মাস্ক বিতর্কে নরম অবস্থানে তদন্ত কমিটি

করোনা মহামারির মধ্যে বিভিন্ন হাসপাতালে এন-৯৫ এর বদলে সাধারণ মাস্ক সরবরাহ করার অভিযোগে সরকারি তদন্ত কমিটি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেনি।
প্রতীকি ছবি। ছবি: স্টার

করোনা মহামারির মধ্যে বিভিন্ন হাসপাতালে এন-৯৫ এর বদলে সাধারণ মাস্ক সরবরাহ করার অভিযোগে সরকারি তদন্ত কমিটি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেনি।

এপ্রিলের শুরুর দিকে মাস্ক বিষয়ক বিতর্ক আলোচনায় আসে। বিভিন্ন হাসপাতালের চিকিৎসকরা সরবরাহকৃত মাস্কের মান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। কেউ কেউ এটা তুলে ধরেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও।

নিম্নমানের মাস্ক সরবরাহের অভিযোগ করার পর সরকারের মেডিকেল পণ্য সংগ্রহের প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রীয় ঔষধাগার জেএমআই হসপিটাল রিকুইজিট এমএফজি লিমিটেড থেকে নেওয়া মাস্কগুলো প্রত্যাহার করে নেয়। এর পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটিকে কারণ দর্শানোর নোটিশও দেওয়া হয়েছে।

দাপ্তরিক বিবৃতিতে জেএমআই তখন জানায়, এটি প্যাকেজিংয়ের ভুল।

পরবর্তীতে এক সরকারি তদন্তে দেখা যায়, জেএমআই নিয়মিত চাহিদার বিপরীতে ‘আমদানিকৃত অনুমোদনহীন কাঁচামাল’ দিয়ে তৈরি ‘গবেষণা পর্যায়ের এন-৯৫’ মাস্ক সরবরাহ করেছে।

তবে সরবরাহকারীর বিরুদ্ধে কি ধরণের ব্যবস্থা নেওয়া উচিত সে বিষয়ে কোনো সুপারিশ দেয়নি তদন্ত কমিটি।

গত ২৭ এপ্রিল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া অপ্রকাশিত সেই তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের সারাংশ দ্য ডেইলি স্টারের হাতে এসেছে।

১৯ এপ্রিল, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একটি ভিডিও কনফারেন্সে পিপিই এবং মাস্ক বিতর্কে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করার আগের দিন, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ এই তদন্ত কমিটি গঠন করে।

কমিটির নেতৃত্বে ছিলেন স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন) এম সাইদুর রহমান। তিন দিনের মধ্যে কমিটিকে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়। পরবর্তীতে তাদের আরও সাত দিন সময় দেওয়া হয়েছিল।

প্রতিবেদন

তদন্ত কমিটি তিনটি সুপারিশ করেছে।

প্রথমত, মাস্কগুলো আসল এন-৯৫ নয়, এমন সন্দেহ থাকার পরও কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের পরিচালককে অবহিত না করেই যারা সেগুলো সরবরাহকারীর কাছ থেকে বুঝে নিয়েছেন সংশ্লিষ্ট সেই কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

দ্বিতীয়ত, ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জামের (পিপিই) চাহিদা ও বণ্টন প্রক্রিয়া শনাক্ত করতে দক্ষ জনশক্তি বাড়াতে হবে।

তৃতীয়ত, এন-৯৫ মাস্কের অনুমোদন, উত্পাদন ও বিপণনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আরও সতর্ক হতে হবে।

সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদনের মতামত অংশে কমিটি আরও তিনটি বিষয় উল্লেখ করেছে।

‘প্রতিষ্ঠানটি নিয়মিত চাহিদার বিপরীতে গবেষণা পর্যায়ের এন-৯৫ মাস্ক সরবরাহ করেছিল; সরবরাহকৃত গবেষণা পর্যায়ের এন-৯৫ মাস্কগুলো আমদানিকৃত অনুমোদনহীন কাঁচামাল দিয়ে তৈরি করা। কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের পরিচালক সরবরাহকারীকে এর ব্যাখ্যা দেওয়ার এবং পণ্যগুলো ফিরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন।’

দ্য ডেইলি স্টার অপ্রকাশিত প্রতিবেদনের একটি অনুলিপি নিয়ে কথা বলেছেন বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক এহতেশামুল হক চৌধুরীর সঙ্গে।

প্রতিবেদনটি যথাযথ হয়নি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এই রিপোর্টের উদ্দেশ্য হতে পারে কাউকে ছাড় দেওয়া। এখানে মূলত কাউকেই দায়বদ্ধ বা জবাবদিহিতার মধ্যে আনা হয়নি।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (প্রশাসন) সাবেক পরিচালক এহতেশামুল হক আরও বলেন, ‘আমার দীর্ঘ চাকরির মেয়াদে আমি কখনও এ জাতীয় প্রতিবেদন দেখিনি। এখানে কি বলতে চাইছে তা পরিষ্কার না।’

এই তদন্ত প্রতিবেদন সম্পর্কে জানতে দ্য ডেইলি স্টার যোগাযোগ করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে। তারা কেউই কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

গত ১০ জুন যোগাযোগ করা হলে তদন্ত কমিটির প্রধান এম সাইদুর রহমান বলেন, ‘কমিটি নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে এবং প্রতিবেদনের বিষয়বস্তু সম্পর্কে আমি কিছু বলব না।’

দ্য ডেইলি স্টারের কাছে তদন্ত প্রতিবেদনের একটি অনুলিপি আছে এবং সেখানে দেখা যাচ্ছে কমিটি সরবরাহকারীর বিরুদ্ধে কোনো শাস্তির সুপারিশ করেনি। এটা জানানোর পর তিনি বলেন, ‘বিষয়বস্তু সম্পর্কে আমি কিছু বলব না। আপনি বলছেন যে আপনি প্রতিবেদনটি পেয়েছেন। তাহলে আপনি তো সব জানেনই। তাহলে আমাকে এসব প্রশ্ন কেন করছেন?’

