তিতাস শুধু নদী নয়, ‘দুর্নীতি’রও নাম

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাংশে প্রবাহমান নদী তিতাস। তবে, এই তিতাস শুধু নদী নয়, ‘দুর্নীতি’রও নাম। বলছি তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের কথা। তাদের সরবরাহকৃত সংযোগের পাইপলাইনে লিকেজ, অবৈধভাবে সংযোগ দেওয়া বা তাদের অনিয়ম-দুর্নীতির কথা নতুন নয়। তবে, সর্বশেষ নারায়ণগঞ্জে মসজিদে বিস্ফোরণের পর এ নিয়ে আবারও ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান তিতাস গ্যাসকে নিয়ে জনমনে ঘুরতে থাকে নানা প্রশ্ন।
অধ্যাপক শামসুল আলম, অধ্যাপক বদরূল ইমাম (উপরে বামদিক থেকে), অধ্যাপক ম. তামিম ও অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ (নিচে বামদিক থেকে)।

• তিতাস এখন গণশত্রুতে পরিণত হয়েছে।

• ঢাকা শহরে ৭০ হাজার পয়েন্ট থেকে গ্যাস লিক হয়।

• পেট্রোবাংলা বলেন আর বিআরসি বলেন, এরা কেউই পারফর্ম করছে না। তারা প্রতিষ্ঠান হিসেবে অকার্যকর হয়ে গেছে।

• তিতাসের মূল সমস্যা হচ্ছে তারা অবৈধভাবে অর্থ উপার্জনের প্রতি বেশি আগ্রহী।

• অবৈধ গ্যাস পাইপলাইনগুলোকে আমি “টিকিং টাইম বোম” হিসেবে দেখছি।

• তারা অবৈধ অর্থ উপার্জন করতে চায়। তিতাসের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা এর সঙ্গে জড়িত।

• দুর্নীতি হলে অবৈধ সংযোগ হবে, অবৈধ সংযোগ হলে দুর্নীতি হবে।

• কোনো প্রতিষ্ঠানে যদি স্বচ্ছতা না থাকে, তাহলে সেখানে যেকোনো ধরনের অনিয়ম হতে পারে।

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাংশে প্রবাহমান নদী তিতাস। তবে, এই তিতাস শুধু নদী নয়, ‘দুর্নীতি’রও নাম। বলছি তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের কথা। তাদের সরবরাহকৃত সংযোগের পাইপলাইনে লিকেজ, অবৈধভাবে সংযোগ দেওয়া বা তাদের অনিয়ম-দুর্নীতির কথা নতুন নয়। তবে, সর্বশেষ নারায়ণগঞ্জে মসজিদে বিস্ফোরণের পর এ নিয়ে আবারও ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান তিতাস গ্যাসকে নিয়ে জনমনে ঘুরতে থাকে নানা প্রশ্ন।

এই যে এতসব বিষয়, এর মধ্যে তিতাস গ্যাসের মূল সমস্যাটা আসলে কী? পাইপলাইনে লিকেজ বা অবৈধ সংযোগ? অনিয়ম-দুর্নীতি? বিদেশি স্বার্থ রক্ষায় দেশের স্বার্থ রক্ষা করতে না পারা? নাকি কিছুদিন পরপর গ্যাসের দাম বাড়িয়ে লাভ করা? তিতাস কি সঠিকভাবে চলছে? তাদের দৃষ্টিভঙ্গি কি বাংলাদেশের জনস্বার্থের পক্ষে?— এসব বিষয়ে চার জন জ্বালানি বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলেছে দ্য ডেইলি স্টার

কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) উপদেষ্টা ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, ‘এটা কোনো কারিগরি সমস্যা না। তিতাস একটি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সংস্থা। অর্থাৎ যার মালিক জনগণ। সরকার কোম্পানি আইনে কস্টপ্লাস মডেলে এটা পরিচালনা করে। তিতাসের মূল সমস্যা তাদের পরিচালনায় গলদ রয়ে গেছে। এখানে আপস্ট্রিমিং রেগুলেটরি কমিশন হচ্ছে জ্বালানি বিভাগ। আর ডাউনস্ট্রিমিং রেগুলেটরি হচ্ছে বিআরসি (বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন)। আবার বিআরসির অ্যাপয়েন্টিংয়ের বিষয়ে জ্বালানি বিভাগ হচ্ছে প্রস্তাবকারী। অর্থাৎ, তারা প্রক্রিয়াকরণটা করে। নিয়োগ দেন রাষ্ট্রপতি, যা আনুষ্ঠানিকতা। যে কারণে বিআরসি জ্বালানি বিভাগের অধীন। পেট্রোবাংলা তাদের সহায়ক কোম্পানি। আর পেট্রোবাংলার অধীনে তিতাস গ্যাস। এখন তিতাসের চেয়ারম্যান হয়ে আছেন জ্বালানি সচিব। তাতে করে দেখা যাচ্ছে তিনটা কর্তৃপক্ষই অচল হয়ে গেছে। জ্বালানি সচিব ও জ্বালানি বিভাগের অতিরিক্ত সচিব তিতাসের পরিচালনা পর্ষদের সঙ্গে যুক্ত। তারা এই কোম্পানি চালায়। তারা তাদের সাংঘর্ষিক অবস্থানে আছে ও স্বার্থ সংঘাতে যুক্ত। তাদের এই অবস্থার কারণে বিআরসির নিয়ন্ত্রণ নেই বা বিআরসি বিধি-বিধান মেনে মানসম্মত সেবা দিতে পারছে না। এই যে অবৈধ সংযোগ, পাইপলাইন অবৈধভাবে বসানো, প্রিপেইড মিটার না লাগানো, গ্যাস চুরি— বিষয়গুলো ঘটে যাচ্ছে, এগুলো নিয়ন্ত্রণের এখতিয়ার বিআরসির। কিন্তু, বিআরসি এখানে অকেজো হয়ে আছে।’

