প্রবাসে

সৌদি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জীবন

প্রবাস জীবনের নয় বছর হতে চললো। পৃথিবীর যে কোনো দেশের তুলনায় কর্মসূত্রে সৌদি আরবে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক বাংলাদেশি থাকেন। তাই মনেই হয় না দূর দেশে থাকি। কোথায় নেই আমরা? বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী থেকে শুরু করে কৃষক, নির্মাণ শ্রমিক কিংবা পরিচ্ছন্নতাকর্মী সব ভূমিকাতেই প্রবাসীরা কাজ করে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সমুন্নত রেখে চলেছেন। কেমন আছেন সাধারণ প্রবাসী কর্মীরা?
সৌদি আরবে গতবছর ঈদুল ফিতরের জামায়াত। ছবি: সৈয়দ করিম

প্রবাস জীবনের নয় বছর হতে চললো। পৃথিবীর যে কোনো দেশের তুলনায় কর্মসূত্রে সৌদি আরবে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক বাংলাদেশি থাকেন। তাই মনেই হয় না দূর দেশে থাকি। কোথায় নেই আমরা? বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী থেকে শুরু করে কৃষক, নির্মাণ শ্রমিক কিংবা পরিচ্ছন্নতাকর্মী সব ভূমিকাতেই প্রবাসীরা কাজ করে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সমুন্নত রেখে চলেছেন। কেমন আছেন সাধারণ প্রবাসী কর্মীরা?

এখানে প্রবাসীদের প্রায় সিংহভাগই সাধারণ শ্রমিক। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পেশাজীবীও আছেন। নারীরাও আছেন গৃহকর্মীসহ আরও নানা পেশায়। সাধারণ প্রবাসী শ্রমিকদের বিরাট অংশ পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করেন। তাই এখানে বাংলাদেশের পরিচিতি মূলত পরিচ্ছন্নতাকর্মী রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে। আফসোসের বিষয় হলো দক্ষ কর্মী রপ্তানির তেমন কোনো অবকাঠামো দেশে গড়ে উঠেনি। তাই আমার দেশের সন্তানেরা মরুর দেশে কঠোর কায়িক শ্রম অথচ কম বেতনে কাজ করে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রেখে চলেছে। অবশ্য তাদের দুর্ভোগের শুরু হয় দেশের মাটিতে। নানা সংঘবদ্ধ চক্রের হাতে পড়ে, ধার দেনা করে স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েকগুন বেশি দাম দিয়ে ভিসা কিনে তারা এখানে এসে দেখে, প্রতিশ্রুতির সাথে বাস্তবতার অনেক ফারাক।

অদক্ষতার কারণে কর্মক্ষেত্রে কাজের চাপ, চাকরি ক্ষেত্রে বেতন বৈষম্য, দেশে ঋণের বোঝা, পরিবারের ভরণ পোষণের দায়সহ নানাবিধ কারণে তারা শুরুতেই হতোদ্যম হয়ে পড়ে। তাই বেশিরভাগ শ্রমিক ভাইদের মলিন মুখে ঘুরে বেড়াতে দেখা এখানকার খুব স্বাভাবিক চিত্র। বাংলাদেশিদের এখানে পরিশ্রমী হিসেবে পরিচিতি আছে। এই কয়বছরে অনেককে দেখেছি শূন্য থেকে ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়ে সমৃদ্ধির পথে যেতে। সাধারণ শ্রমিক ছাড়া আরো কিছু বাংলাদেশি আছেন যারা বিভিন্ন ব্যবসার সাথে জড়িত। কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে ভালো একটা পর্যায়ে পৌঁছে গেছেন তারা।

কর্মক্ষেত্রের বাইরে প্রবাসী কর্মীদের জীবন কীভাবে কাটে? মক্কা ও মদিনার অবস্থানের কারণে সৌদি আরবের একটি আলাদা স্থান আছে ধর্মপ্রাণ প্রবাসী কর্মীদের কাছে। তারা সুযোগ পেলেই এই দুই জায়গায় ছুটে যান উমরাহ জিয়ারতে।

