খাসিয়া পরিবারের পান জুম জোরপূর্বক দখল

খাসিয়া জনগোষ্ঠীর সরল জীবনযাপন সব সময়ই কাল হয়ে দাঁড়ায় তাদের জন্য। তাদের সরলতার সুযোগ নেওয়ার জন্য সব জায়গাতেই মুখিয়ে থাকে কিছু দুর্বৃত্ত। এমনই পরিস্থিতির শিকার হয়েছে মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলার এক খাসিয়া পরিবার। জবরদখল করা হয়েছে তাদের পান জুম।
জবরদখল হওয়া খাসিয়া পরিবারের পান জুম। ছবি: স্টার

খাসিয়া জনগোষ্ঠীর সরল জীবনযাপন সব সময়ই কাল হয়ে দাঁড়ায় তাদের জন্য। তাদের সরলতার সুযোগ নেওয়ার জন্য সব জায়গাতেই মুখিয়ে থাকে কিছু দুর্বৃত্ত। এমনই পরিস্থিতির শিকার হয়েছে মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলার এক খাসিয়া পরিবার। জবরদখল করা হয়েছে তাদের পান জুম।

খাসিয়া পরিবারটির দখলে থাকা জমি জোরপূর্বক দখল করে পাহারাদার বসিয়েছেন টাট্রিউলি গ্রামের স্থানীয় প্রভাবশালী প্রবাসী রফিক মিয়া। খাসিয়া পরিবারটি যাতে কোনো ধরনের বাধা দিতে না পারে, সেজন্য রফিক মিয়া ও তার সঙ্গীরা তাদের প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

প্রভাবশালীদের হুমকির ভয়ে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে ভুক্তভোগী পারিবারটি। একমাত্র আয়ের উৎস পান জুমের টাকা দিয়েই তিন বছর ধরে নিজের ক্যান্সারের চিকিৎসাসহ পরিবার পরিচালনা করেন পরিবারটির কর্তা।

জুমের মালিক জসপার আমলরং দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘এই জমিতে তৎকালীন জমিদার নবাব আলী হায়দার খান ও নবাব আলী আছকর খান সাহেবের অধীনে প্রজা নিযুক্ত থেকে বিংশ শতাব্দীর উর্ধ্বকাল যাবত হতে ভোগ ব্যবহার, শাসন সংরক্ষণ, উৎপাদন করে আসা অবস্থায় বিগত ১৯৫৬-৫৭ সালের সেটেলমেন্ট জরিপে এই জমি আমার পূর্ববর্তীগনের নামে মাঠ পর্চা ও তসদিক করা হয়। পরে তৎকালীন সময়ে আইনি প্রতিবন্ধকতায় এই জমি আমার পূর্ববর্তীগনের নাম বরাবরে রেকর্ড না হয়ে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে জেলা প্রশাসকের নাম বরাবরে রেকর্ড হয়। এতে ওই রেকর্ডের বিরুদ্ধে তৎকালীন সময়ের পুঞ্জি মন্ত্রী গৌরধন খাসিয়া বাদী হয়ে সিলেট জেলা সাব-জজ ২য় আদালতে ২১১/১৯৭৫ নং স্বত্ব মামলা দায়ের করেন। ওই মামলা পরবর্তীতে ১৯৮২ সালে ১৮/৮২ নং স্বত্ব মামলা হয়ে ২য় (অতিরিক্ত) সাব-জজ আদালত সিলেটে পাঠানো হলে বিচারক আক্তারুজ্জামান ভূইয়া ১৯৮২ সালের ২ জুন মামলার বাদী মন্ত্রী গৌরধন খাসিয়ার পক্ষে রায় দেন এবং ১৯৮২ সালের ৯ জুন ডিক্রি হয়। তখনই সরকার পক্ষ ওই রায় ও ডিক্রির বিরুদ্ধে মৌলভীবাজার জজ কোর্টে আপিল করেন।’

