এক কিটে দুই নমুনা পরীক্ষা, আরেক বিপর্যয়ের আশঙ্কা

সরকার অনুমোদিত কিছু কোভিড-১৯ পরীক্ষাগার আরটি-পিসিআর মেশিনে দুটি নমুনা পরীক্ষার জন্য একটি কিট ব্যবহার করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই কাজটি কেবল অবৈজ্ঞানিক এবং অনৈতিক নয়, এর ফলে ভুল ফলাফল আসার ঝুঁকিও রয়েছে।
Corona test logo
প্রতীকী ছবি। সংগৃহীত

সরকার অনুমোদিত কিছু কোভিড-১৯ পরীক্ষাগার আরটি-পিসিআর মেশিনে দুটি নমুনা পরীক্ষার জন্য একটি কিট ব্যবহার করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই কাজটি কেবল অবৈজ্ঞানিক এবং অনৈতিক নয়, এর ফলে ভুল ফলাফল আসার ঝুঁকিও রয়েছে।

এমনকি তারা এটাও বলেছেন, এভাবে পরীক্ষার কারণে এই উচ্চ সংক্রামক ভাইরাসটি আরও ছড়িয়ে পড়তে পারে।

দ্য ডেইলি স্টার অন্তত চারটি ল্যাবে এভাবে পরীক্ষা হচ্ছে বলে জানতে পেরেছে। এসব ল্যাবের কর্মকর্তারা বলছেন, কিটের তীব্র সংকটের কারণে তারা এক কিট দিয়ে দুই নমুনা পরীক্ষা করছেন।

এই ল্যাব কর্মকর্তাদের দাবি, এই রীতিবিরুদ্ধ পদ্ধতিতে কাজ করার জন্য তারা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পূর্ণ সমর্থন পেয়েছেন।

তারা বলেন, একটি নমুনা পরীক্ষার জন্য একটি কিট ব্যবহার করা বিশ্বব্যাপী স্ট্যান্ডার্ড অনুশীলন হলেও তারা এক কিটে দুই নমুনা পরীক্ষা করেও একই মানের ফলাফল পাচ্ছেন। অথচ, কোভিড-১৯ পরীক্ষায় জাতীয় নির্দেশিকাতেও বলা হয়েছে, একটি নমুনা পরীক্ষার জন্য একটি কিট ব্যবহার করতে।

একটি আরটি-পিসিআর কিটে রিএজেন্ট থাকে। যা এই পরীক্ষা বা অনুরূপ রাসায়নিক পরীক্ষার প্রধান উপাদান। এতে থাকা রিএজেন্ট একটি নমুনা পরীক্ষার জন্য দেওয়া থাকে। এই চারটি ল্যাবের কর্মকর্তারা বলেছেন, তারা প্রতিটি নমুনা পরীক্ষার জন্য কিটে অর্ধেক রিএজেন্ট ব্যবহার করছেন।

কোভিড-১৯ জাতীয় নির্দেশিকায় পরীক্ষার জন্য কিটে কতটা রিএজেন্ট থাকবে তার পরিমাণ নির্দিষ্ট করে দেয়নি।

দ্য ডেইলি স্টার বেশ কয়েকজন বিশেষজ্ঞের কাছে এ সম্পর্কে জানতে চেয়েছে। ল্যাবে যা করা হচ্ছে, তা বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক কি না? এমন প্রশ্নের জবাবে বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে পাওয়া গেছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া।

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের ভাইরোলজিস্ট ও সহকারী অধ্যাপক ডা. জাহিদুর রহমান বলেন, ‘একটি পরীক্ষার জন্য একটি কিট তৈরি করা হয়। রিএজেন্ট কম ব্যবহারের কোনো সুযোগ নেই। এমন করা হলে পরীক্ষার ফল প্রশ্নবিদ্ধ হবে।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) বে-নজির আহমেদ ল্যাবরেটরি বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে জানান, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অনুমোদন ও স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) ছাড়াই এ জাতীয় কাজ করা অবৈজ্ঞানিক ও অনৈতিক।

তিনি বলেন, ‘এর কারণে ভুল ফলাফল আসতে পারে এবং এটা গ্রহণযোগ্য না।’

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব প্রিভেন্টিভ অ্যান্ড সোশ্যাল মেডিসিনের (এনআইপিএসওএম) ভাইরালজিস্ট এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. জামাল উদ্দিন দাবি করেছেন, এই প্রক্রিয়াটি বৈজ্ঞানিক এবং একটি কিট ব্যবহার করে দুটি পরীক্ষা করা হলে ফলাফল ভিন্ন কিছু বা ভুল হয় না।

বিশ্বের অন্য কোনো দেশ এই পদ্ধতিতে এক কিটে দুটি নমুনা পরীক্ষা করে কি না, তা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সম্ভবত ভারত করে। তীব্র কিট সংকট পুরো বিশ্বজুড়েই। আরও কয়েকটি দেশ এই কৌশল ব্যবহার করতে পারে, তবে আমরা নিশ্চিত নই।’