এ কারণেই এখানে শ্রমিক নেতাদের প্রভাবও বেড়েছে বলে মনে করেন তিনি। তিনি আরও বলেন ‘কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে যোগসাজশে অবৈধ সংযোগ বাণিজ্যের সূত্রপাত হয়েছে। আমরা দেখছি, বিভিন্ন জায়গায় অবৈধ নেটওয়ার্ক খুলে মানুষের কাছে তিতাসের বাইরে তিতাসের গ্যাস বিক্রি করছে। এক সময় সিএনজি স্টেশন থেকে গ্যাস নিয়ে কলকারখানাগুলোতে দেওয়া হতো। এখন অবৈধ সংযোগ লাইন বসিয়ে ইন্ডাস্ট্রিসহ বিভিন্ন জায়গায় গ্যাস দেওয়া হচ্ছে। এখানে জ্বালানি বিভাগ রেগুলেটরি কমিশন হিসেবে অকার্যকর হয়ে গেছে, যেহেতু তারা তিতাস চালায়। তিতাসে তারা প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ হয়ে গেছে। এখন প্রশাসনের দোষ-ত্রুটি যদি থাকে, তারা তখন সেটাকে প্রতিকার না করে জাস্টিফাই করে এবং নিজের দোষ-ত্রুটি হিসেবে তারা সেগুলোকে স্বার্থ সংঘাত ভাবে। গতদিন জ্বালানি সচিব বলেছেন, শুধু তিতাসেরই দোষ না। আরও অনেকের দোষ আছে। তারা মনে করেন, জ্বালানি বিভাগের এ বিষয়ে কিছু করার নেই। জ্বালানি সচিব হিসেবে এখানে তার কোনো কর্তৃত্ব নেই। তিনি তিতাসের চেয়ারম্যান হিসেবে সব ব্যবস্থা নেবেন। তখন আমাদের তরফ থেকে প্রশ্ন করা হলো, তিতাসের চেয়ারম্যান হিসেবে যখন আপনি করবেন, তাহলে আপনার বিরুদ্ধেই তো অভিযোগ। তিতাস প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অভিযুক্ত, তার বোর্ড অভিযুক্ত। তো আপনি স্বার্থ সংঘাতমুক্ত ও নিরপেক্ষ তদন্তের জন্য বিআরসিকে বলছেন না কেন? বিআরসি তো স্বাধীন। আইনের আওতায় তাকে তৈরি করা হয়েছে। তাকে দিয়ে তদন্ত করান। বিআরসি সবার সঙ্গে কনসাল্ট করে তদন্ত কমিটি করে তারা খুঁজে বের করবে। পাশাপাশি তারা সরকারকে সুপারিশ করবে এবং সরকার সেই সুপারিশ বাস্তবায়ন করবে।’

‘কিন্তু, সেটার দিকে তারা যাবে না। তারা অপরাধীর হয়ে নিজের অপরাধ তদন্ত করবে। তদন্ত করে দরকার হলে পিয়ন-দারোয়ান বা মাঠপর্যায়ের দুই-চার জনকে এই অপরাধের শাস্তি দিয়ে তারা প্রমাণ করতে চায় যে, তারা প্রতিকার করছে। কিন্তু, উচ্ছেদ হচ্ছে, আবার দুই দিন পর নেটওয়ার্ক বসছে। যারা অবৈধভাবে সংযোগ নিচ্ছে, বৈধভাবে সংযোগ নেওয়ার যেসব শর্ত রয়েছে, সেসব শর্ত মেনে সংযোগ নেওয়ার যোগ্যতা তাদের নেই। এটা ইন্ডাস্ট্রির ক্ষেত্রেও আছে, প্রিপেইড মিটার লাগানোর ক্ষেত্রেও এগুলো করে রেখেছে এবং আইনি কাঠামোগতভাবে এমন কিছু তৈরি করে রেখেছে, যা দিয়ে এই জিনিসটা বাঁচিয়ে রাখা যাবে। আলটিমেটলি সচিব, মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা এই কোম্পানিগুলোর চেয়ারম্যান-মেম্বার হওয়ার কারণে এ বিষয়গুলো সংশোধন করা যাচ্ছে না। পেট্রোবাংলা বলেন আর বিআরসি বলেন, এরা কেউই পারফর্ম করছে না। তারা প্রতিষ্ঠান হিসেবে অকার্যকর হয়ে গেছে’, বলেন তিনি।