স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য সিলভেস্টার পাঠাং বলেন, ‘এই মামলার বাদী মন্ত্রী গৌরধন খাসিয়া মারা গেলে বাদী হন তার মেয়ে ইয়োনা পতাম ও ইয়োনার স্বামী বেনিসন টংপের। মৌলভীবাজার জেলা জজ মো. আব্দুর রশিদ ২০১২ সালের ২১ নভেম্বর সরকারের দায়ের করা স্বত্ব আপিল নং ৫৫/৯২ নামঞ্জুর করেন। পরে ওই মামলার বাদী ইয়োনা পতাম ও বেনিসন টংপের উল্লেখিত স্বত্ব ২১১/১৯৭৫ (পুনঃ নং ১৮/৮২) ও স্বত্ব আপিল ৫৫/৯২ নং মামলার ডিক্রি মূলে জমির স্বত্ব পান এবং দখল নিষ্কন্টকভাবে ভোগ দখল ও পান চাষ করে আসছিলেন। বর্তমান রিভিশনাল জরিপ এস.এ. ১৮০১ নং ও আর.এস. ১৮০৪ নং দাগ হিসাবে ইয়োনা পতাম ও তার স্বামী বেনিসন টংপের এর নামে আর.এস.ডিপি. ২০২ প্রস্তুত করা হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘জসপার আমলরং ঠিকভাবেই চলছিলেন। একমাত্র ওই পান জুমের টাকা দিয়েই তার পরিবার চলতো, সঙ্গে তার ক্যান্সারের চিকিৎসা চলতো।’

তিনি জানান, গত ২৭ সেপ্টেম্বর রফিক মিয়া রাতের আধারে তার দলবল নিয়ে জোরপূর্বক দখল করে নেয় ওই পান জুম এবং জসপার আমলরংকে হুমকি দেওয়া শুরু করে। সেদিনই কুলাউড়া থানায় একটি অভিযোগ দাখিল করেন জসপার।

সব অভিযোগ অস্বীকার করে রফিক মিয়া বলেন, ‘সরকারের কাছ থেকে আমার বাবা এই জমি লিজ নিয়েছেন।’

কুলাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এটিএম ফরহাদ চৌধুরী বলেন, ‘রবির বাজার তফসিল অফিসের সর্বশেষ ভূমি জরিপ ও তথ্য অনুসারে এই পান জুমটি ডিসি খতিয়ানের আওতায়। আমরা আগামীকাল রোববার দুই পক্ষের সঙ্গে বসবো।’

কুবরাজ আন্তপুঞ্জি উন্নয়ন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ফ্লোরা বাবলী তালাং বলেন, ‘শত বছরের বসবাস করা জমি পেশীশক্তির বলে দখলে নিয়ে নিল। এটা খুবই দুঃখজনক বিষয়। আমরা এর প্রতিকার চাই।’

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের নির্বাহী কমিটির সদস্য ফাদার যোসেফ গমেজ ওএমআই বলেন, ‘পান চাষের উপর নির্ভরশীল খাসিয়া জনগোষ্ঠী। অথচ পান জুমটি দখল হয়ে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে এই জনগোষ্ঠী একদিন অস্তিত্ব সংকটে পড়বে।’

ক্ষুদ্র ণৃ-গোষ্ঠীদের ভূমি অধিকার সুরক্ষা নিশ্চিতের দাবি জানিয়ে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং বলেন, ‘নানা রকম অপচেষ্টার মাধ্যমে আমাদের জমি দখলের পাঁয়তারা করছে। এতে ভূমির ওপর আমাদের যে ঐতিহ্যগত অধিকার তা লঙ্ঘিত হচ্ছে। সরকারের ও প্রশাসনের উচিত এটি দখলমুক্ত করা। অন্যদিকে মাইনরিটিদের সম্পদ/সম্পত্তি রক্ষার দায়িত্ব হলো রাষ্ট্রের। রাষ্ট্র শান্তিপূর্ণ উপায়ে দখল মুক্ত করবে ও পুনর্দখল নিশ্চিত করবে।’

Comments

The Daily Star  | English

Quota protests: Trauma, pain etched on their faces

Lying in a hospital bed, teary-eyed Md Rifat was staring at his right leg, rather where his right leg used to be. He could not look away.

31m ago