বাংলাদেশ ট্রপিকাল অ্যান্ড ইনফেকশন ডিজিজ ইনস্টিটিউটের (বিআইটিআইডি) ল্যাবরেটরি ইনচার্জ অধ্যাপক ডা. শাকিল আহমেদ জানান, কিটের অভাবে কম কিট দিয়ে বেশি পরীক্ষা করার জন্য তাদের এই পদ্ধতিটি ব্যবহার করতে হয়েছে।

তিনি জানান, বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রথম এই পদ্ধতির ব্যবহার শুরু করে।

অধ্যাপক শাকিল বলেন, ‘তারা প্রথমে একটি গবেষণা করে ইতিবাচক ফল পেয়েছে। আমরা সেই পদ্ধতি অনুসরণ করেছি এবং আমাদের গবেষণায়ও একইরকম ফল পেয়েছি।’

বিআইটিআইডি এই গবেষণা পরিচালনা করেছে মাত্র তিন দিনে ১৫টি নমুনা পরীক্ষা করে।

এমন ধরনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে মাত্র ১৫টি নমুনা পরীক্ষা করা যথেষ্ট কি? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘পরীক্ষা কিটের ঘাটতি রয়েছে। তাই আমাকে কম পরীক্ষা করতে হবে কিংবা রিএজেন্টের পরিমাণ কম ব্যবহার করে বেশি পরীক্ষা করতে হবে। আমি দ্বিতীয় বিকল্পটি বেছে নিয়েছি।’

অধ্যাপক শাকিল জানান, ২ জুলাই তারা পাঁচ হাজার কিটের চাহিদা দিয়ে আড়াই হাজার কিট পেয়েছেন। বিআইটিআইডি প্রতিদিন প্রায় ২০০ পরীক্ষা করে থাকে।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালও একই পদ্ধতি অনুসরণ করছে। তবে, তারা এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পরীক্ষার প্রক্রিয়া সম্পর্কে এক কর্মকর্তা দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আমাদের দুটি নমুনা পরীক্ষার জন্য একটি কিটের রিএজেন্ট ব্যবহার করতে বলেছে এবং আমরা সেই অনুযায়ী চলছি।’

কোভিড-১৯ পরীক্ষায় নারায়ণগঞ্জ ৩০০ শয্যার হাসপাতালেও স্বাভাবিকের চেয়ে কম রিএজেন্ট ব্যবহার করা হয়।

হাসপাতালটির তত্ত্বাবধায়ক গৌতম রায় বলেন, ‘আমরা ভালো ফল পাচ্ছি। কোনো সমস্যায় পড়ছি না।’

চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিম্যাল সায়েন্সেস ইউনিভার্সিটিতেও (সিভিএএসইউ) কোভিড-১৯ পরীক্ষায় দুটি নমুনা পরীক্ষার জন্য একটি কিট ব্যবহার করছে। এখানে প্রতিদিন প্রায় ২০০ নমুনা পরীক্ষা করা হয়।

সিভিএএসইউ’র ল্যাব ইনচার্জ জোনায়েদ সিদ্দিকী বলেন, ‘আমরা আমাদের অন্যান্য সহকর্মীদের কাছ থেকে জানতে পেরেছি যে একটি কিটের অর্ধেক রিএজেন্ট ব্যবহার করেও একই ফল পাওয়া যায়। এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, যেহেতু কিটের সংকট তাই এটা যদি কার্যকর হয় তাহলে করা উচিত।’

জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলেন, এভাবে যে পরীক্ষা করা হচ্ছে, সেটি তারা জানেন। তবে, এ বিষয়ে তারা কোনো আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা দেননি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মুখপাত্র ডা. আয়েশা আক্তার বলেন, ‘কয়েকটি ল্যাব দুটি নমুনা পরীক্ষার জন্য একটি কিট ব্যবহার করে ভালো ফলাফল পাচ্ছে। বিষয়টি আমরা জানি। তবে, আমরা এটি করার জন্য কোনো নির্দেশনা দেইনি।’

তিনি আরও বলেন, ‘যারা ভালো ফলাফল পাচ্ছে, তারা এটা করছে। বাকি পরীক্ষাগারগুলো নিয়মিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করছে। অর্থাৎ, তারা একটি নমুনা পরীক্ষার জন্য একটি কিট ব্যবহার করছে।’

বর্তমানে সারা দেশে ৮০টি প্রতিষ্ঠান কোভিড-১৯ পরীক্ষা করছে। এই ৮০টি ল্যাবে গড়ে দৈনিক পরীক্ষার সক্ষমতা ১৩ হাজার থেকে ১৯ হাজার।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিইএইচও) গত মাসে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি ১০ লাখে দুই হাজার ৪১২ জনের কোভিড-১৯ পরীক্ষা করা হচ্ছে। যা ভারত, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার তুলনায় অনেক কম।

Comments

The Daily Star  | English

Iran’s attacks on Israel: Bark, not bite

If Iran had truly intended to cause serious damage, then it would have done so.

1h ago