তিতাস এখন গণশত্রুতে পরিণত হয়েছে বলে মনে করেন অধ্যাপক শামসুল আলম। তিনি বলেন, ‘আমরা মনে করি, তিতাসের কর্মকর্তারা যদি না থাকে, তারা যদি আমাদের সেবা না দেয়, তাহলেই আমরা বেশি নিরাপদে থাকব। তাদের কারণে আমাদের অর্থ দিতে হচ্ছে, অর্থকর বৃদ্ধি করে অর্থ দিচ্ছি, তাদের ঘুষের টাকা দিচ্ছি, তাদের বেতনের টাকা দিচ্ছি, তাদের দুর্নীতির খেসারত দিচ্ছি, আবার গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি করায় আমাদের টাকা দিতে হচ্ছে, আবার তারা অবৈধ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে মানহীন গ্যাস দিচ্ছে। তাদের মানহীন-অবৈধ সাপ্লাইয়ের কারণে ঢাকা শহরে ৭০ হাজার পয়েন্ট থেকে গ্যাস লিক হয়। তাদের দুর্নীতির খেসারত হিসেবে আমাদের জীবন দিতে হচ্ছে। তারা আমাদের জীবন রক্ষার অধিকার কেড়ে নিয়েছে।  তাদের আচরণ মর্মান্তিক।’

বর্তমানে করণীয় নিয়ে জানতে চাইলে এই জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘প্রধান করণীয় হলো, আপস্ট্রিমিং রেগুলেটরি অথোরিটি হিসেবে মন্ত্রণালয়ের জ্বালানি বিভাগের সব কর্মকর্তাদের এর পরিচালনা বোর্ড থেকে প্রত্যাহার করতে হবে। দ্বিতীয়ত, রেগুলেটরি অথোরিটির পূর্ণাঙ্গ ক্ষমতা বিআরসিকে দিতে হবে। তৃতীয়ত, বিআরসি নিয়োগের কার্যক্রমের দায়িত্ব জ্বালানি মন্ত্রণালয় বা বিভাগ থেকে প্রত্যাহার করে আইন মন্ত্রণালয়ে দিতে হবে। যেহেতু এটা একটা সিভিল কোর্ট। বিচারিক ক্ষমতাটা তার আছে। তাই আইন বিভাগই তাদেরকে নিয়োগ দেবে এবং তারা আইন বিভাগের আওতায় থাকবে।’

তিতাসের মূল সমস্যা হচ্ছে তারা অবৈধভাবে অর্থ উপার্জনের প্রতি বেশি আগ্রহী, এমনটিই বলেছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক বদরূল ইমাম। তিনি বলেন, ‘তারা (তিতাসের কর্মকর্তা) তাদের কাজের প্রতি দায়িত্বশীল না। তাদের যে অবৈধ নেটওয়ার্ক, সেটা তো তাদেরই সৃষ্টি। সাধারণ মানুষ তো এটা তৈরি করতে পারবে না। তারাই এটার সঙ্গে যুক্ত। এখন বিভিন্ন জায়গায় যে পরিমাণ অবৈধ গ্যাস পাইপলাইন আছে, এগুলোকে আমি “টিকিং টাইম বোম” হিসেবে দেখছি। কারণ, আজকে আমরা এগুলো দেখতে পাচ্ছি না। কিন্তু, কাল যখন একটা জায়গায় বিস্ফোরণ হবে, তখন আমরা দৌড়ে সেখানে যাচ্ছি। ততক্ষণে তো অনেক মানুষ মারা যাচ্ছে। কত জায়গায় যে এরকম আছে। বহু জায়গায় এগুলো সুপ্ত অবস্থায় আছে। এর মূল কারণ দুইটা। প্রথমত, যে অবৈধ সংযোগগুলো স্থাপন করা হয়, সেগুলো বাজে উপকরণ দিয়ে লাগানো হয়। ফলে সেগুলোতে ফাটল বা ফুটো হয়। দ্বিতীয়ত, অনেক পুরনো সংযোগগুলোও তো রিপ্লেস করা হয় না। সেই ৭০ বা ৮০’র দশকের যে লাইনগুলো, সেগুলো অনেক জায়গায় ঝং ধরে ভালনারেবল অবস্থানে আছে।’

‘এগুলো রোধে তিতাসের বড় পরিকল্পনা নেওয়া দরকার। যার মাধ্যমে তারা শনাক্ত করবে কত জায়গায় এরকম আছে বা থাকতে পারে। তা না হলে আজকে একটা, এক সপ্তাহ পর আরেকটা, দুই মাস পর আরও একটা, এরকম একটার পর একটা দুর্ঘটনা ঘটতেই থাকবে। এটা তো খুবই বিপজ্জনক। এর পেছনে মূলত তিতাসই দায়ী। দ্বিতীয়ত আমি দায়ী করব যারা রাজনৈতিক নেতারা আছেন, তাদেরকে। কারণ, দেখা যায় অবৈধ সংযোগের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গেলে প্রভাবশালীদের কাছ থেকে বাধা আসছে।’