এই বিশাল সংখ্যক শ্রমিকের সুস্থ বিনোদেনের আয়োজন খুব একটা নেই। অবসরে দেশে পরিবার পরিজনের সাথে কথা বলে কিংবা টেলিভিশন দেখেই অনেকের সময় কাটে। সাধারণ কর্মীদের নগণ্য সংখ্যক এখানে পরিবার নিয়ে থাকেন। রক্ষনশীল এই দেশে সর্বত্র পরিবার অগ্রাধিকার পায়। তাই পার্কে কিংবা সমুদ্র সৈকতে ব্যাচেলরদের ঘুরতে যাওয়ার সুযোগ সীমিত। সারা সপ্তাহ কঠিন পরিশ্রমের পর আয়োজন করে কোথাও ঘুরতে যাওয়া অনেকের কাছেই বাহুল্য মনে হয়। তবুও এর মধ্যেই অনেকে সীমিত পরিসরে হলেও পিকনিক কিংবা আনন্দভ্রমণে বের হন।

মধ্যপ্রাচ্যে প্রবাসীদের জীবনে ঈদ বেদনাবিধুর। এই বেদনা উৎসারিত হয় প্রিয়জনের বিরহে। প্রিয়জনের সান্নিধ্য থেকে হাজারো মাইল দূরে ঈদ এখানে খুশির বার্তা নিয়ে আসে না। এই দেশে ঈদের নামাজ হয় ঠিক ফজরের নামাজের পর। খুব ভোরে সবাই ঈদগাহে রওনা দেয় এবং সূর্য উঠার পরে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়।  নামাজের পড়ে সবাই ঘরে ফিরে একসাথে খাওয়া দাওয়া করে। এরপরে দেশে পরিবার-পরিজনের সাথে কথা বলে,  আশেপাশের বন্ধু-বান্ধবদের সাথে আড্ডা দিয়ে কিংবা টিভি দেখে ঈদের দিনটি কাটিয়ে দেয়।

এই দেশের বিভিন্ন শহরে বাঙালি এলাকা আছে। এই জায়গাগুলোতে বাংলাদেশিরা সেলুন, রেস্তোঁরা, মুদির দোকান, সবজি বা মাংসের দোকান ইত্যাদি নানাবিধ ব্যবসা করে।  দোকানপাটে বাংলা নাম কিংবা যত্রতত্র  পানের পিক দেখে নতুন যে কারো মনে হতে পারে বাংলাদেশে চলে এলাম বুঝি। স্থানীয়ভাবে এগুলোকে ‘সুক বাংগালি’ বা বাংলা বাজার বলে।  এই ‘সুক বাংগালি’ বাংলাদেশিদের কাছে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। অনেকটা লাইফ লাইনের মতো। সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলিতে এই বাজারগুলো শ্রমিক ভাইদের কলকাকলিতে মুখর হয়ে উঠে।  শুঁটকি থেকে শুরু করে লুঙ্গি, দেশীয় প্রায় সব জিনিসই এখানে পাওয়া যায়। 

এখানে সবচেয়ে মূল্যবান যে জিনিসটা পাওয়া যায় সেটি হলো ভীষণ একাকিত্বের প্রবাস জীবনে দূরদূরান্ত থেকে আসা প্ৰিয়জন অথবা বন্ধুবান্ধবের সান্নিধ্য। এ যেন মরুভূমির তপ্ত বালুকাবেলায় এক টুকরো মরুদ্যান। কেউবা দাঁড়িয়ে সুখদুঃখের গল্প জুড়ে দেন। কেউবা বাংলাদেশি রেস্তোরাঁগুলোতে দেশ বিদেশের অবস্থা নিয়ে চায়ের কাপে ঝড় তোলেন। বেলাশেষে যখন ঘরে ফেরেন, তখন শুধু বাংলাদেশি দোকানগুলো থেকে সদাই কিনেই নিয়ে যান না, সাথে নিয়ে যান আগামীর নিস্তরঙ্গ জীবনে সঙ্গ দেয়ার জন্য কিছু সুখস্মৃতি।

প্রবাসী কর্মীদের সিংহভাগেরই খুব বেশি প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা থাকে না। এখানে কর্মক্ষেত্রে ভালো করতে হলে আরবি ভাষা জানতেই হবে। যখন কেউ এদেশে আসেন তাদের আরবি ভাষা জ্ঞান থাকে শূন্যের কোটায়। আবার এখানে আরবি ভাষা শেখার প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধাও নেই। তবুও টিকে থাকার অদম্য স্পৃহাই প্রেরণা যোগায় দ্রুত আরবি ভাষা রপ্ত করার। তাই জীবন চলার পথে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই আরবি কথ্য ভাষাটা শিখে ফেলা হয়।  সৌদি সরকার নিয়ন্ত্রিত ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্র আছে বিভিন্ন শহরে যেখানে উচ্চশিক্ষিত আলেমরা বিভিন্ন ভাষায় ধর্মীয় সবক দেন। প্রবাসীদের কেউ কেউ এখানে নিয়মিত হাজির হয়ে ধর্ম শিক্ষা লাভ করেন। প্রবাসী কর্মীদের মধ্যে যারা পরিবার নিয়ে থাকেন তাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা সন্তানদের পড়াশোনা।

