১৯৭১: এক গ্রামে ৩৭ জনকে হত্যা

১৯৭১ সালের মার্চের পর থেকেই সারাদেশে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসররা চালিয়েছিল ইতিহাসের জঘন্যতম গণহত্যা। নয় মাসে দেশে প্রাণ হারিয়েছিলেন ৩০ লাখ মানুষ।
Cumilla massgrave
কুমিল্লার কৃষ্ণপুর-ধনঞ্জয় গ্রামের খন্দকারবাড়ির গণকবর। ছবি: স্টার

১৯৭১ সালের মার্চের পর থেকেই সারাদেশে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসররা চালিয়েছিল ইতিহাসের জঘন্যতম গণহত্যা। নয় মাসে দেশে প্রাণ হারিয়েছিলেন ৩০ লাখ মানুষ।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর হলেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সেই গণহত্যার স্বীকৃতি দেয়নি। এদিকে, আমরাও পারিনি গণহত্যার স্থানগুলো চিহিৃত করে যথাযথভাবে সংরক্ষণ করতে।

দেশের এমনি একটি গণহত্যার স্থান কুমিল্লার কৃষ্ণপুর-ধনঞ্জয় গ্রামের খন্দকারবাড়ি। মোতাহার হোসেন মাহবুব ‘কৃষ্ণপুর-ধনঞ্জয় গণহত্যা’ বইয়ে মাঠপর্যায়ের গবেষণায় জানিয়েছেন, ‘প্রতিশোধ-স্পৃহা থেকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর এই আক্রমণের ধরন কিছুটা আকস্মিক ও অতর্কিত ছিল।’

বইয়ের সূত্র ধরে সরেজমিনে যাই কুমিল্লা সদরের ঐ এলাকায়। প্রত্যক্ষদর্শী, স্বজন ও এলাকাবাসীর কাছ থেকে জানা যায় নিদারুণ কথা। সেদিন ঘটনাক্রমে বেঁচে যা্ওয়া শাহ আলম ‍খন্দকার দ্য  ডেইলি   স্টারকে বলেছেন, প্রথমে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দুই-এক সদস্যকে এই গ্রামের মুক্তিযোদ্ধারা হত্যা করে। এরপর, কৃষ্ণপুর-ধনঞ্জয় গ্রাম তাদের টার্গেটে পড়ে যায়। হানাদার বাহিনী পরিকল্পনা করে গ্রামটি আক্রমণের।

তিনি জানিয়েছেন, হানাদাররা কৃষ্ণপুর-ধনঞ্জয়ে গণহত্যা চালায় ১৯৭১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর। তারা সেদিন পশ্চিম দিক থেকে গুলি করতে করতে কুমিল্লার আদর্শ সদর উপজেলার আমড়াতলী ইউনিয়নের কৃষ্ণপুর-ধনঞ্জয় গ্রামে প্রবেশ করে।

গ্রামের মানুষজন তখন দৌড়ে পূর্ব দিকে যেতে থাকেন। ভয় আতঙ্কে উপায় না পেয়ে সবাই খন্দকারবাড়িতে আশ্রয় নিতে বাড়ির উঠানে জড়ো হন। সে সময় বাঁচানোর জন্য খন্দকার শামছুল হুদা সবাইকে একটি ঘরে ঢুকিয়ে বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে উঠানে আসতেই পাকিস্তানি বাহিনী প্রথমেই তাকে গুলি করে। তিনি ঘটনাস্থলেই মারা যান।

তারপরে তালা ভেঙে ঘরে আশ্রয় নেওয়া নারী-পুরুষ একে একে ১০ থেকে ১২ জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। জানা যায়, সে সময় ৩ বছরের হিরণ মিঞা নামের এক শিশু বাম হাতে গুলির আঘাত নিয়ে ২ দিন লাশের স্তুপে পড়েছিল।