জনগণের দিকে নয়, তিতাস গ্যাসের দৃষ্টি নিজের দিকে, এমনটিই মনে করেন অধ্যাপক বদরূল ইমাম। তিনি বলেন, ‘তারা অবৈধ অর্থ উপার্জন করতে চায়। তিতাসের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা এর সঙ্গে জড়িত বলে আমি মনে করি। তা না হলে এভাবে তাদের অবৈধ নেটওয়ার্ক প্রসারিত হতে পারত না। তারা জনগণকে সেবা দিচ্ছে না।’

এসব সমস্যার সমাধানের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় এই যে পাইপলাইনের এটা ঠিক করা, ওটা করা, চোর ধরা, এভাবে সমাধান করা যাবে না। এটা করতে হবে মৌলিকভাবে। গ্যাসপ্রাপ্তি সহজলভ্য করতে হবে। গ্যাসের তো চাহিদা আছে। এই যে যারা অবৈধ সংযোগ নিচ্ছে, তারা তো তাদের চাহিদা পূরণের জন্য এভাবে সংযোগ নিচ্ছে। তাহলে কেন আমরা বিকল্প গ্যাস দিয়ে চাহিদা পূরণ করছি না? এই যে এলপিজি (লিকুইড পেট্রোলিয়াম গ্যাস), এগুলো তো অনেক পরিমাণে আসে। সুতরাং এটাকে কেন আরও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেওয়া যায় না? দরকার হলে সরকার এখানে ভর্তুকি দিতে পারে। ভর্তুকি দিয়ে হলেও এলপিজির দামকে নামায়ে রাখলে মানুষ আর পাইপলাইনের দিকে ছুটবে না। তারা এলপিজিতেই সন্তুষ্ট হবে। এলপিজির দাম বেশি হওয়ার কারণে এটার প্রসারতা বাড়ছে না। এটাই একটা সমাধান হতে পারে যে, এলপিজির দামটা সাশ্রয়ী করে দিলে গ্রাহকের চাহিদা মিটে যাবে। অথবা আমরা যে এখন এলএনজি (লিকুইফাইড ন্যাচারাল গ্যাস) আনছি, কেন আনছি? কারণ দেশে গ্যাসের চাহিদা পূরণে। কিন্তু, এলএনজি এসেও যদি আমাদের চাহিদা পূরণ না হয়, তাহলে তো সমাধান হলো না। এখানেও ম্যাকানিজম বের করতেম হবে যে দরকার হলে ভর্তুকি দিয়ে হলেও চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহটা করতে হবে। যাতে অবৈধ সংযোগ নিতে না হয়।’

‘এভাবে (সড়ক) কেটেকুটে কোনো সমাধান হবে না। আজকে ১০ কিলোমিটার কাটা হলে কালকে আরও ২০ কিলোমিটারে ঝামেলা হয়ে যাবে। সুতরাং এভাবে সমাধান হবে না। মৌলিক জায়গা থেকেই এটির সমাধান করতে হবে। আমাদের দেশে এত বেশি অসৎ-দুর্নীতিগ্রস্ত লোক, যা ভাবাও যায় না। কোথায় দেখবেন? আপনি একটা নিউক্লিয়ার পাওয়ার পয়েন্ট করেন, সেখানে বালিশ নিয়ে চুরি হয়। চিন্তা করা যায়? পৃথিবীর যেকোনো জায়গাতেই নিউক্লিয়ার পাওয়ার পয়েন্ট উচ্চ পর্যবেক্ষণের আওতায় থাকে। সেখানে আমাদের এখানে ইঞ্জিনিয়াররা বালিশের নামে চুরি করছে। সুতরাং চোর সব জায়গাতেই আছে। তিতাস এটা করতে পারবে না। কারণ, সেখানে ওই মানসিকতার লোক বা যোগ্য নেতৃত্ব নেই। মন্ত্রীরা বলেন বা সরকারের তরফ থেকে বলা হয় অভিযান চালানো হচ্ছে। এগুলো একেবারে অর্থহীন কথা। আপনি কয়টা অভিযান চালাবেন? অভিযান দুইটা চালালে আরও পাঁচটা জায়গায় ঝামেলা দেখা দেবে। তাই মৌলিক জায়গা থেকেই কাজটা করতে হবে’, যোগ করেন অধ্যাপক বদরূল ইমাম।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, ‘আমি মনে করি মূল সমস্যাটা ব্যবস্থাপনায়। মূলত শাসন। বাজে শাসনব্যবস্থা ও বাজে ব্যবস্থাপনা একত্রিত হয়েছে। এই যে অবৈধ সংযোগ, লাইনে লিকেজ বা অনিয়ম-দুর্নীতি, এগুলো তো একটা আরেকটার সম্পূরক। দুর্নীতি হলে অবৈধ সংযোগ হবে, অবৈধ সংযোগ হলে দুর্নীতি হবে, সেখানে অর্থের বিষয় আছে। তবে, বিদেশি স্বার্থ রক্ষার কোনো বিষয় আছে বলে আমি মনে করি না। এখানে অবৈধ সংযোগের যে মূল সমস্যাটা, সেটা তিতাস সৃষ্টি করেনি। এটা এসেছে নীতি-নির্ধারণী পর্যায় থেকে। কারণ, বাংলাদেশে মাত্র সাত থেকে আট শতাংশ জনগণ পাইপ ন্যাচারাল গ্যাসের সুবিধাটা পায়। এখন আমি যদি বলি, গ্যাস ভোগ করার অধিকার সবার আছে, কিন্তু, সাত থেকে আট শতাংশ পাবে, বাকি আর কেউ পাবে না। যাদেরকে দেওয়া হয়েছে, তা তো হয়েছেই, আর কেউ পাবে না। এই যে পাবে না বলে আমি বন্ধ করে দিলাম, কিন্তু, এটার যে একটা সুবিধা, তা থেকে বাকি সবাই বঞ্চিত হচ্ছে। এখন বঞ্চিত হওয়ার পরে আমি বিকল্প হিসেবে কী দিচ্ছি? তাদেরকে দিচ্ছি এলপিজি সিলিন্ডার।’

