পরমাণু বিজ্ঞানী হত্যা, ইরান যা করতে পারে

ইরানের শীর্ষ পরমাণু বিজ্ঞানী মোহসেন ফখরিজাদাহ হত্যার ঘটনায় উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন করে সংকট সৃষ্টি হয়েছে। এ ঘটনায় ইসরায়েলকে দায়ী করে কঠিন প্রতিশোধ নেওয়ার হুমকি দিয়েছে তেহরান।
ইরানের শীর্ষ পরমাণু বিজ্ঞানী মোহসেন ফখরিজাদাহ হত্যার প্রতিবাদে তেহরানে বিক্ষোভ। ২৮ নভেম্বর ২০২০। ছবি- রয়টার্স

ইরানের শীর্ষ পরমাণু বিজ্ঞানী মোহসেন ফখরিজাদাহ হত্যার ঘটনায় উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন করে সংকট সৃষ্টি হয়েছে। এ ঘটনায় ইসরায়েলকে দায়ী করে কঠিন প্রতিশোধ নেওয়ার হুমকি দিয়েছে তেহরান।

বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, বাইডেন প্রশাসনকে কঠিন চাপে ফেলতে শেষ সময়ে ইরান পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করতে পারেন ইসরায়েলের বন্ধু ডোনাল্ড ট্রাম্প।

তবে, আগামী জানুয়ারিতে বাইডেন দায়িত্ব নেওয়ার আগে উপসাগরীয় অঞ্চলে সংঘাত শুরু হওয়ার সম্ভাবনা কম বলে মনে করছেন মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সিএনএন’র আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সম্পাদক নিক প্যাটন ওয়ালশ।

গতকাল শনিবার সিএনএনে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এমি অ্যাওয়ার্ড বিজয়ী এই সম্পাদক বলেছেন, ‘ট্রাম্পের শেষ ৫০ দিনের মধ্যে ইরানকে চাপে ফেলা ইরানবিরোধী রাষ্ট্রগুলোর আপাত লক্ষ্য। আমি মনে করি, ইরানের শত্রুপক্ষ ও সম্ভবত ইরান নিজেও এই মুহূর্তে সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে চাইবে না।’

তবে, এখানকার মতো উত্তেজনাপূর্ণ একটি অঞ্চল নিয়ে এই ধরনের সরলীকরণ কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।

ওয়ালশ বলেছেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের কট্টরপন্থিদের রাগিয়ে দিতে যথাসাধ্য চেষ্টা করছেন। তবে তেহরানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধ শুরু করা তার এজেন্ডার বাইরে। ট্রাম্প প্রশাসন এখন আফগানিস্তান ও ইরাক থেকে সেনা সরিয়ে নিতেই বেশি ব্যস্ত।’

এ বছর জানুয়ারিতে মার্কিন সেনাদের হাতে ইরানের জেনারেল কাসেম সোলেইমানি হত্যার ঘটনাও পুরাদস্তুর একটি যুদ্ধের রূপ নেয়নি।

ওয়ালশ বলেছেন, ‘ট্রাম্প যেসব যুদ্ধের কোনো শেষ নেই সে সবের সমাপ্তি ঘটানোর পক্ষে ছিলেন। ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়ালে হিজবুল্লাহ বা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্যের মধ্যে থাকা আমেরিকার মিত্র ইসরায়েলের সঙ্গে এ অঞ্চলে আরও একটি অন্তহীন যুদ্ধের সূত্রপাত ঘটবে। সে কারণেই হয়তো মার্কিন প্রশাসন ইরানকে আঘাত করা বন্ধ করে দিয়েছে। তবে, ট্রাম্প ভবিষ্যতে ইরানের সঙ্গে চুক্তি করাকে অসম্ভব করে তুলতে যতটা সম্ভব চেষ্টা করবেন।’

এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের সদ্য নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তি আবারও চালু করতে চান বলে জানিয়েছেন তিনি। সম্ভব হলে আগেরবারের চেয়ে আরও দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি হতে পারে। এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা।

ওয়ালশের মতে, ‘হয়তো এই মাঝখানের সময়টুকুতেই ইরানকে ওই আক্রমণাত্মক প্রচেষ্টা সহ্য করতে হয়েছে। তবে, আমার বিশ্বাস, শেষ পর্যন্ত আমরা সবাইকে আলোচনার টেবিলেই বসতে দেখবো।’

