করোনাভাইরাসের প্রভাব পড়ছে দেশের মেগা প্রকল্পগুলোতে

দেশে করোনা মহামারির প্রকোপ শুরু হওয়ার আগেই নির্ধারিত সময়ের থেকে পিছিয়ে ছিল বেশিরভাগ মেগা উন্নয়ন প্রকল্প। মহামারি শুরু হওয়ার পর কয়েকমাস বন্ধ থাকায় পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়।
Padma Bridge
নির্মাণাধীন পদ্মাসেতু। ছবি: স্টার ফাইল ফটো

দেশে করোনা মহামারির প্রকোপ শুরু হওয়ার আগেই নির্ধারিত সময়ের থেকে পিছিয়ে ছিল বেশিরভাগ মেগা উন্নয়ন প্রকল্প। মহামারি শুরু হওয়ার পর কয়েকমাস বন্ধ থাকায় পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়।

আগামী অর্থবছরে প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ হবে কম। বার্ষিক উন্নয়ন বাজেটের ২১ দশমিক ৭৬ শতাংশ থাকবে প্রকল্পের জন্য। যা বর্তমান অর্থবছরে রয়েছে ২৫ শতাংশ।

চলমান ১৫টি মেগা প্রকল্পের সঙ্গে দুটি নতুন প্রকল্প যুক্ত হওয়ার পরও বাজেট কমছে।

চলতি বছরের ১৫টি প্রকল্পের জন্য ৫২ হাজার ৭৫৮ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও আগামী অর্থবছরে ১৭টি প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ থাকছে ৪৪ হাজার ৬৪০ কোটি টাকা।

আগামী অর্থবছরে মোট উন্নয়ন বাজেট হবে ২ লাখ ৫ হাজার ১৪৫ কোটি টাকা।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ১৫টি মেগা প্রকল্পের জন্য বরাদ্দকৃত তহবিল ব্যবহার করতে ব্যর্থ হয়েছেন প্রকল্প কর্মকর্তারা। বিদেশি তহবিল সংক্রান্ত জটিলতার কারণে দুটি প্রকল্পের জন্য কোনো টাকাই ব্যয় করা হয়নি।

তারা বলেন, দুর্বল পরিকল্পনা, অর্থায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা ও জমি অধিগ্রহণ জনিত সমস্যার কারণে প্রায়ই সময়সীমার মধ্যে কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হয় না।

গত বছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) ম্যাস র‌্যাপিড ট্রানজিট-৬’র জন্য ৭ হাজার ২১২ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। একটি প্রকল্পের জন্য এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ ছিল। সংশোধিত এডিপিতে প্রকল্পটির জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৪ হাজার ৩২৬ কোটি টাকা।

এই প্রকল্পের কর্মকর্তারা গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মাত্র ১ হাজার ১৭০ কোটি টাকা ব্যবহার করতে পেরেছেন। মার্চের শেষের দিকে যখন সরকার করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধে ছুটি ঘোষণা করে, তখন মেট্রোরেল প্রকল্পের কাজ প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।

প্রকল্পের নথি অনুসারে, গত দুই মাসে প্রকল্পের কাজ এগিয়েছে মাত্র দশমিক ৫৫ শতাংশ। মে মাস পর্যন্ত প্রকল্পের সার্বিক কাজ সম্পন্ন হয়েছে ৪৪ দশমিক ৬৭ শতাংশ।

ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে উত্তরা (তৃতীয় পর্যায়) থেকে মতিঝিল পর্যন্ত এলিভেটেড মেট্রো লাইন নির্মাণ করছে। এটি সম্পন্ন হলে প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ৬০ হাজার মানুষ এতে যাতায়াত করতে পারবে।

ডিএমটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এমএএন সিদ্দিক বলেন, ‘হ্যাঁ, আমরা পিছিয়ে পড়েছি।’

তবে, প্রতিষ্ঠানটি এখন স্বাস্থ্যসুরক্ষা নির্দেশিকা বজায় রেখে দ্রুত কাজটি শেষ করবে বলে দ্য ডেইলি স্টারকে জানান তিনি।

‘প্রকল্প নথিতে যা উল্লেখ করা হয়েছে, প্রকৃত উন্নয়ন কাজ তার চেয়ে বেশি হয়েছে’, যোগ করেন এমএএন সিদ্দিক।

সরকার আগামী বছরে এই প্রকল্পের জন্য ৪ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিতে যাচ্ছে।

আর একটি উচ্চ-অগ্রাধিকার সম্পন্ন মেগা প্রকল্প পদ্মা বহুমুখী সেতু। এটি বর্তমান এডিপি থেকে ৫ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা পেয়েছে। তবে, কর্মকর্তারা ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ব্যয় করেছেন ২ হাজার ১৪০ কোটি টাকা।

ছুটি কার্যকর করার পর থেকে পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পে চীনা ও স্থানীয় উভয় শ্রমিক এবং নির্মাণসামগ্রীর সংকট দেখা দিয়েছে।

