যে পাথর ধারণ করে আছে কোটি বছরের ঐতিহ্য

প্রকৃতি-কন্যা খ্যাত জাফলংয়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অসংখ্য পর্যটকদের আকর্ষণ করলেও এ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আড়ালে রয়েছে প্রাচীন ঐশ্বর্যভাণ্ডার, প্রাগৈতিহাসিক পাথরের এক জীবন্ত জাদুঘর।
জাফলংয়ের ডাউকি নদীর পাড়ে রয়েছে ইওসিন যুগের চুনাপাথর। এখানেই দেশের প্রথম ভূতাত্ত্বিক জাদুঘর স্থাপনের প্রক্রিয়া শুরুর অপেক্ষা। ছবি: শেখ নাসির

প্রকৃতি-কন্যা খ্যাত জাফলংয়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অসংখ্য পর্যটকদের আকর্ষণ করলেও এ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আড়ালে রয়েছে প্রাচীন ঐশ্বর্যভাণ্ডার, প্রাগৈতিহাসিক পাথরের এক জীবন্ত জাদুঘর।

ডাউকি নদীর স্রোত বেয়ে মেঘালয়ের পাহাড় থেকে আসা পাথর নয়, এই পাথররাজির সৃষ্টি পৃথিবীতে প্রথম মানুষের পদক্ষেপেরও ২ দশমিক ৭ কোটি বছর আগের।

সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার জাফলংয়ের সীমান্তবর্তী ডাউকি নদীর পূর্ব তীরের এই প্রাচীন চুনাপাথর-  ‘ইওসিন সিলেট লাইমস্টোন’ হিসেবে পরিচিত এবং ভূতাত্ত্বিক ও প্রকৃতি গবেষকরা এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই গবেষণা করছেন।

ভূতাত্ত্বিক সময়ের হিসেবকে প্রধানত দুটি যুগে ভাগ করা হয়- ক্রিটেশিয়াস ও প্যালিওজিন। এর মধ্যে প্যালিওজিনকে তিনটি উপযুগে ভাগ করা-অলিগোসিন, ইওসিন এবং প্যালিওসিন।

সময়ের হিসেবে আজ থেকে ৫ কোটি ৬০ লাখ বছর আগে থেকে শুরু করে ৩ কোটি ৩৯ লাখ বছর আগের সময়সীমাকে ইওসিন উপযুগ বলা হয়।

জাফলংয়ের ডাউকি নদীর পাড়ে ইওসিন যুগের চুনাপাথর। ছবি: শেখ নাসির

জাফলংয়ের এই ভূতাত্ত্বিক সম্পদ সেই ইওসিন উপযুগ (Eocene Epoch) এর। উত্তরবঙ্গের কিছু স্থানে সেই সময়ের চুনাপাথর পাওয়া গেলেও তার অবস্থান ভুপৃষ্ঠের অন্তত চার হাজার ফুট নিচে, আর জাফলংয়ে তা একেবারেই চোখের সামনে—ভূমির একেবারে উপরের স্তরে।

তবে এই ভূতাত্ত্বিক ঐতিহ্য গত কয়েক যুগ ধরে হুমকির মুখে। এই ঐতিহ্য রক্ষায় দীর্ঘদিন ধরেই দাবি জানিয়ে আসছেন গবেষক ও পরিবেশবিদরা।

দেশের প্রথম ‘ভূতাত্ত্বিক জাদুঘর’ গড়ে তোলার উদ্যোগও নেয়া হয়েছে প্রায় এক যুগ আগে। তবে এর অগ্রগতির ধীরগতি বার বার হুমকির মুখে ফেলছে এ ভূতাত্ত্বিক ঐতিহ্যকে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্বের অধ্যাপক ড. সৈয়দ হুমায়ুন আখতার দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘২০০৯ সালে আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের চেয়ারম্যান, তখন জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিবকে এই ভূতাত্ত্বিক ঐতিহ্য রক্ষা এবং একটি ভূতাত্ত্বিক জাদুঘর প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব প্রথম দিয়েছিলাম’।