ইরানি রাষ্ট্রপতি কার্যালয়ের গবেষণা দল সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ গবেষক দিয়াকো হোসেইন মনে করেন, এই হত্যাকাণ্ডেরপ্রতিশোধ নিতে তাৎক্ষণিকভাবে ইরানের পক্ষ থেকে সামরিক প্রতিক্রিয়া দেখানোর সম্ভাবনা কম। তবে এর অর্থ এই না যে, ফখরিজাদাহ হত্যাকাণ্ডের জবাব দেওয়া হবে না।

আল-জাজিরাকে তিনি বলেছেন, ‘আমি মনে করি, এই মুহূর্তে হত্যাকাণ্ডের সমস্ত দিক মূল্যায়ন করে আইন অনুসরণ করাকেই ইরান অগ্রাধিকার দেবে।’

ইরানে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে বর্তমান প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি এখন কট্টরপন্থিদের মুখোমুখি। তারা সরকারের মধ্যপন্থি অবস্থান বদলাতে চাইছেন। তবুও এই নির্বাচনের সবচেয়ে বড় ইস্যু সম্ভবত নাগরিকদের অনীহা। নির্বাচনের ফলাফল ইরানের প্রকৃত ক্ষমতাধর আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে প্রভাবিত করার সম্ভাবনা নেই।

বিশ্লেষকরা বলছেন, সব মিলিয়ে যুদ্ধে জড়ানো এখন ইরানের পক্ষে মোটেই সুবিধাজনক না।

অন্যদিকে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুও আগামী বছর নির্বাচনে লড়তে যাচ্ছেন। ট্রাম্প হেরে যাওয়ায় উপসাগরীয় অঞ্চলে তার আধিপত্যে কিছুটা ভাটাও পড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

দিয়াকো হোসেইন বলেছেন, ‘ইরান ভালো করেই জানে যে, এই হত্যাকাণ্ডের রাজনৈতিক দিকটি ইসরায়েলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এখানে ইসরায়েলের লক্ষ্য, ট্রাম্প প্রশাসন ক্ষমতা ছাড়ার আগে উত্তেজনা বাড়ানো এবং ইরান ও আমেরিকাকে একটি বৃহত্তর দ্বন্দ্বের দিকে টেনে নিয়ে যাওয়া, যাতে পরবর্তী মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে কূটনীতির পথ আরও কঠিন হয়।’

এই হত্যাকাণ্ডের ফলে ইসরায়েলের তেমন কোনো লাভ নেই বলেও মনে করছেন তিনি।

তার মতে, ইরানের পরমাণু কর্মসূচি এখন আর কোনো একক ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল না, এটির একটি দৃঢ় কাঠামো আছে। অনেক তরুণ বিজ্ঞানী এই কাজে নিয়োজিত আছেন।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই মুহূর্তে ইসরায়েল একাই ইরানের বিরুদ্ধে যেতে চাইবে না।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর প্রসঙ্গে হোসেইন বলেন, ‘নেতানিয়াহু এই হত্যাকাণ্ডের ফলে ইসরায়েলকে আরও অনিরাপদ করে তুলেছেন। ইসরায়েলের হাতে নিহত হওয়া ইরানি বিজ্ঞানীদের তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে। এতে ইরানের পক্ষে মানসিক ভারসাম্য ধরে রাখা কঠিন। রাজনৈতিক প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য ইরানের নিরাপত্তা সংস্থাগুলি পাল্টা আক্রমণের চাপ অনুভব করছে।’

ইসরায়েলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা যতই উন্নত হোক না কেন, দেশটি তার উত্তর ও পূর্ব দিক থেকে তাক করে রাখা ক্ষেপণাস্ত্র সহ্য করতে চাইবে না।

পরমাণু বিজ্ঞানী মোহসেন ফখরিজাদাহ হত্যার ঘটনায় কঠিন প্রতিশোধ নেওয়ার হুমকির প্রসঙ্গে ওয়ালশ বলেছেন, ‘ইরান “বজ্রশক্তিতে আক্রমণ” এর কথা বললেও দেশটি পুরোপুরি সংঘাতে জড়ানোর মতো অবস্থানে নেই। করোনা মহামারিতে দেশটির জনগণ ও উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এখন বিপাকে আছেন। দেশটির অর্থনীতিও হিমশিম খাচ্ছে।’

ওয়ালশ আরও জানিয়েছে, জানুয়ারিতে জেনারেল কাসেম সোলেইমানি হত্যার ঘটনারও প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকার করা হয়েছিল। তবে, সে সময় ইরানের দিক থেকে আক্রমণাত্মক তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি।

ইরান এই হত্যাকাণ্ডে ইসরায়েলকে দায়ী করলেও ইসরায়েলের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনও মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

Comments

The Daily Star  | English