তিতাসে সবসময়ই দুর্নীতি ছিল বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘যখন সংযোগ নেওয়া চালু ছিল, তখনও অবৈধ সংযোগ দেওয়া হয়েছে। এই যে গ্যাসের সংযোগ দেওয়া বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, এর আগে যখন চালু ছিল, তখনও কিন্তু অবৈধ সংযোগ দেওয়া হতো। তখন হয়তো কলকারখানায় অবৈধ সংযোগ দেওয়া হতো। সেখানে অবৈধ সংযোগ নিত গ্যাসের বিল থেকে বাঁচার জন্য। কিন্তু, যেহেতু তখন বৈধভাবে মানুষকে সংযোগ দেওয়া হতো, তাই বাসা-বাড়িতে অবৈধ সংযোগ কেউ নিত না। অবৈধ সংযোগ নেওয়াটা শুরু হলো যখন সরকার সিদ্ধান্ত নিলো যে, আমরা পাইপ ন্যাচারাল গ্যাস দেবো না। কোনো বিকল্প না দিয়েই শুধু এই সিদ্ধান্তটা বাস্তবায়ন করা হলো। বিকল্প যেটা আছে, সেখানে তো অর্থের তারতম্য রয়েছে। একজন ৯৫০ টাকায় ২৪ ঘণ্টা গ্যাস পাচ্ছে। অন্যজনকে বলছি এলপিজি নিতে। কারো হয়তো এক হাজার টাকার একটা এলপিজিতে মাস চলে যাবে। কিন্তু, মাঝে হয়তো দেখা গেল এলপিজি গ্যাস শেষ হয়ে গেছে। এটা একটা অসুবিধা। এখানে যে অসুবিধা ও অর্থের তারতম্য রয়েছে, সেটা যদি আমরা দূর না করি, তাহলে অবৈধ সংযোগের চাহিদাটা থাকবে। যখন বাজারে কোনো কিছুর প্রচুর চাহিদা থাকে, তখন কোনো আইন বা নিয়ম করেও এটাকে আটকানো যায় না। সেই চাহিদা পূরণের জন্য যে গ্রাহক সেও টাকা দিতে রাজি, আর যে দিবে তারও সুযোগ হবে।’