রিয়াদ, জেদ্দার মতো বড় কয়েকটি শহরে বাংলা স্কুল থাকলেও ছোট শহরগুলোতে প্রবাসীদের সন্তানেরা মূলত ভারতীয় বা পাকিস্তানি পাঠ্যক্রমের স্কুলেই পড়াশুনা করেন। প্রবাসী কর্মীদের হার না মানার ইস্পাত কঠিন মানসিকতা তাদের সন্তানদের মধ্যেও সঞ্চারিত হয়। ফলে নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও শিক্ষা জীবনে ভালো ফলাফলের মাধ্যমে সাফল্যের শিখরে উঠে যায়। আজকাল সৌদি সরকার স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর পর্যায়ে বৃত্তির মাধ্যমে বিদেশিদের এইদেশে নানা বিষয়ে পড়াশুনার সুযোগ দিচ্ছে। বাংলাদেশ থেকে অনেক শিক্ষার্থী এখানে পড়তে আসে। আমার বিশ্ববিদ্যালয়েও বেশ কয়েকজন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী বৃত্তি নিয়ে এসেছেন স্নাতক পর্যায়ে পড়াশোনা করতে।

পুরো মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে কৃষিবিপ্লবের নেতৃত্বে আছে বাংলাদেশি কর্মীরা। সৌদি আরবে বাংলাদেশি কৃষিকর্মীরা তাদের অভিজ্ঞতা আর সবুজের প্রতি নিদারুণ ভালোবাসাকে পুঁজি করে আবাদ করেন নানা জাতের দেশি বিদেশি শাক সবজি ও ফলমূল। তারা যেখানে হাত দেন সেখানেই যেন সোনা ফলে।  কঠোর পরিশ্রমী হাতের ছোঁয়ায় মরুভূমির মাঝে দেখা দেয় সবুজের হাতছানি, তপ্ত বালুকা বেলার মরুভূমি হয়ে ওঠে সুজলা-সুফলা ফসলের মাঠ। তাদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল পৌঁছে যায় এই দেশের বিভিন্ন সুপারস্টোরে। তাদের কারণেই এই মরুদেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বাংলাদেশিরা সারাদিনের অক্লান্ত পরিশ্রমের পরে পাতে কয়েকটুকরো বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি নিয়ে তৃপ্তির হাসি হাসে।

করোনাকালীন সময়ের অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের ঢেউ আছড়ে পড়েছে মধ্যপ্রাচ্যেও। সৌদি আরবও এর বাইরে নয়। স্থবিরতা নেমে এসেছে এখানকার নানা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে। ইতিমধ্যে বিপুল সংখ্যক কর্মী এখানে কাজ হারিয়েছেন। এই স্থবিরতা চলতে থাকলে  সামনের দিনগুলোতে বিপুল সংখ্যক প্রবাসী কর্মীকে দেশে ফিরে যেতে হবে।

এভাবেই ভালো মন্দে কেটে যাচ্ছে প্রবাসীদের আটপৌরে জীবন। যেহেতু সৌদি আরবে নাগরিকত্ব পাওয়া যায় না তাই সব প্রবাসীর প্রত্যাশা থাকে কাজ শেষে দেশে ফিরে যাওয়ার। অনেকে এখানে যৌবনের শুরুতে এসে বার্ধক্যে উপনীত হোন। তাদের অধিকাংশই  নিজের পরিবারের আর্থিক স্বচ্ছলতা নিশ্চিত করতে পারলেও, নিশ্চিত করতে পারেন না নিজেদের জন্য মানসিক দুশ্চিন্তামুক্ত এক পশলা শান্তির ঘুমের। জীবন এখানে এমন!

লেখক: প্রভাষক, ইংরেজি বিভাগ, কিং খালিদ বিশ্ববিদ্যালয়, সৌদি আরব

Comments

The Daily Star  | English

44 lives lost to Bailey Road blaze

33 died at DMCH, 10 at the burn institute, and one at Central Police Hospital

10h ago