নিষ্ঠুর ফুটবল!

দ্বিতীয়বারের মতো পিছিয়ে পড়ার পর ফের সমতা টানার সুযোগ পেয়েছিল সিটি। কিন্তু অবিশ্বাস্যভাবে ফাঁকা জালে বল পাঠাতে পারেননি ইংলিশ ফরোয়ার্ড রহিম স্টার্লিং।
sterling
ছবি: এএফপি

ডি-বক্সের ভেতরে বাইলাইনের কাছে বসে পড়লেন রহিম স্টার্লিং। শূন্য দৃষ্টি নিয়ে দুহাতে মুখ ঢাকলেন। মুহূর্তেই হাতজোড়া চলে গেল মাথার উপরে। এরপর হাঁটু গেড়ে মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে রাখলেন বেশ কিছুক্ষণ। অলিম্পিক লিঁওর গোলরক্ষক অ্যান্থনি লোপেস সান্ত্বনা দেওয়ার ভঙ্গিতে পিঠে হাত রেখে টেনে তুললেন তাকে। পেপ গার্দিওলার দলের ভাগ্য যেন লেখা হয়ে গেল তখনই!

ম্যাচের তখন ৮৬তম মিনিট। লিসবনের দর্শকশূন্য স্তাদিও হোসে আলভালাদেতে ২-১ ব্যবধানে পিছিয়ে ম্যানচেস্টার সিটি। ডান প্রান্ত দিয়ে ডি-বক্সে ঢুকে পড়েন গ্যাব্রিয়েল জেসুস। কাছের পোস্টে শট নেওয়ার সুযোগ ছিল ব্রাজিলিয়ান স্ট্রাইকারের সামনে। সেটা উপলব্ধি করেছিলেন লোপেসও। পোস্ট ছেড়ে সামনে এগিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। চতুরতার সঙ্গে তাই আশেপাশে থাকা তিন ডিফেন্ডারের মাঝ দিয়ে গোলমুখে ক্রস ফেলেন জেসুস। মানে দাঁড়ায়, লিঁওর জাল আর ফাঁকায় দাঁড়িয়ে থাকা স্টার্লিংয়ের মধ্যে নেই কোনো বাধা। চলতি মৌসুমে ৩১ গোল করা ইংলিশ ফরোয়ার্ড বল পায়েও ছোঁয়ালেন। কিন্তু সংযোগ হলো না ঠিকঠাক। পোস্টের উপর দিয়ে বাইরে চলে গেল বল।

কয়েক মুহূর্তের জন্য শিরদাঁড়া বেয়ে শীতল স্রোত অনুভব করা লিঁওর খেলোয়াড়রা বাঁচলেন হাঁফ ছেড়ে। কিন্তু ডি-বক্সে থাকা সিটির তারকারা? ক্রস দেওয়ার সময় শরীরের নিয়ন্ত্রণ সামলাতে না পেরে পড়ে যাওয়া জেসুস উঠে বসেই মাথায় হাত দিলেন। তার চোখে অবিশ্বাস। বদলি নামা ডেভিড সিলভারও একই দশা। রিয়াদ মাহরেজ শূন্যে লাফিয়ে দুহাত ঝাঁকিয়ে করে উঠলেন চিৎকার। ডাগআউটে গার্দিওলাও হতবাক। লুটিয়ে পড়লেন মাটিতে।

sterling
ছবি: এএফপি

স্টার্লিংয়ের ওই মিসের পর সতীর্থদের মানসিকভাবে নড়বড়ে হওয়া পড়াটা অস্বাভাবিক নয়। বিশেষ করে এমন একটা ম্যাচে, যেখানে হঠাৎ করে কৌশল পাল্টে নেমে সেরা খেলাটা দেখাতে পারেনি সিটি। কী রক্ষণে, কী আক্রমণভাগে! দুই মিনিট পর গোলরক্ষক এদারসনের ভুলে তৃতীয় গোল হজম করল ফেভারিট তকমা নিয়ে মাঠে নামা দলটি। নিশ্চিত হয়ে গেল টানা তৃতীয়বারের মতো উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে তাদের ছিটকে পড়া। শুক্রবার রাতের ম্যাচটার ইতি হলো ওই স্কোরলাইনেই, ৩-১।

