীর শহীদ মিনারের কাছে ফুটপাতে বসে তার স্বামী সুজনের গায়ে হেলান দিয়ে বিশ্রাম নিচ্ছেন। এ অবস্থাতেই গাজীপুর থেকে আসা এই দম্পতি কয়েকটি হাসপাতালে ছোটাছুটি করেছে। তবে, কেউই তাকে ভর্তি করেনি। কারণ, ঝুমার শরীরের তাপমাত্রা বেশি, যা করোনার লক্ষণ। হতাশ এই দম্পতিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয় এক এম্বুলেন্স চালক। অবশেষে, গাজীপুরের একটি হাসপাতালে তিনি ভর্তি হতে পারেন এবং রাত ১২:৪০ মিনিটে সি-সেকশনের মাধ্যমে দুটি সুস্থ বাচ্চা জন্ম দেন। তিনি উদার মনের একজনের সাহায্য পেয়েছেন। কিন্তু সবাই কি এতটা ভাগ্যবান? ছবি: আনিসুর রহমান

সংজ্ঞা অনুসারে স্বাস্থ্যসেবার অধিকার সব মানুষের।

কোভিড-১৯ মহামারির বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে হৃদয়বিদারক হলেও সত্য, দেশের হাসপাতালগুলো, বিশেষত বেসরকারি হাসপাতালগুলো সরকারের যে শর্তে কার্যক্রম চালানোর অনুমতি পেয়েছে তা রক্ষা করছে না।

যদি আপনার শরীরের তাপমাত্রা বেশি থাকে, শ্বাসকষ্ট হয়, বুকে ব্যথা থাকে, কোনো অপারেশনের প্রয়োজন পড়ে বা ডায়ালাইসিসের দরকার হয় তাহলে খুব সম্ভবত আপনি এই মুহূর্তে কোনো বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিকে চিকিত্সা পাবেন না। অনেক রোগী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের এটি একটি সাধারণ অভিযোগ।

এই লক্ষণগুলো থাকলে আপনাকে সন্দেহভাজন কোভিড-১৯ রোগী হিসেবে বিবেচনা করা হবে এবং কোনো চিকিত্সা দেওয়ার আগে আপনাকে পিসিআর পরীক্ষার মাধ্যমে তাদের নিশ্চিত করতে হবে যে আপনি করোনা রোগী নন।

তা না হলে, আপনাকে যেতে হবে রোগীর চাপে ইতিমধ্যে জর্জরিত সরকারি হাসপাতালগুলোতে। যেখানে দেশের রোগীদের মাত্র ৩০ শতাংশের স্বাস্থ্য সেবা দেওয়া সম্ভব।

গত সপ্তাহে, দ্য ডেইলি স্টার বেশ কিছু ছবি এবং ঘটনা তুলে ধরেছে যা রোগীদের ও তাদের পরিবারের সদস্যদের দুর্ভোগের চিত্র প্রকাশ করে। ভিখারিরা যেমন এক দুয়ার থেকে অন্য দুয়ারে যায় ভিক্ষার জন্য, তারা তেমনি চিকিত্সার জন্য মরিয়া হয়ে ছুটেছে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে। এমনকি কোনো চিকিৎসা না পেয়ে মারা গেছে বেশ কিছু মানুষ।

পরিস্থিতির ভয়াবহতা বোঝানোর জন্য দুটি ঘটনা তুলে ধরছি।

আনোয়ার হোসেনের মৃত্যু খুবই নির্মম ছিল। শ্বাসকষ্ট-জ্বর নিয়ে গত শনিবার সকালে প্রায় ষাট বছর বয়সী এই মানুষটিকে রাজধানীর মুগদা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। তিনি মারা যান গর্নিতে (রোগীদের বহন করার ট্রলি)। দুপুর দেড়টার দিকে হাসপাতালের বাইরে কাঁদতে কাঁদতে তার স্ত্রী দ্য ডেইলি স্টারের ফটো সাংবাদিক আনিসুর রহমানকে জানান, হাসপাতালের ডাক্তাররা তার স্বামীর চিকিৎসা করেনি।