সেদিনের স্মৃতি স্মরণ করে তিনি আরও বলেছেন, ‘লোকজন যখন বাড়িতে জড়ো হচ্ছিলেন আমি খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। তাৎক্ষণিকভাবে বুদ্ধি করে ঘরের ‘সামচিটে’ ওঠে লুকাই। আমার এক চাচাতো ভাইও ছিল। দুই জনে সেখানে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ি। শ্বাস নিতে কী যে কষ্ট হয়েছিল বলে বোঝাতে পারবো না।’

‘আমি তখন ক্লাস টেনে পড়তাম’ উল্লেখ করে তিনি আরও বলেছেন, ‘পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী চলে যাওয়ার পর বাইরে এসে দেখি বাবা নেই। চারদিক রক্তে ভেজা, যেন রক্তের পুকুর, শুধু লাশ আর লাশ।’

‘হানাদাররা এ বাড়িতে শুধু গণহত্যাই করেনি যাওয়ার আগে আগুন লাগিয়ে সারা বাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছিল। একটা ঘর টিকে গিয়েছিল। এমন দৃশ্য দেখে কাঁদতেও পারিনি। সে কথা ভাবলে এখনো গা শিউরে উঠে,’ যোগ করেন তিনি।

কৃষ্ণপুর-ধনঞ্জয় গণহত্যা বই থেকে জানা গেছে, হানাদারা যখন গ্রামটিতে গণহত্যা চালায়, মনুজা খাতুন তখন শ্বশুরবাড়িতে ছিলেন। ঘটনার পরপরই তিনি খন্দকারবাড়িতে ছুটে আসেন। দেখেন বাড়িতে রক্তের বন্যা, চারদিকে শুধু লাশ আর লাশ। হানাদাররা তার পরিবারের সবাইকে মেরে ফেলেছে।

মনুজা খাতুন বইয়ের লেখককে জানিয়েছিলেন— তার বাবা সরাফত আলী খন্দকার, তিন বোন- হাফেজা খাতুন, হাজেরা খাতুন, সালেহা খাতুন, ভাই জসিম উদ্দিন, নানি জোহরা খাতুন, ভাশুর তাহের মিয়া ও তার জায়ের ছেলে সেলিমকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী সেদিন গুলি করে হত্যা করেছিল।

শহীদ শামসুল হুদা খন্দকারের বড় ছেলে লেফটেনেন্ট বিএন (অব) ফরিদ উদ্দিন খন্দকার ডেইলি স্টারকে বলেছেন, ‘সে সময় আমি পাকিস্তান নৌবাহিনীতে চাকরি করতাম। জাতির কাছে দায়বদ্ধতা ও জাতিকে অবমাননার প্রতিশোধের তাগিদে সর্বোচ্চ ঝুঁকি নিয়ে প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে অবস্থান নেই।’

‘সে সময় আমার গ্রামের নিজ বাড়ি খন্দকারবাড়িতে পাকিস্তানি সেনারা আক্রমণ চালায়। আমাকে খুঁজে না পেয়ে বর্বর সেনারা গুলি করে হত্যা করে বাড়িতে আশ্রয় নেওয়া গ্রামের শিশু ও নারীসহ ৩২ জন নিরপরাধ মানুষকে।’

‘সেই সঙ্গে শহীদ হন আমার বাবা।’

‘সেদিন এই বাড়িতে গণহত্যা করেই হানাদাররা শান্ত হয়নি। পাশের গ্রাম মধ্যম মাঝিগাছায় লোকজনের ওপর তারা চড়াও হয়েছিল। আমাদের বাড়িটি পাকিস্তানি হানাদারদের দেখিয়ে দিয়েছিল এলাকার ‘ফেনা’ নামে এক ব্যক্তি। সে ছিল পাকিস্তান আর্মির সোর্স।’