শেষ বাঁশি বাজার পর মাটিতে গড়াগড়ি খেলেন স্টার্লিং। প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়রা আরও একবার তাকে টেনে তোলার পর জার্সিতে চোখ মুছলেন তিনি। তাতে কী আর ফিরে আসে সুবর্ণ সুযোগ? মাঠের লড়াইয়ে ভুলের কোনো স্থান নেই। অবধারিতভাবেই প্রায়শ্চিত্ত করার পথ উন্মুক্ত হয়নি সিটিজেনদের জন্য। ফুটবলের নিষ্ঠুরতা নামক বৈশিষ্ট্যটা ভালো করে টের পেলেন তিনি।

সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক প্রতিষ্ঠান আবুধাবি ইউনাইটেড গ্রুপের মালিকানায় আসার পর থেকে দেদার অর্থ খরচ করে যাচ্ছে ম্যানচেস্টার সিটি। দলে সময়ের সেরা তারকাদের ছড়াছড়ি। গেল এক দশকে চারটি ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগসহ ১৪টি ঘরোয়া শিরোপা জিতেছে তারা। কিন্তু ইউরোপের সেরা ক্লাবের মুকুট জেতার স্বপ্ন অধরাই রয়ে গেছে তাদের। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, নামিদামি ফুটবলারদের নিয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের সেমিফাইনালে তারা পৌঁছাতে পেরেছে মোটে একবার।

pep guardiola
ছবি: এএফপি

কাঠগড়ায় এদিন কেবল স্টার্লিংকে নয়, গার্দিওলার অদ্ভুতুড়ে কৌশলকেও দাঁড় করানো হয়েছে। পরিসংখ্যান হয়তো বলবে, অধিকাংশ সময় বল দখলে রাখার পাশাপাশি আক্রমণেও আধিপত্য দেখায় ম্যান সিটি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আগের রাউন্ডগুলোতে দুর্দান্ত ফুটবল উপহার দেওয়া দলটির খেলায় ছিল না ধার। শেষ ষোলোর দুই লেগে রিয়াল মাদ্রিদকে হারিয়ে আসার পর এদিন তারা নিজেদের হারিয়ে খুঁজেছে। ফরমেশন পাল্টে তিনজন সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার খেলালেও লিঁওর পাল্টা আক্রমণ সামলাতে খাবি খেতে হয়েছে তাদের।

কৌশলগত কারণে হারার কথা অবশ্য মানতে নারাজ গার্দিওলা। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘এই ফরমেশন নিয়ে আমরা তিন দিন কাজ করেছি। এটা নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা হয়েছে। (লিঁওর বিপক্ষে) শেষ ২০ মিনিটে আমরা যেমন খেলেছি, তাতে প্রমাণ হয় যে, কৌশলে সমস্যা নেই।’

অরক্ষিত গোলপোস্টে স্টার্লিংয়ের বল জড়ানোর ব্যর্থতা পোড়াচ্ছে বার্সেলোনা ও বায়ার্ন মিউনিখের সাবেক এই কোচকে, ‘ওই মুহূর্তটি এবারের প্রতিযোগিতায় আমাদের (পারফরম্যান্সের) সম্পূর্ণ চিত্র তুলে ধরে। আপনাকে সমতা ফেরাতে হবে এবং (খেলা) অতিরিক্ত সময়ে নিয়ে যেতে হবে। উল্টো আমরা তৃতীয় গোলটি হজম করেছি। তাতে সবকিছু শেষ হয়ে গেছে।’

Comments

The Daily Star  | English

Police see dead man running

Prisoners, migrants, even the deceased get implicated in cases

9h ago