গত মাসে কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের পরিচালককে এবং চলতি মাসের শুরুর দিকে স্বাস্থ্য সচিব ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিবকে বদলি করেছে সরকার।

এপ্রিলে জেএমআইয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আব্দুর রাজ্জাক এক প্রেস বিবৃতিতে জানান, তারা এন-৯৫ মানের মাস্ক তৈরির প্রক্রিয়া শুরু করেছে। মহামারির কারণে বিশ্বব্যাপী লকডাউন না হলে এই প্রক্রিয়া এত দিনে সম্পন্ন হয়ে যেত।

‘যখন কোনো পণ্য গবেষণা এবং উন্নয়নের পর্যায়ে চলে আসে, তখন আমরা আগে থেকেই এর জন্য কার্টন, প্যাকেট ও লিফলেট তৈরি করে ফেলি। যদি পণ্যটি অনুমোদন না পায় সেক্ষেত্রে কার্টন বা প্যাকেটগুলো নষ্ট করে ফেলি।’

জেএমআইয়ের কর্মচারীদের ভুলের জন্য এভাবেই আগে থেকে তৈরি করে রাখা এন-৯৫ মাস্কের প্যাকেটে ২০ হাজার ৬০০টি সাধারণ মাস্ক সরবরাহ করা হয়েছে বলে তিনি যোগ করেন।

তিনি বলেন, ‘আমরা এটি লক্ষ্য করিনি এবং এন-৯৫ মাস্কের হিসেবে কোনো বিলও জমা দেইনি। সুতরাং, আমরা এন-৯৫ মাস্কের কোনো কার্যাদেশ পাইনি এবং সরবরাহও করিনি।’

জেএমআইয়ের কোনো কর্মকর্তার সঙ্গে সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে জানার জন্য যোগাযোগ করা যায়নি।

এপ্রিলের শেষের দিকে, তত্কালীন কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ দ্য ডেইলি স্টারকে বলেছিলেন যে জেএমআইয়ের এন-৯৫ মাস্ক সরবরাহ করার কথা ছিল না।

তিনি আরও বলেন, জেএমআই দীর্ঘদিন ধরে সার্জিক্যাল মাস্ক সরবরাহ করে আসছে। প্রতিষ্ঠানটিকে সাধারণ সার্জিক্যাল মাস্কই সরবরাহ করতে বলা হয়েছিল এবং সে অনুযায়ীই তারা তা সরবরাহ করেছে। তবে এগুলো ভুলে এন-৯৫ এর প্যাকেটে দেওয়া হয়েছে।

এন-৯৫

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এন-৯৫ এক ধরনের পারটিকুলেট-ফিল্টারিং মাস্ক, যেটি ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর অকুপেশনাল সেফটি অ্যান্ড হেলথের (এনআইওএসএইচ) দেওয়া এয়ার ফিলট্রেশনের (বাতাস পরিশোধক) শ্রেণিবিন্যাসের মানদণ্ড পূরণ করে।

এন-৯৫ এমন এক ধরনের মাস্ককে বোঝায় যেটি বাতাসের শূন্য দশমিক ৩ মাইক্রন বা তার চেয়ে বড় কণা ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত আটকাতে পারে। এক মাইক্রন সমান এক মিটারের ১০ লাখ ভাগের এক ভাগ। ভাইরাসগুলো শূন্য দশমিক ৩ মাইক্রন পরিসীমার মধ্যেই থাকে।

তবে, প্রস্তুতকারী ভেদে এন-৯৫ মাস্কের ধরন আলাদাও হতে পারে।

যেহেতু গত বছরের ডিসেম্বরের দিকে চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহরে করোনার সংক্রমণ শুরু হয় এবং পর্যায়ক্রমে তা ইউরোপ-আমেরিকাসহ সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে, তাই এন-৯৫ দুষ্প্রাপ্য ও দামী হয়ে গেছে।

এন-৯৫ মানের মাস্ক ইউরোপিয়ান হিসেবে এফএফপি-২ এবং চীনের হিসেবে কেএন-৯৫ হিসেবে প্রচলিত।

ডব্লিউএইচও’র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাবেক আঞ্চলিক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক বলেন, ‘যেহেতু আমরা এন-৯৫ সংগ্রহে ব্যর্থ হয়েছি, তাই আমাদের কেএন-৯৫ ও এফএফপি-২ মাস্ক গ্রহণ করতে হবে।’

‘কিন্তু, যেহেতু চীনের মাস্কের মান নিয়ে সন্দেহ রয়েছে, তাই এগুলো মানসম্পন্ন কি না, সেটি পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে’, যোগ করেন তিনি।

Comments