তার এসব কথা বলা রয়েছে কৃষ্ণপুর-ধনঞ্জয় গণহত্যা বইয়েও।

মুক্তিযোদ্ধা খলিলুর রহমান ফরিদ হৃদয়ে বধ্যভূমি পুস্তিকায় লিখেছেন, ‘সকাল ৮টায় সানোমুড়া থেকে রওয়ানা হয়ে প্রায় ৯টা-সোয়া ৯টায় বসন্তপুর কাজী মমতাজ উদ্দিনের বাড়ি হয়ে শিবের বাজারে পাশ কাটিয়ে, চাষের জমির ওপর দিয়ে ভরাশাল বাজারের উদ্দেশ্যে পশ্চিম দিকে দ্রুত হাঁটতে থাকি। বাজার জনশূন্য। পশ্চিম দিক থেকে গুলির আওয়াজ শুনতে পেলাম। আওয়াজ পেয়ে অবস্থা বোঝার জন্য দাঁড়াতেই উত্তর দিক থেকে আবার রাইফেল এবং স্টেনগানের লাগাতার আওয়াজ কানে আসে, সেই সঙ্গে নারী-পুরুষ-শিশুর প্রাণবিদারী চিৎকার শুনে মাঠ থেকে আমি নিজেকে আড়াল করার জন্য দক্ষিণ দিকের লোকালয়ের দিকে দৌড়াতে থাকি।’

‘ইতিমধ্যে শত শত মানুষ দৌড়ে পূর্ব দিকে আসতে থাকে। আমিও তাদের সঙ্গে পূর্ব দিকে দৌড়াতে লাগলাম। হাতের পত্রিকার বান্ডিল ধরে প্রাণপণে ছুটতে লাগলাম। একসময় একটি দল খন্দকারবাড়ির উঠানে জড়ো হলো। বাড়ির মালিক খন্দকার শামছুল হুদা তাদেরকে দক্ষিণ ভিটার একটি ঘরে ঢুকিয়ে বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে উঠানে আসতেই পাকিস্তানি বাহিনীর একটি দল প্রথমেই তাকে গুলি করে হত্যা করে।’

সেদিন শহীদদের ধর্মীয় বিধানমতে দাফন পর্যন্ত করা যায়নি। তাদের মরদেহ একসঙ্গে মাটিচাপা দিয়ে গণকবর দেওয়া হয় বলে জানিয়েছেন গ্রামবাসী।

মুনতাসির মামুন সম্পাদিত মুক্তিযুদ্ধ কোষ এ ঘটনাটির উল্লেখ আছে এভাবে: ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ব্যাপকভাবে গণহত্যা চালায়। '৭১-এর ১১ সেপ্টেম্বর কুমিল্লার আমড়াতলি ইউনিয়নের ধনঞ্জয় খন্দকার বাড়ির ২৬ জন নারী-পুরুষ-শিশু হত্যা। মারফত, খন্দকার বাড়ি ছাড়াও অন্যান্য স্থানে হত্যা করা হয় আরও ১০ জনকে।

এখানের হিসাবে ৩৬ জন হলেও গণকবরের নাম ফলকে ‍শিশু সাজেদাসহ ৩৭ জনের কথা উল্লেখ আছে।

এলাকাবাসী ডেইলি স্টারের কাছে তাদের দাবির কথা উল্লেখ করে বলেছেন, একাত্তরের এই গণহত্যার স্মৃতি সংরক্ষণ ও তরুণ প্রজন্মকে উজ্জ্বীবিত করতে গণহত্যার স্থানটি আরও একটু বড় জায়গা নিয়ে প্রাচীর দিয়ে মুক্তিযুদ্ধা স্মৃতি পাঠাগার হতে পারে। তাতে স্বাধীনতার চেতনায় সমাজ আলোকিত হওয়ার পথ সহজ হবে বলেও মনে করেন তারা।

তথ্যসূত্র: মুক্তিযুদ্ধ কোষ, অনলাইন সারাক্ষণ, গণহত্যা-নির্যাতন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষণা কেন্দ্র

ইমরান  মাহফুজ,  কবি      গবেষক

Comments

The Daily Star  | English

Shakib, Rishad put Tigers on course for Super Eights

Shakib Al Hasan hit a commanding half-century to take Bangladesh to 159-5 against the Netherlands in their Group C match of the ICC T20 World Cup at the Arnos Vale Stadium in Kingstown today.

8h ago