গ্যাস সংযোগগুলো নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ না করাটাও একটা বিরাট সমস্যা বলে মনে করেন অধ্যাপক ম. তামিম। তিনি বলেন, ‘সার্বিক ব্যবস্থাপনায় যে অবহেলা, আমাদের ৫০ বছরের পুরনোও যে পাইপলাইন আছে, এগুলো নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের যে প্রক্রিয়াটা, সেটার প্রতি অবহেলা। শুধু গ্যাস না, আরও অনেক ক্ষেত্রেই আমাদের রক্ষণাবেক্ষণের অবহেলা। দেখা যাচ্ছে, প্রথমে আমরা প্রকল্পে অনেক টাকা দেই। কিন্তু, পরবর্তীতে সেটার রক্ষণাবেক্ষণে কোনো টাকা দেই না। রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে এটা একটা সহজাত সমস্যা। তিতাসের পাইপলাইনের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা। বছরের বছর তারা পাইপলাইন লাগিয়ে গেছে। কিন্তু, এগুলোর যে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা, মনিটরিং করা, সেটা করেনি। রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের যে অভাব, সেটাই এখন একটা ভয়াবহ আকারে চলে এসেছে। এটা হচ্ছে শুরু থেকেই ব্যবস্থাপনার দূরদৃষ্টির অভাব। এক্ষেত্রে দুর্নীতি খুব একটা সংযুক্ত না। দুর্নীতি বেশি সংযুক্ত অবৈধ সংযোগে। যা আগে ছিল কেবল বাণিজ্যিক ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল সংযোগে, এখন এটা বাড়িঘরের ক্ষেত্রেও হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘একটা বাড়ি আগে তিনতলা ছিল, এখন সেটা পাঁচতলা করা হলো। তিতাস বলছে, আগে যে তিনতলা সেখানেই সংযোগ থাকবে, বাকি দুইতলায় সংযোগ দেওয়া হবে না। এখন এগুলো তো নীতিগত সিদ্ধান্তের বিষয়। সরকারকে ভাবতে হবে। পাইপ ন্যাচারাল গ্যাসের মূল্য দুটো চুলার জন্য এখন সাড়ে নয় শ টাকা। যেহেতু নিজস্ব গ্যাস না থাকার কারণে আমাদের এখন গ্যাস আমদানি করতে হচ্ছে, এর জন্য খরচ হচ্ছে আমাদের সাড়ে তিন হাজার টাকা। একইভাবে আমদানি করা গ্যাস দিয়ে যদি এখন মিটারড কানেকশন দিতে হয়, সেটার খরচ পড়বে সাড়ে তিন হাজার টাকা। যদি আমি এখন গ্রাহকদের বলি, এখন থেকে গ্যাস সংযোগ দেওয়া হবে, বিল হবে সাড়ে তিন হাজার টাকা। সব অবৈধ সংযোগকে আমি বৈধ করে দেবো। মাসে সাড়ে তিন হাজার টাকা বিল দিতে হলে একজনও সংযোগ নিতে আসবে না। এখন একটা সমাধান যে আমরা এটাকে সাড়ে তিন হাজার টাকা করে দিতে পারি। কিন্তু, সেটা অন্যায্য হবে। কারণ, এখন যে পরিমাণ ব্যবহারের ভিত্তিতে চার্জ (৯৫০ টাকা) করা হয়, সেই পরিমাণই তো কেউ ব্যবহার করে না। তাহলে ইতোমধ্যে তো এই টাকাটাই (৯৫০ টাকা) তারা ব্যবহারের চেয়ে বেশি দিচ্ছে। কারণ, যেখানে তিতাসের মিটারড গ্যাস আছে, সেখানে দেখা গেছে ৪০-৪৫ শতাংশ রেভিনিউ কমে যায়। এমনিতে মাসে সাড়ে নয় শ টাকা, আর মিটারড গ্যাস হলে দেখা যাচ্ছে মাসে চার শ টাকার গ্যাস হলেই হচ্ছে।’

বর্তমানে গ্যাস সংযোগগুলো মিটারভিত্তিক করে ফেলা ও গ্যাসের চাহিদা পূরণ করাটাই মূল সমাধান বলেন মনে করেন এই জ্বালানি বিশেষজ্ঞ। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সব পাইপ ন্যাচারাল গ্যাসগুলোর জন্য একটা সময়সীমা দিয়ে দিতে হবে, ধাপে ধাপে এগুলো মিটারড করা হবে। এখানে আরেকটা বিষয়, ভালো মিটারের দাম ১৫ হাজার টাকা। সেক্ষেত্রে সরকার যদি অ্যাপ্রুভড ডিলার করে, যেটা আমরা বিদ্যুতের ক্ষেত্রে দেখছি, সেটা করে দিয়ে গ্রাহকদেরকে একটা সময়সীমা দিয়ে দিতে হবে। এর জন্য তিতাসের লোকবল তৈরি করতে হবে। মিটার লাগালে যেটা হবে, এমনিতে মাসে বিল যদি সাড়ে তিন হাজার টাকাও করা হয়, মিটারে এটা আমি নামিয়ে এক হাজার টাকায় নিয়ে আসতে পারব। করো জন্য হয়তো দেড় হাজার টাকাও লাগতে পারে। তখন বিষয়টি এমন হবে যে, যারা মিটারড গ্যাস ব্যবহার করবে না, মাসে সাড়ে তিন হাজার টাকা বিল দিতে হবে। নীতিগতভাবে যদি এমন একটা সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তাহলে অন্তত বাড়িঘরে যে অবৈধ সংযোগ আছে, সেটা একেবারে কমে যাবে। কারণ, শহরে এখন অনেকেই আছে যাদের মিটারড গ্যাস আছে, কিন্তু, তারা ভাবছেন তাদের মিটারড গ্যাস দরকার নেই। এক হাজার টাকা যদি সিলিন্ডার হয়, অনেকের এক সিলিন্ডারে দুই মাস চলবে। সে তখন সিলিন্ডার নেবে। তখন একই ভবনে দেখা যাবে, তিন জনের মিটারড গ্যাস, একজনের আনমিটারড, আর দুই জনের এলপিজি। এরকমভাবেই এটার সমাধান করতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘তাৎক্ষণিক সমাধান যে, আজকে একটা দুর্ঘটনা ঘটলে সেখানে অভিযান, গিয়ে ঠিক করলাম, আবার কালকে ঘটলে সেখানে, এটা কোনো সমাধান না। এই যে দুর্ঘটনাগুলো ঘটে, যেকোনো সংকটই কিন্তু সমস্যা সমাধানের একটা সুযোগ তৈরি করে। এই যে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হচ্ছে, এই সময়েই কিন্তু আমরা নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে পরিবর্তনটা আনতে পারি। তাহলে মানুষকে বোঝানো সুবিধা হবে। স্বচ্ছতা এখানে একটা বিরাট বিষয়। তবে, পাইপলাইনগুলোর যে রক্ষণাবেক্ষণ করেনি, সেটা একেবারে গাফিলতি। তারা হয়তো বলবে একেবারেই করিনি, সেটা ঠিক নয়। কিন্তু, এর ব্যাপকতা যা হওয়ার কথা ছিল, সেই হারে করেনি। সেই কারণেই আমরা এখন বলছি প্রায় ৭০ শতাংশ লাইনে লিকেজ করছে। তারপর হলো ম্যাপিং। কোনখান দিয়ে কোন লাইন গেছে, এই সম্পর্কে তিতাসের স্পষ্ট ধারণা আছে কি না, আমি জানি না। একটা ট্যাগলাইন দিয়ে রাখা। আমি তো দেখি হয়তো দুই-এক জায়গায় এটা আছে। বেশিরভাগ সময়ই আমি এটা দেখি না। অনেকটা ওয়াসার মতো। তাদের সুয়ারেজ লাইন কোথায় কোথায় গেছে, সেটা তারাও জানে না।’