প্রধান সেতুর প্রকল্প ব্যবস্থাপক দেওয়ান মো. আবদুল কাদের জানান, তারা মোট স্থানীয় কর্মীর ৭০ শতাংশ নিয়ে কাজ করছেন এবং চীনা কর্মীদের সবাই কাজ করছেন।

গত ৩০ মে দ্য ডেইলি স্টারকে তিনি বলেন, ‘আমরা দুই সপ্তাহের মধ্যে পূর্ণ গতিতে কাজ শুরু করার বিষয়ে আশাবাদী। বেশিরভাগ স্থানীয় কর্মী ঈদ শেষে নির্মাণস্থলে ফিরেছেন। তবে তারা ১৪ দিনের কোয়ারেন্টিনে রয়েছেন।’

সেতু বিভাগের সচিব বেলায়েত হোসেন গত মাসের শুরুর দিকে বলেন, প্রকল্পটি ২০২১ সালের জুনে নির্ধারিত বর্তমান সময়সীমা পার করে যাবে বলে মনে হচ্ছে এবং এর বাজেট বাড়তে পারে।

তিনি বলেন, ‘কমপক্ষে অতিরিক্ত ছয় মাস প্রয়োজন হবে। কোভিড-১৯ পরিস্থিতির উন্নতি না হলে এটি আরও বেশি সময় নিতে পারে।’

প্রকল্পের সামগ্রিক অগ্রগতি চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত ছিল ৭৯ শতাংশ এবং এটি আগামী অর্থবছরে ৫ হাজার কোটি টাকা পাবে।

আর একটি প্রকল্প দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত এক লাইনের ডুয়েল-গেজ রেলপথ নির্মাণ। প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, প্রকল্পটিতে করোনা পরিস্থিতির কারণে স্থানীয় ও চীনা, উভয় শ্রমিক সংকট রয়েছে।

প্রকল্প পরিচালক মফিজুর রহমান জানান, ঈদের আগে তারা আবার কাজ শুরু করেছেন এবং কর্মীর সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়ছে। তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘বেশিরভাগ শ্রমিক আগামী সপ্তাহ থেকে কাজ শুরু করবেন। তবে, এই সমস্যা প্রকল্পের সময়সীমায় প্রভাব ফেলবে কি না, তা এখনই বলা সম্ভব নয়।’

২০১০ সালের জুলাইয়ে শুরু হওয়া প্রকল্পটি ২০২২ সালের জুনের মধ্যে বাস্তবায়িত হওয়ার কথা। তবে, দোহাজারী থেকে রামু পর্যন্ত রেললাইন স্থাপনের কাজ শুরু হয়েছিল ২০১৮ সালের মার্চে।

প্রকল্পটি বাজেটের ১ হাজার ১৩৫ কোটি টাকার মধ্যে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত খরচ করতে পেরেছে ৬৩১ কোটি টাকা। এটি আগামী অর্থবছরে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পেতে পারে।

পরবর্তী এডিপি থেকে অন্যান্য মেগা প্রকল্পের মধ্যে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সর্বোচ্চ ১৫ হাজার ৬৯১ কোটি টাকা, মাতারবাড়ী কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র ৩ হাজার ৬৭০ কোটি টাকা, কর্ণফুলী নদীর সুড়ঙ্গ ১ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা, ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ৭৫৫ কোটি টাকা, পদ্মা রেল সংযোগ ৩ হাজার ৬৮৪ কোটি এবং হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্প্রসারণ (প্রথম পর্ব) পাবে ২ হাজার ৯০০ কোটি টাকা।

এ ছাড়া, ডাবল পাইপলাইনের সঙ্গে সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং স্থাপনে ৭৫২ কোটি টাকা, পায়রা বন্দর অবকাঠামো উন্নয়নে ৩৫০ কোটি টাকা, পায়রা বন্দরে প্রথম টার্মিনাল তৈরিতে ৩৫০ কোটি টাকা, রূপপুর বিদ্যুৎ লাইন ৫৮৫ কোটি এবং কুড়িল-পূর্বাচল খালের জন্য ১ হাজার ৩১৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হতে পারে।

আরও তিনটি মেগা প্রকল্প আগামী অর্থবছর থেকে প্রথমবারের মতো এডিপি থেকে বরাদ্দ পাবে। সেগুলো হলো— ম্যাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (মেট্রোরেল)-৫, ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা; ম্যাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (মেট্রোরেল)-১, ৭৯১ কোটি টাকা ও মাতারবাড়ী বন্দর উন্নয়ন প্রকল্প ৭৬ কোটি টাকা।

Comments

The Daily Star  | English

Dhaka stares down the barrel of water

Once widely abundant, the freshwater for Dhaka dwellers continues to deplete at a dramatic rate and may disappear far below the ground.

7h ago