তিনি বলেন, ‘কয়েক কোটি বছর আগে, বর্তমানের পৃথিবীর ভূতাত্ত্বিক অবস্থা গঠনের সময় যখন ইন্ডিয়ান প্লেট এসে ইউরেশিয়ান প্লেটের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়, ঠিক যে সময় বর্তমানের হিমালয় পর্বতশ্রেণি সৃষ্টি। তখনই জাফলংয়ের এই পাথররাজি ভূস্তরের উপরে উঠে আসে। এই ভূতাত্ত্বিক সম্পদ দীর্ঘকাল ধরেই ভূতত্ত্ব ও প্রকৃতি বিজ্ঞান, এমনকি খনিজ সম্পদ শিক্ষার্থীদের অন্যতম গবেষণার স্থান। এই ভূতাত্ত্বিক ঐতিহ্য কোনভাবেই ধ্বংস হতে দেয়া যাবে না, এসব সংরক্ষণ করতেই হবে।'

ড. সৈয়দ হুমায়ুন আখতারের চিঠির পরই জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ থেকে বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরকে এই সম্পদ রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে নির্দেশনা দেয়া হয়।

এরপরই অধিদপ্তরের তৎকালীন মহাপরিচালক ড. নেহাল উদ্দিনকে সভাপতি করে ড. সৈয়দ হুমায়ুন আখতারসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়।

বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের পরিচালক (ভূতত্ত্ব) মো. নুরুদ্দিন সরকার দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘এই কমিটি ২০১০ সালের মে মাসে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে যাতে এই ভূতাত্ত্বিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং এখানে ভূতাত্ত্বিক জাদুঘর নির্মাণের প্রস্তাবনা দেয়া হয়।'

কমিটির প্রস্তাবনার আলোকেই ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে জাফলংয়ের এই ভূতাত্ত্বিক ঐতিহ্যমণ্ডিত ২২ দশমিক ৫৯ একর ভূমিকে ‘ভূতাত্ত্বিক ঐতিহ্য’ হিসেবে ঘোষণা করে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়।

মো. নুরুদ্দিন সরকার বলেন, ‘সংরক্ষণ ও জাদুঘর নির্মাণের প্রথম পর্যায়ে আমরা ওই ঐতিহ্য এলাকার ১০ একর জায়গা অধিগ্রহণ করছি। ইতোপূর্বে সংরক্ষণ ও জাদুঘর বাস্তবায়ণে কয়েকটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। অধিগ্রহণের পরই কমিটিগুলো আবারও সচল হয়ে জাদুঘরের জন্য পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়নে কাজ শুরু করবে।'

এর আগে ২০১৫ সালে জাফলংয়ের ডাউকি নদীর আশপাশের সব এলাকাকে ‘প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) হিসেবে ঘোষণা করে পরিবেশ অধিদপ্তর।

তবে সম্প্রতি, জাফলংয়ের এই ভূতাত্ত্বিক ঐতিহ্য এলাকায় হাইকোর্টের আদেশে খনিজ সম্পদ উত্তোলনের কাজ চলছে লিখে একটি সাইনবোর্ড লাগানো হয়েছে।

ভূতাত্ত্বিক ঐতিহ্য এলাকার ৬ দশমিক ৫৮ একর ভূমিসহ জাফলংয়ের ৭৮ দশমিক ২৭ একর ভূমি জালালাবাদ লাইম ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড ট্রেডিং অ্যাসোসিয়েশনকে ইজারা দেয়া হয়েছিল অনেক বছর আগে, যা বাতিল হয় ১৯৯১ সালে।

পরবর্তীতে ২০০৯ সালে তারা উচ্চ আদালতে রিট করলে আদালত তাদের পক্ষে রায় দিলেও রাষ্ট্রপক্ষের আপিলের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৫ সালে এ রায় বাতিল হয়ে যায়।

চলতি বছরই তারা উচ্চ আদালতে পুনরায় রিট আবেদন করে এবং আদালত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে রায় বাতিলের কারণ জানাতে নোটিশ দেয়ার পরই এই সাইনবোর্ড টাঙ্গানো হয়।

তবে এই ভূতাত্ত্বিক এলাকার গুরুত্ব ব্যাখ্যা করে আদালতের এই নির্দেশনার বিপক্ষে আপিল করতে সরকারের আইন ও বিচার বিভাগের সলিসিটরকে গতমাসে একটি চিঠি পাঠান খনিজ সম্পদ উন্নয়ন ব্যুরো এর সদ্য সাবেক মহাপরিচালক মো. জাফর উল্লাহ।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) এর সিলেট আঞ্চলিক সমন্বয়ক আইনজীবী শাহ শাহেদা আক্তার দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘ব্যবসায়ীরা তাদের রিট আবেদনে জাফলংকে ‘প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা’ এবং ‘ভূতাত্ত্বিক ঐতিহ্য’ ঘোষণার দুটি ব্যাপারই এড়িয়ে গিয়েছেন। এছাড়াও তারা পূর্ববর্তী রিট এবং তার রায়ের বিষয়েও উল্লেখ না করে কেবলমাত্র ১৯৯১ সালের লিজ বাতিলের বিষয়টি উল্লেখ করেছেন।'