তিনি বলেন, ‘হাসপাতালের মূল গেট দিয়ে নিরাপত্তারক্ষীরা প্রথমে আমাদের ঢুকতেই দেয়নি। অনেক অনুরোধের পর আমাদের ভিতরে যেতে দেয়। আমরা আমার স্বামীকে একটি ট্রলিতে করে ভিতরে নিয়ে যাই। আমরা জরুরি বিভাগের সামনে অপেক্ষা করছিলাম। দীর্ঘ সময় আমার স্বামী ব্যথায় ছটফট করছিলেন, কিন্তু কোনো ডাক্তার বা নার্স তার চিকিত্সা করতে আসেনি। আমরা যখন তাদের কাছে সাহায্য চাইছি, তখন হাসপাতালের কয়েকজন কর্মচারী এসে আমাদের বললেন মরদেহ বাইরে নিয়ে যেতে। স্বামীর দিকে তাকিয়ে দেখি তার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে গেছে।’

এই নারীর কান্নায় হাসপাতালের পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। ছেলে ও দেবরের সঙ্গে আসা এই নারী জানালেন তারা শহরের উপকণ্ঠে মুরাদপুরে থাকেন।

একইভাবে চিকিৎসা পাওয়ার আগেই মারা গেছেন শামীম নেওয়াজ খান।

গত শনিবার দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদক জায়মা ইসলামের সঙ্গে আলাপকালে তার ছেলে সানিদ নেওয়াজ খান জানান, ১১ মে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে সিসিইউ সাপোর্ট দেওয়ার জন্য ১০ ঘণ্টা চেষ্টা করার পর বেডে নিতে পারার আগেই রাত ৯টায় তার বাবা মারা যান।

জীবনের সবচেয়ে অন্ধকারাচ্ছন্ন এই সময়ের বিবরণ দিতে গিয়ে সানিদ জানান, শহরের তিনটি বেসরকারি হাসপাতাল তার বাবার চিকিত্সা করতে অস্বীকৃতি জানায়। কারণ তার শরীরের তাপমাত্রা ছিল বেশি।

তিনি জানান, সেদিন সকাল এগারোটার দিকে আইইডিসিআর নমুনা সংগ্রহ করার কয়েক ঘণ্টা পরেই তার বাবার অবস্থার অবনতি হয়। চতুর্থ বেসরকারি হাসপাতালে তার বাবাকে ভর্তি করতে রাজি হয়েছিল কিন্তু পৌঁছানোর পরে তারা জানায় যে রোগীকে তারা দুই ঘণ্টা পর্যবেক্ষণে রাখবে।

বিকেল ৪টার দিকে তারা একটি রিপোর্ট দিয়ে বলে যে রোগীর হার্ট অ্যাটাক হয়েছে, তবে জ্বর ও শ্বাসকষ্ট থাকায় তারা তাকে ভর্তি করবে না।

সানিদ বলেন, ‘তারা আমাকে বলেছিল যে তারা সিসিইউ সুবিধা দিতে পারবে না। কারণ এটা একটা করোনাভাইরাস মুক্ত হাসপাতাল।’

সিসিইউ সুবিধার জন্য অন্য কোনো হাসপাতাল খুঁজে পাওয়ার আগ পর্যন্ত তার বাবাকে জরুরি সেবা দেওয়ার জন্য অনুরোধ করলেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাতে রাজি হয়নি। তারা তাকে ‘সন্দেহজনক করোনাভাইরাস রোগী’ হিসেবে প্রেসক্রিপশনে নোট দিয়ে ঢামেকে রেফার করে দেন।

এই নোটটি বিষয়টিকে আরও জটিল করে তোলে। সেখানে সন্দেহভাজন করোনা রোগী লেখা না থাকলে তার বাবাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য অ্যাম্বুলেন্স পাওয়া থেকে শুরু করে তাৎক্ষণিক সিসিইউ পাওয়া হয়ত সম্ভব হতো।

সানিদ ধরা গলায় বলেন, ‘বেলা ১১ টার দিকে আমি ঢাকা মেডিকেলে যাই। ততক্ষণে বাবার অবস্থা আরও খারাপ হয়ে গেছে। আমরা তাকে বেডে নিয়ে যাওয়ার আগেই তিনি মারা গেলেন।’

‘পরের দিন, আমি আইইডিসিআর থেকে একটি মেসেজ পেয়েছি যে আমার বাবা কোভিড-১৯ নেগেটিভ,’ বলেই কান্নায় ভেঙে পড়েন সানিদ।