‘এখন হয়তো আমরা এগুলো নিয়ে কথা বলছি। আগামী তিন-চার দিনে আবার নতুন ঘটনা ঘটবে। এটা আলোচনার বাইরে চলে যাবে। এগুলোই তো আসলে কাজ। একটা সংস্থার যদি দেশের জন্য সত্যিকার অর্থে কাজ করতে হয়, এগুলোই তো নিয়মমাফিক কাজ। কাকে সংযোগ দেবে বা না দেবে, সেটা কিন্তু তিতাসের কাজ না, সেটা সরকারের কাজ। নীতি নির্ধারণের কাজ তো সরকারের। তিতাস তো নীতি নির্ধারণ করে না। তিতাসের লোকজনের কাছেও তো ভীষণ চাপ সৃষ্টি হয়েছে, যে আমার পাশের বাড়ির লোকের গ্যাস আছে, আপনি আমাকে দিবেন না কেন। যারা অবৈধ গ্যাস নিচ্ছে, দেশের জনগণ হিসেবে তাদেরও তো এক ধরনের অধিকার আছে। আপনি আরেকজনকে ন্যাচারাল গ্যাস দিচ্ছেন, আমাকে কেন দিবেন না? আমাকে এলপিজি নিতে বলছেন কেন? সুতরাং অপশনগুলোকে জনগণের সামনে সমানভাবে আনতে হবে। একেবারে সমান তো করা যাবে না, মোটামুটি হলেও সমান। সুতরাং আমাদের মূল কাজ হবে অবৈধ সংযোগের যে চাহিদা, সেটা দূর করা। তাহলেই সমাধান আসবে। অন্যথায় কাজ হবে না’, বলেন অধ্যাপক ম. তামিম।

তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্যসচিব এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘এখানে তিতাস গ্যাস একটা প্রতিষ্ঠান হিসেবে শুধু তিতাস গ্যাসের সমস্যা না। এটা সামগ্রিকভাবে যে সরকারি ব্যবস্থাপনা, সেখানেই সমস্যা। সরকারি ব্যবস্থাপনা মানে হচ্ছে, যে সার্ভিস ইনস্টিটিউশন, এজেন্সিগুলো বাংলাদেশে আছে, সেগুলো যদি ঠিকমতো তার সার্ভিস দিতে হয়, তাহলে সেখানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা থাকতে হবে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা, এই দুটো তো খুব বেসিক জিনিস। কোনো প্রতিষ্ঠানে যদি স্বচ্ছতা না থাকে, তাহলে সেখানে যেকোনো ধরনের অনিয়ম হতে পারে। জবাবদিহিতা যদি না থাকে, তাহলে যে কেউ যেকোনো কিছু করে পার পেয়ে যেতে পারে। সামগ্রিকভাবে সরকারের মধ্যেই এই দুইটা প্রবল হওয়ার কারণে সেটার প্রভাব আমরা সব প্রতিষ্ঠানগুলোতেও দেখছি।’

এই যে দুর্নীতি, অনিয়ম বা জবাবদিহির অভাব, এগুলোর ক্ষেত্রে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় প্রথম সারিতে আছে বলে মনে করেন অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। তিনি বলেন, ‘এই বিভাগ নিয়ে সরকারের যে অভিগমন, তারা যে আইন করেছে, মন্ত্রণালয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ বা জ্বালানি বিষয়ে সিদ্ধান্তের জন্য যা কিছু হবে সেটা নিয়ে আদালতে প্রশ্ন তোলা যাবে না। এটাই তো একটা সিগন্যাল দেয় যে যেকোনো প্রতিষ্ঠানের উপর থেকে শুরু করে একদম নিচ পর্যন্ত কাজ করা কর্মকর্তাদের এক ধরনের লাইসেন্স দেওয়া হয় যে, তিনি যদি এক ধরনের চুক্তি ও যোগাযোগের মধ্যে কাজ করে এবং সুপিরিয়রের সঙ্গে তার যদি নেগোসিয়েশন ঠিক মতো হয়, তাহলে যেকোনো অনিয়ম তিনি করতে পারবেন। এর জন্য আইনগত কোনো সমস্যা হবে না। তো এই রকম একটা দৃষ্টিকোণ থেকে তিতাস গ্যাসের বিষয়টা দেখতে হবে।’