তিনি বলেন, ‘তাদের রিটের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত কেবলমাত্র সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ইজারা বাতিলের কারণ দর্শানোর আদেশ দিলেও ব্যবসায়ীরা তার অন্য ব্যাখ্যা দিয়ে খনিজ সম্পদ উত্তোলন করার উদ্দেশ্যে সাইনবোর্ড বসিয়েছেন।'

তবে এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন জালালাবাদ লাইম ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড ট্রেডিং অ্যাসোসিয়েশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আফসার উদ্দিন।

তিনি বলেন, ‘আমাদের মূল দাবির ৭৮ দশমিক ২৭ একরের সামান্য একটি অংশ জাদুঘর নির্মাণের প্রস্তাবিত জায়গার মধ্যে রয়েছে। এছাড়া ওই অংশটাই এখনও অধিগ্রহণ করার উদ্যোগ নেয়নি সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তর।'

রিট আবেদনে কোন তথ্য গোপন করেননি দাবি করে তিনি বলেন, ‘জাফলং প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা না ভূতাত্তিক ঐতিহ্য, এই বিষয় আদালতে জানানোর দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। যেহেতু আদালত আমাদের দাবির ভূমির উপর স্থিতাবস্থার আদেশ দিয়েছেন তাই আমরা সেখানে অবস্থান নিয়েছি আমাদের আইনগত অধিকারেই’।

তিনি আরো বলেন, ‘ভূতাত্ত্বিক জাদুঘরের জন্য যদি কর্তৃপক্ষ আইনগতভাবে আমাদের কাছ থেকে ভূমি অধিগ্রহণ করতে চায় তো আইনি প্রক্রিয়াতেই সেটি করতে পারবে, আর আইনগত কোন বিষয়ে আমাদের আপত্তি থাকবে না।'

সিলেটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. আসলাম উদ্দিন দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘ভূতাত্ত্বিক জাদুঘরের জন্য নির্ধারিত ভূমি অধিগ্রহণের আর খুব বেশি ধাপ বাকি নেই। খুব শিগগির আমরা নির্ধারিত ভূমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন করতে পারব এবং এর মধ্যে যদি আইনগত কোন বিষয় আসে, তাহলে তা আইনসম্মত উপায়েই সমাধান করা হবে।’

ড. সৈয়দ হুমায়ুন আখতার দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘আমরা যদি বাংলাদেশের গঠনকালীন সময়ের অবস্থা থ্রিডি মডেলিংয়ের মাধ্যমে জাদুঘরে দেখাতে পারি এবং একই সাথে এই উন্মুক্ত ঐতিহ্যকেও সংরক্ষণ করে এর গুরুত্ব যথাযথভাবে প্রকাশ করতে পারি, তবে তা একটি অসাধারণ বিষয় হবে। যেহেতু জাফলংয়ে অসংখ্য মানুষ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য দেখতে আসেন, তারা একই সাথে ভূতাত্ত্বিক এই ঐতিহ্যেরও দেখা পেয়ে যাবেন।’

তিনি বলেন, ‘উন্মুক্ত এই ভূতাত্ত্বিক ঐতিহ্য দেখে সবাই বুঝতে পারবে কীভাবে কোটি কোটি বছর আগে আমাদের এই ভূখণ্ড গড়ে উঠেছে। তরুণ শিক্ষার্থীরা এসব দেখে প্রকৃতি বিজ্ঞানে আগ্রহী হবে।’

বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মহ. শের আলী দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘জাফলংয়ের এই ভূতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়েই এখানে ভূতাত্ত্বিক জাদুঘর নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে এবং আমরা এর কাজ দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যেতে কাজ করছি। ভূমি অধিগ্রহণ দ্রুত সম্পন্ন করতেও আমরা সিলেট জেলা প্রশাসনকে বার বার জানাচ্ছি যাতে এরপরই আমরা দ্রুত এই জায়গা সংরক্ষণ ও জাদুঘর স্থাপনের মূল কাজ শুরু করতে পারি।'

Comments

The Daily Star  | English

Dhaka getting hotter

Dhaka is now one of the fastest-warming cities in the world, as it has seen a staggering 97 percent rise in the number of days with temperature above 35 degrees Celsius over the last three decades.

7h ago