‘এখন আমার মনে হচ্ছে সেই হাসপাতালে রিপোর্ট নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসা করি কেন তারা আমার বাবার চিকিত্সা করল না। আমরা কখনই ভাবিনি যে আমরা বাবাকে এভাবে হারিয়ে ফেলব। আমি এই পৃথিবীকে ক্ষমা করতে পারব না।’

এমন ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা আরও অনেকের আছে।

গত সোমবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্টভাবে সমস্ত বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক সন্দেহভাজন কোভিড-১৯ রোগীদের চিকিত্সার জন্য আলাদা ব্যবস্থা রাখার কথা বলা হয়েছে। যদি তাদের রোগীর জন্য প্রয়োজনীয় চিকিত্সা ব্যবস্থা থেকে থাকে, তবে তারা রোগীকে ফিরিয়ে দিতে পারবেন না।

এতে বলা হয়েছে, যদি হাসপাতালগুলোর কোনো রোগীকে অন্য কোনো হাসপাতালে রেফার করতে হয় তবে কোভিড-১৯ কন্ট্রোল রুমের সঙ্গে পরামর্শ করে চিকিত্সা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার পরে তা করতে হবে।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, করোনা আক্রান্ত না হলে ডায়ালাইসিসহ দীর্ঘদিন ধরে চিকিত্সাধীন কিডনি রোগীদের প্রয়োজনীয় চিকিত্সা দিতে হবে।

এই নির্দেশনা অমান্য করার অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল বা ক্লিনিকের বিরুদ্ধে লাইসেন্স বাতিলসহ প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে।

কিন্তু মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনাও না মেনে এমন ভয়াবহ ঘটনার জন্ম দিচ্ছে অনেক বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক।

মার্চের শুরুর দিকে দেশে করোনাভাইরাস মহামারি শুরু হওয়ার পর থেকে আমাদের স্বাস্থ্যকর্মীরা খুবই ব্যস্ত সময় পার করছেন। উপকরণের সীমাবদ্ধতার কারণে সরকারকে প্রয়োজনীয় সংখ্যায় কোভিড-১৯ পরীক্ষার জন্য সংগ্রাম করতে হচ্ছে। চেষ্টা করছে পিপিইর ঘাটতি কাটিয়ে ওঠার জন্য। সেই সঙ্গে সরকার এই অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য অতিরিক্ত চিকিৎসক ও নার্স নিয়োগের প্রশংসনীয় সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

তবে দেশের ৭০ শতাংশ রোগীর স্বাস্থ্য সেবা যে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের হাতে তারা যদি এই বিপদ কাটিয়ে উঠতে যুক্ত না হয় তাহলে এই লড়াইয়ে গতি আসবে না।

এখন সবার জন্যই সময় এসেছে সবার ঊর্ধ্বে মানবতাকে রাখার।

প্রতিদিন দেশে করোনা রোগীর এবং মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। সবার এটাই প্রত্যাশা যে বেসরকারি হাসপাতাল এবং ক্লিনিকগুলো স্বাস্থ্যসেবার মূলমন্ত্র থেকে সরে না গিয়ে তাদের দায়িত্ব পালন করবে। তা না করলে সরকার কঠোর ব্যবস্থা নেবে।

সরকারের নির্দেশ যথাযথভাবে কার্যকর করা হচ্ছে কিনা তার প্রতি নজরদারি করার দায়িত্ব সরকারের ওপরই বর্তায়। কেউ নির্দেশ অমান্য করলে তা দ্রুত ও কঠোরভাবে মোকাবিলা করা দরকার।

সর্বোপরি, নাগরিকদের স্বাস্থ্যসেবার নিশ্চয়তা দেওয়া এবং এ ক্ষেত্রে কারও গাফিলতি রয়েছে কিনা সেটা দেখা সরকারের দায়িত্ব। নাগরিকদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে সরকার সাংবিধানিকভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

Comments

The Daily Star  | English
Tips and tricks to survive load-shedding

Load shedding may spike in summer

Power generation is not growing in line with the forecasted spike in demand in the coming months centring on warmer temperatures, the fasting month and the irrigation season, leaving people staring at frequent and extended power cuts.

8h ago