‘এই যে তিতাস গ্যাসের অবৈধ সংযোগ, এই বিষয়টি তো অনেক আগে থেকেই শোনা যাচ্ছে। এর সঙ্গে তাদের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারাও জড়িত। শুধু তিতাস গ্যাস না, মন্ত্রণালয়ের লোকজনও জড়িত, এরকম কথাবার্তা অনেক দিন থেকেই আছে। আরেকটা ব্যাপার হচ্ছে, গণমাধ্যমে ওপর নানা রকমের বাধা বা হুমকি থাকার ফলে তারাও ঠিকমতো এগুলো নিয়ে রিপোর্টিং করতে পারছে না। এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা সম্পর্কে বলা যাবে না, মন্ত্রী সম্পর্কে বলা যাবে না, এমপি সম্পর্কে বলা যাবে না, উচ্চতর মহলের বিষয়ে কিছু বলা যাবে না। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন করে আরও চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে। একে তো স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা নেই, এগুলোর ফলে পাবলিক যে একটা সার্ভিল্যান্স বা পাবলিক অ্যাকাউন্টিবিলিটির যে প্রসেসটা গণমাধ্যমের মাধ্যমে হয়, সেগুলো নানাভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সব মিলিয়ে শুধু একটা ফাইন্যান্সিয়াল সংকট যে তৈরি হচ্ছে তা নয়। সব জায়গায় একটা ভয়ংকর হুমকি তৈরি হচ্ছে। এটারই একটা প্রতিচ্ছবি হলো নারায়ণগঞ্জে মসজিদে বিস্ফোরণ।’

তিতাস গ্যাসের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘যদিও তিতাস জনগণের প্রতিষ্ঠান, কিন্তু, এটা চালানোর দায়িত্বে তো সরকার আছে। সরকার যদি জনগণের স্বার্থকে তার কেন্দ্রে না রাখে, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ক্ষেত্রেও জনস্বার্থ তো কেন্দ্রে নেই। এখানে বিভিন্ন ব্যবসায়িক দল, দেশি-বিদেশি লবি, তাদের স্বার্থ দ্বারাই মন্ত্রণালয় পরিচালিত হয়। সেখানে তিতাস গ্যাস তো ব্যতিক্রম হতে পারে না। যারা এটা নিয়ন্ত্রণ করে, অর্থাৎ তিতাস গ্যাসে না, তাদেরও যারা বস, মূল দায়িত্ব তো তাদের ওপরেই পড়ে। জনগণের প্রতিষ্ঠান হলেও এখানে জনগণের কাছে জবাবদিহির কোনো জায়গা নেই এবং গণমাধ্যমে বা সামাজিক মাধ্যমে কোনো প্রশ্ন তোলা যাবে না, এই যে পরিবেশটা সরকার তৈরি করেছে, এর সুবিধা তো অপরাধীরা নিচ্ছে। যাদের কারণে আজকে এই বিপদগুলো হচ্ছে এবং মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায় সরকারের হাতে, এমনটিই মনে করেন অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। তিনি বলেন, ‘সরকারের কাছে জনগণ গুরুত্বপূর্ণ নাকি কিছু গোষ্ঠীর স্বার্থ গুরুত্বপূর্ণ, সেটার ফয়সালার ওপর নির্ভর করে এটা। কারণ, জনগণের স্বার্থ গুরুত্বপূর্ণ হলে পাবলিক ইনস্টিটিউট সবগুলো একটা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মধ্য দিয়ে যাবে। একইসঙ্গে প্রাইভেট ইন্টারেস্টের চেয়ে পাবলিক ইন্টারেস্টকে গুরুত্ব দিতে হবে। ইনস্টিটিউশনগুলোর একটা রি-অর্গানাইজেশন হতে হবে। যদি প্রাইভেট ইনস্টিটিউশনের কিছু লোকের ইন্টারেস্ট প্রধান হয়, তখন তো ক্ষতি হবে জনসাধারণের। কিছু লোকের লাভ করতে গিয়ে ক্ষতি হবে দেশের, জনসাধারণের। সেটাই হয়ে যাচ্ছে এখন। সব মিলিয়ে যদি পুরো অভিগমনটাকে, পলিটিক্যাল ইকোনমিকে যদি মৌলিকভাবে পরিবর্তন করা না যায়, তাহলে সামনে আমরা আরও বিপদ দেখব। কারণ, এই যে দুর্নীতি-অপরাধ, জনগণকে তো জীবন দিয়ে এগুলোর জন্য মূল্য দিতে হয়।’

Comments

The Daily Star  | English

New School Curriculum: Implementation limps along

One and a half years after it was launched, implementation of the new curriculum at schools is still in a shambles as the authorities are yet to finalise a method of evaluating the students.

26m ago